আংশিক মেঘলা, তাপমাত্রা ২৭.২ °C
 
২৭ সেপ্টেম্বর ২০১৬, ১২ আশ্বিন ১৪২৩, মঙ্গলবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরে বিক্ষুব্ধ মাদ্রাসা ছাত্রদের তাণ্ডব

প্রকাশিত : ১৩ জানুয়ারী ২০১৬
ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরে বিক্ষুব্ধ মাদ্রাসা  ছাত্রদের তাণ্ডব
  • স্টেশন, হাসপাতাল ও ব্যাংকে হামলা ॥ গাড়ি ভাংচুর- আজ সকাল-সন্ধ্যা হরতাল

স্টাফ রিপোর্টার, ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে ॥ ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় মাদ্রাসার ছাত্র নিহতের ঘটনায় বিক্ষুব্ধ মাদ্রাসার ছাত্র-জনতা শহরের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, রেলস্টেশন, হাসপাতাল, ব্যাংক ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগ করেছে। পুলিশ ও র‌্যাবের গাড়ি ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়। ঘটনার প্রতিবাদে বুধবার সকাল-সন্ধ্যা হরতাল আহ্বান করা হয়েছে। অন্যদিকে পুলিশের ২ কর্মকর্তাকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে প্রত্যাহার করা হয়েছে বলে পুলিশের একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন। পুরো বিষয়টি তদন্তের জন্য পুলিশ সদর দফতরের নির্দেশে একটি তদন্ত টিম গঠন করা হয়েছে। মাদ্রাসা ছাত্র হত্যার প্রতিবাদে ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরে চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে। সকাল থেকে রাজধানী ঢাকা ও চট্টগ্রামের সঙ্গে দেশের পূর্বাঞ্চলের সকল প্রকার ট্রেন যোগাযোগ বন্ধ। সোমবার সন্ধ্যায় শহরের জেলা পরিষদ মার্কেটের মোবাইল দোকানের সামনে তুচ্ছ ঘটনায় এক মাদ্রাসার ছাত্রকে মারধর করা হয়। এর জের ধরে কিছু সংখ্যক মাদ্রাসার ছাত্র ঘটনাস্থলে গিয়ে প্রতিপক্ষকে মারধর করে। এ ঘটনায় নিউ মৌড়াইল এলাকার লোকজন দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে শহরের টিএ রোড এলাকায় তা-ব চালায়। তখন মাদ্রাসার ছাত্রদের সঙ্গে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা চালায়। মাদ্রাসার নেতৃবৃন্দ জানান, ছাত্রলীগ, যুবলীগের কর্মীরা পুলিশের সঙ্গে এসে মাদ্রাসার ছাত্রদের ওপর হামলা করে। অভিযোগ পাওয়া গেছে সংঘর্ষকালে দেশের প্রাচীনতম দিনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান জামেয়া ইউনুছিয়া মাদ্রাসা ভাংচুর করা হয়। এ সময় অন্তত ৫০/৬০টি ককটেল বিস্ফোরিত হয়। বন্ধ করে দেয়া হয় বিদ্যুত সরবরাহ। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ৫০৬ রাউন্ড রাবার বুলেট ও ৭৬ রাউন্ড টিয়ার শেল নিক্ষেপ করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। সংঘর্ষে পুলিশের ২৫ জনসহ কমপক্ষে ৭০ জন আহত হয়। গুরুতর আহত দুই পুলিশ সদস্য রাজিব ও মোশারফকে ঢাকায় প্রেরণ করা হয়। আহতরা গ্রেফতার আতঙ্কে শহরের বিভিন্ন প্রাইভেট ক্লিনিকে চিকিৎসা নেয়। জামেয়া ইউনুছিয়া মাদ্রাসার প্রিন্সিপাল মুফতি মাওলানা মোবারক উল্লাহ জানান, গভীর রাতে পুলিশ ও ছাত্রলীগের কর্মীরা মাদ্রাসার হিফজ বিভাগের মূল ফটক ভেঙ্গে প্রবেশ করে। পরে হিফজ বিভাগের ৮টি কক্ষের দরজা ভেঙ্গে ভেতরে প্রবেশ করে উপস্থিত ছাত্রদের বেধড়ক মারধর করে। এমনকি বুট দিয়ে কোন কোন ছাত্রের মাথা মাটিতে চেপে ধরে। মাদ্রাসার ৮ম শ্রেণীর ছাত্র হাফেজ মাসুদুর রহমানকে (২০) মাদ্রাসার তিন তলা থেকে লাথি মেরে রাস্তায় ফেলে দেয়া হয় বলে নিহতের সহপাঠীরা জানায়। গুরুতর আহত অবস্থায় রাত ২টায় ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা সদর হাসপাতালে নিয়ে আসলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। মঙ্গলবার সকালে মাদ্রাসার ছাত্র নিহতের খবর ছড়িয়ে পড়লে মাদ্রাসার বিক্ষুব্ধ ছাত্ররা এবং আশপাশ এলাকার লোকজন ভোর থেকেই শহরের টিএ রোড, হাসপাতাল রোড, কালীবাড়ি মোড়, মসজিদ রোড, কান্দিপাড়া রোড, মাদ্রাসা রোড, পাওয়ার হাউস রোডসহ শহরের সকল সড়কে রোড ডিভাইডার, বাঁশ ফেলে রাস্তা বন্ধ করে দেয়। শহরের দোকান ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেয়। এক পর্যায়ে বিক্ষুব্ধরা শহরে সকল প্রকার যানচলাচল বন্ধ করে দেয়। ব্রাহ্মণবাড়িয়া রেলস্টেশন ভাংচুর করে লাইনের হুক খুলে ফেলায় ঢাকার সঙ্গে সিলেট ও চট্টগ্রামের ট্রেন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। বেলা ১২টায় স্টেশনের সুইচ বোর্ড, কম্পিউটার, ১০টি সিটি টিভি ক্যামেরা, ভিআইপি কক্ষ, সিগন্যাল বাতি, টিকিট কাউন্টার ভাংচুর চালায়। পরে পার্সেল কক্ষের মালামাল এবং সমস্ত আসবাবপত্রে আগুন লাগিয়ে দেয়। শহরের দি আলাউদ্দিন সঙ্গীতাঙ্গনে ২টি অফিস কক্ষসহ মালামাল ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগ করে। মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কমপ্লেক্সের ব্যাংক এশিয়ার সাইন বোর্ড, ইন্ডাট্রিয়েল স্কুলের ৫টি পৃথক প্রতিষ্ঠানের অফিস কক্ষ, জেলা আওয়ামী লীগের অফিস ও সংসদ সদস্যের কার্যালয়, প্রশিকার অফিস, জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি মাহমুদুল হক ভূইয়ার বাড়ি, অর্ধসাপ্তাহিক পেন ব্রিজ অফিস, জেলা শিল্পকলা একাডেমি ব্যাপক ভাংচুর চালায়। শহরে জেলা আওয়ামী লীগের সমস্ত বিলবোর্ড ভেঙ্গে তাতে আগুন ধরিয়ে দেয়া হয়। শহরের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে ২ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন করা হলেও সকালে মাদ্রাসার ছাত্রদের ব্যাপক উপস্থিতিতে তারা পিছু হটে যায়। এ সময় বিক্ষুব্ধরা ফকিরাপুল উপর পুলিশকে ধাওয়া করে। পুলিশ পিছু হটে থানার গেটে অবস্থান নেয়। দুপুর প্রায় সোয়া একটা পর্যন্ত সদর থানা গেট এলাকায় পুলিশ অবরুদ্ধ অবস্থায থাকে। দুপুরের দিকে শহরের কাজীপাড়া থেকে ছাত্রলীগের কিছু কর্মী মাদ্রাসার ছাত্রদের ধাওয়া করে। আবার শুরু হয় ধাওয়া পাল্টাধাওয়া। এসময় পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ২০/২৫ রাউন্ড টিয়ারশেল ও রাবার বুলেট নিক্ষেপ করে। বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠে মাদ্রাসার ছাত্র-জনতা। এ সময় ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে বিজিবি, র‌্যাব, পুলিশের একটি টহল দল ঘটনাস্থলে পৌঁছে মাদ্রাসার ছাত্রদের নিবৃত্ত করে। বিকেল ৩টায় নিহত মাদ্রাসার ছাত্র মাসুদুর রহমানের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়। পরে তার সহপাঠীরা লাশ আনতে সদর হাসপাতালে গেলে লাশ দিতে অনীহা করে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। তখন বিক্ষুব্ধরা জেলা সদর হাসপাতাল ভাংচুর করে। বিকেল ৪টায় বিক্ষুব্ধ মাদ্রাসার ছাত্র-জনতা থানার অভ্যন্তরে ঢুকে র‌্যাবের একটি প্রাইভেট কার (ঢাকা-মেট্রো-ক-১১-৫৫৫১) ভাংচুর ও র‌্যাবের এক সদস্যকে মারধর করে। বিকেল সাড়ে ৪টায় ফকিরাপুলের উপর পুলিশের একটি রিকুইজিশন পিকআপ ভ্যান আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দেয় বিক্ষুব্ধরা। এসময় পুলিশ বিক্ষোভকারীদের লক্ষ্য করে প্রায় শতাধিক রাউন্ড টিয়ার শেল ও রাবার বুলেট নিক্ষেপ করে। রেলওয়ে সূত্র জানায়, চট্টগ্রাম থেকে ছেড়ে আসা ঢাকাগামী আন্তঃনগর সুবর্ণ এক্সপ্রেস ব্রাহ্মণবাড়িয়ার পাঘাচং রেলস্টেশন, সিলেট থেকে ছেড়ে আসা ঢাকাগামী কালনী এক্সপ্রেস আজমপুর রেলস্টেশন এবং ঢাকা থেকে চট্টগ্রামগামী কর্ণফুলী এক্সপ্রেস কিশোরগঞ্জের ভৈরব রেলস্টেশনে আটকা পড়েছে। মঙ্গলবার সকাল ৮টায় জামেয়া ইউনুছিয়া মাদ্রাসার শীর্ষ আলেমগণ এবং মাদ্রাসার পরিচালনা কমিটি এক জরুরী বৈঠক করে। বৈঠকে আজ বুধবার সকাল-সন্ধ্যা হরতালের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় সৃষ্ট পরিস্থিতিতে পুলিশ হেড কোয়ার্টার থেকে চট্টগ্রাম রেঞ্জের অতিরিক্ত ডিআইজি মাহবুবুর রহমানকে প্রধান করে ৩ সদস্য বিশিষ্ট একটি তদন্ত টিম গঠন করা হয়েছে। আগামী ৩ (তিন) দিনের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। বিকেল ৫টা ৫ মিনিটে শহরের কাজীপাড়াস্থ জেলা ঈদগাহ ময়দানের আলামা মনিরুজ্জামান সিরাজীর ইমামতিতে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। পরে তাকে নবীনগর উপজেলার বিদ্যাকূট ইউনিয়নের সেমন্তঘর গ্রামের পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়। ব্রাক্ষণবাড়িয়ার সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আকুল চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, একজন মাদ্রাসা ছাত্র নিহত হয়েছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক। জেলা প্রশাসক ডক্টর মোঃ মোশাররফ হোসেন বলেন, আমরা সমঝোতার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। মাদ্রাসার নেতৃবৃন্দের সঙ্গে যোগাযোগ হচ্ছে। এদিকে পুলিশ কর্মকর্তাদের একটি প্রতিনিধি দল মাদ্রাসা নেতৃবৃন্দের সঙ্গে সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলে জানান একজন কর্মকর্তা। সারা শহরে এখন থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে। চলছে পুলিশ, র‌্যাব, বিজিপির টহল। ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আল মামুন সরকার জনকণ্ঠকে বলেন, যারা বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর অফিসে হামলা চালিয়েছে তারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনা পরিপন্থী। এ ধরনের হামলা ন্যক্কারজনক। তিনি বলেন, পুলিশের সঙ্গে মাদ্রাসা ছাত্রদের সংঘর্ষের বিষয়ে আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগ জড়িত নয়।

প্রকাশিত : ১৩ জানুয়ারী ২০১৬

১৩/০১/২০১৬ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন

প্রথম পাতা



ব্রেকিং নিউজ: