কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৫ ডিসেম্বর ২০১৬, ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, সোমবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

চট্টগ্রামে বিমানবাহিনীর যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত, বৈমানিক নিখোঁজ

প্রকাশিত : ৩০ জুন ২০১৫
  • বঙ্গোপসাগরে দুটি ভগ্নাংশ উদ্ধার

স্টাফ রিপোর্টার, চট্টগ্রাম অফিস ॥ সোমবার সকালে চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙ্গর এলাকায় বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর একটি যুদ্ধবিমান (এফ-৭) বিধ্বস্ত হয়েছে। নিখোঁজ রয়েছেন বিমানটির পাইলট ফ্লাইট লে. চৌধুরী তাহমিদ কাদের রুম্মান। পতেঙ্গা মোহনা এলাকা থেকে প্রায় ৭ নটিক্যাল মাইল দূরে বহির্নোঙ্গরের ব্র্যাভো পয়েন্টে উত্তাল সাগরে এটি বিধ্বস্ত হয়। আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদফতরের (আইএসপিআর) সহকারী পরিচালক নুর ইসলাম সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, কী কারণে এটি বিধ্বস্ত হয়েছে তা এখনও জানা যায়নি। তবে এ জন্য একটি তদন্ত কমিটি করা হয়েছে।

এদিকে, চট্টগ্রাম বন্দর সূত্রে জানানো হয়, সকাল সাড়ে ১০টায় এই এফ-৭ যুদ্ধবিমান নিয়ে পাইলট ফ্লাইট লে. তাহমিদ চট্টগ্রামের বিমানবাহিনীর জহুরুল হক ঘাঁটি থেকে প্রশিক্ষণে উড্ডয়ন করেন। এরপর সকাল ১১টা ১০ মিনিটের পর থেকে এ বিমানটির সঙ্গে নিয়ন্ত্রণ কক্ষের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। অপরদিকে, ঐ সময় বিমানটি বহির্নোঙ্গরের ব্র্যাভো পয়েন্টে বিধ্বস্ত হয়। বিধ্বস্ত হওয়ার সময় এর পাশে ছিল অয়েল ট্যাংকারসহ দুটি জাহাজ। অয়েল ট্যাংকারের ঠিক পাশাপাশি এটি সাগরে ডুবে যায়। ট্যাংকার জাহাজের উপর পড়লে ভয়াবহ পরিস্থিতি রূপ নিত। এ ঘটনার পর শুরু হয় উদ্ধার অভিযান। নৌবাহিনীর দুটি, কোস্টগার্ডের দুটি ও চট্টগ্রাম বন্দরের দুটি জাহাজ ছাড়াও বিমানবাহিনীর দুটি হেলিকপ্টার উদ্ধার অভিযান শুরু করে। কিন্তু সন্ধ্যায় এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত নিখোঁজ পাইলটের কোন সন্ধান মিলেনি। তবে বিধ্বস্ত বিমানের দুটি ভাঙা অংশ ভেসে ওঠার পর তা মৎস্য শিকাররত নৌকা মাঝিদের মাধ্যমে উদ্ধার হয়। যা পরবর্তীতে কোস্টগার্ডের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।

চট্টগ্রাম বিমানবন্দরের ব্যবস্থাপক উইং কমান্ডার নূর-ই-এ আলম সাংবাদিকদের বলেছেন, এটি পুরনো কোন বিমান নয়। নতুন সংগৃহীত বিমানের একটি। তবে বিমানটি কি কারণে বিধ্বস্ত হয়েছে তা নিয়ে বিমানবাহিনী সূত্রে কিছুই জানানো হয়নি। উদ্ধার অভিযানে অংশগ্রহণকারী সংস্থাগুলোর একটি সূত্র জানিয়েছে, তাদের ধারণা, ব্র্যাভো পয়েন্টে পানির গভীরতা খুবই বেশি। বিধ্বস্ত হওয়ার পর বিমানটি সেখানে আছে কিনা না জোয়ারের টানে সরে গেছে তা নিয়ে সন্ধান চালানো হচ্ছে।

চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের পরিচালক (প্রশাসন) মোঃ জাফর আলম জানান, বন্দর কর্তৃপক্ষের উদ্ধারকারী দুটি জাহাজ ঘটনাস্থলে রয়েছে। তিন বাহিনীর উদ্ধার টিমের সঙ্গে যৌথভাবে অভিযান চালানো হচ্ছে। বিধ্বস্ত এলাকাটি চিহ্নিত করার পর এর পাশ থেকে অবস্থানকারী জাহাজগুলোকে সরানো হয়েছে। এছাড়া দুর্ঘটনার ব্যাপারে বহির্নোঙ্গর ও এর বাইরে অবস্থানরত জাহাজগুলোকে বেতার বার্তা প্রদান করা হয়েছে। তবে উদ্ধারকারী দলের বিভিন্ন সূত্রে ইঙ্গিত দেয়া হচ্ছে বিধ্বস্ত বিমানটির বৈমানিক ফ্লাইট লে. তাহমিদের বেঁচে থাকার সম্ভাবনা অত্যন্ত ক্ষীণ। কারণ বিধ্বস্ত হওয়ার আগে বিমানটির এই বৈমানিক এক্সিট করতে পেরেছেন কিনা তার কোন আলামত মিলছে না। নিখোঁজ ফ্লাইট লে. চৌধুরী তাহমিদ কাদের রুম্মানের বাড়ি আনোয়ারার হাইলধরে। তিনি অবিবাহিত। ৩ ভাই ১ বোনের মধ্যে তিনি সবার বড়। তার পিতা চৌধুরী আবদুল কাদের অবসরপ্রাপ্ত একজন সরকারী কর্মকর্তা বলে জানা গেছে। ঘটনার পর রুম্মানের পরিবারে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। সর্বত্র চলছে কান্নার রোল। পরিবারের বড় ছেলেটি নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় এলাকাবাসীর মাঝেও শোকের ছায়া নেমে এসেছে। বহু আশা ভরসা নিয়ে রুম্মান যোগ দিয়েছিলেন বাংলাদেশ বিমানবাহিনীতে। মাত্র ৩০ বছর বয়সে রুম্মান এগিয়ে যাচ্ছিলেন ‘বাংলার আকাশ রাখিব মুক্ত’ এই স্লোগানে উদ্বুদ্ধ হয়ে বিমানবাহিনীতে যোগ দিয়ে। কিন্তু দুর্ভাগ্য যে তার উপর ভর করেছিল তা কখনও তার জানা ছিল না। সোমবার দুর্যোগমুক্ত আবহাওয়ার পরিবেশে তিনি উড্ডয়ন করেছিলেন প্রশিক্ষণ ট্রায়ালে। কিন্তু উড্ডয়নের প্রায় ৪০ মিনিট পর তার বিমানের সঙ্গে নিয়ন্ত্রণ কক্ষের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এ নিয়ে নিয়ন্ত্রণ কক্ষ থেকে দ্রুত মেসেজ পাঠানো হয় উর্ধতন কর্তৃপক্ষের কাছে। এর কিছুক্ষণ পরে খবর আসে বঙ্গোপসাগরের ব্র্যাভো পয়েন্টে একটি বিমান বিধ্বস্ত হয়েছে। তখনই নিশ্চিত হওয়া যায় রুম্মান চালিত যুদ্ধবিমানটি বিধ্বস্ত হয়েছে। সঙ্গে সঙ্গে উদ্ধার তৎপরতা শুরু হয়। বেশ কিছুক্ষণ ঘটনাস্থল চিহ্নিত করা না গেলেও পরবর্তীতে আশপাশে অবস্থানরত মাছ ধরার নৌকার মাঝি মাল্লা ও সমুদ্রগামী জাহাজের ক্রুদের পক্ষ থেকে নিশ্চিত করা হয় বিমানটির বিধ্বস্ত পয়েন্ট। চীনের তৈরি এফ-৭ এ বিমানটি কিভাবে এবং কিভাবে বিধ্বস্ত হয়েছে তার জন্য অপেক্ষা করতে হবে গঠিত তদন্ত কমিটি রিপোর্টের উপর। বিমানবাহিনী সূত্রে জানানো হয়, এই যুদ্ধ বিমানটি রাশিয়ার তৈরি মিগ-২১ এর লাইসেন্সড ও উন্নততর সংস্করণ। রাশিয়ার কারিগরি সহযোগিতায় চীন এটি তৈরি করে। এর উৎপাদন ২০১৩ বন্ধ হয়ে গেলেও এটি চীনসহ বিভিন্ন দেশে বিমানবাহিনীতে বিশেষত ইন্টারসেপ্টর হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। বিমানটির প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানের নাম চীনের চেংদু এয়ারক্রাফট কর্পোরেশন।

উল্লেখ্য, কিছুদিন পর পরই ঘটছে বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর প্রশিক্ষণ বিমান দুর্ঘটনা। সর্বশেষ গত ১৩ মে চট্টগ্রাম বিমানবন্দর রানওয়ের পাশে বিধ্বস্ত হয়েছিল বিমানবাহিনীর একটি প্রশিক্ষণ হেলিকপ্টার। এতে আহত হন এক প্রশিক্ষক ও দুই প্রশিক্ষণার্থী। তাদের উদ্ধার করে দ্রুত সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সে দিনের দুর্ঘটনা রানওয়েতে কিছুটা প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করায় বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষকে সাময়িকভাবে ফ্লাইট ওঠানামা বন্ধ করতে হয়েছিল। এর আগে ২০১৩ সালের ১৫ জুলাই পটিয়ায় বিধ্বস্ত হয়েছিল বিমানবাহিনীর একটি প্রশিক্ষণ বিমান। সেদিন দুই পাইলট প্যারাসুটে নেমে আসতে সক্ষম হন। তারও আগে ২০১০ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর কর্ণফুলী নদীতে বিধ্বস্ত হয়েছিল আরেকটি প্রশিক্ষণ বিমান। সেবারও প্যারাসুট ব্যবহার করে নেমে আসতে সক্ষম হন পাইলট। এছাড়া গত ১ এপ্রিল রাজশাহীতে একটি এবং ২০১৪ সালে ৬ ফেব্রুয়ারি যশোরের বিমানবাহিনীর একটি প্রশিক্ষণ বিমান বিধ্বস্ত হয়।

প্রকাশিত : ৩০ জুন ২০১৫

৩০/০৬/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন

প্রথম পাতা



ব্রেকিং নিউজ: