মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
১১ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, রবিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

আসছে কোয়ান্টাম কম্পিউটার

প্রকাশিত : ৩০ জুন ২০১৫
  • এনামুল হক

কয়েক দশক ল্যাবরেটরিতে হতাশায় ধুঁকে কাটানোর পর অবশেষে বাণিজ্যকভাবে আত্মপ্রকাশ করতে যাচ্ছে কোয়ান্টাম কম্পিউটার। গুগল, হিউলেট-প্যাকার্ড, আইবিএম, মাইক্রোসফটের মতো নামী-দামী কোম্পানি এখন এমন কম্পিউটার বাণিজ্যকীকরণের উপায় সন্ধান করছে। কোয়ান্টাম কম্পিউটার আপনার দোরগোড়ায় এসে গেল বলে।

কোয়ান্টাম কম্পিউটার কী সে কথায় যাওয়ার আগে শুধু এইটুকু বলে নেয়া যেতে পারে যে, এক অপার সম্ভাবনা নিয়ে হাজির হচ্ছে এই কম্পিউটার। এমনকি সভ্যতার গতিপথ বদলে দেয়ার সম্ভাবনা ও ক্ষমতাও ধারণ করে আছে। আমাদের জীবনের জটিলতম সমস্যার সমাধানে প্রচলিত কম্পিউটারের যেখানে বহু বছর লেগে যাওয়ার কথা সেখানে কোয়ান্টাম কম্পিউটার অতি অল্প সময়ের মধ্যে সমাধান এনে দেবে। সর্ব ক্ষেত্রে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন নিয়ে আসবে।

এখন প্রশ্ন হলো, কোয়ান্টাম কম্পিউটিং আসলে কী? এ হলো বিংশ শতাব্দীর দুই অসাধারণ বৈজ্ঞানিক কর্মকা-Ñ কোয়ান্টাম ফিজিক্স ও ডিজিটাল কম্পিউটিংয়ের মিলন। ধ্রুপদী বা চিরায়ত পদার্থ বিজ্ঞানের ঘাটতি থেকে যেমন কোয়ান্টাম ফিজিক্সের আবির্ভাব তেমনি প্রচলিত কম্পিউটারের সীমাবদ্ধতা থেকে আবির্ভূত হয়েছে কোয়ান্টাম কম্পিউটার।

প্রচলিত কম্পিউটার এক একবারে এক ধাপ অগ্রসর হয়। এর ডাটা প্রসেস করা হয় বাইট বা বিটের আকারে। বাইট বা বিট হলো তথ্যের একক ইউনিট। এই বিট হলো বাইনারি ডিজিটের। কোন উপসংহারে পৌঁছাতে হলে কম্পিউটার এই বাইনারি ডিজিটগুলো যোগ-বিয়োগ করে। যে কোন নির্দিষ্ট মুহূর্তে এই বিটগুলোর একটি একক সুনির্দিষ্ট মূল্য থাকে এবং প্রতিটি বিট একই সময় হয় এক (১) হতে পাবে, নয়ত হতে পারে শূন্য (০)। এই বিটগুলোর যে কোন বিশাল সংগ্রহের ক্ষেত্রেও একথা প্রযোজ্য। এই কারণে কম্পিউটার একটি নির্দিষ্ট মুহূর্তে শুধু একটাই হিসাব করতে পারে। এটাই হলো ডিজিটাল কম্পিউটেশনের ভিত্তি। একটা নির্দিষ্ট সময় শুধু একটি মাত্র অবস্থায় থাকা ও একটি মাত্র হিসাব করতে পারার কারণে কম্পিউটারের ক্ষমতাটা সীমাবদ্ধ হয়ে যায়। প্রচলিত কম্পিউটারের এই সীমাবদ্ধতা দূর করার জন্য এসেছে কোয়ান্টাম কম্পিউটার। কারণ কোয়ান্টাম কম্পিউটার চলে কোয়ান্টাম বাইট বা কিউবাইটে। এই বাইট বা বিটগুলো কোয়ান্টাম ফিজিক্সের সুপার পজিশন সূত্রের বদৌলতে একই সঙ্গে হতে পারে ১ অথবা ০। অর্থাৎ একটা কোয়ান্টাম বাইট বা বিট দুই সমান সম্ভাবনা হিসেবে অস্তিত্বমান। এটা অবিশ্বাস্য রকমের কাজের। যদি কোন কোয়ান্টাম বাইট একই সঙ্গে বা সময়ে দুই অবস্থায় থাকে তাহলে তার অর্থ হচ্ছে সেটি একই সঙ্গে দুটি হিসাব সম্পাদন করতে পারে। দুটি কোয়ান্টাম বাইট একই সঙ্গে চারটি হিসাব, তিনটি কোয়ান্টাম বাইট নয়টি হিসাব করতে পারে। এভাবে কোয়ান্টাম বাইটের সংখ্যা যত বাড়ে কম্পিউটারের হিসাব করার ক্ষমতাও ততই অবিশ্বাস্যভাবে বেড়ে যায়। কোয়ান্টাম কম্পিউটারের ডাটা যেহেতু একই সঙ্গে একাধিক অবস্থায় থাকতে পারে তাই ওটা একাধিক কাজ আলাদাভাবে করে না বরং সব একই সঙ্গে করতে পারে।

কম্পিউটারের এভাবে কাজ করার কৌশল উদ্ভাবনের ব্যাপারে সারা বিশ্বে এ ধরনের প্রকৌশলীদের ছোট ছোট দল কয়েক দশক ধরে কাজ করে আসছে। এ ক্ষেত্রে তারা কোয়ান্টাম ফিজিক্সের দুটো বিষয়কে কাজে লাগিয়েছেন। একটা হলো সুপার পজিশন এবং অন্যটি এ্যান্টাঙ্গেলমেন্ট। এ দুটিকে কাজে লাগিয়েই তারা তৈরি করেছেন কিউবাইট বা কিউবিট এবং সেগুলোকে একত্রে যুক্ত করে তারা এমন কম্পিউটার উদ্ভাবন করেছেন যা একই সঙ্গে বহুবিধ অবস্থায় থাকতে পারে। নিজের ক্ষমতা বা সামর্থ্য বাড়ানোর জন্য এমন কম্পিউটারের গতি বাড়ানোর প্রয়োজন পড়ে না। গতি না বাড়িয়েই তারা প্রচলিত যে কোন কম্পিউটারের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী হতে পেরেছে।

অবশ্য সেই শক্তি অর্জনের কাজটা সহজ তো নয়ই বরং যথেষ্ট কঠিন। নিজের বিশেষ বৈশিষ্ট্য কাজে লাগানোর জন্য কোয়ান্টাম কম্পিউটারের বিশেষ এলগারিদম প্রয়োজন। এই এলগারিদম বিভিন্ন সমস্যাকে কয়েকটি অংশে বিভক্ত করে ফেলে। কিউবাইটের সমাবেশের মধ্য দিয়ে যাওয়ার সময় এই অংশগুলো সমস্যার সবচেয়ে সম্ভাব্য সমাধান দেয়ার জন্য প্রতিটি কিউবাইটের মূল্যের বিভিন্ন সম্ভাবনার সার সঙ্কলন করে থাকে।

তবে সর্বক্ষেত্রেই কোয়ান্টাম কম্পিউটার যে ক্লাসিক্যাল কম্পিউটারের চেয়ে ভাল তা কিন্তু নয়। কোয়ান্টাম কম্পিউটার ক্লাসিক্যালের তুলনায় অধিকতর দ্রুত ওয়েবপেজ ডাউনলোড করতে কিংবা কম্পিউটার গেমের গ্রাফিক্স উন্নততর করতে পারে না।

কিউবিট কী দিয়ে তৈরি হওয়া উচিত সেটাই হলো সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। কিউবিটের জন্য প্রয়োজন এমন ভৌত ব্যবস্থা যেখানে দুই বিপরীত কোয়ান্টাম অবস্থা বিরাজমান। যেমন এটমের নিউক্লিয়াসের চারপাশে ঘুরপাক খাওয়া একটা ইলেক্ট্রনের পাক খাওয়ার দিক। এ কাজটা করতে পারায় মতো বেশ কিছু জিনিস আছে এবং এগুলোর এক একটি এক এক মহলের পছন্দ। কেউ বলে হীরকের স্কটিকের জাফরির মধ্যে আটকে থাকা নাইট্রোজেনের এটম একাজের উপযোগী। কেউ বলে চৌম্বুক ক্ষেত্রে আবদ্ধ ক্যালসিয়াম আয়ন। আবার কারও মতে আলো যা দিয়ে গঠিত সেই ফোটনই সবচেয়ে ভাল! কারও বা ধারণা, পদার্থের মধ্যে কম্পন হিসেবে থাকা কোয়াসিপার্টিকেলই সব থেকে উপযুক্ত। কারণ এগুলো সত্যিকারের সার এটমিক পার্টিকেলের মতো আচরণ করে।

এ মুহূর্তে কেউবিট তৈরির ব্যাপারে সর্বশীর্ষে রয়েছে সুপার কন্ডাকটরের ব্যবহার। গুগল ও আইবিএম উভয়েই এর ওপর নির্ভর করছে। এক্ষেত্রে সুবিধা হলো এই যে, সুপার কন্ডাকটিং কিউবিটগুলোকে বর্তমান কম্পিউটারে ব্যবহৃত সেমিকন্ডাকটিং চিপে বিন্যস্ত করা যায়। এই দুই কোম্পানি মনে করে যে এতে করে কোয়ান্টাম কম্পিউটার বাজারে ছাড়া সহজতর হবে।

যারা ফোটন কিউবিট ব্যবহার করতে চায় তারা বলে এমন কম্পিউটার বাজারজাত করা সহজ। কারণ কম্পিউটার শিল্প প্রচলিত পণ্যে ইলেক্ট্রনের চেয়ে ফোটন অধিক থেকে অধিকতর হারে ব্যবহার করছে। কোয়ান্টাম কম্পিউটিংও এই সুযোগ গ্রহণ করতে পারে। হিউলেট-প্ল্যাকার্ড এই কৌশল ব্যবহারে পক্ষপাতী।

তবে মাইক্রোসফট যে জিনিসটা ব্যবহার করতে চায় সেটা হলো কোয়াসিপার্টিকেল। এগুলোকে এনিয়নও বলে যা মাত্র দ্বিমাত্রিকে চলাচল করে। মাইক্রোসফটের এই কর্মোদ্যোগের নেতৃত্ব দিচ্ছে মাইকেন ফ্রিডম্যান নামে স্বনামধন্য গণিতবিজ্ঞানী। তিনি মনে করেন, এনিয়নগুলোই কিউবিট হিসেবে কাজ করবে। তবে সমস্যা হচ্ছে কোন ব্যবহারযোগ্য এনিয়নের অস্তিত্ব সম্পর্কে এখনও নিশ্চিত হওয়া যায়নি। অবশ্য ল্যাব পরীক্ষায় একটি এনিয়নের সন্ধান পাওয়া গেছে যা তাকে আশাবাদী করে তুলেছে।

কানাডার ভ্যাঙ্কুভারের ডিওয়েভ কোম্পানি ২০০৭ সালে ১৬টি কিউবিটের একটি কোয়ান্টাম কম্পিউটার জনসমক্ষে প্রদর্শন করে। ২০১১ সালে সেই কোম্পানি ১২৮ কিউবিট শক্তিসম্পন্ন ডি-ওয়েভ ওশান তৈরি করে লকহিড মার্টিনের কাছে বিক্রি করেছে। ডি-ওয়েভের কাছ থেকে কোয়ান্টাম কম্পিউটার কিনেছে গুগল, নাসা এবং ইউএসআরএসের মতো স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠান। এমন একটি কম্পিউটারের দামও তেমনি অবিশ্বাস্য অঙ্কের বলে এগুলোর বাণিজ্যিকীকরণ সম্ভব নয়। এমন দাম থাকার কারণও আছে। এতে যে কম্পিউটার চিপ ব্যবহার করা হয় তা রাখা হয় হিমায়ন যন্ত্রে যেখানে তাপমাত্রা মাইনাস ২৭২ ডিগ্রী সেলসিয়াস।

আজ গুগল, মাইক্রোসফট, আইবিএম, হিউলেট-প্ল্যাকার্ড প্রভৃতি কোম্পানি যে ধরনের কোয়ান্টাম কম্পিউটার তৈরি করে বাজারজাত করতে যাচ্ছে সেগুলোতে হিমায়ন যন্ত্র লাগবে না। এগুলোর সুপার কন্ডাক্টর ঘরের সাদারণ তামপাত্রায় থাকতে পারবে। সাধারণের ব্যবহার যোগ্য এমন কোয়ান্টাম কম্পিউটার এখনও তৈরি হয়নি বটে। তবে তা হওয়ার পথে আছে ও বাজারে আসছে। ক্লাসিক্যাল কম্পিউটারের মতো এই কম্পিউটারও প্রথম প্রথম প্রশিক্ষিত টেকনিশিয়ানদের দ্বারা বিশেষ বিশেষ প্রতিষ্ঠান বা স্থাপনায় চলবে। তারপর ধীরে ধীরে তা ঐসব প্রতিষ্ঠানের বাইরেও চলে আসবে। তারপরও কোয়ান্টাম ডেস্কটপ আসতে এখনও অনেক দেরি। আর ট্যাবলেটের তো প্রশ্নই ওঠে না। তথাপি এমন কম্পিউটারের আগমন প্রতিহত করার কোনই উপায় নেই।

সূত্র : দি ইকোনমিস্ট

প্রকাশিত : ৩০ জুন ২০১৫

৩০/০৬/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: