কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৪ ডিসেম্বর ২০১৬, ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, রবিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ

ক্রিকেট ব্যাটে ঘুরছে অর্থনীতির চাকা

প্রকাশিত : ২৮ জুন ২০১৫
  • এসএম মুকুল

কী গ্রাম কী শহর, অলি-গলি, খোলা মাঠ-ময়দানে অথবা রাজপথে তরুণ, শিশু-কিশোরেরা দলবেঁধে মত্ত থাকে ক্রিকেট খেলায়। ক্রিকেট এখন শুধু খেলাই নয়, আমাদের অর্থনীতির সঙ্গেও সম্পৃক্ত হয়ে গেছে। ক্রিকেট কিভাবে অর্থনীতির চাকায় গতি নিয়ে এসেছে তা একটি গল্প দিয়েই শুরু করা যাক।

নাম নিলুফার ইয়াসমিন। তিনি একজন গৃহিণী। দেশের দক্ষিণাঞ্চলের পিরোজপুর জেলার নাসিরাবাদ উপজেলার বিন্না গ্রামের বাসিন্দা। ঢাকার জুড়াইনে ক্রীড়াসামগ্রী বিক্রেতা স্বামীর উপার্জনে সংসার চালানো খুবই কষ্ট হতো তার। টানাপড়েনের জীবন সংসারে ভবিষ্যতের অনিশ্চিত যাত্রা ভাবিয়ে তুলল তাকে। সিদ্ধান্ত নিলেন কিছু একটা করতেই হবে। ব্যাস, যা চিন্তা তাই কাজ। শুরু করলেন ক্রিকেট ব্যাট তৈরি। সেই সঙ্গে শুরু হলো দারিদ্র্য মুক্তির সংগ্রাম। উদ্যোগ গ্রহণের পর তাকে আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি। বিন্না গ্রামে নিলুফারের কারখানায় এখন অনেক শ্রমিক কাজ করছেন। একজন গ্রামীণ মহিলার সৃজনশীল উদ্যোগ বৈপ্লবিক পটপরিবর্তনের শুভ সূচনা করল। মাসে এখন হাজার হাজার ব্যাট তৈরি হচ্ছে তার কারখানায়। নিলুফারের সাফল্য দেখে তাকে মডেল হিসেবে ধরে নিয়ে এ গ্রামেই গড়ে উঠেছে ছোট-বড় আরও প্রতিষ্ঠান। স্বপ্ন সাফল্যের পথযাত্রী নিলুফার ইয়াসমিন কানাডার পূর্ব উপকূলে আটলান্টিক তীরবর্তী বরফ ঢাকা শহর হ্যালিফ্যাক্স থেকে সিটি গ্রুপ ফাউন্ডেশন আয়োজিত শ্রেষ্ঠ সৃজনশীল উদ্যোক্তা পুরস্কার-২০০৬ হিসেবে ৪ হাজার মার্কিন ডলার অর্জন করেন।

নেসারাবাদ উপজেলা সদর থেকে ৫-৬ কিলোমিটার উত্তর পশ্চিমে বেলুয়া নদীর পূর্বপাড়ে বিন্না গ্রামের অবস্থান। এমন অজপাড়া গাঁয়ে ক্রিকেট ব্যাট তৈরির কারখানা থেকে সারাদেশে ব্যাট সরবরাহ করা হচ্ছে, ভাবতেই অবাক লাগে। ক্রিকেট খেলা জনপ্রিয় হয়ে উঠায় ক্রিকেট ব্যাটের চাহিদা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। উপজেলার গগন, উড়িবুনিয়া, জিলবাড়ি, বিন্না, চামীসহ বিভিন্ন গ্রামে গড়ে উঠেছে প্রায় দেড় শতাধিক ক্রিকেট ব্যাট তৈরির কারখানা। এ শিল্পের সঙ্গে প্রায় ৫ হাজার লোকের জীবন-জীবিকা জড়িত। এসব কারখানায় শ্রমিক হিসেবে কাজ করছে কিশোর, তরুণ ও বাড়ির মহিলারা। প্রায় সব পরিবারের অধিকাংশই এটিকে পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছেন। এখানে ব্যাটের কারখানা প্রসারের কারণ হলো প্রচুর গাছগাছালি, কাঠের সহজলভ্যতা এবং সস্তা শ্রম। তবে ব্যবস্থাপনার অভাবে সুন্দরভাবে বিকশিত হচ্ছে না সম্ভাবনার শিল্পটি। এ শিল্পের সরকারী পৃষ্ঠপোষকতা পেলে এ খান থেকেই তৈরি হবে বিশ্বমানের ক্রিকেট ব্যাট। ক্রিকেট ব্যাট তৈরির আরেক গ্রাম যশোরের নরেন্দ্রপুর। গ্রামটি মিস্ত্রিপাড়া নামেও পরিচিত। এই গ্রামের ব্যাট তৈরির গুরু সঞ্জিত মজুমদার। তার চেষ্টাতেই এই গ্রামে ব্যাট তৈরির কাজ শুরু হয়। গ্রামের অর্ধশতাধিক কারখানায় হাজার হাজার ব্যাট তৈরি হয় এখানে। সেই ব্যাট পাঠানো হয় দেশের বিভিন্ন স্থানে। ব্যাট তৈরির কারখানায় ছয় শতাধিক নারী-পরুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। মিস্ত্রিপাড়ার একেকটা ঘর যেন একেকটা ক্রিকেট ব্যাট তৈরির কারখানা। পুরুষরা ব্যাট তৈরি করেন। রঙের ও স্টিকার লাগানোর কাজ করেন মহিলারা। প্রতিটি কারখানায় মাসে তিন হাজার থেকে পাঁচ হাজার ব্যাট তৈরি হয়। এসব ব্যাট পাইকারি বিক্রি হয় ৫০ থেকে ২২০ টাকায়। এখান থেকে প্রতি শীত মৌসুমে সারাদেশে তারা যোগান দেন লাখের ওপর ক্রিকেট ব্যাট।

এখানকার বড় সমস্যা বিদ্যুত। বিদ্যুত থাকলে যন্ত্র বসিয়ে কাজ করা যেত। চলাচলের জন্য গ্রামে এখনও ভাল রাস্তা নেই। উৎপাদকরা পাচ্ছেন না ন্যায্য মূল্য। সিজনে শীতকালে মিস্ত্রিরা কাজ করেন দিনরাত। অফ সিজনে স্বাভাবিক বাজার ধরে রাখতে কাজ করেন। পরবর্তী সিজনের জন্য প্রয়োজনীয় কাঠ সাইজ করে প্রস্তুতি রাখেন। ব্যাট করিগরদের অভিমত, সরকারী সহযোগিতা, বিদ্যুৎ সমস্যা, রাস্তার সমস্যা, বাজারজাত সমস্যা না থাকলে এটি একটি বড় শিল্পে পরিণত হতে পারে। আসতে পারে দেশের জন্য সুনাম ও অর্থ।

প্রকাশিত : ২৮ জুন ২০১৫

২৮/০৬/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: