কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৩ ডিসেম্বর ২০১৬, ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শনিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

হাওড় ॥ জলে ভাসা জনপদ

প্রকাশিত : ২৭ জুন ২০১৫
  • বর্ষায় নাও হেমন্তে পাও

মাটির ওপর জলের বসতি/জলের ওপর ঢেউ/ঢেউয়ের সাথে পবনের পিরিতি/নগরে জানে না কেউ...।

হাওড়। দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের অফুরন্ত সম্ভাবনাময় অথচ বিপন্ন এক জনপদ। বর্ষায় এ জনপদকে মনে হয় কূলহীন সাগর। এ সময় হাওড়ের বুকজুড়ে থাকে জল আর জল। আর শুকনা মৌসুমে হাওড় হয়ে ওঠে দিগন্তবিস্তৃত সবুজ প্রান্তর। হাওড়ের ভূপ্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য একটু আলাদা। ব্যতিক্রম এখানকার ঋতুবৈচিত্র্য। বন্যা, খরা, আফাল, ঢেউসহ নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগের সঙ্গে নিরন্তর সংগ্রাম করতে হয় এ জনপদের মানুষদের।

কথিত আছে, বৃহত্তর সিলেট ও বৃহত্তর ময়মনসিংহের একটি বড় অংশ এক সময় ‘কালীদহ সাগর’ (মতান্তরে লৌহিত সাগর) নামে বিশাল জলরাশিতে নিমজ্জিত ছিল। পরবর্তীতে ভূপ্রাকৃতিক বিবর্তনের ফলে তা পিরিচ আকৃতির নিম্ন সমতলভূমিতে পরিণত হয়, যা পরিচিত হয় হাওড় নামে। তাই বলা যায়, বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের পিরিচ আকৃতির বৃহৎ ভূগাঠনিক অবনমনটির নামই হাওড়। ধারণা করা হয়, ‘হাওড়’ শব্দটি ‘সাগর’ শব্দেরই বিকৃত রূপ। ‘ভাটি অঞ্চল’ নামেও এর আরেকটি পরিচিতি আছে। প্রসঙ্গত, দেশের সাতটি জেলার ৫২টি উপজেলা নিয়ে বিশাল এ হাওড় এলাকা গঠিত। জেলাগুলো হলোÑ নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ, সুনামগঞ্জ, সিলেট, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া। ছোট-বড় ৪২১টি হাওড় রয়েছে এসব জেলায়।

মানব বসতির সূচনা ॥ কবে কোন অমানিশার অন্ধকার থেকে বেরিয়ে প্রথম আলোর মুখ দেখেছিল এই হাওড়াঞ্চল? এর উত্তর নিশ্চিত করে বলা কঠিন। ঐতিহাসিকদের মতে, লৌহিত সাগর থেকে নিম্ন সমভূমিতে (প্লাবন সমভূমি) পরিণত হওয়ার পরও বহু বছর বিরান পড়েছিল হাওড় এলাকা। এরপর পলিমাটিবিধৌত এ উর্বর ভূমিতে প্রথম বসতি স্থাপন করে অস্ট্রো-মঙ্গোলিয়ান জাতিগোষ্ঠীর কোচ, হাজং, গারো ও খাসিয়া উপজাতি। তারাই এসে প্রথম বাস্তুভিটা নির্মাণ করে এবং শুরু করে চাষাবাদ ও মাছ ধরার পেশা। এরপর এক সময় অঞ্চলটি কামরূপ রাজ্যের অধীনে চলে যায়। ততদিনে প্রচার হয়ে যায় এ উর্বর ভূমির কথা। তাই সহজে এ ভূসম্পত্তির মালিকানা পেতে উপজাতিদের পাশাপাশি অন্যান্য সম্প্রদায়ের লোকজনও ছুটে আসে। আর এভাবেই হাওড় জনপদে গড়ে ওঠে বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মিশ্র মেলবন্ধন, যাদের উত্তরসূরিদের নিয়ে হাওড় অঞ্চল এখনও মাথা নুয়ে শুয়ে আছে হিজল-করচের ছায়ায়।

বর্ষায় নাও, হেমন্তে পাও ॥ বাংলাদেশ ষড়ঋতুর দেশ। কিন্তু হাওড়ে ঋতু মাত্র দুটি। একটি বর্ষা, অন্যটি হেমন্ত। বছরের প্রায় পাঁচ-ছয় মাস এখানে বর্ষা থাকে। বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ থেকে শুরু হয়ে বর্ষা শেষ হয় আশ্বিন-কার্তিকে। এ সময় হাওড় সাগরের রূপ ফিরে পায়। জলবন্দী হয়ে পড়ে প্রতিটি গ্রাম, এমনকি প্রতিটি বাড়ি। তখন এক গ্রাম থেকে আরেক গ্রামে তো অবশ্যই, এক বাড়ি থেকে আরেক বাড়িতে যেতেও নৌকা লাগে। কিন্তু বর্ষা বিদায় নিয়ে হেমন্ত এলেই ঘটে বিপত্তি। কারণ হাওড়ের অনেক এলাকায় এখনও রাস্তাঘাট নির্মাণ হয়নি। এ সময় এক স্থান থেকে আরেক স্থানে যেতে ভরসা করতে হয় ‘দুই পা’-এর ওপর। আর এ বাস্তবতার কারণেই হাওড়ের যোগাযোগ ব্যবস্থাকে ব্যঙ্গ করে বলা হয়Ñ ‘বর্ষায় নাও, হেমন্তে পাও’। তেমনি আরেকটি ছড়া- ‘যেখানে চলে না রিক্সা গাড়িÑ তার নাম খালিয়াজুরি’। এটি হাওড়ের উপজেলা খালিয়াজুরির যোগাযোগ ব্যবস্থার ওপর প্রচলিত একটি ব্যঙ্গ ছড়া। এটি শুনে কারও বুঝতে বাকি থাকে না, হাওড়ের যাতায়াত ব্যবস্থা আজও কত সেকেলে। ‘পথিক’ শব্দটিকে যথার্থই স্বার্থক করে তুলেছেন হাওড়ের বাসিন্দারা।

হাওড়ের জল আতঙ্ক ॥ হাওড়ের লোকজন প্রতি বছর ‘জল আতঙ্কে’ ভোগে। বর্ষায় গোটা এলাকা গভীর অন্তর্দেশীয় সমুদ্রে পরিণত হয়। গ্রামগুলো হয়ে ওঠে একেকটি বিচ্ছিন্ন দ্বীপ। প্রতিটি গ্রাম কচুরিপানার মতো পানিতে ভাসে। ঘরের সামনেই থাকে পানি আর পানি। এ সময় হাওড়ের প্রকৃতি হয়ে ওঠে ভয়াবহ উন্মাতাল। সামান্য বাতাসেই হাওড়ের পানিতে প্রচ- ঢেউ ওঠে। রাতে কান পাতলেই শোনা যায় ঢেউয়ের ছলাত ছলাত গর্জন। বিশাল বড় বড় ঢেউ এসে আছড়ে পড়ে গ্রামগুলোর ওপর। আঞ্চলিক ভাষায় এ ধরনের দুর্যোগকে বলা হয় ‘আফাল’। গত এক শতাব্দীতে আফালের তা-বে অসংখ্য গ্রাম ও বসতবাড়ি হাওড়গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। তাই এ তা-ব থেকে ঘরবাড়ি রক্ষার জন্য রীতিমতো লড়াই করতে হয় স্থানীয় বাসিন্দাদের। প্রতি বছর মাটি কেটে বাড়ির ভিটা উঁচু করতে হয়। বর্ষায় ভাঙ্গন প্রতিরোধে বাঁশ-কাঠ-চাইল্ল্যা (জলজ বন) দিয়ে বাড়ির চারপাশে নির্মাণ করতে হয় শক্ত বাঁধ। আবার ঢেউয়ের গ্রাস তীব্র হলে এসব বাঁধেও কাজ হয় না। চোখের সামনেই ভেসে যায় ঘরবাড়ি, সহায়-সম্পদ। তাই হাওড়বাসীর আনন্দ-বেদনার সঙ্গে অনেকখানি জড়িয়ে আছে সর্বনাশা এ ‘আফাল’। অন্যদিকে বন্যাও এ অঞ্চলের প্রায় নিত্যসঙ্গী। হাওড়ে দু’ধরনের বন্যা হয়। একটি অকাল (আগাম) বন্যা, অন্যটি বর্ষাকালীন বন্যা। চৈত্র-বৈশাখের অকাল বন্যায় হাওড়ের মানুষদের বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন বোরো ফসল পানিতে তলিয়ে যায়।

জীবন ও জীবিকার সঙ্কট ॥ হাওড়ের মানুষের জীবন-জীবিকা নিদারূণ দুর্বিষহ। এ অঞ্চলের প্রধান পেশা কৃষি। কিন্তু সারাবছর কৃষিকাজ থাকে না। কারণ, একমাত্র বোরো ধান ছাড়া হাওড়ে আর কোন ফসল হয় না। অগ্রহায়ণ-পৌষ মাসে বোরো চাষাবাদ শুরু হয়। আর তা ঘরে ওঠে চৈত্র-বৈশাখে। ধান ঘরে তোলার পর বেকার হয়ে পড়েন হাজার হাজার কৃষক ও কৃষি শ্রমিক। তখন অলস সময় পার করা ছাড়া আর কোন গত্যন্তর থাকে না তাদের। আরেক শ্রেণীর শ্রমিক আছে, যারা মাছ ধরে জীবিকা চালায়। বর্ষার পাঁচ-ছয় মাস তারা হাওড়ে মাছ ধরার সুযোগ পায়। কিন্তু বর্ষা বিদায় নিলে তারাও বেকার হয়ে পড়ে।

জোর যার জলা তার ॥ কথায় আছে ‘জাল যারÑ জলা তার’। কিন্তু হাওড়ে বাস্তবায়িত হয় এর উল্টো রীতি। এখানে জোর যার জলাও তার। সাত জেলার হাওড়াঞ্চলে অন্তত দু’শতাধিক বড় জলমহাল রয়েছে। ছোট জলমহাল আছে তিন সহস্রাধিক। এসব জলমহাল থেকে প্রতি বছর কোটি কোটি টাকার মাছ আহরণ করা হয়। সরকারী নীতি অনুযায়ী জলমহালগুলো ভোগ-দখলের অধিকার প্রকৃত মৎস্যজীবীদের। কিন্তু বাস্তবে সেগুলো ইজারা পায় সরকারী দলের প্রভাবশালী ওয়াটার লর্ডরা। তাদের দাপটে প্রকৃত মৎস্যজীবীরা জলমহালে তো দূরের কথা, এর আশপাশেও যেতে পারে না।

বিপন্ন পরিবেশ ॥ বিল-ডোবা, নদী-নালা এগুলো ছিল হাওড়ের প্রাণ। অপরিকল্পিত উন্নয়ন, যত্রতত্র বাঁধ ও সøুইসগেট নির্মাণ এবং খননের অভাবে হাওড়ের প্রাকৃতিক জলাধারগুলো হারিয়ে যাচ্ছে। আর এসব কারণে ধ্বংস হচ্ছে হাওড়ের জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশ। সেচনির্ভর হয়ে পড়েছে কৃষি ব্যবস্থা।

প্রশাসনিক ব্যবস্থা ও স্বাস্থ্যের বেহাল চিত্র ॥ কণ্টকাকীর্ণ না হলেও হাওড় মানেই এক দুর্গম জনপদ। আধুনিক নগর সভ্যতার অনেক অনুষঙ্গ আজও হাওড়ের দুর্গম পথ পাড়ি দিতে পারেনি। এসব কারণে সরকারী চাকরিজীবীদের কাছে এলাকাটি ‘পানিশমেন্ট জোন’ হিসেবে পরিচিত। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অনেকে সেখানে থাকতে চায় না। থাকলেও পালা করে থাকে। অনেকে মাসের শেষে শুধু বেতন আনতে যায়। অনুন্নত যোগাযোগ, দরিদ্রতা, প্রাতিষ্ঠানিক সেবার সীমাবদ্ধতাসহ নানা কারণে এখানকার স্বাস্থ্য-শিক্ষার অবস্থা করুণ। প্রয়োজন সত্ত্বেও হাওড়ের বহু গ্রামে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নেই। দুর্গম যোগাযোগের কারণে হাওড়ের গহীন গ্রামের কোন মা মৃত্যু যন্ত্রণায় কাতরালেও অনেক সময় হাসপাতালে নেয়া সম্ভব হয় না। জরুরী ও জটিল রোগীরা অনেক সময় রাস্তাতেই মারা যায়। হাওড় এলাকার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে ডাক্তারের পর্যাপ্ত পদ থাকলেও বাস্তবে হাসপাতালগুলো চলে মাত্র দু-তিনজন ডাক্তার দিয়ে।

Ñসঞ্জয় সরকার, নেত্রকোনা থেকে

প্রকাশিত : ২৭ জুন ২০১৫

২৭/০৬/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: