মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
১০ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শনিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ

জল থৈ থৈ উৎসব

প্রকাশিত : ৪ জুলাই ২০১৫
  • মিলন বণিক

আজ ফুটবল ম্যাচ। সেনপাড়া বনাম রামকৃষ্ণ স্কুল। ফোর ফাইভের ছেলেদের মধ্যে খেলা হবে। সেনপাড়ার পক্ষে খেলার সমস্ত দায়িত্ব থার্ড মাস্টার ভবানী বাবুর। ছাত্ররাও খুশী। স্কুল ছুটির পর ক’দিন ধরে প্র্যাকটিস চলছে। কাদামাটি মেখে সবাই যখন বাড়ি ফিরে। বর্ষার দিন। মাঠ ঘাট পানিতে থৈ থৈ করছে। চারটায় খেলা। তার আগে রামকৃষ্ণ স্কুল মাঠে পৌঁছতে হবে। ভবানী বাবু ঠিক একটায় সবাইকে উপস্থিত থাকতে বলেছেন। জরুরী পরামর্শ হবে।

ভবানী বাবু একটায় এসে বারান্দায় পায়চারী করছেন। বৃষ্টির মধ্যে কাক ভেজা হয়ে এসেছেন। এসেই মাথা খারাপ। একটা ছেলেও আসেনি। মনে মনে বলছেন, এত করে বল্লাম একটায় সবাই উপস্থিত থাকবি। একটা ছেলেরও দেখা নেই। দলের ক্যাপ্টেন বীরেনও নেই। ব্যাটা কোন কাজের না। ছাতাটা রেখে বার বার মাথায় হাত বোলাচ্ছেন। মাথার চুল নেই। চারটার সময় খেলা। আবার ঘড়ি দেখল। দেড়টা বাজে।

নদীর পাড়ে বট গাছে। জোয়ারে সরু নদীর পানি উপচে পড়ছে। বৃষ্টিও থামছে না। চারদিকে জল থৈ থৈ করছে। এমন দিনে কাদা পানিতে বল খেলার মজাই আলাদা। ভবানী বাবু এই স্কুলে আসার পর ছাত্রদের খেলাধুলার প্রতি বাড়তি নজর। তার সোজা কথা, প্রত্যেকের এই সময় খেলাধুলা করা উচিত। শরীর ভালো থাকলে মন, লেখাপড়া ও জ্ঞান বুদ্ধি ভালো হয়। মোটকথা, সুস্বাস্থ্যই সকল সুখের মূল।

শুধু ফুটবল নয়। হারিয়ে যাওয়া খেলাগুলো নিয়েও তার দুশ্চিন্তা। ডাংগুলি, কানামাছি, চি কুত্ কুত্ এসবের প্রতি তার দরদ বেশি। স্কুল ছুটির ফাঁকে ছাত্র এসব খেলাগুলো শেখায়। নিজেও মাঠে নেমে পড়ে। ছেলেমেয়েরা আনন্দ পায়। ডিশলাইনের ওপর তার খুব রাগ। আক্ষেপ করে বলেন, এ ডিশই ছেলেগুলোকে অলস করে রাখছে, মেধার বিকাশ হতে দিচ্ছে না। অথচ একজন সুস্থ সবল শিক্ষার্থী দেশ ও জাতি গঠনে অনেক ভূমিকা রাখতে পারে।

এখনও কাউকে না পেয়ে ভবানী বাবু অস্থির হয়ে পড়লেন। থ্রির ছাত্র বিনুকে দেখে জোরে হাঁক দেন। বিনু সামনে আসতেই জিজ্ঞাসা করল, এই গর্দভগুলো কোথায় দেখেছিস? আর বুঝি খেলাটা হলো না। খেলাই যদি না হয়, জয়পরাজয় হবে কী করে? টিনের চালে ঝুম ঝুম বৃষ্টির শব্দ। বিনু বলল, স্যার ওদেরকে দুপুরে দেখেছি। একটু খবর নিয়ে আয় তো বাপ। পকেট থেকে দু’টো চকলেট দিয়ে বলল, তাড়াতাড়ি যা। যাবি আর আসবি।

নদী পাড়ের বটতলা থেকে ছুটে আসছে কানাইলাল। ভবানী বাবু জিজ্ঞাসা করলেন, ও কানাই, এই ছেলেগুলোকে দেখেছো। একটাকেও খুঁজে পাচ্ছি না। চারটার সময় খেলা।

মাস্টার বাবু, আপনি আছেন খেলা নিয়ে। এদিকে আমার প্রাণ যায়। এইমাত্র ঘাটে নৌকা বেঁধে দুপুরে খাইতে গেলাম। একটু গা টান দিয়ে ঘাটে এসে দেখি নৌকা নেই। নিশ্চয় ওই বান্দরগুলোর কাজ। সঙ্গে আমার পাঁচুও আছে। ঘাটে বাউনি করে ক’টা টাকা পেলে বাজারটা চলত। এখন তাও পারছি না। দেখি, হাত জালটা দিয়ে যদি কিছু পাওয়া যায়। বিরক্ত হয়ে বলল কানাই।

ভবানী বাবু হিসাব মিলিয়ে দেখল। এই সময়ে ছেলেগুলোর ঘরে থাকার কথা নয়। নিশ্চয় দল বেঁধে কানুর নৌকাটা নিয়ে পালিয়েছে। কতক্ষণে ফিরবে কে জানে? ভেবে দেখল, কোনদিকে যেতে পারে। চারদিকে পানি থৈ থৈ করছে। হাতঘড়িটা দেখল। তিনটা বাজে। বিনু আসছে। সঙ্গে ফোরের ছাত্র পরেশ। পরেশ এক্সট্রা প্লেয়ার হিসেবে খেলে। সে স্যারকে একটা চিঠি দিয়ে বলল, স্যার, বীরেন দিয়েছে।

স্যার রাগে মাথার চুল টেনে বলল, আবার চিঠি লেখা হচ্ছে? সাহস কত! যত সব ফালতু। বীরেন লিখেছে, স্যার আমরা নৌকা নিয়ে স্কুল মাঠে এসেছি। আপনি তাড়াতাড়ি চলে আসুন। খেলা শেষে আমরা জয়ী হয়ে নৌকা নিয়ে ফিরে যাব। কী আর করা। পরেশকে নিয়ে রামকৃষ্ণ স্কুলের দিকে ছুটলেন ভবানী বাবু।

খেলা চলছে। ভবানী বাবুর উত্তেজনার শেষ নেই। ঠিক যেন ব্রাজিলের কোচ। উত্তেজনায় সারা শরীর কাঁপছে আর দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে নির্দেশনা দিচ্ছে। এদিকে মুষলধারে বৃষ্টি। কাঁদা মাটি লেগে খেলোয়াড়দের চেহারা চেনা মুশকিল। দেড় ঘণ্টার খেলা। পঁয়তাল্লিশ মিনিট শেষ। কেউ কোন গোল করতে পারেনি।

বিরতির পর দশ মিনিটের মাথায় গোল করল সেনপাড়া স্কুল। ভবানী বাবুকে আর ধরে রাখা যাচ্ছে না। চিৎকার করে বলছেন, গোল দেয়ার দরকার নেই, ডিফেন্স শক্ত কর। বদলি খেলোয়াড় হিসেবে পরেশকে নামানো হলো। উঠেই জাদুর মতো করে আরেক গোল। খেলা প্রায় শেষ পর্যায়ে।

রামকৃষ্ণ স্কুলের গোলপোস্টের সামনে ধাক্কাধাক্কি নিয়ে তুলকালাম কা-। রামকৃষ্ণ স্কুল কিছুতেই মানছে না। রেফারি বলল, ফাউল হয়নি। তাও মানছে না। মারামারি লেগে যাওয়ার অবস্থা। রামকৃষ্ণ স্কুলের শিক্ষক নীতিশ বাবু আর ভবানী বাবু মিলে একটা সমঝোতায় আসল। ফাউল মেনে নিল। ফ্রি কিক। গোল কিপার আটকাতে পারল না। দুই এক গোলে খেলা শেষ। সেনপাড়া স্কুল জয়ী হয়েছে।

পুরস্কার হাতে ছাত্ররা সবাই ভবানী বাবুকে কাঁধে করে নৌকায় তুলল। গর্বে ভবানী বাবুর বুক ভরে যাচ্ছে। আনন্দে চোখে জল এলো। সবাইকে চকলেট দিয়ে বললেন, আজ তোরা শুধু আমার নয়, পুরো স্কুল এবং গ্রামের মুখ উজ্জ্বল করেছিস। আমি স্বপ্ন দেখছি, তোদের মতো ছেলেগুলোই একদিন পেলে ম্যারাডোনা মেসি রোনালদো হয়ে দেশের মুখ উজ্জ্বল করবে।

নৌকা চড়াটা ভবানী বাবুর বাড়তি আনন্দ। কখন যে নিজের অজান্তে নিজেই দাঁড় টানছেন, খেয়াল করেননি। ছাত্ররা সবাই হেসে উঠল।

প্রকাশিত : ৪ জুলাই ২০১৫

০৪/০৭/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: