রৌদ্রজ্জ্বল, তাপমাত্রা ২৩.৯ °C
 
৮ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, বৃহস্পতিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

বাংলাদেশে রোবট নিয়ে গবেষণা

প্রকাশিত : ২৭ জুন ২০১৫
  • রেজা নওফল হায়দার

রোবট নিয়ে গবেষণার অন্ত নেই। এই যন্ত্রের মধ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা স্থাপনের কাজেও অনেকটা এগিয়েছেন বিজ্ঞানীরা। পশ্চিমা বিশ্ব রোবট নিয়ে গবেষণায় এগিয়েছে অনেক। বাংলাদেশও এক্ষেত্রে অবদান রাখার চেষ্টা করছে। বাঙালী রোবট তৈরি করে ২০১৩ সালে সাড়া জাগায় রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইলেকট্রিক্যাল বিভাগের দুই শিক্ষার্থী- সাদলী সালাহউদ্দিন ও সৌমিন ইসলামের এই রোবটকে বাংলায় ‘ডানে যেতে’ বললে সেটি ডানে যেতে পারে। বাংলা ভাষা বোঝা এই রোবট দেখতে ছোট হলেও এটির কাজের ক্ষেত্র হতে পারে অনেক। এমনকি হাজার হাজার মাইল দূর থেকেও এটিকে নিয়ন্ত্রণ সম্ভব। মাত্র তিন হাজার টাকায় বাংলা জানা এই রোবট তৈরি সম্ভব বলে জানান সাদলী। তাঁরা চান, বিনোদন নয় বরং মানব কল্যাণে এই রোবট ব্যবহার করতে। বিশেষ করে হুইলচেয়ার হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে এমন রোবট। বাংলা বলা রোবটেই থেমে নেই বাংলাদেশের রোবট গবেষণা। বাংলার আকাশে সফলভাবে মনুষ্যবিহীন ড্রোন উড়াতে সক্ষম হন শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (সাস্ট) চার শিক্ষার্থী। তিন ফুট লম্বা এই বিমান তৈরি করেছেন সৈয়দ রেজওয়ানুল হক, রবি কর্মকার, মারুফ হোসেন ও সৈয়দ উমর ফারুক? তাঁদের সহায়তা করেছেন সাস্টের অনেক শিক্ষার্থী। সাস্টের ড্রোন আকাশে ওড়ার পর এ ব্যাপারে এক বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে বাংলাদেশ আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদফতর (আইএসপিআর)। বিবৃতিতে ড্রোন উড্ডয়নে বিধিবিধান মানার অনুরোধ জানানো হয়। ড্রোনের সঙ্গে বেসামরিক বা সামরিক বিমানের ধাক্কা লাগার শঙ্কা তাদের। শুধু আকাশ নয়, পানির নিচে চলাচল উপযোগী রোবট নিয়েও গবেষণা হচ্ছে বাংলাদেশে। আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির (এআইইউবি) চার শিক্ষার্থী তৈরি করেছেন রোবট সাবমেরিন। এই রোবট ব্যবহার করে সমুদ্রের গভীরে অনুসন্ধান চালানো সম্ভব হবে। রোবট নিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের প্রতিযোগিতায়ও হাজির হচ্ছে বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরা। চলতি বছরের শুরুতে ভারতের বাণিজ্য নগর মুম্বাইয়ে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক রোবটিক্স চ্যালেঞ্জ প্রতিযোগিতায় দ্বিতীয় ‘রানার আপ’ হয় বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের তৈরি একটি প্রকল্প। আর গত বছর নাসার লুনাবোটিক্স মাইনিং প্রতিযোগিতায় অংশ নেয়া পঞ্চাশটি দেশের মধ্যে ছিল বাংলাদেশও। এভাবে রোবট গবেষণায় এগিয়ে যাচ্ছেন বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরা।

চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে রোবট নিয়ে ব্যাপক কাজ

চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়কে রোবট নিয়ে গবেষণার অন্যতম তীর্থস্থান বলা হয়ে থাকে। ডিজিটাল বাংলাদেশের স্বপ্ন পূরণে রোবটিক গবেষণাকে এগিয়ে নিতে নিরলস কাজ করে চলেছে একদল স্বপ্নবাজ তরুণ। এরই মধ্যে অনেক সাফল্য এসে ধরা দিয়েছে। উন্নত বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এ প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা প্রতিনিয়তই উদ্ভাবন করেছে নতুন নতুন প্রযুক্তি।

উদ্ভাবিত রোবট

চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের রোবট ও তথ্যপ্রযুক্তিবিষয়ক গবেষণাকারী ছাত্র সংগঠন ‘এ্যাসরো’ তৈরি করছে উদ্ধারকারী সিরিজ রোবট। রোবটটির কার্যপ্রক্রিয়া সম্পর্কে গবেষকরা বলেন, এ রোবটটি ঘরে আগুন লাগলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে উদ্ধার কাজ শুরু করবে এবং সতর্ক সঙ্কেত দেবে। আগুন থেকে উদ্ধার করার জন্য রোবটে একটি তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রক মডিউল ব্যবহার করা হয়েছে। বর্তমানে আলোচিত সিএনসি (ঈঘঈ) মেশিন বা কম্পিউটারাইজড নিউমেরিক্যাল কন্ট্রোল হচ্ছে একটি মেশিনকে কম্পিউটার দ্বারা নিয়ন্ত্রণ করা। একজন মানুষের ক্লান্তি আসতে পারে এবং ভুল করতে পারে কিন্তু কম্পিউটার বিনা ক্লান্তিতে কাজ করতে পারে। সফটওয়্যার দিয়ে কম্পিউটার নির্দেশের মাধ্যমে কোন যন্ত্রকে নিয়ন্ত্রণ করাই সিএনসির কাজ। সিএনসিকে পেটেন্ট হিসেবে তৈরি করা যন্ত্র কমপ্লেক্স ফিগার (ঈড়সঢ়ষবী ঋরমঁৎব) কে ড্র (উবধ)ি করতে পারে এবং কাট (ঈঁঃ) করতে পারে। এছাড়াও জটিল বস্তু কাটার জন্য সিএনসি রাউটার সম্প্রতি উদ্ভাবন করেছে চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী নাহিয়ান।

রোবট গবেষণায় অগ্রগতি

বাংলাদেশে মূলত ইন্ডাস্ট্রিয়াল রোবটই বেশি ব্যবহৃত হচ্ছে। তবে মেনিপুলেটর বা রোবটিক আর্ম হিসেবে ক্রেন ও এই ধরনের যন্ত্রপাতি ব্যবহৃত হচ্ছে, সেজন্য ইন্ডাস্ট্রিয়াল রোবট নিয়ে গবেষণার সুযোগই বেশি। এখনও পর্যন্ত সরকারী পর্যায়ে রোবট নিয়ে গবেষণার ব্যাপারে তেমন কোন উদ্যোগ নেয়া হয়নি। তবে বেসরকারীভাবে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে রোবট গবেষণা চলছে। ইতোমধ্যে চুয়েটের শিক্ষার্থীরা বেশ কিছু রোবটিক আর্ম তৈরিও করেছে। রোবটিক আর্ম মূলত দুই ধরনের। একটি মাইক্রোকন্ট্রোলারভিত্তিক ও অপরটি কম্পিউটারভিত্তিক। কম্পিউটারাইজড রোবট বেশি ব্যবহৃত হয় ইন্ডাস্ট্রিতে। ইন্ডাস্ট্রিয়াল রোবটের পাশাপাশি বিভিন্ন কাজে ব্যবহৃত হতে পারে এমন রোবট নিয়েও চুয়েটে গবেষণা চলছে। এছাড়াও সিক্স ডিগ্রী অব ফ্রিডম (ঝরী ফরমৎবব ড়ভ ভৎববফড়স) রোবট শিক্ষার্থীরা তাদের প্রজেক্ট হিসেবে প্রস্তুত করেছে।

ক্ষতিকর প্রভাবমুক্ত রোবট

অন্য অনেক টেকনোলজির মতো রোবটের ক্ষতিকর প্রভাব কি হতে পারে সে বিষয়ে ইঙ্গিত করে ড. তাজুল ইসলাম বলেন, রোবটের কিছু নীতি আছে যেগুলো ‘রোবট ল’ (জড়নড়ঃ খধ)ি নামে পরিচিত। যেখানে বলা আছে, রোবট কখনও মানুষের জন্য ক্ষতিকর হবে না এবং এটা মানুষের সব নির্দেশনা মেনে চলবে। অর্থাৎ মানুষ যদি নিজে রোবটকে ক্ষতিকর কোন কাজে নিয়োগ না করে তবে রোবট নিজে থেকে মানুষের জন্য ক্ষতিকর কোন কিছু করতে পারবে না।

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় প্রকৌশলীদের রোবট উদ্ভাবন

রোবটিক আর্ম উদ্ভাবনের চিন্তা প্রথমে আসে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল (সিএসই) ডিসিপ্লিনের প্রভাষক এসকে আলমগীর হোসেনের মাথায়। তাকে সহযোগিতা করতে এগিয়ে আসেন একই ডিসিপ্লিনের প্রভাষক কাজী মাসুদুল আলম। এ উদ্যোগকে সফল করতে ভাবী প্রকৌশলী কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল ডিসিপ্লিনের তৃতীয়বর্ষের শিক্ষার্থী মো. আবদুলাহ আল আহসানকে প্রধান করে নিযুক্ত করা হয় আরও একজন তরুণ প্রকৌশলী তানভির আহমেদ শুভকে। ছয় মাস পর এসকে আলমগীর হোসেন ও কাজী মাসুদুল আলম কম্পিউটার বিষয়ে উচ্চতর শিক্ষার উদ্দেশ্যে কানাডায় চলে গেলে এ আবিষ্কারে তত্ত্বাবধায়ন করেন একই ডিসিপ্লিনের প্রভাষক মোঃ মাসুদুর রহমান এবং শামীমা ইয়াসমিন। দীর্ঘ এক বছর গবেষণার পর তারা এ রোবটিক আর্ম আবিষ্কার করতে সক্ষম হন।

আবিষ্কারকরা জানান, এটি আমাদের দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি। এতে ব্যবহৃত সব যন্ত্রাংশ সুলভ মূল্যে পাওয়া যায়। তাছাড়া এ যন্ত্রের অন্যতম বিশেষ বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, এটি মানুষের কথামতো কাজ করতে পারে। এ রোবটিক আর্ম সক্রিয় করতে প্রয়োজন একটি কম্পিউটার, বিভিন্ন ড্রাইভার সার্কিট, হেডফোন এবং রোবটসদৃশ যান্ত্রিক হাত। প্রথমে কম্পিউটার, ড্রাইভার সার্কিট ও রোবটিক আর্মকে বৈদ্যুতিক সংযোগ দিতে হবে এবং হেডফোনকে কম্পিউটারের সঙ্গে সংযুক্ত করলে ব্যবহারকারী তার কথার মাধ্যমে যন্ত্রটিকে ইচ্ছা অনুযায়ী পরিচালনা করতে পারবেন। রোবটিক আর্ম হলো এক ধরনের রোবট, যা মানুষের হাতের বিকল্প হিসেবে কাজ করতে সক্ষম। গবেষণাগারে বিভিন্ন বিষাক্ত ও বিপজ্জনক রাসায়নিক বস্তু ব্যবহার মানুষের শরীরের জন্য ক্ষতিকর ও ঝুঁকিপূর্ণ। এসব ক্ষেত্রে এ যন্ত্রটি দ্বারা বিনা সংস্পর্শে সফলতার সঙ্গে কাজ সম্পাদন করা যায়। তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর বর্তমান বিশ্বে রোবটের চাহিদা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। রোবটের মাধ্যমে মানুষ বিনা ঝুঁকিতে অসাধ্য কাজও সাধন করতে চলেছে। এ ধরনের উদ্ভাবন তথ্যপ্রযুক্তির উন্নয়নে বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশকে আরও একধাপ সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাবে বলে প্রত্যাশা করেন উদ্ভাবনকারীরা। এ উদ্ভাবনের তত্ত্বাবধায়ক প্রভাষক মো. মাসুদুর রহমান বলেন, এ উদ্ভাবন উন্নতমানের রোবট তৈরির প্রথম ধাপ হলেও এটি অনায়াসে মানুষের হাতের বিকল্প হিসেবে কাজ করতে পারে। এটি গৃহস্থালির কাজ থেকে শুরু“করে শিল্পক্ষেত্রের বিভিন্ন বিপজ্জনক কাজও করতে সক্ষম। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত ‘রোবটিক্স এ্যান্ড ইনটেলিজেন্ট সিস্টেম’ বিষয়ক সেমিনার ও সফটওয়্যার ফেয়ার এবং ঢাকা পরমাণু শক্তি কেন্দ্রে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ ইলেকট্রনিক্স সোসাইটির (বিইএস) বার্ষিক সম্মেলনে এই রোবটিক আর্মের কার্যকারিতা প্রদর্শন করা হয়। সেমিনারে বক্তারা মানুষের কাজকে আরও সহজ করতে এ ধরনের আবিষ্কারের যথেষ্ট প্রয়োজনীয়তা আছে উল্লেখ করে এ আবিষ্কারকে পূর্ণাঙ্গ রূপ দিয়ে বাজারজাত করতে সরকারী ও বেসরকারী সহযোগিতা কামনা করেন।

প্রকাশিত : ২৭ জুন ২০১৫

২৭/০৬/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: