মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
১১ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, রবিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

রোমাঞ্চকর পথচলা

প্রকাশিত : ৩ জুলাই ২০১৫
  • মো. জাভেদ-বিন-এ-হাকিম

কেউ ভুল করে/কেউ ভুলে পড়ে/আমার হয়েছে কোনটা/জানে না যে এই মনটা।- তবে ‘দে-ছুট’ ভ্রমণ সংঘের বন্ধুরা ভুল করা কিংবা পড়া কোনটার মধ্যে নেই। প্রকৃতিকে ভালবেসেই ছুটে চলে দেশ-দেশান্তরে। ‘এসো বন্ধু দে-ছুট ভ্রমণ সংঘের ছায়াতলে ঘুুরে বেড়াই পাহাড়-পর্বত আর প্রকৃতির মায়াবি অরণ্যে’ এই সেøাগানকে ধারণ করেই এবার অগাধ সৌন্দর্যের লীলাভূমি বান্দরবানের রুমা থেকে পায়ে হেঁটে গিয়েছিলাম প্রকৃতির রহস্যময় সৃৃষ্টি বগালেকের প্রান্তরে। পঁচিশে মার্চ রাত্রে ঢাকার ফকিরাপুল থেকে নানান ঝামেলার পরে ১১.১৫ মিনিটের গাড়ি ছেড়েছে রাত ০১.৩০ মিনিটে, তার ওপর আবার ডাবলিং টিকিটের যন্ত্রণা। সিটে বসা নিয়ে যাত্রীদের মাঝে হুলস্থুল বেধে গেল। কাঁচপুর গিয়ে গাড়ি পুরোই ব্রেক। পরিস্থিতি অনুমান করে বুঝতে পারলাম, সারা রাতও ঘটনার রফাদফা হবে না। বরং ত্রিমুখী সংঘর্ষ হওয়ার বিপুল সম্ভাবনা, মন নাজুক অবস্থায় মোস্তাকের অসাধারণ বুদ্ধিমত্তায় গাড়ি পুনরায় স্টার্ট নিল। এক সময় যেন মনে হলো পুরো বাসের যাত্রিরাই ‘দে-ছুটের পরিবার। পরের দিন বেলা সাড়ে বারোটায় বান্দরবান পৌঁছাই। দেরিতে যাওয়ায় পকেটের বারোটা বেজেছে। চান্দের গাড়িতে চড়ে ছুটি রুমার উদ্দেশে, সেখানে পৌঁছে-দুপুরের আহার সারতে বিকেল হয়ে এলো। ফলে ঐদিন রুমাতেই রাত্রিযাপনের মনস্থির। তাই বিকেলটা সাঙ্গু নদীতে ইঞ্জিন নৌকায় চেপে ছুটলাম রিজুক জলপ্রপাতের পথে। আমার চোখে একযুগ আগে দেখা রিজুক জলপ্রপাতের সৌন্দর্য এখন যেন অনেকটাই করুণ। অবশ্য পরিবেশের এই ভারসাম্যহীনতার জন্য সভ্য সমাজের মানুষেরা অনেকাংশে দায়ী। প্রপাতের পাশে বেশ কিছুটা সময় কাটিয়ে আলো আঁধারিতে ফিরে এলাম রুমা বাজারে। পরের দিন দুর্গম পথ পাড়ি দিয়ে যেতে হবে বগালেকের প্রান্তরে, তাই গাইডকে নিয়ে প্রয়োজনীয় রসদ ক্রয় করলাম। রাতের খাবার শেষে সোজা রিসোর্টে।

সবাই সকাল সকাল প্রস্তুত। কিন্তু জসিম ও কচি ভাই ১৭ কি.মি. হাঁটতে হবে জেনে শারীরিক অসুস্থতার ভান করে বেঁকে বসল। একজনের হার্ট ,আরেকজনের লিভার, আমি ওদের কাহিনী বুঝতে পেরেও না বোঝার ভাব করে তাল মিলিয়ে বললাম, ঠিক আছে তোমরা গাড়িতে যাও। হঠাৎ কচি ভাই কি যেন ভেবে হেঁটে যেতে রাজি হলো। আর জসিম এবার নতুন বাহানা তুলে রনে ভঙ্গ দিয়ে ঢাকার পথে। আর্মি ক্যাম্পে নাম, ঠিকানা, এন্ট্রি করে দুর্গম ঝিরিপথে হাইকিং শুরু, ওয়াও! পাহাড়, অরণ্য আর অগণিত ঝিরি মাড়িয়ে দুর্বার গতিতে ছুটে চলছি। সঙ্গে আছে খুব শীঘ্রই অলরাউন্ডার খেতাবে ভূষিত হতে যাওয়া মোতাহের। সত্যি বলতে কি, মোতাহের সঙ্গে থাকলে আমার মনের সাহস বেড়ে হয় দ্বিগুণ। ফরমালিনমুক্ত কলা, পেঁপে খেয়ে শক্তি জুগিয়ে নিচ্ছি। চারপাশে পাহাড় আর ঘন অরণ্য, তার মাঝ দিয়ে ‘দে-ছুট’ দল মনের আনন্দে হেঁটেছে। দেহ মনে কোন ক্লান্তি আসে নাই, আসেনি কোন ভাবনা, শুধুই আমরা। ঢাকায় মাত্র কয়েক গজ হাঁটলেই ত্রাহি ত্রাহি অবস্থা। আর সেখানে চৈত্রের ভর দুপুরেও মাইলের পর মাইল হাইকিং। নৈঃশব্দের গভীর অরণ্যের পথে হেঁটে চলা কতটা যে রোমাঞ্চকর অনুভূতির, তা শুধু অনুভবই করা যাবে। দীর্ঘ পথ পরিক্রমায় এক সময় মনে হবে নাম না জানা সুর তুলে ডেকে যাওয়া বনের পাখিও ‘দে-ছুট’ সেøাগান দিচ্ছে। প্রায় চার ঘণ্টা হাঁটার পর প্রকৃতির এক অদ্ভুত সৃষ্টি আবিষ্কার করি। রুমা খালের পাশে উঁচু টিলা এমন সুন্দরভাবে আপন মহিমায় সেজেগুজে আছে, যা কিনা উন্নত বিশ্বের পর্যটন মন্ত্রণালয় কর্তৃক নির্মাণশৈলীকেও হার মানায়। অথচ আমরা প্রকৃতির দানকে রেখেছি অবহেলায়। সর্বসম্মতি ক্রমে জায়গাটির নাম দিয়ে দিলাম ‘দে-ছুট-ডেন্স-পয়েন্ট’ ওয়াও! বেশ কিছুক্ষণ সময় ডেন্স ও শীতল জলে দাপা-দাপি, লাফালাফি করে আবারও হাঁটা শুরু। এবারের পথটা যেন আরও রোমাঞ্চকর আরও বেশি হৃদয়ে গেথে থাকার মতো অনুভূতির। দু-পাশের পাহাড় খাড়া হয়ে যেন দিগন্তের সঙ্গে দোস্তি পেতেছে। বিশাল আকৃতির বৃক্ষগুলো যেন প্রহরী হয়ে শির উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে।

পায়ের নিচে বড় বড় পাথর আর মাথার ওপর তীব্র রোদের তাপ, কিন্তু কেন যেন শীতের সকালের সোনা মাখা রৌদ্রের মতোই লেগেছে। মনে হচ্ছিল হারিয়ে যাই অজানায়! কিন্তু পেটের তাড়নায় তা আর হলো না। পাহাড়ের কূলঘেঁষা উম্বংপাড়া ম. ইউ কারবারির ডেড়া ঘরে নুডলস খেয়ে আপাতত পেটকে ঠা-া করলাম। আমাদের মতো আরও অনেক আদিবাসী এই পথ মাড়ালে তার ঘরে খাবার খেয়ে খানিকটা সময় বিশ্রাম নেয়। কারবারি সাহেব খাওয়ার বিল খুব বেশি রাখেন না। আবারও বন্ধুর পথে ছুটে চলা। প্রায় সাড়ে আট ঘণ্টা হাঁটার পর পড়ন্ত বিকেলে নারিশ্বা ঝর্ণা মুখে ব্রেক দেই। কি অদ্ভুদ ! কত সুন্দর তার রূপ। খড়ায় চৌচির হয়ে যাওয়া মৌসুমেও রিমঝিম শব্দ তুলছে পানির অবিরাম ধারা। ঝর্ণা মুখে প্রাকৃতিকভাবেই বেসিন তৈরি হয়েছে। আহ্ পানি কি ঠা-াÑ সেই পানিতে অজু করতেই মনের মাঝে এক অপার্থিব শান্তি দোলা দিয়ে যায়।

বিকেলে হাইকিং অতপর ট্র্যাকিং। ঘন জঙ্গলের কারণে এবার দিনের আলোতেই অন্ধকার। টর্চের আলোতে পাহাড় বেয়ে ওপরে উঠছি। একসময় অমাবস্যা অন্ধকারেই পাহাড় চূড়ায় হাঁটু গেড়ে বসে পড়ি। চিঁড়া-মুড়ি-মিঠাই-খেজুর-পানি পান করে আবারও হাঁটা। পথের শেষে যখন সঙ্গীরা বলল ছবির মতো এমন সুন্দর পথ অথচ পর্যটকদের জন্য নিষিদ্ধ। সম্ভবত কারও যোগসাজশে চান্দের গাড়িওয়ালারা এমনটি করেছে। তখন আবারও সেই ব্যাপক জনপ্রিয় টিভি ডায়লগ কি..জা..নি..বা..পু? সন্ধ্যা ৭.৩০ মিনিটে এসে পৌঁছাই সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ২৭৪১ ফিট ওপরে প্রকৃতির আপন খেয়ালে সৃষ্টি অনিন্দ্য সুন্দর বগা লেকের প্রান্তরে।

হাস্যোজ্জ্বল বম তরুণ মি. কিম আমাদের উষ্ণ অভ্যর্থনা জানালেন। আজ রাতে তার কটেজেই থাকব। লেকের জলে সাফ সুতোর হয়ে বার বি-কিউ করতে ব্যস্ত হয়ে পড়ি। একটা সময় সাইফুল ভাই নিজের ভাব ধরে না রেখে নাচতে শুরু করে দিলেন আর মোস্তাক পেজে লাইক না দিয়ে লাইকে পেজ দেয়ার জন্য উপস্থিত অন্যান্য ভ্রমণপিপাসুদের মাঝে প্রচারণা শুরু করে দিল। তাদের এহেন শিশুসুলভ কর্মকা-ে আনন্দের বাধ ভেঙে আরও অনেকের মাঝে ছড়িয়ে পরে। আমাদের আড্ডার সঙ্গে উপস্থিত অনেক ভ্রমণপিপাসুই যোগদান করে, বার-বি-কিউ খাওয়ার স্বাদও বেড়ে যায় বহুগুণ। লেকের ধারে গভীর রাত পর্যন্ত জম্পেশ আড্ডা হয়।

পরের দিন সকালে বগালেকের চারপাশ দেখে আপন মনে বিড়বিড় করে বলি আমাদের মতো এমন সৌভাগ্যবান জাতি খুব কমই আছে। যে দেশের প্রকৃতি এতটা উজাড় করে দিয়েছে অথচ মনের দিক থেকে কতটা দৈন্যদশায় আছি, তা হাড়ে হাড়ে টের পাওয়া যায় যত্রতত্র ঘর বানিয়ে পুরো এলাকাকে বস্তিতে পরিণত করে দিয়ে সৌন্দর্যকে ম্লান করে দেয়ায়। লেকের জলের দিকে তাকালে বুকের ভেতরটা হুহু করে ওঠে। বিগত কয়েক বছর আগেও জলে ভেসে থাকত অজস্র নীলপদ্ম আর এখন হাতে গোনা দু-চারটি। আগামী কয়েক বছরের মধ্যে প্রকৃতির অপার বিস্ময় বগালেক যে ময়লার ভাগারে পরিণত হবে না তার খোঁজ রাখে কে? এভাবে চলতে থাকলে একদিন হয়ত দূর থেকে যাওয়া ভ্রমণপিপাসুরা বগালেকের প্রান্তরে গিয়ে নিরাশ মনে বলে উঠবে, বস্তির ডোবা দেখতে এতটা পথ ছুটে আসা।

ফেরার দিন সময় থাকায় বেথেলপাড়া ও রউম্মনপাড়ার মাঝামাঝি টেবিল হিল দেখতে গেলাম। পৃথিবীতে সুইজাল্যান্ডের টেবিল হিল একমাত্র টেবিল হিল হিসেবে স্বীকৃত। অথচ দেখতে প্রায় কাছাকাছি প্রকৃতির দান আমাদের গর্ব বান্দরবানের টেবিল হিল সম্পর্কে বিশ্ব তথা দেশবাসীর কাছেই রয়েছে অনেকটা অজানা!

যা দেখবেন : বান্দরবান শহর ও আশপাশে রয়েছে মেঘলা পর্যটন, নীলাচল শৈলপ্রপাত, চিম্বুক পাহাড়, নীলগিরি ও প্রান্তিক লেকসহ আরও অনেক কিছুই।

যোগাযোগ : ঢাকা, গাবতলী ও ফকিরাপুল থেকে বিভিন্ন পরিবহনে বাস সার্ভিসে বান্দরবান। ভাড়া নন এসি ৬২০ টাকা, এসি ৭৫০ টাকা। বান্দরবান শহর থেকে রুমা বাজার চাদের গাড়ি/বাস/ঝিপে ভাড়া ২০০ টাকা হতে চার হাজার টাকা। রুমা বাজারে রাত যাপন করতে চাইলে বিভিন্ন রিসোট/কটেজ/হোটেল ও বোর্ডিং আছে, ভাড়া ৫০ টাকা হতে ১২০০ টাকা পর্যন্ত। গাইড দিন প্রতি ৫০০ টাকা নেবে। বগালেকে খাবার জন প্রতি ১০০ টাকা থাকা মাথাপিছু ১২০ টাকা। ফেরার সময় বগালেক থেকে জিপে চাঁদের গাড়িতে ভাড়া নেবে তিন হাজার টাকা।

বিশেষ তথ্য : বর্তমানে রুমা থেকে ঝিরি পথে যেতে হলে স্থানীয় কোন বিশ্বস্ত ব্যক্তির সাহায্য নিন। পর্যাপ্ত পরিমাণ শুকনো খাবার ও স্যালাইন এবং মশা ও জোঁক প্রতিরোধক ক্রিম সঙ্গে রাখুন। অবশ্যই দক্ষ গাইড রুমা বাজার আর্মি ক্যাম্প হতে নিয়ে নিন। হাইকিং করার সময় একতাবদ্ধ ও শৃঙ্খলা বজায় রাখুন।

প্রকাশিত : ৩ জুলাই ২০১৫

০৩/০৭/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: