আংশিক মেঘলা, তাপমাত্রা ২৭.২ °C
 
২৭ সেপ্টেম্বর ২০১৬, ১২ আশ্বিন ১৪২৩, মঙ্গলবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

সুই সুতার ফোঁড়নে স্বপ্ন বুনন- বাড়তি আয়, স্বাবলম্বী নারী

প্রকাশিত : ১ ডিসেম্বর ২০১৫
সুই সুতার ফোঁড়নে স্বপ্ন বুনন- বাড়তি আয়, স্বাবলম্বী নারী
  • নকশী কাঁথার গ্রাম

মামুন-অর-রশিদ

সুই-সুতার ফোঁড়নে নয়নাভিরাম রঙিন কারুকাজ যেন স্বপ্নের সুন্দরের কথা জানিয়ে দিচ্ছে। পাড়াগাঁওয়ের মেয়েরা এ স্বপ্ন বুনে চলেছেন। তাদের মুখে মুখে গল্প। হাসিভরা মুখ। সবার কাছেই একটি করে নকশীকাঁথা। সেই কাঁথায় চলছে সুই-সুতার ফোঁড়ন। মনের মাধুরী মিশিয়ে তারা তৈরি করে চলেছেন নকশীকাঁথা।

রাজশাহীর তানোর উপজেলার বাধাইড় ইউনিয়নের বদলপুর যেন নকশীকাঁথারই গ্রাম। এই নকশীকাঁথা এ গ্রামের নারীদের বেঁচে থাকার দিশা দেখিয়েছে। আর এর মাধ্যমে তারা পেয়েছে বেঁচে থাকার প্রেরণা। তবে গ্রামটিতে প্রবেশের রাস্তাটুকুও মাটির। সরু, চিকন রাস্তার দুধারে ধানের জমি। এরই ফাঁকে ফাঁকে একের পর এক বাড়ি। কোন কোন স্থানে লাগালাগি বাড়ি। এখানে প্রায় ৯৫ ভাগই ছোট ছোট মাটির বাড়ি। মাঝে মাঝে দুই-একটি আধা-পাকা টিনশেড বাড়ি চোখে পড়ে।

এই গ্রামে ঢুকতেই প্রথমে চোখে পড়বে একটি দৃশ্য তা হলো নারী ও কিশোরীদের হাতে হাতে নকশীকাঁথা আর সুই-সুতা। অবসরে বাড়ির ভেতরে অথবা আনাচে-কানাচে বসে এসব নারী-কিশোরীরা ব্যস্ত নকশীকাঁথার বুননে। গোল হয়ে কিংবা সারিবদ্ধভাবে কয়েকজন নারী একসঙ্গে বসে কাঁথা সেলাই করছেন। গ্রামটির ভেতর দিয়ে চলে যাওয়া সরু চিকন মাটির রাস্তা দিয়ে যেতে থাকলেই এমন দৃশ্যের দেখা মিলবে। যেন নকশীকাঁথার গ্রাম এটি।

রাজশাহী শহর থেকে প্রায় ৪৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত তানোর উপজেলার চক বাধাইড় বদলপুর গ্রাম। গ্রামের প্রায় শতভাগ নারী-কিশোরী এখন নকশীকাঁথার সঙ্গে জীবনকে বেঁধে ফেলেছেন। তানোর উপজেলা সদর থেকে প্রায় ৯ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত মন্ডুমালা পৌরসভা। মন্ডুমালা পৌর সদর থেকে আরও প্রায় ৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত বদলপুর গ্রাম।

গ্রামের হাজার খানেক মানুষের মধ্যে নারী ও কিশোরীরা সবাই এখন নকশীকাঁথা সেলাই করে বাড়তি উপার্জন করেন। অনেকের সংসারই চলছে এ নকশীকাঁথা সেলাইয়ের ওপর। আবার কারও কারও সংসারে খরচ মেটাতে সাহায্য করছে নকশীকাঁথা। নারী ও কিশোরীরাই এ গ্রামের নকশীকাঁথার কারিগর। গ্রামবাসী জানান, এই গ্রামের কোন নারী ও কিশোরীরা আর বসে থেকে সময় কাটান না। সবাই সুযোগ পেলেই হাতে তুলে নেন নকশীকাঁথার সুই-সুতা। এই কাঁথা সেলাই অবস্থায় নারী ও কিশোরীরা খোশগল্পেও মেতে উঠেন।

নকশীকাঁথার নাম এলেই এখন প্রথমে আসে এই গ্রামের দানেশ মোল্লার স্ত্রী গুলনেহার বেগমের নাম। তিনি বছর তিনেক আগ নারী-কিশোরীদের মাঝে নকশীকাঁথা সেলাই কাজ ছড়িয়ে দেন। এর আগে প্রায় ২০ বছর ধরে গুলনেহার নকশীকাঁথা তৈরি করে সংসার চালিয়ে আসছেন। ৬ মেয়ে ও ১ ছেলেকে অল্প করে লেখাপড়া শেখানোর পাশাপাশি সংসারও চালিয়েছেন সেই নকশীকাঁথার আয় দিয়ে। এখনও ছাড়েননি সেই নকশীকাঁথার সুই-সুতা।

গুলনেহার বেগম জানালেন, প্রায় ২০ বছর আগে তার স্বামী যখন মারা যান, তখন তার সংসারে ৭ ছেলে- মেয়ে। সবাই শিশু। স্বামীর মৃত্যুর পর শিশুদের নিয়ে যেন আকাশ ভেঙে পড়ে গুলনেহারের মাথায়। উপায়ন্তর না দেখে তিনি ছুটে যান বাবার বাড়ি চাঁপাইনবাবগঞ্জের কালিনগর গ্রামে। সেখান থেকেই নকশীকাঁথা তৈরির অনুপ্রেরণা নিয়ে আবার বদলপুরে ফিরেন গুলনেহার।

গুলনেহার জানান, চাঁপাইনববাবগঞ্জের কালিনগর গ্রামের কয়েক ব্যবসায়ী ওই গ্রামের নারীদের তৈরি করা নকশীকাঁথা কিনে ঢাকা, চট্টগ্রাম সিলেটসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিক্রি করতেন। গুলনেহার এ রকম কয়েক ব্যবসায়ীর সঙ্গে কথা বলে তিনিও বাড়িতে এসে নকশীকাঁথা তৈরির কাজ শুরু করবেন বলে সিদ্ধান্ত নেন। এরপর বাড়িতে ফিরে বাজার থেকে কাপড় ও সুই-সুতা নিয়ে নেমে পড়েন নকশীকাঁথা সেলাই কাজে। প্রথমে একটি কাঁথা সেলাই করে গুলনেহার বিক্রি করতেন ২৫০ টাকায়। আর কাপড়, সুই-সুতা কিনতে তাঁর খরচ হতো ১০০ টাকা। প্রায় এক মাসে সমানতালে কাজ করে ওই কাঁথাটি সেলাই করেন তিনি। এরপর সেটি চাঁপাইনবাবগঞ্জের কালিনগর গ্রামে গিয়ে বিক্রি করেন। তখন থেকেই নিজে ও মেয়েদের নিয়ে কাঁথা সেলাই করেই সংসার চালাতেন গুলনেহার। এরই মধ্যে ৬ মেয়ে ও ১ ছেলেকে ষষ্ঠ থেকে সপ্তম শ্রেণী পর্যন্ত পড়াশোনা করিয়ে একে একে বিয়েও দিয়েছেন। এখন তার সেই কাঁথা গোটা গ্রামে ছড়িয়ে পড়েছে।

গুলনেহার বেগম আরও জানান, বছর তিনেক আগে গ্রামের কয়েক নারী ও কিশোরীরাও তার কাছ থেকে সুই-সুতা ও কাপড় নিয়ে কাঁথা তৈরি করার প্রস্তাব দেন। বিনিময়ে গুলনেহারের নিকট থেকে মজুরিও দাবি করেন তারা। সেই থেকে গ্রামের নারী-কিশোরীদের কাপড়, সুই-সুতা কিনে দিয়ে কাঁথা তৈরি করে নেন গুলনেহার। পাশাপাশি নিজেও তৈরি করেন। আর তৈরি করা এসব নকশীকাঁথা গুলনেহার নিয়ে বিক্রি করে আসেন চাঁপাইনবাবগঞ্জের কালিনগর গ্রামের ব্যবসায়ীদের কাছে।

গুলনেহার বেগম বলেন, এখন আমার সংসারে আর কোন অভাব নেই। মাসে অন্তত ৫০টি কাঁথা বিক্রি করেই আয় হয় ৮ থেকে ১০ হাজার টাকা। এই দিয়েই আমার সংসার খুব ভালভাবেই চলছে। তিনি জানান, এখন একটি কাঁথা তৈরি করতে কাপড় ও সুতা মিলে খরচ হয় প্রায় ৭০০ টাকা। আর মজুরি দিতে হয় ৫০০-৬০০ টাকা। সবমিলিয়ে প্রায় ১৪০০ টাকা খরচ হয়। সেটি বিক্রি হয় ১৫০০-১৬০০ টাকায়। আবার একটু ভালমানের কাপড় দিয়ে তৈরি করা কাঁথার সেলাই মজুরি ৮০০ টাকাসহ খরচ হয় প্রায় ১৬০০ টাকা। সেটি বিক্রি হয় ১৮০০ থেকে ২০০০ টাকায়। এখন ওই গ্রামের প্রায় নারী অবসরেও ব্যস্ত থাকেন নকশীকাঁথা নিয়ে।

প্রকাশিত : ১ ডিসেম্বর ২০১৫

০১/১২/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন

শেষের পাতা



ব্রেকিং নিউজ: