আংশিক মেঘলা, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৬ ডিসেম্বর ২০১৬, ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, মঙ্গলবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

ঈদকেন্দ্রিক অর্থনীতিতে নারী

প্রকাশিত : ৩ জুলাই ২০১৫
  • আবু সুফিয়ান কবির

রীমা জুলফিকার একজন সফল নারী উদ্যোক্তা। তিনি স্থানীয় গৃহসুখন নামে একটি হস্তশিল্প, রান্না ও বিউটিফিকেশন প্রশিক্ষণ কেন্দ্র পরিচালনা করে আসছেন প্রায় ২৫ বছর ধরে। ইতিমধ্যে এখান থেকে প্রায় ৭২ হাজার নারী প্রশিক্ষণ নিয়ে বিভিন্ন ধরনের কর্মকা-ের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়েছেন। এখানে মেয়েদের জন্য ফ্যাশনডিজাইনিং, কারুপণ্য তৈরি, ব্লক-বুটিক, কাপড় কাটিং, রান্না, ডেকরেশনসহ আছে বিউটিশিয়ান তৈরির নির্ভরযোগ্য প্রশিক্ষণ কেন্দ্র। এখান থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে নারীরা দেশের অর্থনীতির উন্নয়নের সঙ্গে নিজেদের জড়িত করছেন। দেশের ঈদকেন্দ্রিক অর্থনীতির সঙ্গে নরীরা নিজেদের কিভাবে সম্পৃক্ত রাখছেন জানতে চাইলে রীমা জুলফিকার বলেন, “বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার অর্ধেক নারী। এই বিপুলসংখ্যক নারীর সক্রীয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে দেশের অর্থনীতি গতিশীল হচ্ছে। আর ঈদে পোশাক তৈরি থেকে শুরু করে গ্রামীণ নারীরা নিজেদের হস্তশিল্প তৈরিতে যে ভূমিকা রাখছেন, তা উপেক্ষা করার উপায় নেই। সবচেয়ে আনন্দের বিষয়, নারীরা এখন মুক্ত আকাশে বিমান চালনা থেকে শুরু করে অবহেলিত জনপদে মুড়ি ভাজার কাজ করেও অর্থ উপার্জন করছেন। সব কিছুর মূলেই রয়েছে স্বাবলম্বী জীবনের স্বপ্ন। গৃহসুখন থেকে প্রশিক্ষণ নেয়া প্রায় ৭০ ভাগ নারী অর্থনৈতিক কর্মকা-ের সঙ্গে সরাসরি জড়িত। ঢাকার ২৭ নাম্বারে রাপা প্লাজায় গড়ে ওঠা ‘জয়ীতা’র নারী উদ্যোক্তারা ঈদকেন্দ্রিক পোশাক ও কারুপণ্য তৈরির সারা বছর যে কর্মসূচীর অংশিদার তা এদেশের নারী স্বাবলম্বীতার নিদর্শক। এখানে পণ্যের পসরা সাজিয়েছেন দেশের প্রায় প্রতিটি অঞ্চলের নারী। এর মাধ্যমে দেশের প্রতিটি আঞ্চলিক পণ্যের সঙ্গে ঢাকার মানুষের পরিচিতি ঘটছে। নারীদের অর্থনৈতিক কর্মকা-ে সম্পৃক্ত হওয়ার বিষয়টি অবশ্যই ইতিবাচক। তবে সবচেয়ে আনন্দের বিষয়, ঈদকে কেন্দ্র করে নারীদের অর্থনীতির বিষয়টি আরও ব্যাপকতা পায়।”

নানা প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও নারীর অগ্রগতি থেমে নেই। বর্তমানে ২ কোটি নারী কর্মক্ষেত্রে রয়েছেন। এক হিসেবে দেখা গেছে, ১৯৭৪ সালে সমগ্র কর্মশক্তির মাত্র ৪ দশমিক ১ শতাংশ ছিল নারী। ২০১০ সালে তা হয়েছে ৩৯ দশমিক ৪ শতাংশ। নারীরা দেশে অর্থনৈতিক কর্মকা-ের সঙ্গে এখনও নিজেদের সম্পৃক্ত করছে নানাভাবে। বর্তমান সময়ে নারীরা দেশ পরিচালনা থেকে শুরু করে প্রতিটি চ্যালেঞ্জিং পেশায় সম্পৃক্ত হচ্ছেন। মোটকথা, বলা যায় সর্বক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ বেড়েছে।

ঈদের অর্থনৈতিক কর্মকা-ে সবচেয়ে বড় অবদান রেখেছে পোশাক তৈরির ক্ষেত্রটি। সারাদেশের শহর বা গ্রামের ঈদবাজারে ছড়িয়ে যায় গার্মেন্টস শিল্পের পোশাক। বলাবাহুল্য, এই শিল্পের প্রায় ৮০ ভাগ হচ্ছে নারীকর্মী। এটা অস্বীকার করার উপায় নেই, ঢাকা বা অন্য শহরগুলোতে ঈদে ডিজাইনেবল পোশাক তৈরিতে ফ্যাশন হাউসগুলো ও বুটিকগুলো ব্যাপকভাবে জনপ্রিয়তা লাভ করেছে। ‘ব্র্যাক’র ‘শিলু আবেদ ফাউন্ডেশনে’ বিপুল সংখ্যক নারীকর্মী পেশাক তৈরিসহ করছেন বিভিন্ন হস্তশিল্প তৈরির কাজ। এছাড়া আড়ংয়ের শোরুমগুলোতে বিক্রয়কর্মীদের প্রায় ৯০ ভাগ নারী। শুধু আডং নয়, কুমুদিনী ও টাঙ্গাইল শাড়ি কুটিরসহ দেশের অসংখ্য ফ্যাশন হাউস ও বুটিকগুলোর সঙ্গে পণ্য তৈরি ও বিপণনের কাজ করছেন নারীরা। বর্তমানে নাটকপাড়া বেইলি রোড শাড়ির মার্কেট হিসেবে বেশ জনপ্রিয়তা লাভ করেছে। আজ থেকে প্রায় ত্রিশ বছর আগে এখানেই গোড়াপত্তন হয়েছিল ‘টাঙ্গাইল শাড়ি কুটিরের’। দেশের কয়েক শত তাঁতী তাদের তৈরি শাড়ি ও কাপড় টাঙ্গাইল শাড়ি কুটিরের মাধ্যমে বিপণন করছেন। বিষয়টি দেশের অর্থনীতির উন্নয়নের ক্ষেত্রে বিরাট অবদান রাখছে।

নারীরা বর্তমান ঈদের বাজারে কিভাবে নিজেদের সম্পৃক্ত রেখেছেন সেই প্রসঙ্গে বলছিলেন টাঙ্গাইল শাড়ি কুটিরের কর্ণধার মুনিরা ইমদাদ, ‘বর্তমানে বাংলাদেশে তাঁত শিল্পের অবস্থা অনেক ভাল। এই শিল্পের পুনর্জাগরণে মহিলাদের বিরাট ভূমিকা রয়েছে। তাঁতী পরিবারের মহিলারা ঘরকন্যার পাশাপাশি তাঁতের কর্মকা-ের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত। আমাদের অর্থনীতিতে গার্মেন্টসের অবদান আমরা জানি। বাংলাদেশে ঢাকা, টাঙ্গাইল, পাবনা, নরসিংদী, কুমিল্লা, রাজশাহীতে কয়েক লাখ তাঁতীর বসবাস। এছাড়া সিলেটের আদিবাসী, মণিপুরী, পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন আদিবাসীদের মাঝে বিভিন্ন রকম তাঁতের প্রচলন আছে। টাঙ্গাইলের তাঁতীরা সুতি, সিল্ক, রসিল্ক, হাফসিল্ক শাড়ি বুনছেন। বিভিন্ন ধরনের শাড়ির থান আমরা টাঙ্গাইলে পাচ্ছি। এছাড়া ভাল কাপড় কটেজ সিস্টেমে উৎপাদিত হয়। পাবনা টাঙ্গাইলের কাছাকাছি হলেও ওদের কাপড়ের শৈল্পিক গুণ আলাদা। দুটি দুই ঘরানার শাড়ি। পাবনায় বেশির ভাগ চিত্তরঞ্জন হুক জ্যাকার্ড ও খটখটি জ্যাকার্ড তাঁত ব্যবহার হয়। পাবনায় সাধারণ কাপড় ছোট ছোট কারখানার মাধ্যমে তৈরি হয়। এদের উৎপাদনের হার টাঙ্গাইলের তুলনায় অনেক বেশি। তাঁতীদের যদি ভালভাবে কারিগরি ফর্মুলা শেখানো যায় এবং ট্যাকনিক্যল দিকগুলোতে প্রশিক্ষণ দেয়া যায়, তাহলে তারা আরও ভাল কাজ করবেন। আগে নারীরা চরকায় সুতা কাটতেন। এখন নারীরা তাঁতের সব ধরনের কর্মকা-ে অংশ নিচ্ছেন। তাই তাঁত শাড়ি ও বস্ত্রের উন্নয়ন ঘটছে। তাছাড়াও যে কোন বুটিক ও ফ্যাশন হাউসগুলোতে দেখা যায় ব্লক, বাটিক, টাইডাই কাজের সঙ্গে নারীর সম্পৃক্ততা বাড়ছে। নারীরা এই কাজগুলোতে পুরুষদের চেয়ে শৈল্পিক ভঙ্গিমায় উপস্থাপন করে থাকেন। নারীরা শতভাগ পারদর্শী হলো হাতের সুচের কাজে। নক্সি কাঁথা সূচীশৈলী এখন দেখা যাচ্ছে বিভিন্ন পোশাকে ও গৃহসজ্জায় ব্যবহারিত কাপড়জাত পণ্যে। এই সূচীশৈলীর কাজে নারীরা একশত ভাগ সফল। এখানে নারীকর্মীদের একক অধিপত্য রয়েছে। তাই বলা যায়, নারীরা বর্তমানে ঈদকেন্দ্রিক কর্মকা-ে বিরাট ভূমিকা রাখছেন। তাছাড়া তৈরি পোশাক ক্ষেত্রে বিপণনের কাজে নারীরা অনেক ভাল করছেন। এই ক্ষেত্রে তাদের কদরও বাড়ছে। এছাড়া ফ্যাশন ডিজাইনিং, ফ্যাশন হাউস পরিচালনায় নারীদের অংশগ্রহণ বাড়াছে। এর মাধ্যমে নারীরা শুধু স্বাবলম্বী হচ্ছেন না, তারা দেশের অর্থনীতির ভিতও মজবুত করছেন।

দেশের সর্বত্র ছড়িয়ে আছে বিপুল পরিমাণ নারীকর্মী। যারা অনেকে বিভিন্ন পণ্য তৈরি করে ঈদের বাজারকে সমৃদ্ধ করছেন। এর ফলে ঈদের বাজারে একদিকে যেমন কারু ও পোশাক কারিগররা স্বাবলম্বী হচ্ছেন, অন্য দিকে শহরের ক্রেতারারও পাচ্ছেন আকর্ষণীয় পণ্য। শুধু পোশাক তৈরি ও বিপণনের ক্ষেত্রেই নয়, নারীরা রমজানে ইফতার তৈরি ও মিষ্টান্ন তৈরি কাজের সঙ্গেও জড়িত। এই সময় নারীদের হাতে ভাজা মুড়ি বিভিন্ন গ্রামাঞ্চল থেকে শহরে আসছে। ইউরিয়া বিহীন এই মুড়ি ব্যাপক জনপ্রিয় হচ্ছে। ঈদের এক সপ্তাহ আগে থেকে শহরের বিউটি পার্লারগুলোতে দেখা যায়, সৌন্দর্য পিপাসুদের ভিড়। এসব বিউটিপার্লারের সব কর্মী নারী। বর্তমানে ঈদকেন্দ্রিক রূপচর্চার ধরনও পাল্টে গেছে। তাই বিউটি সেন্টারগুলোতে ভিড়ও বাড়ছে কিশোর-তরুণী থেকে সব বয়সের নারীর। বিষয়টির সঙ্গে অর্থনীতির সম্পৃক্ততা ঘটছে। এক সময় ছিল যখন ঈদের পোশাক বলতে সবাই কিনত বিদেশের পোশাক। কিন্তু এখন দেশের কিছু উদ্যেক্তার প্রচেষ্টায় এবং নারীরা স্বাবলম্বী হওয়ার তাগিদে সম্পৃক্ত হয়েছে দেশীয় পোশাক তৈরি ও বিপণনের কাজটি। তবে দেশের নারীদের অর্থনৈতিকভাবে আরও সমৃদ্ধ করতে হলে ক্রেতাদেরও দেশীয় পণ্য ব্যবহারে আগ্রহ আরও বাড়াতে হবে। পাল্টাতে হবে রুচিবোধ ও দৃষ্টিভঙ্গী।

প্রকাশিত : ৩ জুলাই ২০১৫

০৩/০৭/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: