মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
১১ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, রবিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

বই ॥ দুঃসময়ের ‘আঁচ’

প্রকাশিত : ৩ জুলাই ২০১৫
  • নূসরাত নূরিতা খন্দকার

উপন্যাস রচিত হয় সমাজ দেশ রাষ্ট্র বিভিন্ন বিষয় নিয়ে। লক্ষ্য থাকে কিছু বোধের দ্বার খুলে দেয়া। সেদিক থেকে সমাজচেতনা বিষয়ক ‘আঁচ’ একটি সার্থক উপন্যাস।

বিচিত্র অরাজকতা আর দুর্ভিক্ষকবলিত এক দুঃসময়ের অন্ধকার দৃশ্য সেঁচে একজন সুক্কু মিয়ার ঝুপড়ি দাঁড়িয়ে আছে সাযযাদ কাদিরের ‘আঁচ’ উপন্যাসের বুকে। মঙ্গার ছোবলে জলপাহাড় শহরের একদিকে ধান্দাবাজদের ক্ষমতার দুনিয়া অন্যদিকে নিপীড়িতের আবাস উপকণ্ঠ জলাজঙ্গল। ভূগোলে জলপাহাড় আর জলাজঙ্গলের হদিস কোথায় পাওয়া যেতে পারে তা বলা মুশকিল। কিন্তু লেখকের সূক্ষ্ম লিখন দক্ষতায় ওই দুই স্থান আমাদের পরিচিত অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক এবং সামাজিক-ভৌগোলিক ভূখণ্ডে অবস্থিত। দেশের সার্বিক পরিস্থিতির সারমর্ম নিংড়ে চরিত্রগুলো নির্মিত। ক্ষমতালোভী এক লম্পট লিডার তার চেলাচামুণ্ডা নিয়ে ধান্দার চেম্বার খুলেছে কাহিনীর গলিপথে। তার মাথার ওপর ঠাঁয় দাঁড়িয়ে থাকে আরও কিছু ফায়দাবাজ ধুরন্ধর ব্যবসায়ী চক্র, এনজিও। এরা সবাই লিপ্ত সমাজবিরোধী চক্রান্তে। ব্যবসার প্রয়োজনে নতুন রোগের নাম দিয়ে লিডারকে সমাজের মঞ্চে মাইক হাতে ধরিয়ে নতুন ওষুধ সেবনে উদ্বুদ্ধ করে অবুঝ আমজনতাকে। আসলে সে ওষুধ নয় বহুজাতিক কোম্পানির মেধা আর পরিশ্রমে ‘বিশুদ্ধ ডিস্টিল্ড ওয়াটার, বিশুদ্ধ সুগার অব মিল্ক, বিশুদ্ধ ফাইটাম... আরও সব বিশুদ্ধ ব্যাপার দিয়ে তৈরি ও সব...স্ট্রিপ, কার্টন, প্রিন্ট, প্যাকেজিংয়ের ডিজাইন’ ইত্যাদি ‘চেহারা দেখলেই মনে হবে কি দারুণ সব সামগ্রী’। বোকা আমজনতার ঘাড়ে কাঁঠাল ভাঙার ছবি দেখা যায় এসব ব্যবসায়ীর কুকারবার চিত্রপটে। রোগ বানাতে কিছুই লাগে না, লাগে কেবল হুজুগ। ব্যস বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের ব্যবসার রাস্তা তৈরি।

পেটের ক্ষুধার জ্বালায় গাঁয়ের বউ-ঝিরা ধরা দেয় মহাজনদের বিকৃত ক্ষুধার ফাঁদে। সুক্কু মিয়ার একমাত্র মেয়েটি একদিন সার্কাসে ছুরি খেলায় দর্শকের চোখে ধাঁধা ধরিয়ে দিত, সেই মেন্দি-ও দুর্ভিক্ষের হিংস্র কবলে পরে ভুখা পেটে বাপ-ভাই-স্বামীর জন্য অপেক্ষা করে-করে এক পর্যায়ে উদোম হয়ে দাঁড়ায় হাজার টাকার নোটের সামনে। খবিরের মতো সামাজিক খবিশদের কাছেই যৌনতার বিনিময়ে পেটের ক্ষুধা নিবারণের হাতেখড়ি পায় সে। তারপর নিরুপায় ভালবাসার মিথ্যা কুহেলি একদিন ডেকে নিয়ে যায় রক্তপাত আর গা ঢাকা দেয়ার অদৃশ্য পথে।

সাযযাদ কাদিরের ‘আঁচ’ না পড়লে বোঝা যাবে না আমাদের আশপাশে যত আনন্দপূর্ণ জাঁকজমকপূর্ণ দৃশ্য বিরাজিত ঠিক তার গভীরেই রয়েছে অজস্র নোংরা খেলার চক্রান্ত। উপন্যাসটির ছকে সমাজের নিম্ন প্রান্ত থেকে শুরু করে উঁচু স্তর পর্যন্ত নব্য ধনিকদের আধিপত্য এবং বিপন্ন অসহায় নিম্নবর্গ মানুষের জীবনাচার ফুটে উঠেছে। সেইসঙ্গে কাহিনীর একেবারেই শেষ পটভূমিতে লেখক স্পষ্ট করেছেন ইন্টেলেকচুয়ালদের ভাবনার ভাব-ভঙ্গি এবং বাস্তবতা। চিরে-চিরে নানা স্তরের জীবনকে সেঁচে তুলেছেন উপন্যাসের সংলাপসমগ্রে।

বইটির উপস্থাপনায়ও নতুনত্ব পাওয়া যায়। একদম শেষে রাখা হয়েছে একটি পরিশিষ্ট অধ্যায়। পাঠকের সুবিধার্থে উপন্যাসে মাদক-অস্ত্র-সন্ত্রাসী-যৌনব্যবসায়ী চক্রের ব্যবহৃত উপভাষা বা সø্যাং, সেইসঙ্গে নিম্নবর্গের মানুষের ব্যবহৃত বেশকিছু অশিষ্ট শব্দের অর্থ দেয়া হয়েছে সেখানে। অপরাধ জগতে ব্যবহৃত অনেক শব্দের ইঙ্গিতপূর্ণ ব্যবহার থাকায় সাধারণ পাঠকের কাছে সংলাপ বোধগম্য না-ও হতে পারে, সেই লক্ষ্যে ঔপন্যাসিক সযতেœ পরিশিষ্টে সে সকল শব্দের একটি ‘চলন্তিকা’ রেখে দিয়েছেন। যেমন, ‘কাঁঠালি চাঁপা’ একটি ফুলের নাম। কিন্তু অপরাধচক্রের ব্যবহৃত ভাষায় এর অর্থ- যে নিজের আসল রূপ দেখাতে চায় না; খাপরি-সুন্দর নারী; এজমালি-যৌনকর্মী; ইনডোর গেম-সঙ্গম; বডি ফেলা- যৌনসঙ্গী করা; ব্যাল্কা-বেজায় বোকা ইত্যাদি। উপন্যাসটি সকল পাঠকের কাছে আদৃত হবে এটাই আশা করি।

প্রকাশিত : ৩ জুলাই ২০১৫

০৩/০৭/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: