রৌদ্রজ্জ্বল, তাপমাত্রা ২৩.৯ °C
 
৮ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, বৃহস্পতিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

চিঠি ॥ তুমি আজ কত দূরে

প্রকাশিত : ৪ জুলাই ২০১৫

এলাহী ভরসা। পাকজনাবেষু ভাইজান, আমার শত কোটি সালাম গ্রহণ করিবেন। বাটিস্থ সকলকেই শ্রেণীমতো আমার সালাম ও ভালবাসা পৌঁছাইয়া দিবেন। পর সমাচার এই যে... ফিরতি ডাকে পত্রের উত্তর দিবেন। বি.দ্র. গত বছর বাউলা হাটে কেনা গাই গরু বকনা বাছুর বিয়াইছে। প্রতিদিন চার সের করিয়া দুই দিতেছে।

সাধু ভাষায় লিখিত নিকট অতীতের এই চিঠি প্রবীণদের কাছে আজ শুধুই স্মৃতি। প্রজন্মের কাছে অনেকটাই বিস্ময়। বিশ্বাসই করতে চায় না, এভাবে চিঠি লেখা হতো। সেদিনের চিঠির ভাষায় শ্রদ্ধেয়দের ‘আমার কদমবুচি গ্রহণ করিবেন’ বাক্যে কদমবুচি শব্দের অর্থ (পায়ে ছুঁয়ে সালাম করা) অনেকেই জানে না। একটা সময় সাদা অথবা বঙিন কাগজে কালির কলম (দোয়াতের কালি কলমে ভরে) দিয়ে লেখা চিঠি ডাকঘরের (পোস্ট অফিস) হলুদ খামে ভরে ঠিকানা লিখে ডাকবাক্সে ফেলে দিলে দূরত্ব অনুযায়ী দিনা কয়েক পরে গন্তব্যে পৌঁছত। চিঠির প্রাপক একইভাবে উত্তর দিতেন। পরিবার, অফিস ও প্রতিষ্ঠান তথা মানুষে মানুষে যোগাযোগের মাধ্যম এই চিঠি জীবনের নানা বিষয় তুলে ধরত। চিঠি লেখার বাক্য চয়ন, ভাষার প্রায়োগিক ব্যবহার, চিঠির কথা সব মিলিয়ে চিঠির নান্দনিকতায় স্নেহ ভালবাসার পূর্ণতায় এক অপার মমত্ত্ব উঠে আসত। হাতের লেখা একটি চিঠি হৃদয়ের শত সহস্র কথাই শুধু কইত না, আবেগ আকুলতা ও ব্যাকুলতা সবই প্রকাশ পেত। মা-বাবা যখন সন্তনের হাতের লেখা চিঠি পড়তেন তখন লেখার মধ্যে হৃদয় দিয়ে সন্তানের মুখ দেখতে পেতেন। অবচেতনে চিঠি বুকে জড়িয়ে আদর দিতেন। প্রণয়ের চিঠি তো ছিল একেকটি প্রেমের হতিহাস। প্রেমিক-প্রেমিকা হৃদয়ের আকুলতা-ব্যাকুলতা প্রতীক্ষার প্রহরের খুঁটিনাটি ভাষার মাধুর্যে এমনভাবে লিখত যা পড়ে মনে হতো শত ফুল দিয়ে গাঁথা একটি গল্প বা উপন্যাস। প্রণয়ের চিঠি লিখতে কত পাতা যে ভরে যেত তার কোন সীমারেখা থাকত না। বেশি পাতার চিঠি হলে খামের ওপর বাড়তি টিকিট লাগাতে হতো। বাড়তি মাশুল না দিলে প্রাপককে তা পরিশোধ করতে হতো। খামের ওপর অর্ধচন্দ্রের সিলমোহর আঁটা এই চিঠিকে বলা হতো বেয়ারিং। হাতে লেখা চিঠি পরিবারের মধ্যে নিবিড় সম্পর্ক ও ভালবাসার গভীরতার সেতু গড়ে দিত। পোস্ট অফিসের খাকি বুশ শার্ট পোশাকের পিয়ন দরজায় কড়া নেড়ে যখন উচ্চস্বরে হাঁক দিত চি...ঠি, তখন কে আগে ছুটে গিয়ে চিঠিটি নেবে এর ছোটখাটো দৌড় প্রতিযোগিতা হয়ে যেত। দীর্ঘদিন পিয়নের এমন হাঁকডাক না শুনলে অর্থাৎ চিঠি না এলে মনে নানা ভাবনার উদয় হতো। প্রণয়ের চিঠি তো ছিল তারুণ্যের উচ্ছ্বাসে হৃদয়ের আবেগের এক মধুময় পাঠশালা। যেখানে লেখার সঙ্গে মিশে থাকত সৃষ্টিশীল ভাবনার প্রকাশ। ভাষা ও জ্ঞানের কত শৈলি দিয়ে একে অপরের (প্রেমিক প্রেমিকা) হৃদয়ের কত গভীরে পৌঁছা যায় তার প্রতিযোগিতা শুরু দেখা। চিঠি পাঠানোর সময় কখনও কাগজের ভাঁজে ফুলের পাপড়ি ছিটিয়ে দেয়া, কখনও পারফিউমের দুই এক ফোঁটা ফেলে সুগন্ধী করা ছিল বাড়তি অনুভূতির বিষয়। প্রেমের এই চিঠি আদান-প্রদানও ছিল এ্যাডভেঞ্চারাস। লুকিয়ে চিঠি লিখে তা খামে ভরে পোস্ট অফিসের বাক্সে ফেলার পর শুরু হতো ফিরতি চিঠির প্রহর গোনা। এই ক্ষেত্রে পিয়ন ছিল প্রণয় গভীর করে দেয়ার অনুঘটক। প্রেমিক-প্রেমিকা উভয়ই সুসম্পর্ক রাখত পিয়নের সঙ্গে। হাতের লেখা চিনিয়ে দিত পিয়নকে। খামের ওপর ঠিকানায় এমন লেখা থাকলে তা যেন অভিভাবকের হাতে না পড়ে তার ‘আন্ডারস্ট্যান্ডিং’ ব্যবস্থা ছিল। এভাবে অনেক সফল প্রণয়ের নীরব স্বাক্ষী হয়ে থাকত ডাকপিয়ন। বিয়ের আনুষ্ঠানিকতায় তারাও নিমন্ত্রণ পেত। প্রেম উপাখ্যানে এতদিন যে পিয়ন প্রণয়ের মানুষদের কাছ থেকে বখশিশ পেত অনুষ্ঠানে তার ছিল উপহার দেয়ার পালা। প্রণয়ের সফল মানুষদের আশীর্বাদ করতে গিয়ে কত পিয়নের চোখে আনন্দের জল গড়িয়ে পড়েছে। আবার প্রেমের ব্যর্থতায় ব্যথিত হয়েছে। পরিবারের চিঠিই হোক আর প্রেমের চিঠি হোক, যে চিঠি যত নান্দনিকতার সৃষ্টিতে লেখা তা কতবার যে পড়া হতো! কোন চিঠি পড়ে হৃদয় জুড়িয়ে যেত। কোন চিঠি পড়ে আনন্দে মুখ হাসি ফুটত। আবার কোন চিঠি পড়ে চোখের জলও গড়িয়ে পড়ত। পারিবারিক চিঠিগুলো অনেক সময় খবরের কাগজের বিকল্প হিসাবে কাজ করত। কোন চিঠিতে গ্রামের কোন ঘটনা, আবাদের খবর, প্রাকৃতিক দুর্যোগের খবরসহ নানা খবর লেখা থাকত। আগের দিনে কোন চিঠি ফেলে দেয়া হয়নি। প্রায় প্রতিটি বাড়িতেই সাইকেলের স্পোকের মাথায় বড়শির মতো করে তার মধ্যে গেঁথে রাখা হতো। অনেক চিঠি ছিল নীরব স্বাক্ষী। বাজারে রাইটিং প্যাড (চিঠি লেখার প্যাড) মিলত। বনেদী বাড়িতে টেবিলে এই প্যাড থাকত। বিদেশে চিঠি পাঠাতে বিশেষ ধরনের নীল রঙের এয়ার মেইল পার এ্যাভয়েন ছাপাঙ্কিত খাম পাওয়া যেত। অনেক সময় নীল কাগজে ও খামে লেখা চিঠি ছিল প্রেমের চিঠির প্রতীক। পোস্ট অফিসের এসব চিঠিকে ঘিরেই এসেছে সভ্যতা। ডাকঘরের এই চিঠির দিন আজ ফুরিয়ে গেছে। সভ্যতার অগ্রযাত্রায় চিঠির বদলে এসেছে কম্পিউটারে ই-মেইল, সেল ফোনের ক্ষুদে বার্তা (শর্ট মেসেজ), সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে স্ট্যাটাস হোয়াটস অন ইউর মাইন্ড বক্সে লিখা। বর্তমানে কুরিয়ার সার্ভিসে যে চিঠি আদান প্রদান হয় তার বেশিরভাগই প্রাতিষ্ঠানিক ও অফিসিয়াল। সেদিনের ও আজকের চিঠি সবই চিঠি। তবে কোন চিঠিতে প্রাণের আকুলতা কতটুকু তাই প্রশ্ন! বর্তমানে যার কাছে আমরা চিঠি লিখতে চাই তাকে স্কাইপি বা ভাইবারের মাধ্যমে কম্পিউটারের মনিটরে দেখে কথা বলা যায়। সেল ফোনে সরাসরি কথা বলা যায়। ক্ষুদে বার্তায় অতি সংক্ষেপে জানান দেয়া যায়। তাহলে আর চিঠি লেখার দরকার কী! এমন প্রশ্নে উত্তর মেলেÑ কাগজে লেখা চিঠির আবেগের ভাষা হৃদয়ের গভীরে যে ক্লাসিক্যাল সুর তোলে যন্ত্রের চিঠি তা কি পারে! বিজ্ঞান বলে, কাগজে-কলমের ডগায় মাত্রা রেখা ও বৃত্তের সমন্বয়ে বর্ণমালা লিখে শব্দ বাক্য তৈরির সময় মস্তিষ্কের কোষে ধাক্কা দেয়। এই অনুরণনে সৃষ্টি হয় ভাষার শৈলী। লন্ডনে অবস্থানরত মনোস্তাত্ত্বিক ও গবেষক ড. সুপ্রিয় রায় বলেন, মানব দেহের হাতের বৃদ্ধাঙ্গুলি ও তর্জনী কলমকে চেপে ধরে কাগজে লেখা শুরু করলে নিওরন সেনসেটাইজ হয়ে যায়। চলে আসে সৃষ্টিশীলতা। রবীন্দ্রনাথের চিঠিতে মানুষের জীবন প্রকৃতি ও সমাজ উঠে এসেছে। বার্ট্রান্ড রাসেলের লেখা চিঠি নিয়ে প্রকাশিত ‘আনআর্নড ভিক্টরি’ শান্তির পথ নির্দেশক হয়ে আছে। ভারতে ইন্দিরা গান্ধীর কাছে বাবা জওহরলাল নেহেরুর লিখা চিঠি নিয়ে প্রকাশিত দুটি গ্রন্থ আজও পাঠকের কাছে বিস্ময় । এসব চিঠির মূল বিষয় পৃথিবী ও মানবজাতির ইতিহাস। চিঠি নিয়ে অনেক মজার ঘটনা আছে। ১৮৬২ সালে বিখ্যাত ফরাসি সাহিত্যিক ভিক্টর হুগো তার প্রকাশিত উপন্যাস ‘লা মিজারেবল’ নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিলেন। প্রকাশককে সাদা পাতায় লেখা চিঠিতে শুধু ছিল প্রশ্নবোধক চিহ্ন (?)। রসিক প্রকাশক উত্তর দিলেন সাদা পাতায় শুধু বিস্ময়কর চিহ্ন (!) দিয়ে। এই চিঠিটি আজও বিশ্বের সবচেয়ে ছোট চিঠি হয়ে গিনেজ বুকে আছেÑ হুগো লিখেছিলেন কেমন বিক্রি, উত্তর অবিশ্বাস্য বিক্রি। ১৯৫২ সালে কোরিয়ার যুদ্ধে নিউইয়র্কের এক নারী তার প্রেমিককে যে চিঠি লিখেছিলেন তা ছিল তিন হাজার ২শ’ ফুট লম্বা। লিখতে সময় লেগেছিল এক মাস। এই চিঠি আজও বিশ্বের দীর্ঘতম চিঠি। চিঠি নিয়ে উপমহাদেশের সুর সাগর জগন্ময় মিত্রের কণ্ঠে রেকর্ডের দুই পৃষ্ঠায় দুই খ-ের গান অমর হয়ে আছে। প্রথম খ-ের গানের শুরুতে সংলাপে আছেÑ ‘বলেছিলে তাই চিঠি লিখে যাই, কথা আর সুরে সুরে মন বলে তুমি রয়েছ যে কাছে, আঁখি বলে কত দূরে’। দ্বিতীয় খন্ডের শুরুর সংলাপে আছেÑ ‘যত লিখে যাই তবু না ফুরায় চিঠিত হয় না শেষ, চিঠির বীনায় আজও বাজে হায় প্রথম দিনের রেশ’। এরপর শুরু হয় গান ‘তুমি আজ কত দূরে তুমি আজ কত দূরে....’। দিনে দিনে হাতে লেখা চিঠি যেভাবে হারিয়ে যাচ্ছে তাতে হয়ত একদিন বলতে হবে ‘চিঠি আজ কত দূরে....’।

Ñসমুদ্র হক, বগুড়া থেকে

প্রকাশিত : ৪ জুলাই ২০১৫

০৪/০৭/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: