আংশিক মেঘলা, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৭ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, বুধবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

সিকদার আমিনুল হককে নিয়ে যৎসামান্য

প্রকাশিত : ৩ জুলাই ২০১৫
  • সরকার মাসুদ

আমরা যাদের কবিতা পড়তে পড়তে বেড়ে উঠেছি সিকদার আমিনুল হক তাদেরই একজন। মনে পড়ে ১৯৮০ থেকে ১৯৮৫-এর দিনগুলো। আমি সে সময় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজী বিভাগে পড়ছি। দুচোখে কবিতার স্বপ্ন। মাথাভরা উম্মাদনা- সবই সাহিত্যকে কেন্দ্র করে। এবং জীবনযাপনে অনেকটাই বোহেমিয়ান। মোহাম্মদ কামাল, আরিফুল হক কুমার, অসীম কুমার দাস প্রমুখ কবিযশোপ্রার্থী তরুণ বন্ধুদের সঙ্গে চষে বেড়াচ্ছি মতিহার ক্যাম্পাস; ছুটে বেড়াচ্ছি শহরের যত্রতত্র। মাঝে মাঝে ট্রেনে চেপে বৃহত্তর রাজশাহী জেলার নানা প্রান্তে চলে যাচ্ছি- তাও যেন কবিতারই প্রণোদনায়!

সে সময় শহরের নিউ মার্কেটে একটা আড্ডা ছিল আমাদের। ওখানে কয়েকটা বইয়ের দোকানও আছে। মনে পড়ে, আবুল হাসানের ‘রাজা যায় রাজা আসে’ এবং ‘যে তুমি হরণ করো’ কাব্যগ্রন্থ দুটি কিনেছিলাম ওখান থেকেই। ফরহাদ মজহারের কাব্যগ্রন্থ ‘ত্রিভঙ্গের তিনটি জ্যামিতি’ কিনেছি একই জায়গা থেকে। বিকেল পাঁচটা থেকে সন্ধ্যা সাতটা পর্যন্ত অসীম আর আমি কাটাতাম ‘ব্রিটিশ কাউন্সিল’ এ। একেবারে রুটিন করে। তারপর ঘরে ফেরার আগে ‘বুকস প্যাভিলিয়ন’-এর সামনের ছোট, চত্বরে আড্ডা মারতাম ঘণ্টা খানেক। ‘বুকস প্যাভিলিয়ন’ তার ঝলমলে অঙ্গসজ্জা এবং উল্লেখযোগ্যসংখ্যক বইয়ের সংগ্রহের জন্য আমাদের খুব একটা আকর্ষণের জায়গায় পরিণত হয়েছিল। ঢাকায় সদ্য প্রকাশিত বই-পুস্তকের অনেকই অল্পদিনের ভেতর এসে পড়ত ওই দোকানটায়। স্পষ্ট মনে আছে, ‘বুকস প্যাভিলিয়ন’ এর কাঁচের শেল্পে সাজিয়ে রাখতে দেখেছি, পারাবত, এই প্রাচীরের শেষ কবিতা নামের বইটিকে। লেখক সিকদার আমিনুল হক। কাব্যগ্রন্থের এ ধরনের নাম আমাদের কাছে ছিল এক নতুন অভিজ্ঞতা। পরে ঐ বইটিও আমি কিনে ফেলি। বন্ধুরা পালা করে পড়েছি ঐ বই। ‘সেতারের তীব্র ঝালা রাত্রি কাঁপে সমুদ্রে সরোদে’...এ জাতীয় একাধিক পঙক্তি এখনও কানে বাজে। আজকে শূন্য দশকের নবীন কবিদের সিংহভাগই টানা গদ্যে কবিতা লিখতে অভ্যস্ত। তারা কি জানেন, এই একই জিনিস কত আগে কতটা কল্পনাসচ্ছল ভঙ্গিতে লিখে গেছেন সিকদার, আমিনুল হক? ‘পারাবত, এই প্রাচীরের শেষ কবিতা’ বইটি পাঠ করা তাদের কর্তব্য বলেই মনে করি।

পূর্ববর্তী কাব্যগ্রন্থ ‘দূরের কার্নিস’-এ লক্ষ্য করা গিয়েছিল অপ্রতিরোধ্য রোমান্টিকতা। তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কল্পনামধুর গীতলতা। যদিও সেই পর্যায়ের অনেক অনচ্ছতা এবং নাতিগভীর সাবলীলতা অতিক্রম করে সিকদার উত্তরকালে নিজের জন্য একটি শক্ত-সমর্থ শৈল্পিক প্লাটফর্ম তৈরি করতে পেরেছিলেন, তথাপি, ‘দূরের কার্নিস’ পর্বের ‘সুলতা জানে, সুলতা জানে, সুলতা জানে ভালো/আকাশে মেঘ পুকুরে ভাসে হাঁস/ ‘সুলতা জানে, সুলতা জানে, সুলতা জানে ভালো/কবিরা কেন নারীর ক্রীতদাস।’... এই সব পঙ্ক্তি আমাদের ছন্দ-মিল-এঅনভ্যস্ত নতুন কানে মন্দ শোনায়ানি।

স্মৃতি, ভ্রমণ, যৌনতা, পানাহার, স্বপ্ন উচ্চস্তরের কবিতা রচনার আকুতিÑ এসব ছিল তাঁর পরবর্তীকালের কবিতার পুনরাবৃত্ত বিষয়-আশয়। শেষদিকে এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল অবসাদবোধ ও মৃত্যুচেতনা। কয়েকটি উদ্ধৃতি :

ক. স্মৃতি থাকে পাহাড়ের সবচেয়ে উঁচু জায়গায়।/সমতলে আসবার সময় সঙ্গে নিয়ে আসে শীত। (আমি ক্লান্ত,...)

খ. পশু শিকারের পরে আসে উগ্র অবসাদ/ পাতাঝরা রাত্রি আর যৌনতার অন্ধকার। (এই মদ উঁচু পাহাড়ের)

গ. রিতা কিংবা ঈশিতার যুগোল স্তন/যা প্রাপকের কাছে জর্জেট বা মিহি সিল্কের বিনিময় ব্যবস্থায় বাধ্য হয়ে পৌঁছে যায় কনকনে শীতের রাত বারোটায়। (শীত)

ষাটের কবিতা সৃজিত হয়েছিল অনেকখানি উচ্চাশা নিয়ে। তুলনায় সার্মথ্য ছিল কম। এটা হয় তো সব যুগের কবিতা সম্বন্ধেই কম-বেশি বলা যায়। কিন্তু বিশেষভাবে পাটের প্রজন্ম সম্বন্ধে এ কথা বললাম এজন্য যে, এরা পঞ্চাশের কবিদের তুলনায় অনেক বেশি বৈচিত্র্যসন্দ ছিলেন। এই একই প্রজন্মে আবদুল মান্নান সৈয়দ, মুস্তফা আনোয়ার-এর মতো প্রথাবিরোধী কবি ছিলেন, আবার আছেন মহাদেব সাহা, নির্মলেন্দু গুণ-এর মতো প্রথানুগ কবিও। উপরন্তু রবার্ট লাওয়েল, সিলভিয়া প্লাথ, টেড হিউজ, আন্দ্রে ভজনস্কি প্রমুখ বিদেশী কবির কবিতা পড়ে তারা অনেক সাহসী ও উচ্চাশী হয়ে পড়েছিলেন। সিকদার আমিনুল হকের কাব্যবিশ্বাস এবং শিল্পপ্রতীতিও মোটামুটি অভিন্ন ছিল। তবে জীবনদৃষ্টির ক্ষেত্রে তিনি অনেকটা আলাদা ছিলেন। তার অন্তর্মুখী কবিতায় একটা বৈশ্বিক আবহ লক্ষণীয়। ‘বিশুদ্ধ কবিতা’-য় বিশ্বাসী ছিলেন সিকদার। ‘বিশুদ্ধ কবিতা’ বলতে তিনি কী বুঝিয়েছেন? যে কবিতায় আছে ভাব-কল্পনার বিশুদ্ধতা সে রকম রচনা? তিনি নতুন ধরনের কবিতা লিখতে চেয়েছিলেন, কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে সহজাত ভাবেই প্রথার দিকেই ঝুঁকে ছিল তার কাব্য-প্রবণতা।

সিকদার আমিনুল হকের কবিতা যে সব বিষয়কে উপজীব্য করেছে তা তার সময়ে অপরাপর কবিদের বেলায় দেখা যায় না, বা বলা চলে সামান্যই দেখা যায়। বাকপ্রতিমার ক্ষেত্রে, অবশ্য তিনি শহীদ কাদরী, আবুল হাসান প্রমুখ কবিদের মতো ‘আলাদা’ নন। তা সত্ত্বেও তার বেশকিছু পঙ্ক্তি- অনেক কবিতাই শিল্পের অনেক শর্তই পূরণ করে। তার অসংখ্য উচ্চারণ যাকে বলে কাব্যগুণান্বিত, ঠিক তাই। কখনও কখনও ব্যতিক্রমী ভাবনাও চোখে পড়ে যা একজন পরিণত বয়স্ক কবির জীবনাভিজ্ঞতার মূল্যবান নির্যাসÑ

১. ‘আমি কনকনে শীতে মাঘে বা পৌষে অভিভূত হয়ে বলি,/হে নিয়তি হে পরম ঈশ্বর অনুগ্রহ,/শীতেই এসব হয়,/ধার করা যায় বৈধ আর অবৈধ জিহ্বার অ্যাসেডিক স্বাদ/বা অভিজ্ঞার ব্রণ মুখম-ল/কেননা তখনই কেবলমাত্র ভালো লাগে সকল উন্মাদ মহিলার সুখ ভালো লাগে তাজা লাগে’ (শীতে)

২. ‘একটা বিড়াল নিয়ে কবিতা লিখবো। বসে আছি।/বাটি ভরা মাংস আছে। মাছ চাচ্ছে। এ-দিকে আসে না। একটা কুকুর নিয়ে কবিতা লিখবো। বসে আছি।/কোথাও দেখি না তাকে। তার মানে এটা ভাদ্র মাস! চুমু ছিলো অনিচ্ছায়! তাকে নিয়ে কবিতা লিখবো।/আজ এলো বুক খুলে। বস্ত্র নেই। কবিতা হলো না!’ (কবিতা হলো না)

শেষের দিকে, তার তিরোধানের বেশ কিছুদিন আগে, লক্ষ করা যাচ্ছিল তার কবিতায় ছায়া ফেলেছে ক্লান্তি এবং মৃত্যুচেতনা। অকাল মৃত্যুর শিকার হয়েছেন এমন কবি ছাড়া পৃথিবীর বাদবাকি প্রধান কবিগণ একটা বয়সে পৌঁছে মৃত্যু নিয়ে ভেবেছেন। লিখেছেন বিচ্ছেদের কবিতা; মৃত্যুর কবিতা। খুবই স্বাভাবিক। কিন্তু এমন ভাবনার এবং তার প্রকাশভঙ্গির মধ্যে তারতম্য আছে। এটাও স্বাভাবিক এবং সমীচীন। ফলে আমরা দেখেছি, রবীন্দ্রনাথ মৃত্যু নিয়ে লিখেছেন একভাবে। জীবনানন্দ দাশ আরেকভাবে। আসলে কবিস্বভাব ও রুচিই পার্থক্য গড়ে দেয়। বাংলাদেশের ষাটের কবিরাও মৃত্যু নিয়ে লিখেছেন নিজেদের সার্মথ্যমতো। সিকদার আমিনুল হক কিভাবে তা ব্যক্ত করেছেন দেখুনÑ ‘সেই অন্ধকার আমি ভালোবাসি; যেতে ভয় নাই!/ অনেক দেখেছি আমি, কাঁচা শসা, পুকুরের হাঁস;/রোজ রোজ মদ্যপান, অন্ধকার দেখা হয় নাই। (১২ নং কবিতা। ১৫.০৫.০৩)

যদি পঞ্চাশ পরবর্তী আধুনিক বাংলা কবিতার মূল্য বিচার করতে বসি আমরা, তাহলে আমি বলব, ষাটের প্রজন্মের প্রথম সারির একজন কবি সিকদার আমিুনল হক। আবুল হাসান, মুস্তফা আনোয়ার, রফিক আজাদ, আবদুল মান্নান সৈয়দ প্রমুখের পরেই তার স্থান। একটা সময়ে তার কবিতা প্রচুর পড়েছি। এখনও মাঝে মাঝে পড়ি। ভাবুক হিসেবে তার স্তরটি যে জায়গায় এবং যে ধরনের বিষয়-আশয় নিয়ে তিনি নিরন্তর কাজ করে গেছেন, তার কবিতা ঠিক সেই উচ্চতায় পৌঁছাতে পারেনি। তা সত্ত্বেও, ভেবে দেখেছি, মহৎ কবিতার অসংখ্য উপাদান সজীব আছে তার কবিতায়। কিন্তু সেগুলো তেমন কার্যকর হয়ে উঠতে পারেনি তার কাব্যভাষাটির কারণে। আমার ধারণা, সেজন্য খুব প্রয়োজন ছিল একটা নিজত্বম-িত লিপিকৌশল। এটা বলা বোধ হয় অত্যুক্তি হবে না যে, অনেকটা শামসুর রাহমানীয় ভাষাবলয়ের ভেতর বেড়ে উঠেছে সিকদারের কবিতা। সেই ঘেরা টোপ থেকে তিনি বেরিয়ে আসতে পারেননি। ভিড়ের মধ্যে কণ্ঠস্বর স্পষ্টত আলাদা করে চেনা সম্ভব, এ রকম কবি তো বিশ্বের সব ভাষাতেই বিরল। এভাবে দেখলে বলা যায়, সিকদার আমিনুল হকের কবিতায়ও বিশিষ্টতা আছে। আছে স্বাতন্ত্র্যদীপক নানা প্রবণতা ও প্রীতি। স্খলন তো আছেই। এসব নিয়েই তিনি সিকদার আমিনুল হক। বাংলাদেশের কবিতায় একটি উজ্জ্বল নাম।

প্রকাশিত : ৩ জুলাই ২০১৫

০৩/০৭/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: