রৌদ্রজ্জ্বল, তাপমাত্রা ২৩.৯ °C
 
৯ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শুক্রবার, ঢাকা, বাংলাদেশ

শব্দদূষণে অতিষ্ঠ জীবন

প্রকাশিত : ২৯ জুন ২০১৫
  • মোঃ আবু হাসান তালুকদার

মাইগ্রেনের ব্যথা ক্রমান্বয়ে বেড়েই যাচ্ছে। মিসেস শায়লা বুঝতে পারছে একটু পরে মাথায় অসহ্য যন্ত্রণা শুরু হবে। সারা বাড়ির দরজা-জানালা বন্ধ করেও শব্দ রোধ করা যাচ্ছে না। পাশের বাড়িওয়ালার ছেলের জন্মদিন, নাকি কি একটা অনুষ্ঠান। সেই উপলক্ষে তাদের ছাদের ওপর হই-হুল্লোর করে উচ্চ শব্দে গান বাজাচ্ছে। গানের তালে তালে আবার কয়েকজন উঠতি বয়সী যুবক নাচা-নাচি করছে। তাদের এই উদ্দাম নাচ-গানই মিসেস শায়লার মাথার যন্ত্রণার কারণ। পাশের বাড়ির বৃদ্ধ খালাম্মা-খালুজানের অবস্থা আরও ভয়াবহ। খালুজান তো দীর্ঘদিন ধরেই শয্যাসায়ী। কোথায় একটু আল্লাহ্ আল্লাহ্ করবে। একটু শান্তিতে ঘুমাবো। তা না, আজকালকার পোলাপানের আনন্দের অত্যাচারে অতিষ্ঠ জীবন। গত সপ্তাহে তো পুরো মহল্লাই গম গম শব্দে প্রায় সারারাত ঘুমুতে পারে নাই। প্রতিবেশী এক ভদ্রলোক কোন এক পীরের মুরিদ। তার বাসায় ওয়াজ মাহফিলের আয়োজন করেছিল। আয়োজন সামান্যই। মানুষ হয়েছে মাত্র কয়েকজন। কিন্তু, আধা বর্গকিলোমিটারজুড়ে মাইক লাগিয়েছে দশ থেকে বারটি। পীরের প্রতি ভালবাসা বাইরে না দেখালে কি চলে? মানুষ বেশি বেশি জানবে আর বেশি করে তার পীরের ভক্ত হবে। সারা রাত চলল ওয়াজ ও জিকির। মাঝে মাঝে ওয়াজ ও জিকিরের রেকর্ড বাজানো হলো। মিসেস শায়লা জানত না যে, আজকাল জিকিরেরও রেকর্ড পাওয়া যায় বা রেকর্ড করে শুনা হয়। জিকির তো আল্লাহর প্রতি গভীর ভালবাসা, যা অন্তরের অন্তঃস্থল থেকেই বের হয়। শায়লার সবচেয়ে বেশি অবাক লাগল একই সভাস্থল একই মাইক হতে জিকির আজকারের পরিবর্তে মাঝরাতের পরে যখন গান বাজানো শুরু হলো। মারফতি বা বাউল গান।

ঢাকা শহরের বা শহরতলীর যেসব এলাকায় মধ্যবিত্ত বা নিম্নবিত্ত পরিবার বাস করে সেসব এলাকায় এরকম ঘটনা তো নিত্য নৈমিত্তিক ব্যাপার। তাছাড়া প্রতিদিন সকালের ঘুম আর অলস দুপুরের আরাম হারাম করে দেয় ফেরিওয়ালার চিৎকার। পিঁপড়া-তেলাপোকার ওষুধ বিক্রেতার লাউড স্পিকারের হাঁক-ডাক। বিকেলে তো মহল্লার রাস্তাই হয়ে যায় খেলার মাঠ। বাচ্চাদের হট্টগোল। রাস্তায় বের হবেন? কারণে অকারণে গাড়িগুলো হর্ন বাজিয়ে যাচ্ছে। সামনে হয়ত ট্রাফিক সিগন্যাল কিন্তু হর্ন বাজানো থামছে না। যেন শব্দ সৃষ্টির প্রতিযোগিতা। নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে আবাসিক এলাকায় গড়ে উঠেছে লেদ, ওয়েল্ডিং, গ্রিল ওয়ার্কসপ, ছাপাখানা, ফার্নিচার কারখানা, গলির ভেতর আবাসিক এলাকার কোন এক ভবনের কয়েকটি রুম ভাড়া নিয়েই গড়ে উঠছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। আর এসব কারখানা বা প্রতিষ্ঠান প্রতিনিয়ত শব্দদূষণ করে আবাসিক এলাকার শান্ত পরিবেশ অশান্ত করছে। বড় রাস্তায় ব্লক দিয়ে মাঝেই মধ্যেই চলে রাজনৈতিক সমাবেশ বা বাৎসরিক অনুষ্ঠান। ওইসব অনুষ্ঠানে মাইকের আওয়াজে তো সরগম অবস্থা। আবাসিক এলাকার নিয়মনীতি, সুবিধা-অসুবিধার তোয়াক্কা না করে চলছে নতুন কোন ভবন নির্মাণের জন্য ইট ভাঙ্গানো মেশিন বা কংক্রিট মিক্সার মেশিন। যেদিন এই মেশিন চলে সেদিন তো ঐ এলাকার জন-জীবন শব্দদূষণে অতিষ্ঠ।

সবাই যে যার মতো করে তার কাজ করে যাচ্ছে। অন্যের কি হলো তা ভাবার সময় কোথায়? ভাবখানা এমন আমরা সবাই রাজা, আমাদের এই রাজত্বে। এই প্রসঙ্গে ইশপের একটি গল্পের কথা মনে হচ্ছেÑ যার ভাবার্থ হলো : একবার ঈশ্বর পৃথিবীতে নেমে এসে এক কৃষককে বর দিতে চাইল। বলল, তুমি যা চাইবে তাই পাবে। তবে একটি শর্ত আছে। শর্তটি হলো, তুমি যা পাবে তোমার প্রতিবেশী তার দ্বিগুণ পাবে। কৃষক ভাবনায় পড়ে গেল। সে যদি এক হাজার স্বর্ণমুদ্রা চায়, তবে তার প্রতিবেশী পাবে দুই হাজার স্বর্ণমুদ্রা। সে যদি এক শ’ একর জমি চায়, তাহলে তার প্রতিবেশী পাবে দুই শ’ একর জমি। যা চাইবে তার প্রতিবেশী না চাইতেই তার দ্বিগুণ পাবে। এটা হতে পারে না। এটা মানা যায় না। অবশেষে কৃষক অনেক ভেবেচিন্তে ঈশ্বরকে বলল তার একটি চোখ কানা করে দিতে।

আমরাও যার যার স্বার্থসিদ্ধি নিয়ে ব্যস্ত। এতে অন্যের কি হলো তাতে কি আসে যায়? প্রতিবেশীকে নিয়ে এতো ভাবার কি আছে? অন্যের ভাল না করলেও নিদেনপক্ষে আমরা যেন গল্পের কৃষকের মতো না হই। যে নিজের একটি চোখ হারিয়ে হলেও প্রতিবেশীর দুই চোখ নষ্ট করেছে। নিজের সর্বনাশ হয়েছে, তবুও প্রতিবেশীর ভাল চায় নাই।

এখন কথা হলো, এই শব্দদূষণ কি শুধুই মিসেস শায়লা বা তার প্রতিবেশী অসুস্থ বৃদ্ধের সমস্যা। না কি সবারই? আসলে সমস্যা সবার। সমস্যা ঘরে ঘরে। শব্দে সমস্যা নেই, তবে সমস্যা শব্দদূষণে। চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা বলেছেন, শব্দদূষণের ফলে উচ্চ রক্তচাপ, কানে কম শোনা বা বিকলতা, অনিদ্রা, বিরক্তিভাব, হ্রদরোগ, গর্ভধারণে জটিলতা, মাইগ্রেনসহ অন্যান্য চাপ সংশ্লিষ্ট রোগ হয়ে থাকে। এছাড়া শব্দদূষণে শিশুর স্বাভাবিক দৈহিক ও বুদ্ধি বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয় এবং কর্মজীবীদের কর্মক্ষমতা হ্রাস পায়।

আমরা তো ধরেই নেই শব্দদূষণে আর সমস্যা কি, শুধু কথাবার্তা বলায় বা শোনায় অসুবিধা ছাড়া। আমাদের শব্দদূষণ (হড়রংব ঢ়ড়ষষঁঃরড়হ) ও এর প্রতিক্রিয়া বিষয়ে সচেতন হতে হবে। আমাদের অবশ্যই শব্দদূষণ পরিহার করতে হবে। সুন্দরবনের পাশ দিয়ে বা ভেতর দিয়ে প্রবাহিত জলপথে জাহাজের সাইরেনের শব্দে বনের প্রাণিকুল ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এজন্য পরিবেশ বিজ্ঞানীরা বা পরিবেশ রক্ষা কমিটি আন্দোলন করে যাচ্ছে যাতে সুন্দরবনের ভেতর বিকট শব্দে জাহাজ না চলে। বন্যপ্রাণিকুলের কোন ক্ষতি না হয়। নিঃসন্দেহে এটা প্রশংসনীয়। কিন্তু আশরাফুল মাখলুকাত মানুষ রক্ষায় আমরা কতটুকু সোচ্চার হয়েছি?

প্রকাশিত : ২৯ জুন ২০১৫

২৯/০৬/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: