আংশিক মেঘলা, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৬ ডিসেম্বর ২০১৬, ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, মঙ্গলবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

প্রকৃতিনির্ভর জীবনধারা মানতা সম্প্রদায়ের

প্রকাশিত : ২৭ জুন ২০১৫

প্রকৃতিকে নির্ভর করে কয়েক শ’ বছর ধরে বৈচিত্র্যপূর্ণ জীবন যাপন করে আসছে দেশের অন্যতম জনগোষ্ঠী মানতা সম্প্রদায়ের মানুষ। বেদে সম্প্রদায়ের মতোই অনেকটা জীবনধারা। তবে পরিবর্তন আছে পেশায়। বেদেরা সাপ ধরে। খেলা দেখায়। তাবিজ-কবজ বিক্রি করে। বাঁদর নাচ দেখায়। আর মানতা সম্প্রদায়ের মানুষের পেশা পুরোপুরি নদী-সাগরে মাছ ধরা। ইদানীং কিছু ব্যতিক্রম বাদ দিলে সম্প্রদায়টির অধিকাংশের মূল ভূমিতে ঘর নেই। বাড়ি নেই। দিন মাস বছর কাটে নৌকায়। ছইয়ের নিচে কাটে জীবন। জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত আবর্তিত হয় নৌকা ঘিরে। আজ এ ঘাটে। কাল অন্য ঘাটে। এবেলা এ নদী, তো কাল অন্য কোন নদী। জোয়ার-ভাটায় চলে নৌকা। ছোট্ট সে নৌকা। তার ভিতরেই সন্তানাদি থেকে শুরু করে সকলকে নিয়ে দিনযাপনের সংসার। মূলভূমির মানুষের সঙ্গে খুব একটা যোগাযোগ নেই। মূলভূমির মানুষের কাছে জনগোষ্ঠীটি মানতা, বেবাইজ্জা, নাইয়া, বইড়ালসহ নানা নামে পরিচিত। তবে মানতা শব্দটিই বেশি প্রচলিত। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সম্প্রদায় শব্দটি। নিজেদের বেদে হিসেবে মানতে রাজি নন। তারপরেও জীবনের অনেক কিছুতেই বেদেদের জীবনযাত্রার ছাপ আছে। বেদে সম্প্রদায়ের মতো তাদেরও আছে সরদার প্রথা। সরদার নির্বাচন করা হয় বংশানুক্রমে। নৌকা চলে বহর বেঁধে। প্রতিটি বহরে আছে একজন সরদার। তার আদেশ-নির্দেশেই চলে বহর। ১০/১৫টি নৌকা নিয়ে বহর করা হয়। কোন কোন বহরে কমবেশি নৌকা থাকে। বিচার সালিশ সব করে সরদার। বিয়ে শাদিতেও সরদারের ভূমিকা মুখ্য। বেদেদের মতো মানতাদের মধ্যে আছে কয়েকটি গোত্র। যেমন গাউছা এবং লাউয়া। গাউছারা নিজেদের কিছুটা অভিজাত শ্রেণীর মনে করে। লাউয়াদের মধ্যে ‘আট গ্রাম’ ও ‘বাইশ গ্রাম’ নামে দুটি উপগোত্র রয়েছে। বিয়ে শাদি নিজেদের মধ্যেই হয়। তবে বেদেদের সঙ্গে বিয়েতে কারও আপত্তি নেই। বেদেদের একটি অংশ যেমন মনসাসহ বিভিন্ন দেবদেবির পূজা করে। তেমনি মুসলমান হিসেবে দাবি করলেও মানতাদের একটি অংশ মনসা, শিতলাসহ বিভিন্ন পূজা করে থাকে। নতুন নৌকা নদীতে ভাসানোর আগে করে গঙ্গা পূজা। আশ্বিনের পূর্ণিমায় করে লক্ষ্মীপূজা। চৈত্র মাসে করে শিতলা দেবির পূজা। বিয়ের অনুষ্ঠানে নদীর তীরে তারা বসায় গানের আসর। বিয়ের গান মানেই তাদের কাছে ‘হয়লা’। গানের আসরে নারীরাই মধ্যমণি। এক নৌকা থেকে আরেক নৌকায় বর-কনেকে পাঠিয়ে সাঙ্গ হয় বিয়ে। বিয়েতে আছে পণপ্রথা। আর পণ মানেই আস্ত একখানা নৌকা। সঙ্গে সংসারের কিছু মালামাল। ঈদ কোরবানি কিংবা যে কোন অনুষ্ঠানে বহরের সব নৌকা থেকে সরদারের নৌকায় পাঠানো হয় বিশেষ রান্নাবান্না এবং সামর্থ্যভেদে পোশাক আশাক। সম্প্রদায়টির মধ্যে একাধিক বিয়ের প্রচলন প্রায় নেই বললেই চলে। স্বামী-স্ত্রীর ঝগড়া নৌকার গলুইয়ে সীমাবদ্ধ থাকে। বাইরে খুব একটা আসে না। নারীদের দেয়া হয় বিশেষ সম্মান। যে কারণে তালাক প্রথা প্রায় নেই। ছেলে সন্তান কিংবা মেয়ে সন্তানে নেই হা হুতাশ। সম্পত্তির অধিকার সবার সমান। যদিও সম্পত্তি বলতে শুধুই নৌকা। সম্প্রদায়টির রয়েছে নিজস্ব ভাষা। যা নিজেদের মধ্যে ব্যবহৃত হয়।

Ñশংকর লাল দাশ, গলাচিপা থেকে

প্রকাশিত : ২৭ জুন ২০১৫

২৭/০৬/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: