কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৫ ডিসেম্বর ২০১৬, ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, সোমবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

চট্টগ্রাম বন্দরের এনসিটি অবশেষে চালু হচ্ছে

প্রকাশিত : ২৭ জুন ২০১৫
  • কাজ পেয়েছে সাইফ পাওয়ার টেক ॥ বেসরকারী খাতে দেয়ায় চট্টগ্রামে ১৪ দল ক্ষুব্ধ

স্টাফ রিপোর্টার, চট্টগ্রাম অফিস ॥ অবশেষে প্রায় সাত বছরের দীর্ঘসূত্রতার অবসান ঘটিয়ে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ এনসিটির (নিউমুরিং কন্টেনার টার্মিনাল) দুটি বার্থ পরিচালনার জন্য সাইফ পাওয়ার টেকের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। বৃহস্পতিবার দুপুরে বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার এ্যাডমিরাল নিজামউদ্দিন আহমেদ ও সাইফ পাওয়ার টেক লিমিটেডের কর্ণধার তরফদার রুহুল আমীনের মধ্যে এই চুক্তি স্বাক্ষর হয়। উল্লেখ্য, প্রায় ৭শ’ কোটি টাকা ব্যয়ে এনসিটির নির্মাণ কাজ সম্পন্ন হলেও গত সাত বছর ধরে এটি পরিচালনার দায়িত্ব কাদের দেয়া হবে এবং কিভাবে, তা জটিলতার মধ্যে আটকা ছিল। এনসিটির আরও দুটি বার্থ রয়েছে। এগুলোর জন্যও ইতোমধ্যে দরপত্র গ্রহণ করা হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, এ দুটি বার্থ পরিচালনার দায়িত্বও পেয়ে যাবে সাইফ পাওয়ার টেক। কেননা, কন্টেনার টার্মিনাল পরিচালনার ক্ষেত্রে অভিজ্ঞতাসহ যেসব শর্ত ছিল তা সাইফ পাওয়ার টেক ছাড়া অন্য কোন বার্থ অপারেটরের নেই। সঙ্গত কারণে নানাভাবে আলোচিত সাইফ পাওয়ার টেক লিমিটেড চট্টগ্রাম বন্দরের এনসিটির চার বার্থ পরিচালনার দায়িত্ব পাওয়ার একচেটিয়া সুযোগ পাওয়ার পথ সুগম হলো। এনসিটি পরিচালনা নিয়ে দরপত্র আহ্বানের ক্ষেত্রে যেসব শর্ত দেয়া হয়েছিল তা নিয়ে বিভিন্ন বার্থ অপারেটর ও আগ্রহী টেন্ডারদাতাদের ব্যাপক আপত্তি ছিল। কেননা, এক এগারো সরকার আমল থেকে এ সাইফ পাওয়ার টেকই চট্টগ্রাম বন্দরে এককভাবে কন্টেনার হ্যান্ডলিংয়ের দায়িত্ব পেয়ে তা অদ্যাবধি করে আসছে। সঙ্গত কারণে দরপত্রে জুড়ে দেয়া শর্ত অনুযায়ী সাইফ পাওয়ার টেকই এ দরপত্রে অংশগ্রহণ ও কাজ পাওয়ার ক্ষেত্রে অগ্রণী ছিল। অন্যরা এর ধারে-কাছেও নেই এবং থাকার কথাও নয়।

বুধবার দুপুরে চুক্তি স্বাক্ষরের পর সাইফ পাওয়ার টেকের কর্ণধার তরফদার রুহুল আমিন জনকণ্ঠকে জানান, চুক্তি স্বাক্ষর হয়েছে। এনসিটির ৪ ও ৫ নম্বর বার্থ কাজ সহসা শুরু করা হবে। নানা মহলের আপত্তির প্রেক্ষিতে তিনি জানান, বন্দরের আহ্বান করা টেন্ডারে দরপত্র দাখিল করে যোগ্যতার ভিত্তিতেই কাজ পেয়েছে তার প্রতিষ্ঠান। উল্লেখ্য, এনসিটির দরপত্র মূল্যায়নে যোগ্য বিবেচিত হওয়ার পর মন্ত্রণালয় থেকে অনুমোদন আসার পর এ চুক্তি স্বাক্ষর হয়। বৃহস্পতিবার বন্দর কর্তৃপক্ষের সঙ্গে এ ব্যাপারে চুক্তি স্বাক্ষরিত হলে বন্দর এনসিটিতে অপারেটর নিয়োগে সকল জল্পনা-কল্পনার অবসান হয়। এদিকে, এনসিটি পরিচালনার দায়িত্বভার বন্দর কর্তৃপক্ষের ওপর ন্যস্ত করার দাবি জানিয়েছে চট্টগ্রাম ১৪ দল। এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত এক সভা থেকে এ সরকারের প্রতি এ আহ্বান জানানো হয়। উল্লেখ্য, আলোচিত সাইফ পাওয়ার টেকের ব্যাপারে বন্দর ব্যবহারকারী বিভিন্ন মহল, বার্থ অপারেটরসহ সরকারী দল সমর্থিত অনেক নেতৃবৃন্দের আপত্তি রয়েছে। কারণ, এক এগার সরকার আমলে সাইফ পাওয়ার টেক বন্দরে কন্টেনার হ্যান্ডলিংয়ের যে কাজ পায় তা বৈধ প্রক্রিয়ায় হয়নি। এ নিয়ে গেল বছর সাইফ পাওয়ারকে বন্দর থেকে হটানোর জন্য ব্যাপক আন্দোলন চলে। কিন্তু এরপরও সাইফ পাওয়ার টেককে এনসিটি পরিচালনায় যে দরপত্র আহ্বান করা হয় তাতে অংশগ্রহণের সুযোগ করে দেয়া নিয়ে বন্দর ব্যবহারকারীদের ব্যাপক আপত্তি রয়েছে। এ অবস্থায় সাইফ পাওয়ার টেক জয়েন্টভেঞ্চারে বার্থ অপারেটিংয়ের কাজ চালানোর পথ খুঁজে নেয়।

এ নিয়ে নানা বিতর্ক থাকলেও শেষ পর্যন্ত এনসিটিতে অপারেটর নিয়োগ আলোর মুখ দেখতে পাওয়ায় ব্যবসায়ী মহলের অনেকেই সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। তবে প্রকাশ্য বিরোধিতা না থাকলেও অনেকের মধ্যেই অসন্তোষ ও ক্ষোভ রয়েছে।

এনসিটির এই দুই বার্থে সাইফ পাওয়ার টেকের সঙ্গে যৌথভাবে রয়েছে চট্টগ্রাম সিটি মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দিনের মালিকানার প্রতিষ্ঠান মেসার্স এমএইচ চৌধুরী এবং নোয়াখালীর আওয়ামী লীগ দলীয় এমপি একরামুল করিম চৌধুরীর মালিকানার মেসার্স এ এ্যান্ড জে ট্রেডার্স। এ তিন প্রতিষ্ঠান যৌথভাবে একটি দরপত্র দাখিল করে। টেকনিক্যাল অফার মূল্যায়নে টেন্ডারের শর্ত অন্য কোন প্রতিষ্ঠান পূরণ করতে ব্যর্থ হওয়ায় সাইফ পাওয়ার টেকই শেষ পর্যন্ত যোগ্য বিবেচিত হয়। মূল্যায়ন কমিটির প্রতিবেদন মন্ত্রণালয়ে প্রেরণের পর গত বুধবার তা অনুমোদিত হয়। আর বৃহস্পতিবার স্বাক্ষরিত হয় চুক্তি। উল্লেখ্য, চারটি বার্থে অপারেটর নিয়োগের জন্য দরপত্র আহ্বান করা হয় গত ৪ মে। তন্মধ্যে ৪ ও ৫ নং বার্থের জন্য ৯ জুন এবং ২ ও ৩ নম্বর বার্থের জন্য ১০ জুন দরপত্র গ্রহণ করা হয়।

বন্দর সূত্রে জানা যায়, সাইফ পাওয়ার টেক লিমিটেড এই দুই বার্থের জন্য ৪৯ কোটি ৬৪ লাখ টাকা দর প্রদান করে। এর জন্য প্রাক্কলিত দর ছিল ৪২ কোটি টাকার। টেন্ডারে প্রদান করা দর প্রাক্কলিত দরের চেয়ে কিছু বেশি হলেও অন্য প্রতিদ্বন্দ্বী না থাকায় এই দরপত্রটিই যোগ্য হিসেবে মূল্যায়িত হয়। তবে এ নিয়ে ক্ষোভ রয়েছে অন্য বার্থ অপারেটরদের মধ্যে। তাদের অভিযোগ, পরিকল্পিতভাবে টেন্ডারে শর্ত আরোপ করে পছন্দের প্রতিষ্ঠানকে কাজ পাইয়ে দেয়া হয়েছে। বার্থ অপারেটর নিয়োগের জন্য চাওয়া হয়েছে টার্মিনাল অপারেটরের অভিজ্ঞতা। এর কোন প্রয়োজনই ছিল না। বিশেষ কৌশলের আশ্রয় নিয়ে অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রতিযোগিতার বাইরে রাখা হয়েছে।

এদিকে, শত সমালোচনা সত্ত্বেও শেষ পর্যন্ত এনসিটিতে অপারেটর নিয়োগ চূড়ান্ত হওয়ায় সন্তোষ প্রকাশ করেছে চিটাগাং চেম্বার, বিজিএমইএসহ ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো। আমদানি-রফতানির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এ প্রতিষ্ঠানগুলো নেতৃবৃন্দ বলেন, নানা জটিলতায় অপারেটর নিয়োগ হচ্ছিল না বন্দরের ৭শ’ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এনসিটিতে। এ টার্মিনালের বার্ষিক কন্টেনার হ্যান্ডলিং ক্ষমতা ১৫ লাখ টিইইউএস। টার্মিনালটি চালু হলে চট্টগ্রাম বন্দরের উৎপাদনশীলতা আরও বৃদ্ধি পাবে। এনসিটির বাকি দুই বার্থেও অতি শীঘ্রই অপারেটর নিয়োগ হবে বলে তারা আশা প্রকাশ করেন।

চট্টগ্রাম ১৪ দল ক্ষুব্ধ ॥ চট্টগ্রাম বন্দরের এনসিটি পরিচালনার দায়িত্ব বন্দর কর্তৃপক্ষের ওপর না রেখে প্রাইভেট ছেড়ে দেয়ার ঘটনায় চট্টগ্রাম চৌদ্দ দলের পক্ষ থেকে ক্ষোভ প্রকাশ করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার চৌদ্দ দলের এক বৈঠক নগর আওয়ামী লীগসভাপতি ও ১৪ দলীয় নেতা সাবেক মেয়র এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরীর বাস ভবনে অনুষ্ঠিত হয়। চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কন্টেনার টার্মিনালের (এনসিটি) পরিচালনার দায়িত্ব বন্দর কর্তৃপক্ষের ওপর ন্যস্ত করার দাবি জানানো হয়।

১৪ দলের এ সভায় সভাপতিত্ব করেন এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরী। এতে উপস্থিত ছিলেন জাসদ কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ও চট্টগ্রাম মহানগর জাসদের সাধারণ সম্পাদক জসিম উদ্দিন বাবুল, ন্যাপ সাধারণ সম্পাদক আলী আহমদ নাজির, জেলা ওয়াকার্স পার্টির সভাপতি এ্যাডভোকেট আবু হানিফ, সম্পাদক শামসুদ্দিন খালেদ সেলিম, ন্যাপ নেতা জিএম আলমগীর, সাম্যবাদী দলের জেলা সম্পাদক অমূল্য বড়ুয়া ও গণ আজাদী লীগের মাওলানা নজরুল ইসলাম আশরাফী। বক্তারা এনসিটি পরিচালনার দায়িত্ব বিশেষ কোন গোষ্ঠীর কাছে না দিয়ে এ দায়িত্ব বন্দর কর্তৃপক্ষের ওপর ন্যস্ত করতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানান। এছাড়া চট্টগ্রাম নগরীর অসহনীয় যানজট নিরসনের জন্য যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানানো হয়। ১৪ দল নেতৃবৃন্দ জলাবদ্ধতা নিরসনের জন্য মহেশখালের ওপর অবিলম্বে স্লুইসগেট নির্মাণের দাবিও জানান।

প্রকাশিত : ২৭ জুন ২০১৫

২৭/০৬/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন

অর্থ বাণিজ্য



ব্রেকিং নিউজ: