হালকা কুয়াশা, তাপমাত্রা ১৬.১ °C
 
২১ জানুয়ারী ২০১৭, ৮ মাঘ ১৪২৩, শনিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ

শিশুর শিক্ষারাজ্য হোক ‘আলোয় ভুবন ভরা’

প্রকাশিত : ৩১ আগস্ট ২০১৫
  • পান্থ আফজাল

আনন্দের মাঝেই শিশুর শিক্ষা জীবনের অবস্থান। কঠোর শাসন, নিয়ন্ত্রণ, প্রতিকূল পরিবেশ, শিশুর শিক্ষা জীবনকে অনিশ্চয়তার পথে ঠেলে দেয়। শিশুর মনের আনন্দই তার দেহ মনের শক্তির মূল উৎস। আনন্দ ও শিশুবান্ধব পরিবেশ ছাড়া তার সুপ্ত প্রতিভার বিকাশ অসম্ভব। ‘আনন্দময় শিক্ষা’ হচ্ছে শিশু শিক্ষার অন্যতম মাধ্যম।

শিশুরা সবসময় বাধার প্রাচীর ভাঙতে চায়। তারা চায় নীল আকাশের নিচে উন্মুক্ত জীবন, যেখানে কোন ধরাবাধা নিয়ম শৃঙ্খলা থাকবে না। শিশুরা ছুটতে চায়, খোলা আকাশের নিচে, নিজের মতো করে। তাই শিশুর রুচি ও মানসিক চাহিদা অনুযায়ী কাজ করার সুযোগ সৃষ্টি করে দিতে হবে। এ ক্ষেত্রে শিক্ষকের মূল কাজ হচ্ছে শিশুর মাঝে মুক্ত চিন্তার বহির্প্রকাশ ঘটিয়ে সঠিক পথে পরিচালিত করা। শিক্ষককে আনন্দমূলক শিক্ষার কৌশল রপ্ত করতে হবে। অজানাকে জানার, অচেনাকে চেনার, অদেখাকে দেখার চরম ইচ্ছা জাগ্রত করতে হবে।

বিদ্যালয় শিশুর মেধা ও মননশীলতার বৈচিত্র্যময় লীলাভূমি। এটি শিশুর অবাধ জ্ঞান চর্চার কেন্দ্রস্থল। শিক্ষক হলেন এ অবাধ জ্ঞানচর্চা কেন্দ্রের নিয়ন্ত্রক। অহেতুক ভয়-ভীতি, সংশয় ও দ্বিধা শিশুর জ্ঞান লাভের স্পৃহাকে নষ্ট করে দেয় এবং তাদের মনে একঘেয়েমি সৃষ্টি করে। তাই শিশুর জানার পথে যাতে একঘেয়েমি সৃষ্টি না হয় সেদিকে আদর্শ শিক্ষককে বিশেষভাবে নজর দিতে হবে। শিক্ষককে শেখার পরিবেশে আনতে হবে নতুনত্ব। গতানুগতিক শিক্ষার বাইরে বৈচিত্র্যময় শিক্ষার ধারার প্রবর্তন করতে হবে।

শিক্ষককে শিশুর মতো, বন্ধুর মতো আচরণ করে তাদের সঙ্গে মিশে যেতে হবে। তাদের অনায়াসে প্রশ্ন করার এবং মনের ভাব প্রকাশের জন্য সুযোগ সৃষ্টি করে দিতে হবে। সহজ, সরল, সাবলীল ও প্রাঞ্জল ভাষায় করতে হবে পাঠদান। শিক্ষকদের শিক্ষাদান সংক্রান্ত বিষয়ে ইংরেজীতে একটি প্রবাদ আছে- “ঘড় ংুংঃবস ড়ভ বফঁপধঃরড়হ রং নবঃঃবৎ ঃযধহ রঃ’ং ঃবধপযবৎং- অর্থাৎ কোন শিক্ষাদান পদ্ধতিই স্বয়ং শিক্ষক অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ হতে পারে না। ঞবধপযবৎ রং ঃযব নবংঃ সবঃযড়ফ- অর্থাৎ শিক্ষকই শিক্ষাদানের সবচেয়ে ভাল পদ্ধতি।

শিশুরা কোমল মনের অধিকারী। আনন্দঘন পরিবেশে থাকতেই শিশুরা স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। শাসন, নিয়ন্ত্রণ, ভীতিকর ও বিষাদময় পরিবেশ শিশুর শিক্ষা লাভকে বাধাগ্রস্ত করে। শিশু শিক্ষা ও আনন্দ ওতপ্রোতভাবে জড়িত। আনন্দ ছাড়া কোমলমতি শিশুরা শিক্ষা লাভে উৎসাহিত হবে না। শিক্ষার্থীর শিক্ষাকাল হলো একটা মানসিক ভ্রƒণ অবস্থা। উপযুক্ত পরিবেশ পেলেই সেই ভ্রƒণ বিকশিত হওয়ার সুযোগ পাবে। শিশুরা শিখবে আনন্দের মাধ্যমে, নিজেদের ইচ্ছামতো, ঘুরে-ফিরে, কল্পনার ফানুস উড়িয়ে। শিশুরা শিখবে খেলাধুলার মাধ্যমে, তাদের মনের অজান্তে। প্রকৃতির সঙ্গে সংযোগ রেখে মনের চর্চা করবে তারা, শ্রেণীকক্ষের চারদেয়ালের মধ্যে সীমাবদ্ধ থেকে নয়। শিশুরা শিখবে বিদ্যালয়, পরিবার ও সমাজ থেকে, একান্ত নিজেদের মতো করে। শিশুরা অজানাকে জানার সঙ্গে করবে মিতালী। শিশুরা জানবে সহজভাবে, আনন্দের সঙ্গে। আনন্দ ছাড়া শিশুর বিদ্যা অর্জনে আগ্রহী হবে না। আনন্দের মাঝেই লুকিয়ে থাকবে তার শিক্ষা। আনন্দই তার শিক্ষার বাহন ও মাধ্যম।

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন- ‘আনন্দহীন শিক্ষা, শিক্ষা নয়, যে শিক্ষায় আনন্দ নেই, সে শিক্ষা প্রকৃত শিক্ষা হতে পারে না।’ তিনি আনন্দহীন শিক্ষা প্রসঙ্গে আরও বলেছেন, ‘অন্যদেশের ছেলে যে বয়সে নবোদগত দন্তে আনন্দমনে ইক্ষু চর্বন করিতেছে, বাঙালীর ছেলে তখন স্কুলের বেঞ্চির ওপর কোঁচা সমেত দুইখানি শীর্ণ খর্ব চরণ দোদুল্যমান করিয়া শুধুমাত্র বেত হজম করিতেছে, মাস্টারের কূট গালি ছাড়া তাহাতে তার কোনরূপ মসলা মিশানো নেই।

শিক্ষককে হতে হবে আদর্শের মূর্ত প্রতীক। তাঁর থাকতে হবে চরম ধৈর্য ও শিশু শিক্ষার প্রতি আগ্রহী। শিশুর অবুঝ মন বোঝার ক্ষমতা থাকতে হবে শিক্ষককে। একজন শিক্ষককে হতে হবে শিশু মনোবিজ্ঞানী। শিক্ষক একাধারে হবেন, শিক্ষাগুরু, পিতা-মাতা ও নির্ভরযোগ্য অভিভাবক। যে শিশু শিক্ষককে ভয় পাবে সে শিশু শিখতে আগ্রহী হবে না। কোন ছাত্র যদি শিক্ষককে ভয় পায় তা হলে সে শিক্ষক শিশু শিক্ষাদানে অযোগ্য বলে বিবেচিত হওয়াই স্বাভাবিক।

শিশুরা সামনে যা দেখে তাই তারা অনুকরণ করে। একজন শিক্ষক ছাত্রকে যা দেখাবেন বা শেখাবেন সে সেভাবেই গড়ে উঠবে। তাই শিক্ষক ও ছাত্রের সম্পর্ক হতে হবে একদিকে আদর্শের, নীতির অপরদিকে অভিভাবকের। শিক্ষকের সঙ্গে একজন ছাত্রের শুধু লেখাপড়ার সম্পর্কই মূল কথা নয়। একজন আদর্শ শিক্ষক একজন আদর্শ মানুষ গড়ে তোলেন, যে মানুষ একদিন তার পরিবারের তথা সমাজের বা রাষ্ট্রের কর্ণধার হয়ে ওঠে।

বর্তমানে আমাদের সমাজে যে অবক্ষয় চলছে, তা থেকে উত্তরণে শিক্ষকই হতে পারেন পরিত্রাণের উপায়। একটা সময় ছিল যখন প-িত মশাইরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে ছাত্র জোগাড় করতেন, বিনা পারিশ্রমিকে ছাত্রদের পড়াতেন, সমাজের মানুষকে আলোর পথ দেখাতেন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অগ্রসরমান সমাজে আজ তা দেখা না গেলেও শিক্ষার মাধ্যমগুলো বেশি যান্ত্রিক তথা প্রযুক্তিনির্ভর হয়ে পড়েছে। ফলে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে দূরত্বটা ক্রমশ বেড়ে যাচ্ছে।

বেশিরভাগ শিক্ষক বিশ্বাস করেন যে, ছাত্রদের থেকে তাদের স্পষ্ট দূরত্ব বজায় রাখতে হবে। ছাত্রদের সুযোগ দিলে সব উচ্ছন্নে যাবে। তাদের সব সময় ভয়ে রাখতে হবে। অনেককে বলতে শুনি যে, তাদের সময়ে তারা তাদের শিক্ষককে রাস্তায় দেখলে ভয়ে অন্য রাস্তা দিয়ে যেত না; আর এখনকার ছাত্ররা নাকি শিক্ষককে সম্মানই দিতে জানে না। ভয় পাওয়ার নাম যদি সম্মান হয় তাহলে সেই সম্মান ছাত্র শিক্ষক দু’জনের জন্যই ক্ষতিকর। শিক্ষকের সঙ্গে ছাত্রের দূরত্ব মানেÑ শিক্ষার সঙ্গে ছাত্রের দূরত্ব।

স্কুলগুলোতে এত বেশি পরীক্ষার চাপ যে ছাত্রছাত্রীরা অন্য কোন বিষয়ে মনোযোগী হতে পারে না। পরীক্ষার চাপ কমিয়ে শিশুদের হাসতে, খেলতে, বেড়াতে, বই পড়তে শিক্ষক ও অভিভাবকদের অগ্রণী ভূমিকা রাখতে হবে। অনেক শিশু স্বাভাবিক আচরণ করে না। সেক্ষেত্রে রাগান্বিত না হয়ে তাদের মানসিকতা বুঝে সস্নেহে তাদের সমস্যাগুলো দূর করতে হবে। ছাত্রছাত্রীদের মনস্তাত্ত্বিক বিষয়গুলো বিশ্লেষণের জন্য শিক্ষকদের ট্রেনিংয়ের প্রয়োজন রয়েছে। এছাড়া শিশুকাল থেকে শিশুদের মানবিক গুণাবলী সম্পর্কে আস্তে আস্তে শিক্ষাদান করা উচিত। এখানে শিক্ষক ও অভিভাবকদের ভূমিকা অগ্রগণ্য।

কোনভাবে এই ধারণা আমাদের শিক্ষা পদ্ধতির মধ্যে ঢুকে গেছে যে, ছাত্রদের প্রহার না করলে তারা মানুষ হবে না। শুধু স্কুলে না, বাড়িতেও বাবা-মার ও গৃহশিক্ষক শাসনের প্রক্রিয়াটি খুবই সেকেলে এবং অযৌক্তিক। সন্তান কোন অপরাধ করলে প্রথমেই তাকে শারীরিক শাস্তি দেয়া হয়। পরীক্ষায় খারাপ ফলাফলের জন্য শিশুকে শারীরিক শাস্তি দেয়া কখনই সমর্থনযোগ্য নয়। ধর্মীয় অনুশাসন না মানার জন্য ও অনেক সময় শিশুদের প্রহার করেন বাবা মা’রা। আমাদের বাবা মা’রা কখনই বাচ্চাদের মানসিক বিকাশের ব্যাপারটা গুরুত্বের সঙ্গে নেন না। বুদ্ধি হওয়ার পর থেকে একশ’টা নিষেধাজ্ঞা, আর না মানলে বকা।

ভয়, লজ্জা আর অপমান নিয়ে বেড়ে ওঠে আমাদের বেশিরভাগ শিশু। মানসিক এবং শারীরিক শাস্তি দিয়ে কখনই ভাল কিছু আশা করা যায় না একটা মানুষের কাছ থেকে। এসবের ফলে তার মধ্যে তৈরি হয় ঘৃণা, ভয় এবং অশ্রদ্ধা। খারাপ ফলের জন্য একটা বাচ্চাকে শাস্তি দিলে, তার আত্মবিশ্বাস কমে যায়। ক্লাসে শিক্ষক খারাপ ফল করা ছাত্রকে সবার সামনে খারাপ ছাত্র বলে গালি দেন। বাড়িতে বাবা কিংবা গৃহশিক্ষক যদি বলেন, ‘তোকে দিয়ে কিচ্ছু হবে না’।Ñ তা হলে সে নিজেও এটা বিশ্বাস করতে শুরু করে যে, তাকে দিয়ে কিছু হবে না। এভাবে সে শিক্ষা থেকে ক্রমশ নিজেকে দূরে সরিয়ে নেয়। পড়াশোনা তার কাছে একটা বোঝার মতো হয়ে যায়। মানসিকভাবে থেকে যায় অপরিপক্ব। আত্মবিশ্বাসহীনতার ফলে জীবনের সব ক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়ে।

মডেল : শিপলু ও ইসমাম

ছবি : লিজা নূর

প্রকাশিত : ৩১ আগস্ট ২০১৫

৩১/০৮/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: