কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৪ ডিসেম্বর ২০১৬, ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, রবিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

অধরা রাঘব বোয়াল

প্রকাশিত : ১ জুলাই ২০১৫
অধরা রাঘব বোয়াল
  • মানবপাচার কয়েক ধাপে
  • পাচারচক্রে আন্তর্জাতিক মাফিয়া ডনরা
  • আড়াই শ’ মামলায় এমন তথ্য

গাফফার খান চৌধুরী ॥ মানবপাচারে রাঘববোয়ালরা জড়িত। তারা আন্তর্জাতিক মানবপাচার চক্রের সদস্য। তবে তদন্তে তাদের নাগাল মেলে না। ফলে আইনের চোখে তারা অধরাই থেকে যায়। এর অন্যতম কারণ বহু ধাপে মানবপাচার। পাচারের শিকার হওয়া ব্যক্তিরা দালালদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন। মামলার তদন্তে দালালসহ দুই থেকে তিন ধাপ উপরে থাকা মানবপাচারে জড়িতদের শনাক্ত করা সম্ভব হয়। এর উপরের ধাপে থাকা মানবপাচারকারীদের শনাক্ত করা সম্ভব হয় না। মানবপাচারে যোগসূত্র থাকার তথ্য মিললেও অকাট্য তথ্য-প্রমাণাদির অভাবে রাঘববোয়ালদের চার্জশীটভুক্ত আসামি করা যায় না। যে কারণে আড়ালেই থেকে যায় রাঘব বোয়ালরা। মানব পাচার সংক্রান্ত প্রায় আড়াই শ’ মামলার তদন্ত করতে গিয়ে এমন তথ্যই পেয়েছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)।

গত ৭ জুন রাজধানীর শাহবাগ মডেল থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করেন আলী আহমেদ (৬০) নামের এক অভিভাবক। জিডির অভিযোগে বলা হয়, তার ছেলে মাহবুবুর রহমানসহ সাত জনকে কানাডা পাঠানোর কথা বলে এক কোটি ২৩ লাখ ২০ হাজার টাকা নেন কবি সুফিয়া কামাল গণপাঠাগারের প্রকৌশলী মাকসুফুর রহমান। গত বছরের ১৭ জুলাইয়ের মধ্যে টাকাগুলো গ্রহণ করেন। এরপর থেকেই তিনি টালবাহানা শুরু করেন। আজও তাদের কাউকে কানাডায় পাঠায়নি। প্রকৌশলীর কাছে সাত জনের পাসপোর্ট রয়েছে। পার্সপোটগুলো ফেরত দেয়নি।

এ ব্যাপারে আলী আহমেদ জনকণ্ঠকে বলেন, টাকা ফেরত দিচ্ছে না। টাকা ফেরত চাইলে উল্টো হুমকিধমকি দেয়। অবশ্য এমন অভিযোগ অস্বীকার করে ওই প্রকৌশলীর দাবি, তার শ্যালকের কারণে তিনি ঘটনার সঙ্গে নিজের অজান্তেই জড়িয়ে গেছেন। শ্যালক তার ব্যাংক এ্যাকাউন্ট নম্বরটি বিদেশ যেতে ইচ্ছুকদের দেন। সাত জনের মধ্যে তিনজন তার এ্যাকাউন্টে ২৪ লাখ টাকা পাঠায়। তারই ভিত্তিতে আলী আহমেদ তার বিরুদ্ধে জিডি করেছেন। তিনি ঘটনার আদ্যোপান্ত কিছুই জানেন না। যদিও তার শ্যালক তার ব্যক্তিগত ব্যাংক এ্যাকাউন্ট নম্বর কিভাবে জানতে পেরেছেন, তার যৌক্তিক ব্যাখা দিতে ব্যর্থ হয়েছেন। এছাড়া তার এ্যাকাউন্টে কানাডা যেতে ইচ্ছুকদের মধ্যে তিনজন কেন ২৪ লাখ টাকা পাঠাল সে বিষয়টির কোন সুস্পষ্ট ব্যাখা দেননি ওই প্রকৌশলী।

জিডি দায়েরকারীর অভিযোগ, ওই প্রকৌশলী দিব্যি চাকরি করছেন। পুলিশ তাকে আটক বা জিজ্ঞাসাবাদও করেনি। মোটা অঙ্কের টাকা দিয়ে ওই প্রকৌশলী পুলিশকে ম্যানেজ করেছেন। পুলিশ ও প্রকৌশলীর তরফ থেকে যদিও এসব অভিযোগ ভিত্তিহীন বলে দাবি করা হয়েছে।

সিআইডি সূত্রে জানা গেছে, দীর্ঘদিন ধরেই বিদেশ পাঠানোর নামে সহজ-সরল মানুষকে আকাশ, স্থল ও জলপথে পাচার করা হচ্ছে। গত দুই বছরে পাচার হওয়াদের মধ্যে অন্তত ৫ হাজার জনকে বিভিন্ন দেশ থেকে ফেরত আনা হয়েছে। এরমধ্যে ২০১৩ সাল থেকে চলতি বছরের মে পর্যন্ত ১ হাজার ৪৯৪ বাংলাদেশীকে অবৈধভাবে প্রবেশের দায়ে গ্রেফতার করে থাইল্যান্ড পুলিশ। এর মধ্যে ৯১৯ জনের পরিচয় শনাক্ত হয়। তাদের পর্যায়ক্রমে দেশে ফেরত আনা হচ্ছে। অন্যদের পরিচয় শনাক্ত করে দেশে ফেরত আনার প্রক্রিয়া চলমান । এছাড়া ২০১৩ সালে ইরান থেকে ফেরত আনা হয় ২ হাজার জনকে। সম্প্রতি থাইল্যান্ডের জঙ্গলে একের পর এক গণকবর আবিষ্কৃত হচ্ছে। উদ্ধার হচ্ছে শত শত মানুষের কঙ্কাল। এ সংক্রান্ত মামলা দায়ের হচ্ছে। মামলাগুলোর তদন্ত করছে সিআইডি, থানা ও ডিবি পুলিশ। সিআইডি পুলিশ সংঘবদ্ধ অপরাধ সংক্রান্ত প্রায় সাড়ে চার শ’ চাঞ্চল্যকর মামলা তদন্ত করছে। যার মধ্যে আড়াই শ’ই মানবপাচারের মামলা। দিন দিন মামলার সংখ্যা বাড়ছে। ফেরত আসাদের লিখিত জবানবন্দী লিপিবদ্ধ করা হচ্ছে।

এমনই একজন বাগেরহাট জেলার মোল্লারহাট থানার উত্তরকান্দি এলাকার উদয়পুর গ্রামের বাসিন্দা মাহবুব মোল্যা (৩৩)। সম্প্রতি থাইল্যান্ডের জঙ্গল থেকে উদ্ধার হয়ে দেশে ফিরেছেন তিনি। সিআইডি পুলিশের কাছে দেয়া জবানবন্দিতে তিনি জানান, একই গ্রামের বাসিন্দা কামরুল মোল্যা ও মনির খার সঙ্গে পরিচয় হয় তার। তাদের মাধ্যমেই মালয়েশিয়া যাওয়ার জন্য চুক্তিবদ্ধ হন। মানবপাচারকারী চক্রের এ দুই সদস্যের মাধ্যমে পরিচয় হয় রফিক নামে আরেক মানবপাচারকারী চক্রের সদস্যের সঙ্গে। রফিক তাকে সরাসরি চট্টগ্রামের কক্সবাজারে নিয়ে যায়। সেখানে একটি হোটেলে রাখে। সেই হোটেল থেকে তাকে ট্রলারযোগে সমুদ্রপথে মালয়েশিয়ার উদ্দেশে পাঠানো হয়। তার ট্রলারটিতে ৭০ থেকে ৮০ জন ছিল। সমুদ্রের মাঝে আগে থেকে অবস্থান করা আরেকটি ট্রলারে তাদের তোলা হয়। বিভিন্ন রাস্তা দিয়ে ছোট ছোট ট্রলারে করে এভাবেই অনেককেই সেই ট্রলারে তোলা হয়। সবমিলিয়ে সাগরের মাঝে থাকা ট্রলারটিতে প্রায় সাড়ে তিন শ’ বিদেশগামীকে তোলা হয়। এরপর ট্রলার চলতে শুরু করে। ট্রলারটি একটি জায়গায়ই প্রায় তিন মাস অবস্থান করে। এ সময় বেলা এগারোটা এবং বিকেল চারটায় তাদের সামান্য খাবার দেয়া হতো। খাবার ছাড়াও যেকোন বিষয় নিয়ে বেশি কথা বললেই তাদের মারধর করা হতো। এভাবে অনাহারে -অর্ধাহারে তাদের দিন কাটতে থাকে। বেশি গ-গোল করলে ট্রলারে থাকা দালালরা গুলি করে হত্যার হুমকি দিত। খাবার নিয়ে মারামারি হয়ে বহুজন সমুদ্রে ঝাঁপিয়ে পড়েছে। ক্ষুধার যন্ত্রণায় সমুদ্রের লবণাক্ত পানি খেয়ে বমি করতে করতে অনেকের মৃত্যু হয়েছে। অনেককেই দালালরা সমুদ্রে ফেলে দিয়ে হত্যা করেছে। অনেককে পিটিয়ে রক্তাক্ত জখম করে সমুদ্রে ফেলা হয়েছে। তাদের অনেকেরই স্থান হয়েছে কুমির বা হাঙ্গরের পেটে।

সমুদ্রে ট্রলার থামিয়ে রেখে দালাল হামিদ ও আলম তার পরিবারের কাছে ফোন দেয়। তার মুক্তিপণ হিসেবে পরিবারের কাছে ২ লাখ টাকা দাবি করা হয়। শেষ পর্যন্ত বিকাশের মাধ্যমে তার পরিবার ৭০ হাজার টাকা দেয়। আর টাকা দিতে না পেরে আল্লাহর ওয়াস্তে তাকে (মাহবুব) মুক্তি দিতে অনুরোধ করেন পরিবারের সদস্যরা। শেষ পর্যন্ত তাদের উদ্ধার করে মিয়ানমারের নেভী। এমন বক্তব্য দিয়েছেন দেশে ফেরত আসাদের অধিকাংশ জনই। তাদের অনেককেই থাইল্যান্ডের জঙ্গলে বা সমুদ্রের মাঝপথে রেখে মুক্তিপণ আদায় করা হয়েছে।

সিআইডি সূত্র বলছে, চলতি বছর অন্তত ৬শ’ জনকে ফেরত আনা হয়েছে। ইরান, ইরাক, থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়াসহ বিভিন্ন দেশ থেকে তাদের ফেরত আনা হয়। সম্প্রতি আন্দামান সাগরে মাছ ধরা জেলেরা প্রায় আট শ’ বাংলাদেশীকে সাগরে ভাসতে দেখে উদ্ধার করে। পরে তাদের ইন্দোনেশিয়ার আচেহ প্রদেশে রাখা হয়। সেখান থেকে তাদের ধাপে ধাপে বাংলাদেশে ফেরত আনা হচ্ছে।

সিআইডির অর্গানাইজড ক্রাইম (সংঘবদ্ধ অপরাধ) বিশেষ পুলিশ সুপার মীর্জা আব্দুল্লাহেল বাকী জনকণ্ঠকে বলেন, আজ পর্যন্ত কত মানুষকে বিদেশ পাঠানোর নামে বা সত্যি সত্যিই পাচার হয়েছে তার সঠিক কোন পরিসংখ্যান জানা যায়নি। তবে গত বছর শুধু সিআইডির তরফ থেকেই সংঘবদ্ধ অপরাধ সংক্রান্ত ৩১শ’ মামলার তদন্ত করা হয়। যার মধ্যে দুই হাজারেরও বেশি মানবপাচারের মামলা ছিল। মানবপাচারের মামলায় ৯ হাজার জনকে আসামি করে চার্জশীট দাখিল করা হয়েছে। চার্জশীটভুক্ত আসামিদের অধিকাংশই দালাল। আসামিদের অধিকাংশই পলাতক। সারাদেশের সব থানায়ই মানবপাচার সংক্রান্ত মামলা আছে। তবে সবচেয়ে বেশি মামলা হয়েছে কক্সবাজার জেলার থানাগুলোতে। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে উত্তরবঙ্গের থানাগুলো।

সিআইডি কর্মকর্তা বলছেন, মানব পাচারে রাঘববোয়ালরা জড়িত। তবে অকাট্য প্রমাণাদি না থাকায় এবং দায়েরকৃত মামলার আসামি না হওয়ায় তাদের আইনের আওতায় আনা সম্ভব হয় না। বহু ধাপে মানবপাচারের ঘটনাটি ঘটাই এর অন্যতম কারণ। পাচারের শিকার হওয়া ব্যক্তিরা গ্রামের বা শহরের দালালদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন। কারণ আর্থিক লেনদেনও ওইসব দালালদের মাধ্যমেই হয়। এসব দালাল একবারে প্রান্তিক পর্যায়ে কাজ করে। এসব দালাকে নিয়ন্ত্রণ করে প্রতিটি থানায় থাকা বিশেষ দালাল চক্র। থানা পর্যায়ের দালালরা জেলা পর্যায়ের এবং জেলা পর্যায়ের দালালরা ঢাকার দালাল বা রিক্রুটিং এজেন্সির সঙ্গে যোগাযোগ রাখে। এটি একটি বিশাল চেনের (শিকল) মতো। ঢাকা থেকে বিভিন্ন রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে মানবপাচার হয়ে থাকে। এজেন্সিগুলোর সঙ্গে দেশ-বিদেশের আন্তর্জাতিক পাচারকারী চক্র, বিমানবন্দর, সংশ্লিষ্ট দেশের বাংলাদেশস্থ দূতাবাস, ইমিগ্রেশন বিভাগ, সমুদ্রবন্দরের সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে যোগাযোগ থাকে। তারাই মানুষদের বিদেশে পাঠানোর নাম করে পাচার করে দেয়।

এমন দীর্ঘ প্রক্রিয়ার কারণে প্রান্তিক পর্যায়ের দালালদের সঙ্গে দেশী-বিদেশী আন্তর্জাতিক মানবপাচারকারী চক্র বা বিক্রুটিং এজেন্সির সরাসরি যোগাযোগ হয় না। পাচারের শিকার হওয়াদের সঙ্গে মূল পাচারকারীদের কোন সময়ই যোগাযোগ বা দেখাসাক্ষাত হয় না। অত্যন্ত সুকৌশলে ধাপে ধাপে নিজেদের আড়াল করে মানবপাচারের ঘটনাটি ঘটায়। এটি পাচারকারীদের কৌশল। পাচারকারীরা নিজেদের আড়ালে রাখতে কমিশনের ভিত্তিতে এই চক্রটি তৈরি করে। গ্রামে যে ব্যক্তির কাছ থেকে মালয়েশিয়া যাওয়ার জন্য ৫ লাখ টাকা নেয়া হয়, মূল রিক্রুটিং এজেন্সি তা থেকে হয়তো তিন লাখ টাকা পেয়ে থাকে। বাকি দুই লাখ টাকা বিভিন্ন ধাপে দালালরা পেয়ে থাকে।

সিআইডির এই কর্মকর্তা আরও জানান, মানব পাচার মামলার তদন্তে দেখা গেছে পাচারের শিকার হওয়ার পর উদ্ধার পাওয়া ব্যক্তিরা দেশে ফিরেই দালালদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন। মামলার তদন্তে প্রান্তিক পর্যায়ের দালাল, থানা পর্যায়ের দালাল, জেলা পর্যায়ের দালাল ও রিক্রুটিং এজেন্সি সম্পর্কেও তথ্য পাওয়া যায়। কিন্তু মামলায় রিক্রুটিং এজেন্সিকে আসামি না করায় এবং তাদের বিরুদ্ধে পাচারের অকাট্য প্রমাণাদি না থাকায় তাদের আইনের আওতায় আনা সম্ভব হয় না। আবার অনেক রিক্রুটিং এজেন্সি ভুয়া নাম ঠিকানা ব্যবহার করে ব্যবসা করে থাকে। সারাদেশে অসংখ্য মানবপাচার সিন্ডিকেট রয়েছে।

সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মানবপাচারের ক্ষেত্রে জিরো টলারেন্স দেখানোর ঘোষণা দিয়েছেন। পুলিশ মহাপরিদর্শক একেএম শহীদুল হক পুলিশের প্রতিটি ইউনিট প্রধানকে মানবপাচার সংক্রান্ত মামলা গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করে দোষীদের আইনের আওতায় আনতে লিখিত চিঠি দিয়েছেন। পুলিশের তরফ থেকে একটি কমিটিও গঠন করা হয়েছে। পুলিশের বিশেষ শাখার (এসবি) অতিরিক্ত উপমহাপরিদর্শক তৌফিক মাহবুব চৌধুরীকে প্রধান করে একটি কমিটিও গঠন করা হয়েছে। কমিটির অপর সদস্যরা হচ্ছেন সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার রেজাউল হায়দার এবং পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সের ডিসিপ্লিন এবং প্রফেশনাল স্ট্যান্ডার্ড শাখার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মিজানুর রহমান। মানবপাচারে জড়িতদের গ্রেফতার করে আইনের আওতায় আনার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

প্রকাশিত : ১ জুলাই ২০১৫

০১/০৭/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন

প্রথম পাতা



ব্রেকিং নিউজ: