আংশিক মেঘলা, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৭ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, বুধবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

পথচলতি দৃশ্যচিত্র

প্রকাশিত : ৩০ জুন ২০১৫
  • মাহবুব রেজা

বাসটা এসে থামল এলিফ্যান্ট রোডের সিগন্যালে। তখন রোদের গায়ে দুপুর পেরিয়ে আসন্ন বিকেলের আগমনী বার্তা। গরমও পড়েছে বেশ। সিগন্যালে বাসটা থামার পর কমবয়সী কন্ডাক্টর ছেলেটা সামনের দরজার কাছে এসে দরজায় ঝুলতে থাকা মাঝবয়সী হেলপারকে ধমকের সুরে বলল, ওই মিয়া অটিস্টিক গো মতন চুপচাপ খাড়ায়া থাকেন ক্যান? প্যাসেঞ্জার ডাকবার পারেন না? নাকি মুখে তালা লাগাইচ্ছেন? একথা বলে সে নিজেই এক যাত্রীর মাথার ওপর দিয়ে জানালার দিকে গলা বাড়িয়ে চিৎকার করে বলতে লাগল- শাহবাগ, প্রেসক্লাব, পল্টন, গুলিস্তান, মতিঝিল, যাত্রাবাড়ী...।

শাহবাগ আসার পর কিছু যাত্রী বাস থেকে তড়িঘড়ি করে নেমে গেলেন। শাহবাগ থেকে বেশ কয়েকজন পুরুষ ও দু’জন কমবয়েসী তরুণী ধাক্কাধাক্কি করে বাসে উঠলেন। বাসের গেটের মধ্যে চাপাচাপি, ঠাসাঠাসি অবস্থা। ভিড়-ভাট্টার মধ্যে মহিলা সিটে দু’জন পুরুষ আগে থেকে বসে আছেন। তরুণী দুটি মানুষজনের ভিড় সামলে মহিলা সিটের কাছে এসে বসে থাকা দু’জন পুরুষকে বললেন, ভাই এইটা মহিলা সিট, আপনারা উঠলে আমরা বসতে পারি।

কন্ডাক্টর ছেলেটি বলল, আপা আপনেরা কই যাইবেন?

তরুণী দুটি বললেন, যাত্রাবাড়ী।

বাস ততক্ষণে শিশু পার্কের কাছাকাছি এসে পড়েছে। তরুণীর কথায় পুরুষ যাত্রী দু’জন প্রায় একসঙ্গে বলে উঠল, এইটা মহিলা সিট! কন কী? আমরা উঠব না।

পুরুষ যাত্রীদের কথা শুনে ঠেলাঠেলি করে দাঁড়িয়ে থাকা একজন যাত্রী তরুণীর পক্ষ নিয়ে বাসের গায়ে লেখা দেখিয়ে দিয়ে বললেন, ভাই এটা কী ধরনের কথা বলেন? ভাল কইরা দেখেন ওই যে লেখা মহিলা সিট।

দাঁড়িয়ে থাকা যাত্রীর প্রতিবাদে মহিলা সিটে বসে থাকা পুরুষ যাত্রীর একজন তখন বেশ যুক্তি দিয়ে বলল, ভাই আপনে ঠিকই কইছেন? এইটা মহিলা সিট। কিন্তু ভাল করে দেখেন তো ওই খানে কী লেখা আছে- বলে সে উঠলেন না। গোঁ ধরে বসে রইলেন। তারপর বললেন, বাসের মধ্যে তিন সারিতে নয়টা সিট মহিলা, শিশু ও প্রতিবন্ধীদের জন্য সংরক্ষিত থাকে। ওই খানে তো লেখা মহিলা, শিশু, প্রতিবন্ধী- তার মানে তিনটা সিট মহিলার, তিনটা সিট শিশুর আর তিনটা সিট প্রতিবন্ধীদের জন্য। তারা তাদের যুক্তিকে আরও মজবুত করে তুলল এই বলে, সামনের দুই সারিতে তিনজন করে ছয়জন মহিলা বসে আছেন। আমরা প্রতিবন্ধীদের জন্য সংরক্ষিত আসনে বসে আছি- আমাদের সঙ্গে একজন মহিলাও বসে আছেন। পাশে বসে থাকা মহিলা উসখুস করছেন। যুক্তিবাদী যাত্রীটি বেশ গ্যাট মেরে বসে রইলেন।

বোঝা গেল, পুরুষ দুটি উঠে না দাঁড়ানোয় তরুণী দুটি যেন একটু বিব্রত। তারা আর কথা না বলে চলতি বাসে সিটের রড ধরে দাঁড়িয়ে থাকলেন। এর মধ্যে রমনার কাছাকাছি বাস প্রচ- ব্রেক করল। তরুণী দু’জন প্রায় পড়েই যাচ্ছিলেন। কোনমতে সিটের রড ধরে নিজেদের সামলে নিলেন।

এবার দাঁড়িয়ে থাকা এক তরুণকে দৃশ্যপটে দেখা গেল। সে মহিলাদের পেছনের সিট থেকে দাঁড়িয়ে মহিলা সিটে গ্যাট মেরে বসে থাকা দু’জনকে উদ্দেশ করে উচ্চস্বরে বললেন, ভাই, দেখে তো মনে হয় না আপনারা প্রতিবন্ধী! আপনারা উঠে পড়ুন। মহিলাদের বসতে দেন। তরুণটি বিড় বিড় করে আর কী যেন বলল ঠিক বোঝা গেল না।

তরুণের কথায় মহিলা সিটে বসে থাকা যাত্রী দু’জন তরুণকে দেখার জন্য পেছনে তাকালেন। তারপর একজন বলে উঠলেন, আমরা সিট ছাইড়া উঠতে পারুম না। আপনে যদি মনে করেন আমরা প্রতিবন্ধী তাইলে আমরা তাণ্ডই।

প্রেসক্লাবের কাছে এসে বাস থামতেই তরুণী দু’জন নেমে গেলেন। তাদের চোখে-মুখে বিব্রত হওয়ার ছাপ। বাসের ভেতরে বসে থাকা মহিলাদেরও তখন একই অবস্থা।

পথ চলতি যাত্রী হিসেবে এ রকম দৃশ্যচিত্র নিত্যদিন আপনার চোখেও নিশ্চয় পড়ে।

তখন কী করেন আপনি?

athairidha15@yahoo.com

প্রকাশিত : ৩০ জুন ২০১৫

৩০/০৬/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: