মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
৯ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শুক্রবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

পাহাড়ের ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে আবাসন টিকিয়ে রাখছে ৩ সংস্থার অসাধুরা

প্রকাশিত : ২৭ জুন ২০১৫
  • চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের অপসারণ কাজেও আসে বাধা

মাকসুদ আহমদ, চট্টগ্রাম অফিস ॥ চট্টগ্রামে পিডিবি, কর্ণফুলী গ্যাস ও ওয়াসা অবৈধ সংযোগ দিয়ে পাহাড়ে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থানে রেখেছে হত দরিদ্রদের। নিজেদের অবস্থান চাঙ্গা করতে গিয়ে সংশ্লিষ্ট বিভাগের অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীরা মৃত্যুমুখে ঠেলে দিয়েছে হতদরিদ্র পরিবারগুলোকে। এদিকে, পাহাড়বাসীদের নিয়ে টেনশনে রয়েছে জেলা প্রশাসন। শুক্রবার সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত প্রায় চার ঘণ্টার টানা অভিযানে মতিঝর্না এলাকায় পাহাড়ের ঢাল থেকে ২৫টি ঘর উচ্ছেদের মধ্য দিয়ে ৭৫ পরিবারকে সরিয়ে নিয়েছে জেলা প্রশাসন। এসব পরিবারের সদস্যদের ওই এলাকার মানিকনগর সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ঠাঁই দেয়া হয়েছে। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে এদের জন্য শুকনো খাবারের ব্যবস্থাও করা হয়েছে।

অভিযোগ রয়েছে, চট্টগ্রামে ঝুঁকিপূর্ণ ১৩টি পাহাড়ে কাঁচাপাকা ঘর নির্মাণের পেছনে রয়েছে ভূমিদস্যুদের ভয়াল থাবা। ভূমিদস্যুরাই সরকারী পাহাড় দখলে রাখতে ও ভাড়া বাণিজ্য অব্যাহত করতে এ ধরনের চক্রান্ত চালাচ্ছে সরকারের সঙ্গে। সরকারী ভূমি দখলে রাখা গেলেই পকেট পুরছে ভূমিদস্যুদের। কেয়ারটেকারের মাধ্যমে ভাড়া আদায়ের মধ্য দিয়ে নিজেদের আড়ালে রেখেছে ভূমিদস্যুরা। ফলে প্রশাসন উচ্ছেদ অভিযানে গেলে এসব দস্যুর নাম পরিচয় পর্যন্ত মেলে না ভাড়াটিয়াদের কাছ থেকে। প্রশাসনের অবস্থান আগেভাগেই জেনে কেয়ারটেকাররা যেমন ভূমিদস্যুদের দূরে সরিয়ে রাখে তেমনি নিজেরাও থাকে অভিযানে থাকা দলের সঙ্গে বেশভূষা পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে। ভূমিদস্যুদের পক্ষ থেকে প্রশাসনের উচ্ছেদের আগে ও পরে ভাড়াটিয়াদের প্রতি সতর্ক বার্তা হিসেবে জানানো হয়, ‘একবার ছেড়ে গেলে ফিরে আসার সুযোগ নেই।’ ফলে ভাড়াটিয়ারা কম ভাড়ার এসব ঘর ছেড়ে যেতে নারাজ ‘যতক্ষণ পর্যন্ত না পাহাড়ে ভূমিধস’ হচ্ছে।

আরও অভিযোগ রয়েছে, ৬৬৬টি পরিবারকে পাহাড়ে টিকিয়ে রাখতে ওয়াসা, বিদ্যুত ও কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশনের অসাধু কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা জড়িত রয়েছে। তাদের অপতৎপরতার কারণেই পাহাড়খেকো ভূমিদস্যুরা পাহাড়ের চূড়ায়, ঢালে ও পাদদেশে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থানে একের পর এক গৃহ নির্মাণ করছে। এমনও দেখা গেছে দেড় দু’ফুট সুড়ঙ্গের মতো পাহাড় কেটে এক পাহাড় থেকে অন্য পাহাড়ে চলাচলের পথ তৈরি করা হয়েছে। কাটা ও খাড়া পাহাড়ের পাশেই তৈরি করা হয়েছে কাঁচা ও সেমিপাকা ঘর। এমনও দেখা গেছে, শত শত সিঁড়ি পার হয়ে পাহাড়ের চূড়ায় তৈরি করা হয়েছে ভাড়া বাণিজ্যের জন্য দ্বিতল ঘরও। এ ক্ষেত্রে চউকের উদাসীনতা ও অসাধু কর্মকর্তাদের অপতৎপরতায় নক্সাবিহীন ও পরিবেশ অধিদফতরের অনুমতিবিহীন পাকা ঘর নির্মাণ করা হয়েছে। এদিকে, পরিবেশ অধিদফতরও উদাসীন হওয়ায় পাহাড়ে একের পর এক তৈরি হচ্ছে ভাড়া গৃহ। কেয়ারটেকাররা ভূমিদস্যুর পক্ষ হয়ে মাস শেষে ভাড়া আদায় করছে। বিদ্যুত বিল, গ্যাস বিল ও পানির বিলসহ আদায়কৃত অর্থ ভাগবাটোয়ারা করে সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোর অসাধু কর্মকর্তাদের কাছে পৌঁছে দেয়া হচ্ছে। এদিকে, আইনশঙ্খলা পরিস্থিতি সামাল দিতে থানা পুলিশকেও ম্যানেজ করা হচ্ছে ভূমিদস্যুদের পক্ষ থেকে। গৃহ নির্মাণ থেকে শুরু করে ভাড়া আদায় পর্যন্ত সকল ক্ষেত্রেই উল্লেখিত দফতরের অসাধুদের জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছে ভাড়াটিয়ারা। ফলে জেলা প্রশাসন উচ্ছেদ অভিযানে গেলে ভাড়াটিয়ারা বাধ্য হয় অপরাধীদের পরিচয়গোপন রাখতে।

এ প্রসঙ্গে জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও উচ্ছেদ অভিযান টিমের নেতৃত্বে থাকা ম্যাজিস্ট্রেট রুহুল আমিন জানিয়েছেন, ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থানে থাকাদের সরিয়ে নিতে প্রশাসন উচ্ছেদ অভিযান অব্যাহত রেখেছে। পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের সহায়তায় এবং মহানগর ভূমি অফিসের সহকারী কমিশনাররাও এ অভিযানে অংশ নিচ্ছেন। অভিযানের পূর্বে অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হচ্ছে গ্যাস, বিদ্যুত ও ওয়াসার। উচ্ছেদকৃত পরিবারগুলোকে পার্শ¦বর্তী সরকারী প্রাইমারী স্কুলে অবস্থান নিতে বলা হয়েছে এমনকি সেখানে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে থাকা ও খাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে।

জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানা গেছে, চট্টগ্রামে তিনটি থানা এলাকায় মোট ১৩টি পাহাড়ের চূড়ায়, ঢালে ও পাদদেশে ৬৬৬টি পরিবার রয়েছে। এসব পাহাড় রেলওয়ে, ওয়াসা ও সরকারের ভূমি অধিদফতরের মালিকানাধীন। নগরীর খুলশী, বায়েজিদ ও আকবর শাহ থানা এলাকায় এসব পাহাড়ের অবস্থান। নগরীর ১১টি পাহাড়ে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থানে থাকাদের মধ্যে খুলশী থানাধীন একে খানের মালিকানাধীন পাহাড়ে রয়েছে ১৮৬টি পরিবার। ইস্পাহানি মালিকানাধীন পাহাড়ের দক্ষিণ পাশে কথিত হারুন খানের পাহাড় ও বাইতুল আমান সোসাইটি সংলগ্ন পাহাড়ে ৫টি পরিবার রয়েছে। আকবর শাহ থানাধীন কৈবল্যধাম ট্যাঙ্কির পাহাড়ে ২৭টি পরিবার, ফয়স লেক লেকসিটি আবাসিক এলাকার পাহাড়ে ১২টি এবং আকবর শাহ আবাসিক এলাকার পাহাড়ে ২২টি, পরিবেশ অধিদফতর সংলগ্ন সিটি কর্পোরেশনের ঝর্নার পেছনে থাকা পাহাড়ে ১১টি, ফয়স লেক আবাসিক এলাকার পাশের পাহাড়ে ৯টি পরিবার রয়েছে। ফরেস্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউট একাডেমির উত্তর পাশে জনৈক মোঃ হাসানের পাহাড়ে ৩৮ পরিবার, নাসিরাবাদ শিল্প এলাকা সংলগ্ন পাহাড়ে ৩টি পরিবার, জালালাবাদ হাউজিং সোসাইটি পাহাড়ে ৩৩টি, মতিঝর্না ও বাটালি হিল পাহাড়ে ৩২০টি পরিবারের ঝুঁকিপূর্ণ বসবাস রয়েছে।

জেলা প্রশাসনের অভিযান টিম সূত্রে জানা গেছে, বিদ্যুত, গ্যাস ও ওয়াসার সংযোগ বিচ্ছিন্নকরণের মধ্য দিয়ে প্রতিনিয়ত উচ্ছেদ অভিযান চালানো হচ্ছে তেরোটি ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড় এলাকায়। বুধবার লালখান বাজার বাটালি হিল পাহাড় থেকে ৫০টি পরিবারকে সরিয়ে নেয়া হয়েছে। শুক্রবার মতিঝর্নার ট্যাঙ্কির পাহাড় থেকে ২৫টি ঘর উচ্ছেদের মাধ্যমে ৭৫টি পরিবারকে সরিয়ে নেয়া হয়েছে। এসব পরিবারকে আপাতত বৃষ্টি থাকাকালীন লালখান বাজার মানিকনগর প্রাইমারী স্কুলে ঠাঁই দেয়া হয়েছে। এদের জন্য জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে শুকনো খাবার ও থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছে।

প্রকাশিত : ২৭ জুন ২০১৫

২৭/০৬/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন

শেষের পাতা



ব্রেকিং নিউজ: