রৌদ্রজ্জ্বল, তাপমাত্রা ২৩.৯ °C
 
৯ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শুক্রবার, ঢাকা, বাংলাদেশ

নেইমারের মন্দ-ভাগ্য

প্রকাশিত : ১ জুলাই ২০১৫
  • মাহমুদা সুবর্ণা

নিজেদের মাটিতে বিশ্বকাপ। সবার চোখে-মুখে একটাই স্বপ্ন। আর তা হলো শিরোপা পুনরুদ্ধারের। কিন্তু দুর্ভাগ্য নেইমারের। বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে কলম্বিয়ার বিপক্ষে ম্যাচে জুয়ান জুনিগার হাঁটুর গুঁতোয় তার মেরুদ-ে প্রচ- আঘাত লাগে। আর সেই আঘাতেই পুরো টুর্নামেন্ট থেকেই ছিটকে পড়েন নেইমার। বিশ্বকাপের পর দোর্দ- প্রতাপে খেলতে থাকে ব্রাজিল। কার্লোস দুঙ্গার অধীনে গড়ে টানা ১০ ম্যাচ জয়ের রেকর্ড। ফেবারিট হিসেবে খেলতে নামে লাতিন আমেরিকার টুর্নামেন্ট কোপা আমেরিকায়। গ্রুপপর্বের শেষ ম্যাচে ব্রাজিলের সামনে আবারও সেই কলম্বিয়া। এবারও ম্যাচের শেষে বিতর্কিত এক ঘটনার জন্ম দেন নেইমার। পরিণামে লাল কার্ড দেখে কোপার পুরো টুর্নামেন্ট থেকে বিদায় নেন বার্সিলোনার ব্রাজিলিয়ান তারকা নেইমার। এরপর ব্রাজিলও আর কোয়ার্টার ফাইনালের বাধা পেরুতে পারেনি।

আসলে দুর্ভাগ্যই বলতে হবে নেইমারের। কলম্বিয়ার বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনাল ম্যাচে জুয়ান জুনিগার সেই আঘাতের ক্ষতটা এখনও তরতাজা। সেই ম্যাচের ৮৮ মিনিটে কলম্বিয়ার জুনিগা হাঁটু দিয়ে নেইমারকে আঘাত করেন। সেই আঘাতের পরও খেলার চেষ্টা করেছিলেন ব্রাজিলের সেরা তারকা নেইমার। কিন্তু সেই চেষ্টায় সফল হতে পারেননি তিনি। আঘাতের পরপরই মাটিতে লুটিয়ে পড়েন নেইমার। একপর্যায়ে যন্ত্রণায় কাতরাতে থাকেন তরুণ প্রতিভাবান এই ফুটবলার। এরপর স্ট্রেচার দিয়ে মাঠের বাইরে নিয়ে যাওয়া হয় নেইমারকে। পরে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয় তাঁকে। কিন্তু সেই যে মাঠ থেকে বেরিয়ে গেলেন, দীর্ঘদিন মাঠের বাইরে থাকতে হয় তাঁকে। এরপর দলও লজ্জাজনকভাবে বিদায় নেয় বিশ্বকাপ থেকে। টুর্নামেন্টের প্রথম সেমিফাইনালে জার্মানদের কাছে ৭-১ গোলের লজ্জায় ডুবতে হয় পাঁচবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন ব্রাজিলকে। ঐ পরাজয়টাকে অনেকেই অঘটন হিসেবে দেখছিল। তাই তৃতীয় স্থানের ম্যাচটি ছিল সেলেসাওদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচেও ব্রাজিলকে ৩-০ গোলে রীতিমতো উড়িয়ে দেয় হল্যান্ড। এত সেই বিশ্বকাপের কথা।

সেই বিশ্বকাপের পর ব্রাজিলিয়ানরা স্বপ্ন দেখছিল কোপা আমেরিকা নিয়ে। কিন্তু এবারও ঘোর অন্ধকার নেমে এল নেইমারের সামনে। ব্রাজিল বিশ্বকাপে ঘটে যাওয়া সেই দিনের পরে এক বছরও কাটেনি। নেইমারের ফুটবলজীবনে ফিরে এলো কলম্বিয়া নামক ‘অভিশাপ’। সে দিনের বিশ্বকাপের মতোই এদিন কোপা আমেরিকার স্বপ্নও শেষ হয়ে গেল নেইমারের। কলম্বিয়া ম্যাচে রেফারির সঙ্গে খারাপ আচরণ করায় চার ম্যাচ নিষিদ্ধ হন ব্রাজিলিয়ান ফুটবলের সেরা তারকা। প্রথমে শাস্তিস্বরূপ এক ম্যাচ নিষিদ্ধ করেন নেইমারকে। কিন্তু তারপর শাস্তির মেয়াদ বাড়িয়ে দেয়া হয় তাঁর। এর কারণটাও পরে সুস্পষ্ট হয়েছে। জানা যায়, কনমেবোলের কর্মকর্তারা ম্যাচটার ভিডিও দেখেছেন। যেখানে কলম্বিয়ার এক ফুটবলারকে হেড বাট করা ছাড়াও জুনিগাকে অকথ্য গালিগালাজ করেন নেইমার। তাতে অবশ্য চটেনি লাতিন আমেরকিার ফেডারেশন। তাদের মূল অভিযোগ, বার্সা মহাতারকা নাকি ম্যাচ শেষের পরে টানেলে রেফারির সঙ্গে ঝামেলা করেন। লাল কার্ড দেখার পরে খুবই চটে যান তিনি। রেফারি ড্রেসিংরুমে যাওয়ার পথে তাঁকে অকথ্য গালিগালাজ করেন নেইমার। জানতে চান, কোন ভিত্তিতে তাকে লাল কার্ড দেখানো হলো। নেইমারের এহেন আচরণের পরেই তাঁর এক ম্যাচ সাসপেনশনের সঙ্গে আরও তিন ম্যাচ জুড়ে দেন কনমেবোল কর্তারা।

সাসপেনশনের পরে অবাক করেই নেইমার পাশে পেলেন চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী দেশের ফুটবলার ও কোচকে। আর্জেন্টিনার তারকা ফুটবলার জাভিয়ার মাসচেরানো বলে দেন, এটা নাকি নেইমারের বিরুদ্ধে ফেডারেশনের চক্রান্ত। তার মতে, ‘কোপায় এ রকম ঘটনাই ঘটেই থাকে। নেইমারকে প্রায় কুড়ি বার লাথি মারা হয়। কিন্তু অবাক করে একটা হ্যান্ডবলের জন্য ওকে হলুদ কার্ড দেখতে হয়।’ এ সময় মাসচেরানো আরও বলেন, ‘নেইমারের মতো বিশ্বমানের প্রতিভাকে স্বাধীনভাবে খেলতে দেয়া হয় না। মনে রাখতে হবে নেইমারের বয়স কিন্তু তেইশ। ওকে দশ বার লাথি মারলে ও রেগে যেতে বাধ্য।’ আর আর্জেন্টিনার অভিজ্ঞ কোচ জেরার্ডো মার্টিনো তো সরাসরি বলে দেন যে, নেইমারের এই শাস্তি প্রাপ্য নয়। এরপর নেইমারের পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন স্প্যানিশ জায়ান্ট বার্সিলোনার সতীর্থ ফুটবলার লিওনেল মেসিকে। ক্লাব সতীর্থ নেইমারের কোপা আমেরিকা শেষ হয়ে যাওয়া নিয়ে হতাশা প্রকাশ করে মেসি বলেন, ‘আমি দুঃখিত যে, সে (নেইমার) আর কোপা আমেরিকার এই আসরে খেলবে না। নেইমার আমার একজন বন্ধু এবং আমি তার দিকটা দেখি। তাকে যে নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়েছে, তার জন্য আমার দুঃখ হচ্ছে। কেননা আমি বিশ্বাস করি, ব্রাজিলের জন্য সে গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়।’

তবে নেইমারকে কাঠগড়ায় দাঁড় করালেন সাবেক ব্রাজিল স্ট্রাইকার রোনাল্ডো। এ বিষয়ে তিনি বলেন, ‘ব্রাজিলের ঐতিহাসিক হলুদ জার্সি পরা মানে দায়িত্ব নিতে শেখা। নেইমার প্রথম থেকেই খুব আগ্রাসী ব্যবহার করছিল, যেটা মানা যায় না। ব্রাজিল জার্সি পরা মানে আরও দায়িত্ব নিতে শিখতে হবে।’ নেইমারহীন ব্রাজিলের ভবিষ্যত নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছিলেন অনেকেই। শেষ পর্যন্ত হলও তা। প্যারাগুয়ের কাছে পেনাল্টি শূটআউটে হেরে টুর্নামেন্ট থেকে ছিটকে যায় নেইমারের দল। কোপা আমেরিকায় কোয়ার্টার আর সেমিফাইনালে ৯০ মিনিট পর্যন্ত ড্র থাকলে অতিরিক্ত ৩০ মিনিট ?না খেলার নিয়মই করা হয়েছে। এর বদলে ৯০? মিনিট শেষেই পেনাল্টি শূটআউট। ফলে টাইব্রেকার নিয়ে দলগুলোকে বাড়তি প্রস্তুতি নিতেই হচ্ছে। দুঙ্গাও হয়ত পরিকল্পনা করে রেখেছিলেন কে কে শট নেবে। কিন্তু সেই তালিকায় রবিনহোর নাম রাখা হয়নি। যা দেখতে পেয়ে অনেকেই অবাক হয়েছেন। নেইমার ছিটকে যাওয়ার পর একাদশে আসা এই ৩১ বছর বয়সী অভিজ্ঞ ফরোয়ার্ডই ব্রাজিলকে পথ দেখাচ্ছিলেন। ভেনিজুয়েলার বিপক্ষে তার কর্নার থেকে গোল করেছিলেন থিয়াগো সিলভা। প্যারাগুয়ের বিপক্ষেও ১৫ মিনিটে এগিয়ে দিয়েছিলেন রবিনহোই। পেনাল্টি যেখানে স্নায়ুর চাপ নেয়ার লড়াই, সেখানে রবিনহোর অভিজ্ঞতার দাম দেননি দুঙ্গা। রবিনহো নিজেও পেনাল্টি নেবেন বলেই জানতেন। কিন্তু ?একেবারে শেষ মুহূর্তে তাকে তালিকা থেকে বাদ দেন দুঙ্গা। রিবেইরো আর কস্তার মিসই ব্রাজিলকে টুর্নামেন্ট থেকে ছিটকে দেয়। গতবারও পেনাল্টি শূট আউটেই ব্রাজিলকে বিদায় করে দিয়েছিল এই প্যারাগুয়ে। এবারও সেই লজ্জাজনক বিদায় নিতে হলো নেইমারবিহীন কার্লোস দুঙ্গার ব্রাজিলকে।

প্রকাশিত : ১ জুলাই ২০১৫

০১/০৭/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: