আংশিক মেঘলা, তাপমাত্রা ১৭.২ °C
 
১৭ জানুয়ারী ২০১৭, ৪ মাঘ ১৪২৩, মঙ্গলবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

দূরে দেখা যায় বিন্দু

প্রকাশিত : ১ সেপ্টেম্বর ২০১৫
  • মাহবুব রেজা

বিকেলের ঝলমলে রোদটা ফিকে হতে হতে কপাল হয়ে নাক পর্যন্ত এসে থমকে দাঁড়াল। রোদটাকে অসহ্য লাগছিল মিলুর। কেমন তেরছা হয়ে রোদটা তার পিঠে বর্শার মতো লাফিয়ে লাফিয়ে পড়ছিল। ঘামে শার্ট ভিজে একসা।

মিলু মার সঙ্গে রাগ করে বাড়ি থেকে বেরিয়েছে ঠিক দুপুরে। তখন সূর্য ছিল মাথার ওপরে। মধ্য গগনে।

মিলু স্কুল থেকে ফিরল দুপুরে। স্কুল থেকে ফিরে মিলু বলল, মা ক্ষিদা লাগছে খাবার দাও।

মিলুর কথায় মা হাসলেন। ছোট্ট রান্নাঘর। মাটির চুলা। চুলার ওপর হাঁড়ি। হাঁড়ির ভেতর ভাত ফুটছে। মা বললেন, তরকারি হয়ে গেছেÑ তুই হাতমুখ ধুয়ে খাইতে আয়।

মিলুদের বাড়িটা কাঠের পুলের কাছে। মুরগীটোলায়। ছোট্ট গলির ভেতর অনেক ভাড়াটেদের নিয়ে একতলা বাড়ি। সারি সারি ঘর। মিলুরা সেই বাড়ির বড় একটা ঘরে ভাড়া থাকে। আট ভাইবোন, দু-চারজন আত্মীয় মিলিয়ে মিলুদের অনেক বড় সংসার। মিলুদের এত ভাইবোন দেখে এলাকার লোকজন মুখ চেপে হাসি মসকরা করে, গিয়াস সাহেব যেভাবে সংসার বড় করছেন তাতে একটা ফুটবল দল হয়ে যাবেÑ ইনশাল্লাহ।

আমার লাইগা বেগুন ভাজছোÑ মিলু মার সামনে দাঁড়িয়ে থাকে।

না, বাবা আইজ তরকারি দিয়াই ভাত খাও। বেগুন আনতে ভুইলা গেছিÑ

বড় গোল গোল বেগুন ভাজি হলে মিলুর আর কিছুই লাগে না। সে বেগুন ভাজি দিয়ে গরম ভাত খুব মজা করে খায়। সকালে স্কুলে যাওয়ার সময় মিলু মাকে বেগুনের কথা বার বার বলে দিয়েছিল। আর এখন কী না মা বলে, বেগুন আনতে ভুইলা গেছি!

মিলুর মেজাজটা খারাপ হয়ে গেল। সে মাকে কিছু বলল না। মিলু দ্রুত পায়ে ঘর থেকে বেরিয়ে মুরগীটোলার ছোট গলিটা পার হলো। পুরো এলাকাটা ক্যামন শুনশান। কোথাও কেউ নেই। হাঁটতে হাঁটতে মিলু চলে এলো ধুপখোলা মাঠে। পাশেই সাধনা ঔষধালয়। সাধনা ঔষধালয় থেকে দিনমান একটা ভেষজ ঘ্রাণ পুরো এলাকায় ভেসে বেড়ায়।

মিলু ধুপখোলা মাঠের এক কোনায় একটা গাব গাছের তলায় মন খারাপ করে বসে থাকে। আশে পাশে বেশ গাছপালা। সামনে সমুদ্রের মতো বিশাল ধুপখোলা মাঠ। মাঠের শেষ মাথায় ইস্ট এ্যান্ড ক্লাব। দীননাথ সেন রোড। রজনী চৌধুরী রোড। ডিস্টিলারী রোড। শিংটোলা। ডাইল পট্রি।দয়াগঞ্জ। নারিন্দা। মাঠের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে মিলু অনেকগুলো বালুর ঢেউ দেখতে পেল। না,না, ওটা বালুর ঢেউ না। সে ভাল করে তাকাল। দেখল, অনেক দূর থেকে বিন্দুর মতো কিছু একটা ক্রমশ দৃশ্যমান হয়ে উঠছে। মিলু অবাক হলো। বিন্দুটা আস্তে আস্তে পরিষ্কার হয়ে উঠতে লাগল। আরে! কী অদ্ভুত ব্যাপার! বিন্দুটা পূর্ণতা পেতেই মিলু দেখল, তার সামনে খদ্দরের জীর্ণ পাঞ্জাবি গায়ে দাঁড়িয়ে আছেন কয়েকদিনের না কামানো দাড়ি-গোঁফে বাবা। বাবার চোখ বসে গেছে। চেহারা বিষণœ। প্রখর রোদের মধ্যে বাবার কপাল বেয়ে দর দর করে ঘাম পড়ছে। বাবা মিলুর সামনে এসে দাঁড়ালেন।বললেন, বাবা মিলু, এই দুপুর রইদে তুমি মাঠের মইধ্যে কী করো? তোমার কী মন খারাপ! ভাত খাইছো তুমি?

ভাত খাইছো তুমিÑ বাবার মুখে কথাটা শুনে মিলুর হাউমাউ করে কেঁদে দিতে ইচ্ছে করল। কিন্তু সে কাঁদল না। তার অসম্ভব ক্ষিদে পেয়েছে। সে এখনও ভাত খায়নি।

মিলু কি বলবে মা তার জন্য বেগুন আনে নি ? না, এ কথাটা বাবাকে বলা যাবে না। মা সব সময় মিলুদের একটা কথা বলেন, তোমাগো যা কিছু কওনের, চাওনের হেইগুলা শুধু আমারেই কইবা। তোমরা তোমাগোর বাপের কাছে কিছু চাইবা না। আমি কী কইছি বুচছো?

মিলুরা ভাইবোন মার কথা অক্ষরে অক্ষরে বুঝে চলে। মার সঙ্গে মিলুর নানিও গলা মিলিয়ে মিলুদের বলে, নাতি-নাতিনরা তোমরা আমার আনুর কথা মতো চইল্লো কিন্তুক। মিলুরা মা আর নানির কথা মতো চলে। বাবার কাছে কোন আবদার-টাবদার করে না। আর করবেই বা ক্যামন করে! বাবার মিউনিসিপ্যালিটিতে ছোট চাকরি। একবার কি কারণে বাবার সেই চাকরিটাও বছর খানেকের জন্য চলে গেল। বাবার যে তখন কি অবস্থা! বাড়িভাড়া, সংসার খরচ মেটাতে গিয়ে বাবা অনেক ধার-দেনার মধ্যে পড়ে গেলেন। প্রায় সময়ই পাওনাদাররা বাবার খোঁজে বাসায় আসত। বাবা কখনও কখনও ঘরে থেকেও মাকে দিয়ে পাওনাদারদের বলাতেন, জরুরী কাজে উনি ঢাকার বাইরে গেছেন। টাকার ব্যবস্থা হলে গিয়াস সাহেবই দেখা করবেন। কষ্ট করে আর আপনাদের আসতে হবে না।

মিলু বাবাকে কিছু বলল না। মুখ ফুলিয়ে বসে থাকল। গরমে ঘামছে সে। মিলু এমনিতেই বেশ ফর্সা। রোদের আঁচ পেয়ে তার অমন ফর্সা চেহারা আরও লালচে হয়ে আছে।

বাবা মিলুকে বললেন, আমার চাকরীটাও এমন সময় চলে গেল-কথাগুলো বলার সময় বাবার চেহারা বিষণœ হয়ে উঠল, তোমার মা অনেক কষ্ট করে সংসার চালান। মাকে দুঃখ দিও না। মা যেভাবে বলবে সেইভাবে চলবা বাবা থামলেন। তারপর এদিক-ওদিক তাকিয়ে নিলেন ভাল করে। বাবা কী এই একলা দুপুরেও পাওনাদারদের ভয়ে তটস্থ!

বাবার কথা শুনতে শুনতে মিলুর মধ্যে কী যেন হয়। সে বুঝতে পারে এই বিজন দুপুরে কেউ একজন তার ভেতরে এসে বাসা বেঁধেছে। মিলু হঠাৎ করে বড় হতে শুরু করে। মাঠের মধ্য থেকে একটা ঠা-া বাতাস উঠে আসে। মিলু সেই বাতাসে প্রাণভরে নিঃশ্বাস নেয়। দুপুরের গা জ্বালা ধরা গরমটা এখন আর লাগছে না তার।

বিশাল ধুপখোলা মাঠের মধ্য দিয়ে বাবা হেঁটে হেঁটে দূরবর্তী হয়ে যাচ্ছেন। হাঁটতে হাঁটতে বাবা অনেক দূর চলে গেলেন। হাওয়া পেয়ে বাবার পাঞ্জাবি ফুলে ফুলে উঠছে। আচ্ছা, বাবা কী একটা পাল তোলা নৌকা!

মিলুর মন ভাল হয়ে যায়। সে আকাশের দিকে তাকায়। শরতকালের ফকফকা আকাশ। মিলু উঠে দাঁড়ায়। দূরে, বহুদূরে একটা বিন্দু সে দেখতে পায় ।

বিন্দু দেখতে দেখতে মিলু পা বাড়ায় ঘরের দিকে।

ধঃযধরৎরফযধ১৫@ুধযড়ড়.পড়স

প্রকাশিত : ১ সেপ্টেম্বর ২০১৫

০১/০৯/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ:
যমুনায় নাব্য সঙ্কট ॥ বগুড়ার কালীতলা ঘাটের ১৭ রুট বন্ধ || আট হাজার বেসরকারী মাধ্যমিকে প্রয়োজনীয় ভৌত অবকাঠামো নেই || সেবা সাহসিকতা ও বীরত্বের জন্য পদক পাচ্ছেন ১৩২ পুলিশ সদস্য || দু’দফায় আড়াই লাখ টন লবণ আমদানি, সুফল পাননি ভোক্তারা || বাংলাদেশের আর্থিক খাত উন্নয়নে বিশ্বব্যাংক রোডম্যাপ করছে || নিজেরাই পাঠ্যবই ছাপানোর চিন্তা প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের || গণপ্রত্যাশার প্রতিফলন ঘটেছে, প্রমাণ হয়েছে বিচার বিভাগ স্বাধীন || নিহতদের স্বজনদের সন্তোষ ॥ রায় দ্রুত কার্যকর দাবি || আওয়ামী লীগ আমলে যে ন্যায়বিচার হয় ৭ খুনের রায়ে তা প্রমাণিত হয়েছে || নারায়ণগঞ্জের চাঞ্চল্যকর ৭ খুন মামলার রায় ॥ ২৬ জনের ফাঁসি ||