আংশিক মেঘলা, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৬ ডিসেম্বর ২০১৬, ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, মঙ্গলবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

এবার এশিয়া এনার্জিকে ছাড়তে হচ্ছে ফুলবাড়ী কয়লাখনি

প্রকাশিত : ৪ জুলাই ২০১৫
  • সরকারের নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় উন্নয়নের সিদ্ধান্ত

রশিদ মামুন ॥ এবার ফুলবাড়ী কয়লাখনি ছাড়তে হচ্ছে এশিয়া এনার্জিকে। সরকার নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় ফুলবাড়ী কয়লাখনি উন্নয়নের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ইতোমধ্যে ভূতাত্ত্বিক জরিপ অধিদফতরকে করণীয় নির্ধারণের নির্দেশ দিয়েছে জ্বালানি বিভাগ। ভূতাত্ত্বিক জরিপ অধিদফতর শীঘ্রই প্রকল্প প্রস্তাব তৈরি করে বাস্তবায়নে সরকারের অনুমোদন চাইবে। সরকারের এই সিদ্ধান্তে ফুলবাড়ী কয়লাখনি নিয়ে এক যুগের বেশি সময়ের টানাপোড়েনের অবসান হতে চলেছে। সরকার দীর্ঘমেয়াদী বিদ্যুত উৎপাদনের স্বার্থে নিজেই ওই খনি করার উদ্যোগ নিয়েছে বলে সরকারী সূত্রগুলো জানায়।

বিদ্যুত ও জ্বালানি মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, সরকার তাদের ভিশন বাস্তবায়নকে সব থেকে বেশি অগ্রাধিকার দিচ্ছে। এক্ষেত্রে ২০৪১ সালের মধ্যে বাংলাদেশের উন্নত দেশের তালিকায় স্থান করে নেয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। ইতোমধ্যে বাংলাদেশ মধ্য আয়ের দেশের তালিকায় প্রবেশ করেছে। যদিও সরকারের পরিকল্পনা ছিল ২০২১ সালের মধ্যে বাংলাদেশ মধ্য আয়ের দেশে পরিণত হবে। বিশ্বব্যাংকের রিপোর্ট অনুযায়ী পাঁচ বছর আগেই ওই তালিকায় প্রবেশ করল দেশ। এখন উন্নত দেশের তালিকায় নিজেদের প্রবেশের জন্য বিদ্যুত এবং জ্বালানি ব্যবস্থার উন্নয়নের পাশাপাশি অবকাঠামো উন্নয়নের কাজ চলছে। সরকারের বিদ্যুত উৎপাদনের মহাপরিকল্পনায় দেখা যায়, ২০৩০ সাল নাগাদ দেশে বিদ্যুত খাতে মোট ৬৬ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ হবে। ব্যাপক শিল্পায়নে এসব বিদ্যুত ব্যবহার হবে। তবে এজন্য দেশীয় জ্বালানির সংস্থানের ওপর জোর দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা। গ্যাসের মজুদ দ্রুত ফুরিয়ে আসায় দেশের কয়লাখনি উন্নয়নের কোন বিকল্প নেই বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

প্রায় নয় বছর আগে ফুলবাড়ীতে আন্দোলনরত জনতার ওপর তৎকালীন বিএনপি সরকারের উচ্চপর্যায়ের নির্দেশে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী গুলিবর্ষণ করে। এতে অন্তত তিনজন নিহত হন। আহত হন কমপক্ষে ২০০ জন। লাগাতার আন্দোলনে উত্তেজিত জনতা স্থানীয় এশিয়া এনার্জির অফিস ভেঙ্গে দেন। আন্দোলনের মুখে তৎকালীন সরকার আন্দোলনকারীদের সঙ্গে এশিয়া এনার্জিকে দেশ থেকে বহিষ্কারের চুক্তি করতে বাধ্য হয়। যদিও গত নয় বছর ধরে এশিয়া এনার্জি ফুলবাড়ী কয়লাখনিকে নিজেদের সম্পদ বলে দাবি করে আসছে। একই সঙ্গে সেখানে খনি করার অনুমোদন পাওয়ার প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। ফুলবাড়ী কয়লাখনি প্রকল্প নিয়ে এশিয়া এনার্জি কর্পোরেশন (বাংলাদেশ) প্রাইভেট লিমিটেড তাদের নিজস্ব ওয়েবপেজে বলছে, ‘এশিয়া এনার্জি ফুলবাড়ী কয়লা প্রকল্পর সর্বোত্তম বাস্তবায়নে অঙ্গীকারবদ্ধ এবং আশা করে খুব শীঘ্রই খনি উন্নয়নের অনুমোদন পাওয়া যাবে। এশিয়া এনার্জি দ্রুততম সময়ে ফুলবাড়ী খনি উন্নয়নের কাজ শুরু করার জন্য প্রস্তুত রয়েছে, যাতে বিদ্যুত উৎপাদনসহ চাহিদা পূরণে কয়লা সহজলভ্য করা যাবে।’

জ্বালানি সচিব আবু বক্কর সিদ্দিক এ প্রসঙ্গ জনকণ্ঠকে বলেন, ভূতাত্ত্বিক জরিপ অধিদফতরকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে ফুলবাড়ী নিয়ে কাজ করার জন্য। কিভাবে খনি উন্নয়ন করা যায় সে বিষয়ে কাজ করে সরকারকে পরামর্শ দেবে প্রতিষ্ঠানটি। সরকার নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় ফুলবাড়ী খনি উন্নয়ন করতে চায়। এশিয়া এনার্জি প্রসঙ্গে জানতে চাইলে জ্বালানি সচিব বলেন, এশিয়া এনার্জির সঙ্গে আমাদের এমন কোন চুক্তি নেই যে, তাদের খনি উন্নয়ন করতে দিতে হবে। তাদের আমরা একটি জরিপ করতে দিয়েছিলাম। কিন্তু সেই জরিপের ফলাফল আমরা বিশেষজ্ঞ দিয়ে পর্যালোচনা করে দেখেছি তারা যা বলার চেষ্টা করছে তা সঠিক নয়। এখন দেখি তারা ফুলবাড়িতে যায় আর স্থানীয় জনগণের প্রতিরোধের মুখে পড়ে। তিনি আরও বলেন, তারা প্রতি বছর একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ ফি হিসেবে সরকারের কোষাগারে জমা দেয়। কিন্তু কেন এই অর্থ জমা দেয় তা আমরা জানি না। যে কেউ এভাবে সরকারের কোষাগারে অর্থ জমা দিলে নিশ্চয়ই কেউ বাধা দেবে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

দেশের কয়লাখনি উন্নয়নে ফুলবাড়ী ট্র্যাজেডিকে একটি কালো অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। ফুলবাড়ী ট্র্যাজেডির পর কয়লাখনি উন্নয়নের পরিকল্পনা পিছিয়ে যায়। দেশে মাত্র ১৬ বছরের গ্যাসের মজুদ থাকলেও কেবলমাত্র রাজনৈতিক কারণে সরকার কয়লাখনি উন্নয়নের পরিকল্পনা থেকে সরে আসছে। যদিও এর সঙ্গে বিস্তীর্ণ এলাকার ফসলি জমি বিনষ্ট এবং পরিবেশ দূষণ ও পুনর্বাসনের ঝক্কি রয়েছে। এসব বিষয়কে পাশ কাটিয়ে তৎকালীন সরকারের সঙ্গে সমঝোতা করে ফুলবাড়ী খনি উন্নয়নের চেষ্টা করে এশিয়া এনার্জি। ওই সময় খনির অতিমূল্যায়নের পাশাপাশি সকল ঝুঁকিই কমিয়ে দেখানো হয়।

এশিয়া এনার্জির সঙ্গে সরকারের খনি করার চুক্তি নেই। পরোক্ষভাবে হলেও তারাই বিষয়টি স্বীকার করছে। কোম্পানিটি বলছে, এশিয়া এনার্জি মূল কয়লাসম্পদ এলাকার খনি ইজারা এবং অন্যান্য এলাকার অনুসন্ধান লাইসেন্স পেয়েছে। একই সঙ্গে নিজস্ব ওয়েবপেজে পরবর্তী লাইনেই বন্ধনীচিহ্নর মধ্যে স্বীকার করছে, বর্তমানে খনি ইজারায় ওই লাইসেন্স রূপান্তরের জন্য আবেদন করা হয়েছে, যা সরকারের বিবেচনাধীন রয়েছে বলেও ওই বন্ধনীচিহ্নর মধ্যে বলা হচ্ছে।

জানা যায়, অস্ট্রেলিয়াভিত্তিক মাইনিং কোম্পানি বিএইচপির (বর্তমান বিএইচপি বিলিটন) সঙ্গে ১৯৯৪ সালের ২০ আগস্ট সরকারের একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। পরবর্তীতে ১৯৯৮ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি বিএইচপির সঙ্গে সম্পাদিত লাইসেন্স ও চুক্তি এশিয়া এনার্জির কাছে হস্তান্তরের এ্যাসাইনমেন্ট এগ্রিমেন্ট (হস্তান্তর চুক্তি) হয় সরকারের সঙ্গে। এভাবে দেশে বিএইচপি বিলিটনের স্থলে এশিয়া এনার্জির প্রবেশ ঘটে, যা দেশে এশিয়া এনার্জি কর্পোরেশন (বাংলাদেশ) প্রোপ্রাইটরি লিঃ নামে নিবন্ধিত। এটি লন্ডনভিত্তিক জিসিএম রিসোর্সেস পিএলসির (জিসিএম) বাংলাদেশী সাবসিডিয়ারি।

পরবর্তীতে বিএনপি সরকারের সময় আরও একটি চুক্তি হয়। এশিয়া এনার্জি দাবি করছে, ওই চুক্তি কয়লা অনুসন্ধান, খনি উন্নয়ন ও কয়লা উৎপাদনের জন্য করা হয়েছিল। চুক্তির শর্তে বলা হয়, প্রয়োজনীয় আমদানি শুল্ক আড়াই শতাংশ, রয়্যালিটির হার মাত্র ছয় শতাংশ, কর্পোরেট ট্যাক্স ৪৫ শতাংশ, ডিভিডেন্ডের উপরে উইথহোল্ডিং ট্যাক্স ৫ শতাংশ হবে। মাত্র ছয় ভাগ রয়্যালিটির বিষয়ে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়ে ওই সরকার। তখন সমালোচনা সামাল দিতে সরকার কয়লানীতি করার ঘোষণা দেয়। আজও সেই কয়লানীতির চূড়ান্ত রূপ দিতে পারেনি বিগত চারটি সরকার। গত মহাজোট সরকারের শেষদিকে এসে কয়লানীতির বিষয়ে পেট্রোবাংলার সাবেক চেয়ারম্যান মোশারফ হোসেনকে প্রধান করে একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করা হয়। ওই কমিটি তাদের সুপারিশে এশিয়া এনার্জির জরিপের ফলাফল নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।

জানা যায়, প্রাথমিক হিসাবে ফুলবাড়ি খনিতে মোট কয়লা মজুদের পরিমাণ ৫৭২ মিলিয়ন টন। উন্মুক্ত খনন করলে খনির ৯০ ভাগ কয়লাই তোলা যাবে, যার পরিমাণ দাঁড়াবে ৫১৪ মিলিয়ন টন। এশিয়া এনার্জি তাদের হিসাবে বলছে, বছরে উন্মুক্ত খনন করা হলে এখান থেকে ১৫ মিলিয়ন টন কয়লা পাওয়া যাবে। যদিও ২০০৬ থেকে এখন পর্যন্ত এই বিপুল পরিমাণ কয়লার চাহিদা স্থানীয় বাজারে নেই। ওই সময়ে অভিযোগ তোলা হয়, চাহিদা না থাকার পরও এশিয়া এনার্জি দেশের জ্বালানি তুলে বাইরে বিক্রি করে দেয়ার পাঁয়তারা করছে, যা এখনও অব্যাহত রেখেছে বিতর্কিত এশিয়া এনার্জি। প্রাথমিক তথ্যে বলা হচ্ছে, ফুলবাড়ীতে মজুদ কয়লার ধরন হচ্ছে বিটুমিনাসজাতীয় কয়লা (উচ্চ তাপমানসম্পন্ন, অল্প ছাই ও অল্প সালফারযুক্ত- তাপীয় থারমাল) ও সেমিসফট কোকিং কয়লা (মেটালারজিক্যাল)।

দিনাজপুর জেলার চারটি উপজেলা ফুলবাড়ী, বিরামপুর, নবাবগঞ্জ ও পার্বতীপুরের অধীন ৭টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভার অংশ প্রকল্প এলাকার ভেতরে রয়েছে। খনি করার জন্য পাঁচ হাজার ৯৩৩ হেক্টর জমির প্রয়োজন হবে। আর এখান থেকে উচ্ছেদ হতে হবে ৪০ হাজার মানুষকে।

জানতে চাইলে ভূতাত্ত্বিক জরিপ অধিদফতরের (জিএসবি) মহাপরিচালক ড. নেহাল উদ্দিন জনকণ্ঠকে বলেন, আমাদের খনি উন্নয়নে কিভাবে কাজ করা যায় তা নির্ধারণ করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। তবে এখনও প্রকল্প প্রস্তাব তৈরি করা হয়নি। তিনি বলেন, আমরা নিশ্চয়ই এ বিষয়ে দ্রুতই আমাদের কার্যক্রম শুরু করতে পারব।

ভূতাত্ত্বিক জরিপ অধিদফতর কোন খনি উন্নয়নের আগে সাধারণত জরিপকাজ পরিচালনা করে। সেখানে কয়লার মজুদ, ভূতাত্ত্বিক জরিপের ওপর নির্ভর করে খনন পদ্ধতি নির্ধারণ, ভূপ্রাকৃতিক অবস্থা পর্যালোচনা, মাটির গঠন, পানি ব্যবস্থাপনা, পরিবেশের ওপর সম্ভাব্য প্রভাব মোকাবেলা বিষয়ে সরকারকে পরামর্শ দিতে পারে তারা। মূলত এসব বিষয়ের ওপর নির্ভর করেই খনি করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়ে থাকে। সরকার সম্প্রতি দেশের খনিগুলোতে কয়লা উত্তোলন করলে পানি ব্যবস্থাপনা নিয়ে একটি জরিপ করেছে। সরকারী ওই প্রতিষ্ঠানের জরিপ বলছে, পানি ব্যবস্থাপনা করা সম্ভব। যদিও তারা অন্য সম্ভাব্যতা যাচাই করার পরামর্শ দিচ্ছে সরকারকে।

প্রকাশিত : ৪ জুলাই ২০১৫

০৪/০৭/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন

প্রথম পাতা



ব্রেকিং নিউজ: