আংশিক রৌদ্রজ্জ্বল, তাপমাত্রা ২৮.৯ °C
 
২২ ফেব্রুয়ারী ২০১৭, ১০ ফাল্গুন ১৪২৩, বুধবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

স্বরূপ অন্বেষায় অক্ষয় কুমার মৈত্রেয়

প্রকাশিত : ৪ সেপ্টেম্বর ২০১৫
  • জাফর ওয়াজেদ

(পূর্ব প্রকাশের পর)

ইতিহাসবিদ অক্ষয় কুমার মৈত্রেয় সম্পর্কে বরেণ্য ইতিহাসবিদ রমেশচন্দ্র মজুমদার যথাযথ মূল্যায়নই করেছেন। লিখেছেন, “সংস্কৃত ভাষায় তাঁহার যথেষ্ট বুৎপত্তি ছিল এবং বাংলা ও সংস্কৃত সাহিত্যের নানা বিভাগের তিনি পা-িত্যপূর্ণ আলোচনাও করিয়াছেন। কিন্তু বিশেষভাবে ঐতিহাসিক রচনার জন্যই বিখ্যাত। ‘সিরাজদ্দৌলা’ (১৮৯৮ খ্রি.) ও ‘মীর কাসিম’ (১৯০৬) নামক দুইখানি ঐতিহাসিক গ্রন্থ লিখিয়া তিনি বিদ্বৎ-সমাজে বিশেষ খ্যাতি লাভ করেন। মূল দলিল দস্তাবেজের সাহায্যে তিনি ইহাদের প্রকৃত ইতিহাস উদ্ধারের চেষ্টা করেন এবং প্রচলিত অনেক ধারণা ভ্রান্ত বলিয়া প্রতিপন্ন করেন। বাংলা ভাষার এই রূপ বিজ্ঞানসম্মত প্রণালীতে ইতিহাস রচনার তিনিই পথ প্রদর্শক। তাঁহার পরবর্তীকালের রচনা ‘গৌড় লেখমালা’ (১৯১২ খ্রি.) তাঁহার অপূর্ব পা-িত্যের পরিচায়ক। এই গ্রন্থে বাংলার পালরাজাগণের তাম্রশাসন ও শিলালিপি বাংলা অনুবাদসহ প্রকাশ করিয়া তিনি বাংলার ইতিহাস সম্বন্ধে গবেষণার পথ সুগম করিয়াছেন।”

রবীন্দ্রনাথ যখন ‘ভারতী’ পত্রিকা সম্পাদনার দায়িত্বভার নেন, তখন কবি-সম্পাদকের অনুরোধে অক্ষয় কুমার ‘ঐতিহাসিক চিত্র’ সম্পাদনার দায়িত্ব নেন। এটি ছিল ত্রৈমাসিক। এই পত্রিকা সম্পর্কে বরেণ্য ইতিহাসবিদ রমেশচন্দ্র মজুমদার মন্তব্য করেছিলেন, “বাংলা ভাষায় বিজ্ঞানসম্মত প্রণালীতে ইতিহাস চর্চার প্রসারের জন্য অক্ষয় কুমার ১৮৯৯ খ্রিস্টাব্দে রবীন্দ্রনাথের সহায়তায় ‘ঐতিহাসিক চিত্র’ নামক একখানি ত্রৈমাসিক পত্রিকা প্রকাশ ও সম্পাদনা শুরু করেন। বাংলা ভাষায় এই রূপ চেষ্টা এই প্রথম।” ইতিহাস লিখতেন শাসক ইংরেজরা এবং তা তাদের স্বকল্পিত এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। অক্ষয় কুমার কল্পনাশ্রয়ী ও বিকৃতি থেকে বাংলা ইতিহাসকে সত্যসন্ধ করার অভিপ্রায়ে প্রাগ্রসর ভূমিকা নিয়েছিলেন। ‘ঐতিহাসিক পত্র’র প্রস্তবনায় অক্ষয় কুমার উল্লেখ করেছিলেন, ‘আমাদের ইতিহাসের অনেক উপকরণ বিদেশীয় পরিব্রাজকগণের গ্রন্থে লিপিবদ্ধ; তাহা বহুভাষায় লিখিত বলিয়া আমাদের নিকট অপরিজ্ঞাত ও অনাদৃত। মুসলমান বা ইউরোপীয় সমসাময়িক ইতিহাস লেখকগণ যে সকল বিবরণ লিখিয়া গিয়াছেন, তাহারও অদ্যাপি বঙ্গানুবাদ প্রকাশিত হয় নাই। পুরাতন রাজবংশের কাগজপত্রের মধ্যে যে সকল ঐতিহাসিক তত্ত্ব লুক্কায়িত আছে তাহার অনুসন্ধান লইবারও ব্যবস্থা দেখা যায় না।... নানা ভাষায় লিখিত ভারত ভ্রমণকাহিনী ও ইতিহাসাদি প্রামাণ্য গ্রন্থের অনুবাদ; অনুসন্ধানলব্ধ নবাবিষ্কৃত ঐতিহাসিক তথ্য, আধুনিক ইতিহাসাদির সমালোচনা এবং বাঙালী রাজবংশ ও জমিদার বংশের পুরাতত্ত্ব প্রকাশিত করাই (এই প্রস্তাবিত পত্রের) মুখ্য উদ্দেশ্য।’ রবীন্দ্রনাথ এই উদ্যোগকে সমর্থন জানিয়ে প্রবন্ধ লিখলেন। প্রাচীন গ্রীস রোম এবং আধুনিক প্রায় সকল সভ্য দেশেই ইতিহাসের প্রতি পক্ষপাত যেরূপ প্রকাশ পেয়েছে, ভারতবর্ষে কখনও তেমন ছিল না বলে রবীন্দ্রনাথ আক্ষেপ করেছেন। তথাপি বাংলা সাহিত্যে সমকালে যে একটি ইতিহাস উৎসাহ জেগে ওঠেছে, তার মধ্যে সর্বজনীন সুলক্ষণ প্রকাশ পাচ্ছে বলে তাঁর মনে হয়েছে। এই ইতিহাস বুভুক্ষাকে তিনি অঙ্কুর হিসেবেই চিহ্নিত করেছেন। অক্ষয় কুমার মৈত্রের ঐতিহাসচিত্রকে যুগান্তকারী কর্ম বলে অভিহিত করে রবীন্দ্রনাথ লিখলেন, “নিজের সম্বন্ধে সচেতন হইয়া এক্ষণে আমরা দেশে এবং কালে একরূপে এবং বিরাট রূপে আপনাকে উপলব্ধি করিতে উৎসুক। এখন আমরা মোগল রাজত্বের মধ্যে দিয়া পাঠান রাজত্ব ভেদ করিয়া সেনবংশ পালবংশ গুপ্তবংশের জটিল অরণ্য মধ্যে পথ করিয়া পৌরাণিক কাল হইতে বৌদ্ধ কাল এবং বৌদ্ধ কাল হইতে বৈদিক কাল পর্যন্ত অখ- আপনার অনুসন্ধানে বাহির হইয়াছি। সেই মহৎ আবিষ্কার ব্যাপারে নৌযাত্রায় ‘ঐতিহাসিক চিত্র’ একটি অন্যতম তরণী যে সকল নির্ভীক নাবিক ইহাতে সমবেত হইয়াছেন ঈশ্বর তাঁহাদের আশীর্বাদ করুন, দেশের লোক তাহাদের সহায় হউন এবং বাধাবিঘœ ও নিরুৎসাহের মধ্যেও অনুরাগ প্রবৃত্ত মহৎ কর্তব্য সাধনের নিষ্কাম আনন্দ তাঁহাদিগকে ক্ষণকালের জন্য পরিত্যাগ না করুক।... আমরা দেশকে প্রকৃতরূপে প্রত্যক্ষরূপে সম্পূর্ণরূপে জানিতে চাইÑ তাহার সমস্ত দুঃখ দুর্দশাগতির মধ্যেও তাহাকে লক্ষ করিতে চাইÑ আপনাকে ভুলাইতে চাই না।”

অক্ষয় কুমার মৈত্রেয় কথা ও কাজে সংগতি রেখে চলেছেন। ‘ঐতিহাসিক চিত্র’ পত্রিকার জন্য তিনি নিজে যেমন লিখেছেন, তেমনি অন্যদের সহায়তাও নিয়েছেন। ইতিহাস রচনায় সহযোগী সহকর্মীরাও ছিলেন সত্যনিষ্ঠ। রবীন্দ্রনাথ সেই কারণেই অক্ষয় কুমারের কর্মের দীর্ঘ মূল্যায়ন শেষে উল্লেখ করেছেন ‘ভারতী’ পত্রিকায়, ‘হউক বা না-হউক, আমাদের ইতিহাসকে আমরা পরের হাত হইতে উদ্ধার করিব, আমাদের ভারতবর্ষকে আমরা স্বাধীন দৃষ্টিতে দেখিব, সেই আনন্দের দিন আসিয়াছে।’ অক্ষয়কুমার বাংলার ইতিহাস পুনর্গঠনের নতুন আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন। আর সেই পথ ধরেই বাঙালির ইতিহাস চর্চার বিকাশ ও সম্প্রসারণ ঘটেছে বলা যায়।

অক্ষয় কুমার মৈত্রয়ের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের পরিচয় ঘটে ১৮৯২ সালে। এ বছরের নবেম্বর মাসে কবি প্রথম রাজশাহী শহরে আসেন। রাজশাহীর সে সময়ের জেলা জজ লোকেন পালিত ছিলেন যিনি আইসিএস এবং সাহিত্যমোদী, রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে ছিল হৃদ্যতা। তারই আমন্ত্রণে রবীন্দ্রনাথ রাজশাহীতে আসেন ১৩ নবেম্বর এবং ৩০ নবেম্বর পর্যন্ত মোট ১৮ দিন ছিলেন। লোকেন পালিতের বাসভবনে আয়োজিত কয়েকটি সাহিত্য আসরে অক্ষয় কুমারও যোগ দিয়েছিলেন। তাঁরই উদ্যোগে রাজশাহী এ্যাসোসিয়েশন কবিকে সংবর্ধনা প্রদান উপলক্ষে সাহিত্য সভার আয়োজন করে। এখানেই রবীন্দ্রনাথ শিক্ষা বিষয়ে রচিত ‘শিক্ষার হের ফের’ নামক তাঁর বিখ্যাত প্রবন্ধটি পাঠ করেন। তাছাড়া ‘প্রতীক্ষা’ কবিতাটিও রচনা করেন। অক্ষয় মৈত্রেয় ছিলেন এই এ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক। ১৮৭২ সালে প্রতিষ্ঠিত এই সংগঠনের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের আগেই যোগাযোগ ছিল। সাহিত্য সভায় সাহিত্যিক প্রমথ চৌধুরীও অতিথি হিসেবে ভাষণ দিয়েছিলেন। এই সভাতে রবীন্দ্রনাথ প্রস্তাব করেছিলেন যে, ‘আমাদের স্কুল-কলেজে বঙ্গভাষার সম্যক চর্চা হওয়া একান্ত কর্তব্য। অবশ্য বাস্তবতা ছিল সে যুগে যে, বঙ্গসন্তানের শিক্ষা বঙ্গভাষাতে হতো না। বাঙালী হিন্দু সংস্কৃত ও ইংরেজী এবং মুসলমান ফারসী ও আরবি ভাষায় শিক্ষা নিতোÑ অর্থ বোধগম্য হোক আর না হোক। প্রমথ চৌধুরী উল্লেখ করেছিলেন যে, রবীন্দ্রনাথের এ প্রস্তাব শুনে অনেকে হাসি সংবরণ করতে পারেননি, অনেকে আবার অসম্ভরূপ বিরক্তও হয়েছিলেন।

রবীন্দ্রনাথ রাজশাহীতে এসেছিলেন মোট চারবার। প্রথম সফরের মাস চারেক পরেই চৈত্রে রাজশাহী যান। ১৩, ১৫ ও ১৭ চৈত্র রচনা করেন ‘সুখ’, ‘ঝুলন’ এবং ‘সমুদ্রের প্রতি’ কবিতা। এরপর ১৮৯৪ সালের মার্চ মাসে সফরকালে লেখেন ‘এবার ফিরাও মোরে’ নামক বিখ্যাত কবিতাটি। একই বছরের সেপ্টেম্বরে আবার এসেছিলেন। রাজশাহী এ্যাসোসিয়েশন গোড়াতে ছিল, মূলত অতদঞ্চলের জমিদারদের সংগঠন। পরে অন্য ব্যক্তিত্বরা এতে যোগ দেন। আর সে কারণে আইনজীবী অক্ষয় কুমার মৈত্রেয় এর সাধারণ সম্পাদক হয়েছিলেন। অক্ষয় কুমার তার ‘সিরাজদ্দৌলা’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছিলেন, ‘সেকালে রাজশাহীর জমিদারিই এদেশে, এমনকি সমুদয় ভারতবর্ষে, সর্বাপেক্ষা সুবৃহৎ জমিদারি বলিয়া পরিচিত ছিল। তাহার চতুঃসীমা ভ্রমণ করিয়া আসিতে ৩৫ দিন সময় লাগিত।’ রাজশাহী অঞ্চলের জমিদাররা জনহিতার্থে গড়ে তুলেছিলেন রাজশাহী এ্যাসোসিয়েশন। বাঙালী জাতির ইতিহাস পুনর্নির্মাণ, পুরাতত্ত্ব উদ্ধারসহ শিক্ষা বিস্তারে যা রেখেছে বিশাল ভূমিকা। আর এক্ষেত্রে সাংগঠনিক ভূমিকা রেখেছিলেন অক্ষয় কুমার। সিপাহি বিদ্রোহের পনেরো বছর দীঘাপতিয়ার রাজা প্রমদানাথ রায়ের উদ্যোগে জমিদারদের সংগঠনটি গড়ে ওঠেছিল। মূলত জনকল্যাণমুখী তৎপরতার জন্য। পদ্মাপারের মানুষকে শিক্ষিত করে তোলা, শিল্পসাহিত্য সংস্কৃতির বিকাশ সাধন। এই এ্যাসোসিয়েশনের নিজস্ব ভবন, নাট্যমঞ্চ, নাট্যক্লাব এবং পাঠাগার ছিল। এই পাঠাগারটি একসময় বাংলার বৃহত্তম পাঠাগার ছিল। মহাত্মাগান্ধী, রবীন্দ্রনাথ, নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু, শরৎচন্দ্র, সরোজনী নাইডু এ পাঠাগার পরিদর্শন করেছিলেন।

১৮৭৬ সালে আনন্দ মোহন বসু, সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, শিবনাথ শাস্ত্রী প্রমুখের উদ্যোগে ‘ইন্ডিয়ান এ্যাসোসিয়েশন’ বা ভারত সভা প্রতিষ্ঠিত হলে রাজশাহীতে তার শাখা গঠিত হয়। সাধারণের মধ্যে জাতীয়তাবোধ ও রাজনৈতিক অধিকারবোধ জাগিয়ে তোলার লক্ষ্যে রাজশাহী শাখার সদস্য অক্ষয় কুমার মৈত্রেয় নিবেদিতপ্রাণ হিসেবে কর্মকুশলতায় নিজস্ব সৃষ্টিশীলতা আর সৃজনশীলতাকে কাজে লাগান। ইতিহাসচর্চায় তিনি পুরাতত্ত্ব সংগ্রহে উদ্যোগী হয়ে ওঠেন। ১৯০৭ সালে রাজশাহীতে অনুষ্ঠিত বঙ্গীয় সাহিত্য সম্মিলনে রামেন্দ্র সুন্দর ত্রিবেদী পৌন্ড্রবর্ধনের প্রকৃত পরিচয় উদ্ধারের আহ্বান জানিয়ে তাঁর ভাষণে বলেছিলেন, বাঙালী জাতির উৎপত্তিতত্ত্ব নিরূপণের জন্য উত্তরবঙ্গ হইতে উপকরণ সংগ্রহ করিয়া গ্রন্থ প্রচার আবশ্যক।... আমরা রাজশাহীর নিকট প্রার্থনা করিতেছি, তাহারা এতদঞ্চলের ঐতিহাসিক প্রশ্নের মীমাংসার পথ একটু প্রশস্ত করিয়া দিন। আমাদের পূর্ব পুরুষেরা দেশের ইতিহাস লিখিয়া যান নাই বটে কিন্তু ইতিহাসের প্রচুর উপকরণ এখনও দেশের মধ্যেই প্রচ্ছন্ন আছে। বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিক্রমে সেই উপকরণ সংগৃহীত হইলে তাহা হইতে দেশের ইতিহাস আবিষ্কৃত হইবে।’ তাঁর এই প্রস্তাবকে রাজশাহী এ্যাসোসিয়েশন কার্যকর করার উদ্যোগ নেয়। গঠন করা হয় বরেন্দ্র অনুসন্ধান সমিতি। আর সমিতি থেকে গড়ে ওঠে বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘর। (চলবে)

প্রকাশিত : ৪ সেপ্টেম্বর ২০১৫

০৪/০৯/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: