আংশিক মেঘলা, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৭ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, বুধবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

বিশ্বের সর্বাধিক কারাবন্দী আমেরিকায়

প্রকাশিত : ১ জুলাই ২০১৫

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে যত বন্দী আছে, তত বন্দী বিশ্বের আর কোন দেশে নেই। যে কোন সময়ের হিসেবে সে দেশে প্রায় ২৩ লাখ বন্দীকে দেখতে পাওয়া যাবে। আমেরিকার জনসংখ্যা বিশ্বের জনগোষ্ঠীর ৫ শতাংশের কম। অথচ বিশ্বে যত লোক কারাবন্দী রয়েছে, তার প্রায় ২৫ শতাংশ রয়েছে আমেরিকায়। এদের বেশিরভাগই কৃষ্ণাঙ্গ ও হিসপ্যানিক। সেখানে শ্বেতাঙ্গ বন্দীদের ছয়গুণ হলো কৃষ্ণাঙ্গ এবং দ্বিগুণ হলো হিসপ্যানিকদের সংখ্যা। প্রতি তিনজন কৃষ্ণাঙ্গ তরুণের একজনের জীবনের কোন না কোন সময় কারাভোগ করার সম্ভাবনা থাকে। মার্কিন সমাজ মাদকের ছোবল, হিংসা ও মারদাঙ্গায় জর্জরিত। সে দেশে প্রতি বছর একজন বন্দীর পেছনে প্রায় ৩৪ হাজার ডলার ব্যয় হয়। বন্দীদের পেছনে মোট বার্ষিক ব্যয়ের পরিমাণ প্রায় ৮ হাজার কোটি ডলার। বলা বাহুল্য, এই অর্থের পুরোটাই জোগায় আমেরিকার জনগণ তাদের করের টাকায়।

অবশ্য আবস্থাটা বরাবর এমন ছিল না। ১৯৭০ সালে আমেরিকার রাজ্য ও ফেডারেল কারাগারগুলোর মোট বন্দীর সংখ্যা ছিল দুই লাখের কম। আর ২০১৩ সালে শুধুমাত্র ফেডারেল কারাগারগুলোতে কয়েদির সংখ্যা ছিল দুই লাখেরও বেশি। এসব কারাগারে শুধু সেই শ্রেণীর কয়েদি থাকে, যারা মাদক চোরাচালান বা জালিয়াতির মতো ফেডারেল অপরাধের কারণে দোষী সাব্যস্ত বা সাজাপ্রাপ্ত। এ সময় রাজ্য কারাগারগুলোতে প্রায় ১৪ লাখ কয়েদি ছিল। এছাড়াও ৭ লাখেরও বেশি লোক জেলখানায় আটক ছিল, যাদের কিছু অংশ স্বল্পমেয়াদী সাজাভোগ করছিল এবং বেশিরভাগ ছিল বিচারাধীন আসামি। বন্দীদের সিংহভাগই পুরুষ। কারাগারের পরিবেশ প্রায়ই খারাপ দেখা যায়। অনেকক্ষেত্রে বন্দীদের শিক্ষা, প্রশিক্ষণ বা পুনর্বাসনের ব্যবস্থাও নেই।

কারাবন্দীর সংখ্যা এত ব্যাপক পরিসরে বৃদ্ধি পাওয়া শুরু হয় রিচার্ড নিক্সন সূচিত মাদকবিরোধী যুদ্ধের মধ্য দিয়ে। রিগ্যানের আমলে কোকেন পাচারে যে কঠোরতর শাস্তির বিধান রাখা হয়, তাতে বর্ণগত পক্ষপাতদুষ্টতা জোরদার হয়েছিল। ১৯৮০ থেকে ১৯৯০ সালের মধ্যে মাদকঘটিত অপরাধে সাজাপ্রাপ্ত বন্দীর সংখ্যা ৮ শতাংশ থেকে প্রায় ২৫ শতাংশে পৌঁছেছিল। আমেরিকার কারাগারগুলো কয়েদিতে ভরে যায়। ২০১২ সালে এ্যারিজোনার কারাগারগুলোর ওপর এ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের এক জরিপ রিপার্টে দেখা যায়, হাজার হাজার বন্দীকে জানালাবিহীন প্রকোষ্ঠে দিনে ২২ থেকে ২৪ ঘণ্টা আটকে রাখা হয়েছে। টেক্সাসের অধিকাংশ কারাগারে এয়ার কন্ডিশনার নেই। এর অর্থ, গ্রীষ্মে আর্দ্রতা যুক্ত হয়ে তাপমাত্রা যখন ৬০ ডিগ্রী সেলসিয়াসে পৌঁছে, তখন বন্দীদের অবর্ণনীয় কষ্টে হাঁসফাঁস করে কাটানো ছাড়া আর কিছুই করার থাকে না। আলাবামায় একটি মহিলা কারাগারে দেখা গেছে যে, রক্ষীরা নিয়মিত বন্দীদের ধর্ষণ করছে। কেউ এ নিয়ে অভিযোগ করলে তাকে নির্জনাবাস দেয়া হয়েছে কিংবা হাত-পা ভেঙ্গে দেয়ার হুমকি দেয়া হয়েছে।

কারাবন্দীদের একটি বড় অংশ মাদকঘটিত অপরাধে সাজাপ্রাপ্ত হয়। ২০১০ সালে এক জরিপে দেখা যায়, ৬৫ শতাংশ বন্দী মাদক সেবনজনিত সমস্যায় আক্রান্ত। অথচ তাদের মাত্র ১১ শতাংশ যথার্থ কোন সাহায্য পায়। অনেক রাজ্য কারাগারে বন্দীদের বৃত্তি, শিক্ষা বা উচ্চতর শিক্ষার সুযোগ অতি সীমিত। ১৯৯৪ সালে বিল ক্লিনটন স্বাক্ষরিত অপরাধ বিলের একটি অনুচ্ছেদে বন্দীদের কলেজ ডিগ্রী অর্জনের সহায়ক হিসেবে অনুদান গ্রহণ নিষিদ্ধ করা হয়। এতে করে কারাভ্যন্তরে শিক্ষার্জন নাটকীয়ভাবে কমে আসে। ফলে কারাভোগ শেষে তাদের জেল থেকে বেরিয়ে আসার পর ভালভাবে জীবনযাপনের তেমন কোন সুযোগ থাকে না। কারণ, তেমন জীবনযাপনের জন্য তারা নিজেদের উৎপাদনশীল কোন কাজের উপযোগী করে তৈরি করে নিতে পারেনি। এই শ্রেণীর লোকদের অনেকেই আবার কারামুক্তির পর নতুন করে জড়িয়ে পড়ে অপরাধে । মার্কিন বিচার বিভাগের এক জরিপে দেখা যায়, ৩০টি অঙ্গরাজ্যের রাজ্য কারাগার থেকে ২০০৫ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত বন্দীদের ৭৭ শতাংশ পাঁচ বছরের মধ্যে আবার গ্রেফতার হয়। এদের অর্ধেকেরও বেশি গ্রেফতার হয়েছিল মুক্তি পাওয়ার এক বছরের মধ্যে।

সাজাভোগ শেষে মুক্তিলাভের দীর্ঘদিন পরও এই শ্রেণীর মানুষদের পরোক্ষ সাজা দেয়ার নীতি চালিয়ে যাওয়া হতে থাকে, যার কারণে ওদের পক্ষে নতুন জীবন গড়ে তোলা আরও বেশি কঠিন হয়ে পড়ে। অনেক রাজ্যে সাবেক কয়েদির ফুড স্ট্যাম্প কিংবা সরকারী আবাসন পাওয়া নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

কোন কোন পেশায় এমনও আছে যে, কেউ একবার সাজাভোগ করলে সেই পেশার দরজা তার কাছে সারাজীবনের জন্য রুদ্ধ। টেক্সাসের জেলখানায় বন্দীদের হয়ত চুলকাটা শেখানো হয়। কিন্তু জেল থকে ছাড়া পাওয়ার পর কিছু কিছু সাজাপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে বার্বারস লাইসেন্স দেয়া হয় না। বিচারের ক্ষেত্রে আমেরিকায় যে বর্ণবৈষম্য করা হয়, সে কথা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। কথাটা স্বয়ং হিলারি ক্লিনটনও স্বীকার করেছেন। গত এপ্রিল মাসে এক ভাষণে হিলারি বলেন, আমেরিকার বিচার ব্যবস্থাই এমন যে, একই অপরাধে একজন শ্বেতাঙ্গের তুলনায় একজন আফ্রিকান-আমেরিকানের অধিকতর বেশি মেয়াদের সাজাভোগ করার অধিকতর সম্ভাবনা থাকে।

মিসৌরির ফার্গুসনে দাঙ্গার পর থেকে সব শ্রেণীর আমেরিকানের ধারণা হয়েছে যে, আমেরিকার বিচার ব্যবস্থা বর্ণগতভাবে পক্ষপাতদুষ্ট। ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থা সম্পর্কে আমেরিকানদের ধারণার লক্ষণীয় পরিবর্তন ঘটা সত্ত্বেও বর্ণগত প্রশ্নে তারা বিভক্ত। শ্বেতাঙ্গদের ৫১ শতাংশ, কৃষ্ণাঙ্গদের ৮৪ শতাংশ এবং লাতিনদের ৬০ শতাংশ বিশ্বাস করে, এই বিচার ব্যবস্থা বৈষম্যমূলক।

লস এ্যাঞ্জেলেসের কংগ্রেস সদস্য ম্যাক্সিন ওয়াল্টার্স বলেন, এ দেশের বিচার ব্যবস্থা এমনই বর্ণবাদী যে, কেউ গ্রেফতার হবে কিনা, তার বিরুদ্ধে কঠোর মামলা দায়ের করা হবে কিনা, তার কঠিন সাজা হবে নাকি লঘুদ- হবেÑ সবকিছুই তার গাত্রবর্ণ দ্বারা নির্ধারিত হবে। ওয়াশিংটন পোস্টের ২০১২ সালের এপ্রিলের এক রিপোর্টে বলা হয়, ৮৪ শতাংশ কৃষ্ণাঙ্গ মনে করে বর্ণবৈষম্য বিচার ব্যবস্থার সর্বত্র বিস্তারলাভ করছে। পুলিশ থেকে শুরু করে আদালতকক্ষ পর্যন্ত সবাই কালো মানুষদের অসম চোখে দেখে। যুক্তরাষ্ট্রে এখন যত কৃষ্ণাঙ্গ কারাবন্দী রয়েছে, বর্ণবৈষম্য তুঙ্গে থাকার সময় দক্ষিণ আফ্রিকায়ও তত কৃষ্ণাঙ্গ বন্দী ছিল না। যুক্তরাষ্ট্রে এখন মোট বন্দীর অর্ধেক কারাভোগ করছে মাদকঘটিত অপরাধে। মাদক অপরাধে একজন শ্বেতাঙ্গ যত মেয়াদী কারাদ- ভোগ করে, একই অপরাধে একজন কৃষ্ণাঙ্গ ভোগ করে তার ২০ থেকে ৫০ গুণ বেশি কারাদ-।

সূত্র : দ্য ইকোনমিস্ট

প্রকাশিত : ১ জুলাই ২০১৫

০১/০৭/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: