মূলত মেঘলা, তাপমাত্রা ২৭.৮ °C
 
২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৬, ১১ আশ্বিন ১৪২৩, সোমবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

গ্রেগরি

প্রকাশিত : ৮ জানুয়ারী ২০১৬
  • সাযযাদ কাদির

গ্রেগরি নামের বিখ্যাত মানুষদের মধ্যে যিনি সবচেয়ে বিখ্যাত তিনি ত্রয়োদশ গ্রেগরি (১৫০২-১৫৮৫)- রোমের ভ্যাটিকান সিটিতে আসীন ক্যাথলিক চার্চের ২২৬তম পোপ। ১৫৭২ সালের ১৩ মে ক্যাথলিক খ্রীস্টান সম্প্রদায়ের ধর্মগুরুর দায়িত্ব গ্রহণ করে তা পালন করেছেন আমৃত্যু- মোট ১২ বছর ৩৩২ দিন। আসল নাম উগো বনকমপাইনি। জন্ম উত্তর ইতালি’র বোলোনিয়া’য়। বাবা ক্রিসটোফোরো বনকমপাইনি (১৪৭০-১৫৪৬), মা আনজেলা মারেসকালচি। পড়াশোনা করেছেন আইন বিষয়ে। ১৩৫০ সালে স্নাতক হওয়ার পর শিক্ষকতা করেছেন কয়েক বছর। তাঁর প্রণয়ীর নাম মাডডালেনা ফালচিনি, দু’জনের প্রেমজ সন্তান জাকোমো। এ ঘটনা অবশ্য চার্চের সঙ্গে তাঁর যুক্ত হওয়ার আগেকার।

উগো’র বয়স যখন ৩৬, তখন তাঁকে রোমে ডেকে পাঠান পোপ তৃতীয় পল (১৫৩৪-১৫৪৯)। প্রথমে বিচার ও ভাষা বিভাগে দায়িত্ব দেন, পরে তাঁকে উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দেন সালেরনো প্রদেশের কামপানিয়া’য়। পোপ চতুর্থ পল (১৫৫৫-১৫৫৯) তাঁকে যুক্ত করেন কারডিনাল কারলো কারাফা’র সঙ্গে। পোপ চতুর্থ পিউস (১৫৫৯-১৫৬৫) তাঁকে করেন ‘সান সিসটো ভেকিও’র কারডিনাল-প্রিস্ট, পাঠান ট্রেন্ট-এ আয়োজিত গুরুত্বপূর্ণ কাউনসিলে। এছাড়া পোপের নির্দেশে স্পেনের টলেডো যান কারডিনালের বিষয়াদি তদন্তে। সেখানে ভ্যাটিকানের দূত হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন রাজা দ্বিতীয় ফিলিপ (১৫৫৬-১৫৯৮)-এর দরবারে। ওই সূত্রে রাজার সঙ্গে যে সখ্য গড়ে ওঠে তা বিশেষ ভূমিকা পালন করেছে তাঁর পোপ-জীবনে।

পোপ পঞ্চম পিউস (১৫৬৬-১৫৭২)-এর মৃত্যুর পর কারডিনালদের সভা (‘কনক্লেইভ’)-য় পোপ হিসেবে বেছে নেয়া হয় কারডিনাল উগো বনকমপাইনি-কে। ‘মহান সংস্কারক’ পোপ প্রথম গ্রেগরি (৫৯০-৬০৪)-র প্রতি শ্রদ্ধাস্বরূপ তিনি গ্রহণ করেন ‘ত্রয়োদশ গ্রেগরি’ নাম। ওই মনোনয়ন সভা ছিল সংক্ষিপ্ত, শেষ হয়েছিল ২৪ ঘণ্টারও কম সময়ে। অনেকে মনে করেন, এর নেপথ্যে ছিল দ্বিতীয় ফিলিপের প্রভাব।

ওই সময়ে চার্চের যেমনটি প্রয়োজন ছিল ঠিক তেমন মানুষটিই ছিলেন গ্রেগরি। পূর্বসূরিদের তুলনায় তাঁর ব্যক্তিজীবন ছিল শুদ্ধ, নির্মল। সরল জীবন যাপন করে আদর্শ হয়ে উঠেছিলেন সকলের। এছাড়া আইন ও বিচার বিষয়ে গভীর জ্ঞান এবং ব্যবস্থাপনায় নিপুণ দক্ষতা থাকায় গুরুতর সব সমস্যার ক্ষেত্রেই দ্রুত ও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে পারতেন তিনি। তবে সব সময় যে তাতে সফল হয়েছেন তা নয়।

তুরস্কের ব্যাপারে বরাবরকার বিপদের আশঙ্কা প্রকাশ করলেও গ্রেগরি বেশি মনোযোগী ছিলেন প্রোটেস্টান্টদের বৈরিতা মোকাবিলার দিকে। ইংল্যান্ডের রানী এলিজাবেথ (রাজত্বকাল ১৫৫৮-১৬০৩)-কে গদিচ্যুত করার দ্বিতীয় ফিলিপের উদ্যোগে সর্বতো ভাবে সমর্থন যুগিয়েছেন তিনি। ফলে ইংরেজ প্রোটেস্টান্টদের কাছে রোমান ক্যাথলিক মাত্রই হয়ে উঠেছিল অবিশ্বাসের পাত্র, সম্ভাব্য বিশ্বাসঘাতক। আয়ারল্যান্ডে প্রোটেস্টান্টদের আবাদের বিরুদ্ধে ক্যাথলিকদের প্রতিরোধে সহায়তা দিতে ৮০০ সৈন্যের এক বাহিনীকে গ্রেগরি পাঠিয়েছিলেন যুদ্ধজাহাজে করে, কিন্তু তারা পরতুগালের রাজা সিবাসতিয়ান-এর পক্ষে যুদ্ধ করতে যায় মরক্কোর সম্রাট আবদুল মালিকের বিরুদ্ধে। ১৫৭৯ সালে মাত্র ৫০ সৈন্যের এক দলকে তিনি এক অভিযানে পাঠিয়েছিলেন আয়ারল্যান্ডে। সেখানকার কেরি অঞ্চলে নোঙ্গর ফেলতেই তাদের জাহাজ দখল করে নেয় ইংরেজ সৈন্যরা। তারপর নাবিক, সহগামী নারী-শিশুসহ সবাইকে ফাঁসি দিয়ে ও গলা কেটে হত্যা করা হয় সঙ্গে-সঙ্গে। তবে ইউরোপজুড়ে কলেজ ও যাজকদের শিক্ষাশ্রম প্রতিষ্ঠা নিঃসন্দেহে গ্রেগরির মহত্তম সাফল্য।

১৫৭০ সালে পোপ পঞ্চম পিউস ‘রেগনান্স ইন এক্সসেলসিস’ অনুশাসনের মাধ্যমে ধর্মচ্যুত করেন রানী এলিজাবেথকে। ১৫৮০ সালে ইংরেজ জেসুইট ((‘যিশু সংঘে’র সদস্য)-রা ধরে বসেন গ্রেগরিকে, ‘ওই অনুশাসনটি হয় নমনীয় নয় বাতিল করুন।’ তাঁদের বলা হয়, ‘রানীকে গদিচ্যুত করার সময় ও সুযোগ না আসা পর্যন্ত সকল সরকারী বিষয়াদিতে রানীকে আপাত ভাবে মেনে চলুন।’ ১৫৮২ সালে রানীকে হত্যার যে ষড়যন্ত্র করেন হেনরি, ডিউক অভ গাইস ও চার্লস, ডিউক অভ মায়েন- অভিযোগ করা হলেও তাতে জড়িত ছিলেন না গ্রেগরি।

১৫৮০ সালে ভাটিকানের বাসিলিকা অভ সেন্ট পিটারে নয়নাভিরাম গ্রেগরিয়ান চ্যাপল নির্মাণ করান গ্রেগরি, সম্প্রসারণ ঘটান রোমের কুইরিনাল প্রাসাদের। ডায়োক্লিটিয়ান স্নানাগারকে রূপান্তরিত করেন শস্যভা-ারে। পুত্র জাকোমোকে সান টানজেলো দুর্গের প্রশাসক ও চার্চের ‘গনফালোনিয়ার’ নিয়োগ করেন তিনি। গ্রেগরিকে খুশি করতে ভেনিসের সমাজ জাকোমোকে দেয় আভিজাত্যের মর্যাদা। দ্বিতীয় ফিলিপ সেনাধ্যক্ষ নিয়োগ করেন তাঁকে। পুত্রকে প্রভাবশালী সামন্তপ্রভু হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে নেপলস-এর সীমান্তবর্তী ডাচি অব সোরা এক লাখ রৌপ্যমুদ্রায় কিনে নেন গ্রেগরি। তবে চার্চ-সংশ্লিষ্ট শিক্ষা-সংস্কৃতি-স্থাপত্য ক্ষেত্রে অনেক স্থাপনা, নির্মাণ, সংস্কার ও প্রবর্তন-প্রচলন করে ভ্যাটিকানের ভাবমূর্তি তিনি গরিয়ান করে তোলেন দেশে-দেশে। জাপান, ফিলিপিন্সসহ এশিয়ার বিভিন্ন দেশে ক্যাথলিক চার্চের প্রচার ও প্রতিষ্ঠা করে স্মরণীয় হয়ে আছেন তিনি। তবে তাঁর নামকে বিশ্ববিখ্যাত করেছে গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার (বর্ষপঞ্জি)। তাঁর দ্বারা প্রবর্তিত বলে এটি পরিচিত ‘খ্রিস্টাব্দ’ নামে। আমাদের দেশে এর প্রচলন খ্রীস্টান ধর্মাবলম্বী ইংরেজদের শাসনকালে হয় বলে একে ‘ইংরেজি সন’ বা ‘খ্রিষ্টীয় সন’ বলি আমরা। ধর্মনিরপেক্ষতাবাদীরা একে খ্রিস্টাব্দ বলতে নারাজ। এই গ্রেগরিয়ান অব্দ বিশ্বব্যাপী প্রধান অব্দ হয়ে ওঠায় একে স্রেফ ‘অব্দ’ বলতে চান তাঁরা।

পোপ গ্রেগরির কাছে প্রচলিত জুলিয়ান বর্ষপঞ্জি সংস্কারের প্রস্তাব দিয়ে অনুমোদন পেয়েছিলেন দক্ষিণ-পশ্চিম ইতালির কালাব্রিয়া’র চিকিৎসক, জ্যোতির্বিদ, দার্শনিক ও পঞ্জি-বিশারদ আলোয়সিউস লিলিউস (আ. ১৫১০-১৫৭৬)। কিন্তু তাঁর মৃত্যুতে অসমাপ্ত থেকে যায় এ কাজ। এরপর জারমান জেসুইট গণিতবিদ ও জ্যোতির্বিজ্ঞানী ক্রিসটোফার ক্লাভিয়াস (১৫৩৮-১৬১২)-কে দায়িত্ব দিলে ওই কাজ এগিয়ে নিয়ে চূড়ান্ত করেন তিনি।

রোমান রাষ্ট্রনায়ক গাইয়াস জুলিয়াস সিজার (১০০ পূর্বাব্দ - ৪৪ পূর্বাব্দ) সেকালে প্রচলিত রোমান বর্ষপঞ্জি সংস্কার করে ৪৫ পূর্বাব্দে প্রবর্তন করেন জুলিয়ান বর্ষপঞ্জি। এই পঞ্জিতে প্রতিটি বছর ছিল ৩৬৫ দিন ৬ ঘণ্টা দীর্ঘ; কিন্তু আসলে এ দৈর্ঘ্য ৩৬৫ দিন ৫ ঘণ্টা ৪৯ মিনিট। ফলে বসন্তকালীন মহাবিষুবের তারিখ ১০ মার্চ থেকে সরতে-সরতে ১৩০০ বছরে পৌঁছয় ২১ মার্চে। এ হিসাবটি প্রমাণিত হয় ক্লাভিয়াসের পর্যবেক্ষণে। এরপর ১৫৮২ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি গ্রেগরি জারি করেন পোপের অনুশাসন ‘ইনটের গ্রাভিসিমাস’। ফলে ১৫৮২ সালের ৪ অক্টোবর বৃহস্পতিবারের পরের দিন ৫ অক্টোবর শুক্রবার না হয়ে ১০ দিন এগিয়ে গিয়ে দেখা দেয় ১৫৮২ সালের ১৫ অক্টোবর শুক্রবাররূপে। গ্রেগরির সংশ্লিষ্টতার কারণে শোধিত জুলিয়ান বর্ষপঞ্জি পরিচিতি পায় গ্রেগরিয়ান বর্ষপঞ্জি হিসেবে।

নতুন পঞ্জির বিরুদ্ধে অসন্তোষ দেখা দেয় তীব্র আকারে। অনেকেই ভাবেন, এই সুযোগে ভূস্বামীরা দেড় সপ্তাহের ভাড়া থেকে বঞ্চিত করবেন তাঁদের। তবে ক্যাথলিক রাজ্যগুলোর মধ্যে স্পেন, পর্তুগাল, পোলান্ড ও ইতালি একে মেনে নেয় সঙ্গে-সঙ্গে। ফ্রান্স, ডাচ প্রজাতন্ত্রের কয়েকটি রাজ্য, জারমানি ও সুইজারলান্ডের বিভিন্ন ক্যাথলিক রাজ্য নতুন অব্দ চালু করে এক-দু’ বছরের মধ্যে। হাঙ্গারিতে চালু হয় ১৫৮৭ সালে।

তবে প্রোটেস্ট্যান্ট দেশগুলোর এ অব্দ গ্রহণ করতে কেটে যায় ১০০ বছরের বেশি। ডেনমার্ক, ডাচ প্রজাতন্ত্রের বাকি রাজ্যগুলো, হোলি রোমান এম্পায়ার (জারমান জাতি অধ্যুষিত রাজ্যসমূহ) ও সুইজারলান্ডের অন্যান্য রাজ্যে এ পঞ্জি চালু হয় ১৭০০-০১ সালে। এর মধ্যে দুই অব্দের পার্থক্য ১০ থেকে দাঁড়ায় ১১ দিনে। গ্রেট ব্রিটেন ও তাদের উপনিবেশগুলোতে সংস্কার আসে ১৭৫২ সালে। সেখানে ১৭৫২ সালের ২ সেপ্টেম্বর বুধবারের পরদিন হয় ১৭৫২ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর বৃহস্পতিবার। শেষ প্রোটেস্ট্যান্ট দেশ সুইডেন গ্রহণ করে ১৯৫৩ সালের ১ মার্চ।

প্রাচ্যদেশীয় খ্রীস্টান দেশগুলোতে গ্রেগরিয়ান অব্দ স্বীকৃতি পায়নি কয়েক শ’ বছর কেটে গেলেও। তারপরও এর যে ব্যবহার চলছে তা কেবল সরকারি কাজে। রাশিয়ায় ১৯১৭ সালে এ অব্দ চালু করে বলশেভিকরা, রোমানিয়ায় রাজা ফারদিনান্দ চালু করেন ১৯১৯ সালে (সেখানে ওই বছরের ১ নভেম্বর হয় ১৪ নভেম্বর), ১৯২৩ সালে তুরস্কে চালু করেন কামাল আতাতুর্ক, এ বছর চালু হয় গ্রিসেও। কোন-কোন ইস্টার্ন অরথোডক্স চার্চ গ্রেগরিয়ান পঞ্জি অনুযায়ী একই তারিখে পালনীয় পর্বগুলো উদযাপন করলেও পরিবর্তনীয় তারিখের পর্বগুলো পালন করে জুলিয়ান পঞ্জি অনুসারে।

প্রকাশিত : ৮ জানুয়ারী ২০১৬

০৮/০১/২০১৬ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: