আংশিক রৌদ্রজ্জ্বল, তাপমাত্রা ২৮.৯ °C
 
২২ ফেব্রুয়ারী ২০১৭, ১০ ফাল্গুন ১৪২৩, বুধবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

চলচ্চিত্র পরিচালক রবীন্দ্রনাথ

প্রকাশিত : ৪ সেপ্টেম্বর ২০১৫
  • জোবায়ের আলী জুয়েল

রবীন্দ্রনাথের মূল ও প্রাথমিক পরিচয় কবি হিসেবে। বাংলা ভাষা, সাহিত্য, উপন্যাস, গল্প, নাটক, সঙ্গীত, সুর, চিত্রকলা, শিক্ষা, দর্শন তাঁর দানে হয়েছে সমৃদ্ধ। উপমহাদেশের চলচ্চিত্র শিল্প তাঁর কালে সমৃদ্ধ হয়েছে। তাঁর কাহিনী, গান ও সুর ব্যবহৃত হয়েছে চলচ্চিত্রের নির্বাক ও সবাক যুগে।

১৯৩০ সালের ২৬ জুলাই রবীন্দ্রনাথের কাহিনী অবলম্বনে প্রথম বাংলা নির্বাক চলচ্চিত্র ‘দালিয়া’ মুক্তি পায়। রবীন্দ্রনাথের কাহিনী অবলম্বনে ১৯৩২ সালে প্রথম সবাক চলচ্চিত্র ‘চিরকুমার সভা’ মুক্তি লাভ করে।

রবীন্দ্রনাথ কি চলচ্চিত্র পরিচালনা করেছিলেন? এমন প্রশ্ন অনেক গবেষকের। সাম্প্রতিককালের গবেষণায় জানা গেছে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর জীবনে একটি মাত্র চলচ্চিত্র পরিচালনা করেছিলেন, সেটি ছিল ‘নটীর পূজা’। মূলত এটি তাঁরই লেখা নাটক।

জেনে রাখা ভালো, রবীন্দ্রনাথ তাঁর কাহিনী নিয়ে নির্মিত ছায়াছবিতে অভিনয়ও করেছেন। তাঁর নাটক ‘তপতী’ ব্রিটিশ ডমিনিয়ন ফিল্মস লিমিটেড ১৯২৯ সালের চলচ্চিত্রে রূপান্তরিত করেছিল। যে ছবির শূটিং হয় শান্তিনিকেতনে ১৯২৯ সালে। কবি এতে প্রধান ভূমিকায় অভিনয় করেন। ৮ রিলের ছায়াছবির হাত ধরেই রুপালি পর্দায় কবির প্রথম আবির্ভাব।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রায় ৭০ বছর বয়সে পরিচালনা করলেন একটি চলচ্চিত্র। চলমান ছবিই কথা বলবে, এই বিষয়টি আকৃষ্ট করল রবীন্দ্রনাথকে। চলচ্চিত্র যখন বিকশিত হচ্ছে সে সময়ই ছবি পরিচালনা করলেন রবীন্দ্রনাথ। এর আগে শান্তিনিকেতনে শিক্ষার্থীরাই অভিনয় করেছিলেন এই ‘নটীর পূজা’ নৃত্যনাট্যে। সেকালের নামকরা চিত্রশিল্পী নন্দলাল বসুর কন্যা গৌরীবসু সে নৃত্যনাট্যে অসাধারণ অভিনয় করেছিলেন। সে সময় রক্ষণশীল ভদ্র সমাজের মেয়েরা প্রকাশ্যে নাচের মঞ্চে আসত না। রক্ষণশীল সমাজে এই নৃত্যনাট্যটি মঞ্চস্থ করার জন্য রবীন্দ্রনাথ শুধু মেয়েদের দিয়েই অভিনয় করেছিলেন। এই নাটকটি বহুবার মঞ্চস্থ হয়েছে চিত্ররূপ দেয়ার আগে। স্টেজে মঞ্চায়ন করার কালে রবীন্দ্রনাথ স্বয়ং ‘উপালী চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন। তৎকালীন বিশ্বভারতীর সাহায্যার্থে (১৯২১ সালের ২২ ডিসেম্বর বিশ্বভারতী প্রতিষ্ঠিত হয়) বেশ কয়েকবার মঞ্চস্থ হয়েছিল এ নাটকটি। ‘নটীর পূজা’ সে সময়ের সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গিকে কিছুটা পরিবর্তন করে শিক্ষিত মেয়েদের প্রকাশ্য রঙ্গালয়ে অবতীর্ণ হওয়ার পথকে সুগম করেছিল এতে কোন সন্দেহ নেই। আর এই অনুকূল বার্তাবরণ সৃষ্টিতে রবীন্দ্রনাথ ছিলেন পথিকৃতের ভূমিকায়।

নিউ থিয়েটার্সের স্বত্বাধিকারী এবং প্রধান কর্ণধার বীরেন্দ্রনাথ সরকার (বি.এন সরকার) নৃত্যনাট্যটির অভিনয়ের সুখ্যাতিতে মুগ্ধ হয়ে কবিকে অনুরোধ জানালেন তাঁর নিউ থিয়েটারের ব্যানারে এবং রবীন্দ্রনাথের পরিচালনায় ‘নটীর পূজার’ মঞ্চরূপকে ছায়াছবিতে পরিণত করার। সঙ্গে এটিও প্রস্তাব ছিল এই ছায়াছবির টিকেটের বিক্রয়লব্ধ অর্থ থেকে যা লাভ হবে তার অর্ধেক রবীন্দ্রনাথের শ্রী নিকেতনের সাহায্যার্থে দান করা হবে। কবি সম্মতি দিলে শূটিং শুরু হয় নিউ থিয়েটার্সের স্টুডিওর ১ নম্বর ফ্লোরে। এর আগে গোলঘর তৈরি করা হয়। রবীন্দ্রনাথ শূটিংয়ের ফাঁকে এই খড়ের চালের গোলঘরে বিশ্রাম নিতেন। এটি ছিল সে সময়কার নিউ থিয়েটার্সের রবীন্দ্র স্মৃতিধন্য বিখ্যাত গোলঘর। কবি এই অভিজ্ঞতা ও স্টুডিওর মনোরম পরিবেশ দেখে বলেছিলেন, ‘এটা আমার দ্বিতীয় শান্তিনিকেতন।’

নিউ থিয়েটার্সের ১ নম্বর ফ্লোরে চলচ্চিত্র পরিচালনা করছেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ, এই খবর রটে গেল সর্বত্র। অগণিত দর্শনার্থী এসে হাজির হলো সেখানে। নিউ থিয়েটার্সের ২৫ সদস্যের দলটি ৫ দিন এক নাগাড়ে শূটিং করে ছবিটি শেষ করল।

‘নটীর পূজা’র মঞ্চস্থরূপ মুভিক্যামেরায় ধারণ করা হয়েছিল। ক্যামেরাম্যান ছিলেন নিতেন বসু। সঙ্গে ছিলেন ইউসুফ মুলাজী। আর সম্পাদনায় ছিলেন সূবাধ মিত্র। কবিকে ল্যাবরেটরিতে নিয়ে গিয়েছিলেন সূবাধ মিত্র। তাঁর চেয়ারে বসেই কবি সম্পাদিত ফিল্মগুলো গভীর মনোযোগ দিয়ে পরীক্ষা করেছিলেন।

১৯৩১ সালের শেষের দিকে রবীন্দ্রনাথ ‘নটীর পূজা’র শূটিং শুরু করেন। আর এটি সেন্সর সার্টিফিকেট লাভ করে ১৯৩২ সালের ১৪ মার্চ। এর দৈর্ঘ্য ছিল ১০ হাজার ৫৭৭ ফুট। ‘নটীর পূজা’ ১৯৩২ সালের ২২ মার্চ কলকাতার ‘চিত্রা’ সিনেমা হলে মুক্তি লাভ করে। ‘নটীর পূজা’য় অভিনয় করেছিলেন শান্তিনিকেতনের ছাত্রছাত্রীরা। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্যরা হলেনÑ ললিতা সেন (শ্রীমতি), সুমিতা চক্রবর্তী (লোকেশ্বরী), লীলা মজুমদার প্রমুখ। ছবির সঙ্গীত পরিচালনা করেন দিনেন্দ্রনাথ ঠাকুর আর শব্দ গ্রহণ করেন মুকুল বসূ। তবে চলচ্চিত্রের কলাকৌশল ও রীতিনীতি কতটা অনুসৃত হয়েছিল সে সম্পর্কে বিশেষ কিছু জানা যায় না। কারণ ‘নটীর পূজা’ চিত্রের প্রিন্ট চিরতরে হারিয়ে গেছে।

১৯৪০ সালে নিউ থিয়েটার্সে আগুন লেগে গেলে অনেক ছবির প্রিন্টের সঙ্গে ‘নটীর পূজার’ নেগেটিভও পুড়ে যায়। এখন শুধু একটি আংশিক ১৬ মিলি মিটার ফিল্ম রাখা আছে রবীন্দ্র ভবনে। তবে রবীন্দ্র স্মৃতিধন্য সেই খড়ের চালের গোলঘর হারিয়ে গেছে কয়েক বছর আগে চিরদিনের জন্য।

তথ্যসূত্র :

ক. রবীন্দ্রনাথ ও চলচ্চিত্র : অনুপম হায়াৎ, দিব্য প্রকাশন-২০০৮ খ্রি।

খ. চিত্রপরিচালক রবীন্দ্রনাথ (প্রবন্ধ) : মাহবুব আলম।

গ. বিচিত্র রবীন্দ্রনাথ : জাহিদ রেজা নূর।

প্রকাশিত : ৪ সেপ্টেম্বর ২০১৫

০৪/০৯/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: