আংশিক মেঘলা, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৬ ডিসেম্বর ২০১৬, ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, মঙ্গলবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

নায়কদের রাজা যিনি

প্রকাশিত : ২ জুলাই ২০১৫

১৯৬৪ সালে কলকাতায় দাঙ্গা বাধলে স্ত্রী আর এক শিশুপুত্রকে নিয়ে এপার বাংলায় পাড়ি জমালেন এক যুবক। কলকাতায় থাকতেন টালিগঞ্জের পাশাপাশি এলাকায়, বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা মারতেও যেতেন মাঝে মাঝে। ছোটখাটো কিছু রোলে অভিনয়ও করেছিলেন। সুতরাং অভিনয়টাই ছিল তাঁর একমাত্র পুঁজি। সেই পুঁজি দিয়ে বাংলাদেশে এসে টুকটাক থিয়েটার আর সিনেমায় ছোটখাটো কাজ করে জীবন সংগ্রামের সূচনা। হঠাৎ বাংলা চলচ্চিত্রের কিংবদন্তি জহির রায়হানের চোখে পড়ে গেলেন তিনি। তিনি তখন তার নির্মিতব্য ‘বেহুলা’ ছবির জন্য সুচন্দার বিপরীতে নায়ক খুঁজছিলেন। কাজ শুরু হলো। সিনেমা সুপারহিট। এবার প্রকৃত অর্থেই বাংলা ছবিতে যাত্রা শুরু হলো রাজ্জাকের। আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি তাঁকে (রাজ্জাককে)। অভিনয় জগতে অসামান্য অবদানের জন্য আমজনতার কাছে তিনি নায়করাজ নামেই পরিচিত।

অভিনয়ের বীজ কিন্তু বোনা ছিল সেই শৈশবেই। স্কুলে সরস্বতী পূজা উপলক্ষে নাটক মঞ্চস্থ হতো প্রতি বছরই। সেবার কলকাতার খানপুর হাইস্কুলের গেমটিচার ‘বিদ্রোহী’ নাটকের কেন্দ্রীয় চরিত্রে বেছে নিলেন রাজ্জাককে। অভিনয় করে রীতিমতো তাক লাগিয়ে দিলেন সবাইকে। পেয়ে বসল অভিনয়ের নেশা, নাট্যকার পীযূষ বোসের শিশু রঙ্গসভার সদস্য হয়ে গেলেন সঙ্গে সঙ্গেই। আর কলেজে ওঠার পর তো কথাই নেই, পীযুষ বোসের একাধিক নাটকে টানা অভিনয় করে ভিত্তি পাকিয়ে নিয়েছিলেন সেই সময়েই। আর মনের ভেতর স্বপ্ন ছিলÑ ‘একদিন আমিও...’

বাংলাদেশে রোমান্টিক শ্রুতিমধুর যেসব গান আমরা হারানো দিনের গান হিসেবে কিংবা পুরোনো দিনের বাংলা সিনেমার গান হিসেবে শুনে থাকি, সেসব গানের বেশির ভাগই কিন্তু রাজ্জাক অভিনীত। যেমন ধরা যাকÑ ‘পিচ ঢালা এই পথটাকে ভালবেসেছি’ কিংবা ‘আয়নাতে ঐ মুখ দেখবে যখন’ গানগুলোর কথা। এসব গান তখন মানুষের মুখে মুখে ফিরতো। পরিচালক জহির রায়হানের একাধিক ছবিতে কাজ করেছেন তিনি। মূলত তাঁর দিক নির্দেশনাতেই অভিনয় জীবনের প্রথম দিকে নিজেকে গড়ে তুলেছিলেন। প্রথম ছবি বেহুলা দর্শকপ্রিয়তা পাওয়ার পরেও একটা ভয় কাজ করেছিল রাজ্জাকের মনে। সে ভয় কেটে গিয়েছিল অচিরেই। কিভাবে? ইতোপূর্বে জনকণ্ঠকে দেয়া এক সাক্ষাতকার থেকে শোনা যাক সে কাহিনীÑ ‘সুচন্দা চলচ্চিত্র প্রযোজিত ‘দুই ভাই’ ছবিতে আমি অভিনয় করেছিলাম, আমার বিপরীতে ছিল ববিতা, ছবিতে মনপ্রাণ উজাড় করে অভিনয় করেছিলাম। ছবি মুক্তি পাওয়ার পর জহির ভাই ডেকে পাঠালেন তাঁর কায়েৎটুলির বাসায়, ছবির ফলাফল জানালেন, আর আমাকে আশীর্বাদ করে দিলেন এই বলে যে, যাও, কেউ তোমায় রুখতে পারবে না... জহির ভাইয়ের সেই কথা আজও কানে ভাসে, মনে হয় এই তো সেদিনের কথা।’

শুধু রোমান্টিক নায়ক নয় বাংলা ছবিতে প্রথম এ্যাকশন তথা গ্যাংস্টার ফিল্মের শুরু তার মাধ্যমে। সেটা ১৯৭৩-এর কথা, পরিচালক জহিরুল হকের পরিচালনায় নির্মিত হয়েছিল ‘রংবাজ’, যেখানে রংবাজের চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন তিনি। সঙ্গে ছিলেন কবরী। ছবিটি প্রযোজনাও করেছিলেন তিনি। আর ছবিটি বাংলা সিনেমার জগতে একটি মাইলফলক। পরবর্তীতে এ্যাকশন ছবিগুলো এ ধারা বজায় রেখে নির্মিত হতে থাকে। তার এই রংবাজ ছবি ’৯০-এর দশকে রিমেক হয়েছিল, যেখানে অভিনয় করেছিল মৌসুমী ও ওমর সানী। এছাড়াও নিজেকে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন চরিত্রে হাজির করেছেন তিনি। যেমন অমর চলচ্চিত্র ‘ছুটির ঘণ্টায়’ তিনি অভিনয় করেছেন একজন দফতরির ভূমিকায়। কিংবা ‘অশিক্ষিত’ ছবিতে তাঁর অভিনীত চরিত্র ব্যতিক্রম হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। বাংলা চলচ্চিত্রকে সমৃদ্ধ করেছেন যেসব চলচ্চিত্রে অভিনয় করার মাধ্যমে সেসবের মাঝে উল্লেখযোগ্য হলোÑ একটুকু আশা, ময়নামতি, মনের মতো বউ, নীল আকাশের নিচে, ক খ গ ঘ ঙ, জীবন থেকে নেয়া, স্বরলিপি, নাচের পুতুল, আলোর মিছিল, ওরা ১১ জন, জিঞ্জির, অনন্ত প্রেম, সোহাগ, কালো গোলাপ, আনার কলি, লাইলী মজনু, অশিক্ষিত, চন্দ্রনাথ, সৎ ভাই, বাবা কেন আসামি ইত্যাদি।

বাংলা সিনেমায় জুটি প্রথা গড়ে ওঠা মূলত রাজ্জাক-কবরী জুটি থেকে। সেই সময় এই দু’জনের চমৎকার বোঝাপড়ায় এত ছবি দর্শকপ্রিয়তা পায় যে, পরিচালকরা জুটি মাথায় রেখে ছবি বানানো শুরু করেন। অবশ্য সেই সময় একমাত্র রোমান্টিক নায়ক হওয়ায় তার পক্ষে একটি জুটি বজায় রাখা সম্ভব হয়নি বরং একে একে অভিনয় করে যেতে হয়েছে সুচন্দা, শাবানা, ববিতা, সুজাতা সবার সঙ্গেই। তবে রাজ্জাক-কবরী জুটি অমর হয়ে থাকবে সেই সময়ের দর্শকদের কাছে।

যারা গুণী অভিনেতা, তাদের পক্ষে নিজেকে একটি অবস্থানে নিজেকে ধরে রাখা সম্ভব হয় না, তারা নিজেদের মেধাকে ছড়িয়ে দেন বহুমাত্রিক ধারায়। রাজ্জাকও দিয়েছিলেন। অভিনয়, প্রযোজনা থেকে শুরু করলেন সিনেমা পরিচালনা। প্রথম ছবিই সুপারহিট, ছবির নাম ‘অনন্ত প্রেম’। নিজেই অভিনয় করেছিলেন, বিপরীতে ছিলেন ববিতা। কাহিনী, চিত্রায়ন, নির্দেশনা, অভিনয়, গান সব মিলিয়ে অনন্ত প্রেমের কথা বাংলাদেশের দর্শকদের মনে গেঁথে থাকবে অনেকদিন। বিশেষ করে বাংলা সিনেমায় চিরায়ত ধারা অনুযায়ী সিনেমার শেষে মধুর মিলনের বদলে নায়ক-নায়িকার মৃত্যৃ দিয়ে শেষ করার পড়েও দর্শকদের প্রতিক্রিয়া ছিল চোখে পড়ার মতো। আর এটা সম্ভব হয়েছে শুধু পরিচালকের গুণে, তিনি পেরেছিলেন সিনেমার আবেগকে আপামর জনতার মাঝে ছড়িয়ে দিতে। প্রথম সিনেমা বানিয়েই থেমে থাকেননি রাজ্জাক। তাঁর পরিচালিত অন্যান্য উল্লেখযোগ্য ছবিগুলো হলোÑ বদনাম, সৎ ভাই, চাপাডাঙ্গার বউ,বাবা কেন চাকর ইত্যাদি।

আশির দশকের মাঝামাঝি তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাস অবলম্বনে ‘চাপাডাঙ্গার বউ’ তাঁর পরিচালিত উল্লেখযোগ্য একটি চলচ্চিত্র, যেখানে তাঁর ছেলে বাপ্পারাজ ও অভিনেত্রী শাবানার দুর্দান্ত অভিনয় দর্শকের মনে গেঁথে আছে অনেক দিন। বিশেষ করে বাপ্পারাজের ‘আমার সাধ না মিটিল আশা না ফুরিল সকলি ফুরায়ে যায় মা’ গানের সঙ্গে দুর্দান্ত প্রকাশভঙ্গি আদায় করতে পরিচালকের ভূমিকাও কম নয়। চাপাডাঙ্গার বউ ছবিটির প্রযোজকও তিনি। সিনেমার পাশাপাশি গড়ে তুলেছিলেন নিজস্ব প্রযোজনা সংস্থা রাজলক্ষ্মী প্রোডাকশন, যার ব্যানারে নির্মাণ করেছেন প্রায় ২০টি ছবি। পরিচালক হিসেবে তাঁর সর্বশেষ কীর্তি ইমপ্রেস টেলিফিল্মের ব্যানারে ‘আয়না কাহিনী’। এরপর বিবিধ শারীরিক অসুস্থতার কারণে আর সম্ভব হয়নি সিনেমা বানানো। কমিয়ে দিয়েছিলেন অভিনয়ও। কারণ হিসেবে কয়েক বছর আগে জনকণ্ঠকে দেয়া এক সাক্ষাতকারে তিনি বলেছিলেন, ‘ভালো গল্পের ছবি পেলে অভিনয় করতে পারি। আসলে এখনকার ছবিতে মৌলিক কাহিনীকারের খুব অভাব। সুতরা নিজেকে সরিয়ে রাখছি অভিনয় থেকে।’

মাঝে নিজের জন্মস্থান কলকাতার ছবিতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন তিনি। মূলত বাংলা সিনেমার দুর্যোগকালে ‘বাবা কেন চাকর’ নির্মাণ করে তিনি সাড়া ফেলে দেন বাংলা সিনেমার জগতে। এই ছবিটি কলকাতায় রিমেক করা হয়। মূলত সেই সূত্র ধরেই পরবর্তীতে একাধিক ছবিতে কাজ শুরু করেন তিনি, দর্শকপ্রিয়তা পান অপার বাংলাতেও। এই তো ৭৩তম জন্মদিনের আগেও সপরিবার ঘুরে এলেন কলকাতা থেকে, নিজের ভিটেমাটির পরশ নিয়ে ফিরলেনও যা কিনা তিনি ছেড়ে এসেছিলেন সেই ষাটের দশকে।

সারাজীবন অভিনয়ের স্বীকৃতি স্বরূপ একাধিকবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার ঝুলিতে পুরেছেন তিনি। ‘জাতীয় চলচ্চিত্র আজীবন সম্মাননা’ পেয়েছেন ২০১৩ সালে। এছাড়া ২০১৫ সালে স্বাধীনতা পদকে তাঁকে ভূষিত করেছে সরকার, বাংলা সিনেমায় অবদান রাখার জন্য। এটি বাংলাদেশ সরকারের সর্বোচ্চ বেসামরিক পদক। নিজের ৭৩তম জন্মদিনে জনকণ্ঠের কাছে দেয়া এক সাক্ষাতকারে নিজের শারীরিক সুস্থতার ব্যাপারে দর্শকদের কাছ থেকে দোয়া চেয়েছিলেন তিনি। গত বেশ ক’বছর ধরেই বার্ধক্যজনিত নানা জটিলতায় ভুগছেন এই কিংবদন্তি। বর্তমানে গুলশানের ইউনাইটেড হসপিটালে চিকিৎসাধীন আছেন তিনি। আমাদের সবার প্রার্থনা, অতি দ্রুত শঙ্কামুক্ত হয়ে আবার তিনি ফিরে আসুক বাংলা চলচ্চিত্রের রুপালি পর্দায়।

ছবি : আরিফ আহমেদ

প্রকাশিত : ২ জুলাই ২০১৫

০২/০৭/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: