আংশিক মেঘলা, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৬ ডিসেম্বর ২০১৬, ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, মঙ্গলবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

পাখীমারা গ্রামের হিরালাল

প্রকাশিত : ২৬ জুন ২০১৫
  • আশরাফ উদ্দীন আহ্মদ

পাখীমারা গ্রামের সবাই জানে হিরালাল ওরফে হিরকচাঁদ হাজরা একজন নপুংশক, কিন্তু সে কি সত্যিই নপুংশক ছিলো বরাবর, প্রথম বউয়ের গর্ভে তো সতীষের জন্ম হলো, সতীষের ঠাম্মা অর্থাৎ হিরালালের মায়ের কারণে ঘর-সংসার করলো না স্বামীর, জাঁদরেল-বজ্জাত শাশুড়ী বটে হিরালালের মা। পরের বাড়ির ঝি কি আর অতো সহ্য করে কখনো, পান থেকে চুন খসলেই কি সে লংকাকা-, যেন এক কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের মতো ভয়াবহ তেলেসমাতি কারবার। সেই সঙ্গে হিরালালের বাংলামদ-চোলায়ের নেশায় সর্বস্বান্ত হয়ে পথে বসার অবস্থা। একদিন হিরালালই বলে, যে ভাবেই হোক প্রতিরাত্রে নেশার টাকা আমার চাই... এক রাত্রে তো লাখাইগঞ্জের পাট ব্যাপারি মজিদ খন্দকারের বখাটে ছেলে কামাইলাকে নিয়ে আসে, কাজেরীকে ওর সঙ্গে শুতে বলায় গোখরা সাপের মতো ফস করে ওঠে। হিরালালের মা বোঝে ছেলে তার ভালো মক্কেল ঘরে এনেছে, এবার টাকায়-টাকায় ভরে যাবে তাদের ঘর-উঠোন...অভাব নামের সেই বজ্জাত ছোঁয়াচে রোগ-বালাই পালিয়ে যাবে বউটার কল্যাণে, মনটা তার ভরে ওঠে আনন্দে, সুখের দিন শুরু হতে যাচ্ছে এবার। কাজেরীর তর্জন-গর্জন আর ফসফসানি শুনে তেলে-বেগুনে জ্বলে ওঠে চিৎকার দেয়, ওমন মানুষের সঙ্গে শুবি-নে তো কোন্ রাজপুতের মুত খাবি রে মাগী...

কাজেরি একদিন রাত্রে স্বামীর অত্যাচারে অসহ্য হয়ে বাপের দেশ লোহরশালী চলে যায়, সতীষকে ধরে-বেঁধে রেখে দেয় কালনাগিনী শাশুড়ী, বয়স ওর কতোই বা হবে তখন, বড় জোর তিন থেকে চার হবে, হিরক অর্থাৎ হিরালাল এখন আর আগের মতো নেই, অনেক বদলে গেছে, কালে-কালে অনেক শিখেছে, অনেক দেখেছে...সতীষ বড় হয়েছে, স্কুলে যায়, হিরালালের মা’ টা কয়েক বছর আগে মরে গেছে, হাট-ঘাট করে সুস্থ-সুন্দর জীবন কাটায় সে। মাঝরাত্রে কখনো-সখনো ফেলে আসা বিদগ্ধ দিনগুলো বড় যন্ত্রণা দেয় তাকে, মাঝে বেশ ক’ বার শ্বশুরবাড়ি গেছে কাজেরীকে ফিরিয়ে আনার জন্যে, কিন্তু শালা-সমুন্ধিরা দেখা অবধি করতে দিতে চায় না। মুখের ওপর বলে ওঠে, কাজেরি আর তার সংসার করবে না।

হিরালাল অনেক বুঝিয়ে বলেছে, আর কোনোদিন ওমন হবে না, এমন সে বেশ ভালো হয়ে গেছে। উত্তরে স্পষ্ট জানিয়েছে, কয়লা যায় না ধুলে আর এলত যায় না ম’লে, ব্যর্থ হয়ে প্রত্যেকবারই ফিরে এসেছে, নিজের ওপর প্রচ- রাগ হয়, কুয়াশায় আচ্ছন্ন চোখজোড়া কেমন বিবর্ণ আর তামাটে দেখায়, যেমন কর্ম তেমন ফল আর কি! তুলসীতলায় মাথা খুঁড়ে মরে, পুরানো প্রেম জাগ্রত হলে মনটা কেমন-কেমন করে ওঠে, হয়তো তখন চোখ দিয়ে ফোঁটা-ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ে, বেপরোয়া শ্রাবণ মাসের পদ্মানদীর মতো উথলে ওঠে গানি আর যন্ত্রণা সিক্ত মরা প্রেম। কাজেরীর শেষ স্মৃতি সতীষই এখন হিরালালের একমাত্র ভরসা। দ্বিতীয় সংসার করার কোনো ইচ্ছে নেই বলেই না আর ও’পথে পা বাড়ায়নি, নিষ্ঠুর পরিণতির জন্যে সেই যে দায়ী, সে কথাও কোনোদিন ভুলে যায় না। অনুশোচনায় কান্না পায়, কিন্তু কান্নাও যেন কণ্ঠনালীর মধ্যে আটকে যায়, চারদিকে শুধু ধ্বংস আর আগুনের লেলিহান দাবানল প্রত্যক্ষ করে সে, একেই কি জীবন বলে, কিছুই বোঝে না, একসময় শ্বাস রুদ্ধ হয়ে আসে, মস্তিষ্কের কোষে-কোষে জট বাঁধে, নিজের কাছে নিজেই অদৃশ্য ছায়া মনে হয়, বোধের প্রাচীরে কে বা যেন কশাঘাত করে আর রক্তাক্ত হয় বুকের বাতায়ণ, ক্ষীণ স্বপ্নও ম্লান হয়।

মাঝে-মাঝে শেষ রাত্রের বিছানায় নিজেকে অন্যরকম ভাবে আবিষ্কার করে হিরালাল, ঘুম থেকে ওঠে বাইরে বের হয়ে আকাশ দেখে। রাজশাহী সিল্কের মতো ঝরঝরে মসৃণ ওই আকাশ যেন ভালোবাসার কতকগুলো অনাবিল শ্বেত-শুভ্র বক অথবা কাঁশফুল, ওর বুক জুড়ে ভালোবাসা ছাড়া যেন বা আর কিছু নেই। কখনো বা গুমরে কেঁদে ওঠে আপন মনে, কান্নার গুমোট পাথর বুক থেকে নেমে গেলে কিছুটা স্বস্তি বোধ করে, তখন আলতো চুমু দেয় নদীর চলমান হাওয়া। দূরের নীল জমিনের মতো প্রকা- আকাশটাকে কাছে পেতে বড় সাধ হয়। কাজেরীকে কাছে পেয়েও কোনোদিন মনের কথা বলতে পারেনি, মানুষ যে কখনো-সখনো মানুষ থেকে নেমে অমানুষে পরিণত হয়, তার জ্বলন্ত প্রমাণ আসলে যে নিজে, বুকের মধ্যে ভয়াবহ কষ্ট বোয়ালমাছের মতো খাবলায় দিবানিশি, কাজেরিকে সে কি কোনোদিন এতোটুকু ভালোবেসেছিল নাকি শুধুই জ্বালা-যন্ত্রণা আর অত্যাচারে জর্জরিত করেছে, নির্মম অত্যাচারের ফলে, কাজেরি সংসার করতে পারেনি। তার ইজ্জত-সম্ভ্রম একটু-একটু ছিনিয়ে নিয়েছে পিশাচ এক মানব হিরালাল। লোহরশালী গ্রামের মানুষজন জানে পাখীমারা গ্রামের হিরালাল নামের একজন জানোয়ার ইতরশ্রেণীর প্রাণী আছে, নিজের বউকে অন্যের হাতে স্বেচ্ছায় অর্পণ করতে যার বুক এতোটুকু কাঁপে না, সে কতোটুকু মানুষ তাও সন্দেহ রয়েছে, হিরালাল চা-াল অথবা ধাঙড় কিংবা কোনোই নয়, বরং তার চেয়ে আরো নীচু শ্রেণীর কিছু, মানুষ কি এতোটাই নিম্ন পর্য়ায়ে নামতে পারে কখনো! টাকা রোজগারের আশায় ঘরের লক্ষèীকে... আর সে কিছুই কল্পনা করতে পারে না, সর্বাঙ্গে কেমন একটা ঘৃণা রি-রি করে অনুভূত হয়।

অথচ আজ সে একেবারে অন্যরকম মানুষ, মনে-প্রাণে ভালোবাসে কাজেরীকে, কিন্তু কাজেরী তো সে কথা কখনো জানে না, হিরালাল শুনেছে কাজেরী আজো শাঁখা-সিঁদুর লোহার পলা পরে, তার মানে সে অমানুষ হয়নি, তাকে আজো স্বামী বলে স্বীকার করে, বিয়ে সে করবে না, অবশ্যই ওর দাদা-ভাইরা দ্বিতীয় বিয়ের কথা বলেছে, অথচ কাজেরি সে ব্যাপারে একেবারে নীরব, বলে কি না, হিন্দু মেয়েদের বিয়ে তো ওই একবারই হয়... কাজেরীর সব কথায় হিরালালের কাছে উড়ে আসে, সে মনে-মনে নতুন করে কাজেরীকে ভালোবাসে, কাজেরীর পথের দিকে সন্ধান করে সেই পুরনো ছায়া, হাটঘাটের চেনা-পরিচিত মানুষজন হিরালালের দিকে আড়চোখে তাকায়। ওদের ওমনভাবে তাকানো দেখে মাঝে-সাঝে হিরালালের শরীর জ্বলেপুড়ে যায়, ওদের বাক্যবাণে কানের মধ্যে সীসা ঢালার যন্ত্রণা অনুভব করে।

কেউ-কেউ আবার একধাপ এগিয়ে এসে বলেই বসে, কি রে হিরা, তুই বাঁজাপুরুষ আগে বলতে হয়, তোর ডাগর বউটাকে ঠিকঠাক পারতিস না বলেই...

হিরালাল থেমে যায় মুহূর্তে, কাছে পিঠে কোনো মুগুর বা বাঁশ অথবা চেলাকাঠ থাকলে মেরে একেবারে কুরুক্ষেত্র বাঁধিয়ে ফেলতো, শত শত মানুষের শত শত ব্যঙ্গ কথাগুলো বড় বেশি কামড়ায় শরীরখানাকে।

বিকেলের দিকে বাঁশঝাড়ের কাছাকাছি বসে হিরালাল, শীতের নরোম বাতাস খেলে যায়, বাঁশঝাড়ের ভেতর পাখিদের কিচিরমিচির সুমধুর ধ্বনি, হিরালালের মনটা কোথায় যেন বা হারিয়ে যায়। পাখীমারা গ্রামটা এককালে নাকি পাখিশূন্য ছিলো, আর সে কারণে এমন একটা হতচ্ছাড়া নাম এঁটে দিয়েছে কোনো বেরসিক মানুষ। উদাসীন বিবাগি মন হারিয়ে যায় আকাশের খুব কাছাকাছি, চুলোর ছাইয়ের রঙে রঙা শত-সহস্র পাখপাখিদের সঙ্গে ভেসে বেড়ায় মেঘের দেশে। মেঘকন্যাকে খুব ভালোবাসতে ইচ্ছে হয়, কতদিন মেঘের বুড়ি আকাশের বুকে এসে দাঁড়ায়নি। একসময় হিরালালের চোখের কোণে অশ্রু“জমে, মাঝে-মাঝে আজকাল তার এমনই হয়। অনেকক্ষণ দূরের আকাশের পাখিদের খেলা দেখতে-দেখতে সময় কাটে। তালগাছের ঝুলন্ত বাবুই পাখিদের বাসাগুলো একেকটা ভালোবাসার ফসল মনে হয় হিরালালের কাছে। মাটি-খড় লতা-পাতা বাঁশের কঞ্চি দিয়ে কি সুনিপুণভাবে বাবুই পাখিরা এমন বাসা বানায়। ভালোবাসা আর আনন্দ গচ্ছিত থাকলে পাখিরাও শিল্পী হয়ে যায়। আর মানুষ... সে তো আসলে কোনো মানুষই নয়, মানুষের প্রতিচ্ছায়া হয়েও একটা জানোয়ার বৈ তো আর কি!

বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যায় এসে মেশে, সন্ধ্যার আগমনী বার্তা পেয়ে গেছে পাখিরা, আর তাই ঘরে ফেরার বার্তা পেয়ে তারা এখন তাদের পাখায়। কিচির-মিচির কলরবে ভরে যাচ্ছে চারদিকে। সূর্যটা রক্তিমাভা আলো ছড়িয়ে আকাশের পশ্চিম কোণে ডুবে যাওয়ার অপেক্ষায় সময় গুনছে, সূর্যটাকে এখন অনেকটা ডালিম ফুলের পাপড়ির মতো মনে হচ্ছে, এমন সুন্দর হাসি তো শুধু সদ্য প্রসূত শিশুর ঠোঁটে লেপ্টে থাকে।

গোধূলি ধূসর বেলায়, কার ভালো লাগে আর শূন্য ঘরে প্রত্যাবর্তন, মৌন বিকেলের নিস্তব্ধ আকাশের নীচে হারিয়ে যেতে। দিনকে দিন হিরালালের মনে হয়, তার ঘরটা এক মহাশ্মশান বৈ তো কি! অন্ধকার থকথক করে আর অশ্লীল হাসি বাতাসে ঢেউ খেলে যায়। বাতাসও যেন বৈরী, মনটাকে ভেঙেচুরে নিমেষে খান খান করে দেয়, পাথরের মূর্তির মতো সে নিষ্প্রাণ একটা মানুষ, বুকে এক হিমালয়, হাউমাউ করে চিৎকার দিয়ে কাঁদতে অভিপ্রায় জাগে। কিন্তু পারে না, ছুটন্ত ট্রেনের হুইসলের আওয়াজে সমস্ত সত্তা ভেঙে তছনছ হয়ে যায়। নিজেকে বড় বেমানান আর খাপছাড়া মনে হয়। কতোবার ভেবেছে এমন করে জ্বলে-পুড়ে নিঃশেষ হওয়ার চেয়েও আবার খারাপ হয়ে যাবে ঠিক আগের মতো। এভাবে কি মানুষ কখনো বাঁচে, নাকি এর নাম জীবন বলে, বাস্তবে জীবন যে কাকে বলে তাও কি হিরালাল জানে, পুঁথিবিদ্যা না হলে নাকি জীবন সম্পর্কে মানুষ একেবারে অজ্ঞ রয়ে যায়, হয়তো বা সে সারাজীবনই অজ্ঞই রয়ে গেলো। জীবনকে নিয়ে ভাববার সময়ই বা আর কতোটুকু পেলো জীবনে, সহসা মনটা দুমড়ে মুচড়ে যায়, ভাবনাগুলো তাড়াহুড়োয় কোথায় অদৃশ্য হয় হিরালাল বুঝে পায় না। আজকাল জীবন নিয়ে ভাবতে গিয়ে কেমন হোঁচট খাচ্ছে পায়ে-পায়ে, এভাবে বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মতো জীবন বড়ই এলোমেলো আর যাচ্ছেতাই মনে হয়।

সন্ধ্যা ক্রমে-ক্রমে হাঁটতে-হাঁটতে গ্রাস করে তাবৎ পৃথিবী, একসময় পাখিরা সবাই ঘরে ফেরে, হিরালাল বসে থাকে অনড়, তার যেন আজ কোনোদিকে খেয়াল নেই। কি একটা ফুলের ঘ্রাণ মাতিয়ে রেখেছে চারদিক, এমন মিষ্টি ঘ্রাণ হঠাৎ যেন আজ প্রথম তার নাকে ধাক্কা দিলো, নিস্তব্ধ নিথর পৃথিবী এখন। কারো কোনো সাড়া শব্দ নেই কোথাও, পাতার মর্মর ধ্বনি আর বাঁশের কঁচি পাতাদের শিরশির শব্দ কানে শোনা যায়। আকাশটাকে শামিয়ানা টাঙানো মনে হয় তার কাছে, চাঁদ উঠেছে কি এখনো মুখে বোরখা টেনে বসে আছে লজ্জাবতী নারীর মতো, কিছুই আন্দাজ করা যাচ্ছে না, কুয়াশায় ঢেকে আছে চারদিক। মশারীর জালের আচ্ছাদন ছিন্নভিন্ন করে ঝিরঝিরিয়ে কুয়াশা নেমে যাচ্ছে গাছেদের শরীরে পাতার বুকে মাটির গায়ে।

হিরালাল শুধু একজন মানুষ বলেই কি তাকে কুয়াশার চাদর ঢেকে নিচ্ছে না। বিড়ালের পায়ের মতো ধীরে-ধীরে সন্ধ্যা ঘন হয়ে কালো কুচকুচে অন্ধকার ঢেকে ফেলে চারপাশ। অনেকটা সময় পার হয়ে যাচ্ছে, হিরালালের কাছে মনে হয় সে যেন যুগ-যুগান্তর থেকে মহাকাল কেটে গেছে, এতোটা সময় ধরে আকাশের নীচে বসে-বসে পৃথিবীটাকে দেখছে, পৃথিবীর আলো-আঁধারী বাতাস প্রকৃতি প্রেম-ভালোবাসা তাকে কোনোভাবেই আকর্ষণ করতে পারে না।

জামতৈলী হাটের কাছের গায়েনের মৃত্যু হলো কয়েক মাস আগে, মানুষটা সারাজীবন ওই একটা কথাই বললো, পৃথিবীর এতোটুকু সাধ্য নেই মানুষকে টেনে বেঁধে ধরে রাখে... কি বাস্তব আর সুন্দর কথা। ওই কাদের গায়েনকে বড় বেশি মনে পড়ে আজ। গান গাইতে তার সত্যিই জুড়ি নেই সাতগাঁয়ে। ওমন প্রাণ কাড়া ছন্নছাড়া মধুর সুর, কে আর পারে, সুর তো নয় যেন অন্য এক প্রেমের ইন্দ্রজাল, টানতে জানে, ভালোবাসা ছড়িয়ে শুধু টানে, কি সেই অদৃশ্য টানার সুতো! ওমন সুর আর গানের বাণী সাজানো কি আর চাট্টিখানি কথা। বাউন্ডেলে ওই মানুষটা সুরের সাধনায় জীবনটাকে উৎসর্গ করে, তার ফলে সুর যেন তার অস্তিত্বের একটা অবিচ্ছেদ্য অংশ হলো। ভাঙা হারমোনিয়ামের মতো জীবনকে ভাঙা শত বিভক্ত আয়নার মতো ভাবতো সর্বদা। সেখানে মুখ দেখা ঠিকই কিন্তু সে মুখের আদল বড় বীভৎস দেখায়, উজ্জ্বলতা নষ্ট আতাফলের কালো বীচির মতো অনেকটা। মানুষটা চিরকাল নিঃসঙ্গ থেকে গেলো, সংসারের কথা বললে, সুস্পষ্ট বলতো, গায়েনদের ব্রহ্মচারী হতে হয়, জীবনের চরম স্বাদ তো ওই একাকি জীবনে পরিপূর্ণ, তাছাড়া অন্ধকার কবরে প্রতি মানুষকে একলা থাকতে হবে, আর তাই এখন থেকেই ওভাবেই তৈরি হচ্ছি রে...

মৃত্যুর পূর্বে মানুষটার গভীর চোখ দুটোতে কিসের এক মায়াবী ছায়া খেলছিলো, হিরালাল খুব কাছে থেকে মানুষটাকে মরে যেতে দেখেছে, মৃত্যু যে ওমন সুন্দর আর স্বচ্ছ নির্মল হয় কোনোদিন ভাবেনি। যাওয়ার সময় ঠোঁট দুটো শিরশিরিয়ে একটু নড়েছিলো, কণ্ঠে হয়তো কোনো নতুন সুর খেলছিলো, আর হাতের নরোম আঙুল দিয়ে মনে-মনে ছুঁয়ে যায় সেই অদৃশ্য একতারা, যার বুকে সুর তুলতে-তুলতে জীবন যৌবন পেরিয়ে এসেছে সে। বিস্ময়ভরা চোখে তাকিয়ে দেখেছে মানুষটার সুন্দর মৃত্যু, স্বর্গে যাওয়ার সিঁড়ি বেয়ে-বেয়ে শুভ্র শাদা কাফনে সেজে-গুজে বিয়ের দুলাহর মতো পালকির বেয়ারারা নিয়ে যায় তাকে। হিরালালের চোখ ফেটে টপটপ করে অশ্রু ঝরে পড়ে, ওমন মানুষ কি আর জন্মাবে কখনো এদশে, যারা চলে যায় তারা আর কোনোদিন আসে না। কেনো যে মানুষ একবার চলে গেলে ফিরে আসে না হিরালাল বুঝে পায় না। কাজেরীর মতো ওমন অভিমানে মানুষ কেনো যে থাকে, আর কিছুই ভাবতেই পারে না। কেমন সব ওলটপালট হয়ে যায়, বুকে কেমন একটা অদৃশ্য ভাঙন অনুভব করে।

মন আর মানে না হিরালালের এভাবে একা-একা থাকতে, দিন-মাস বছর কেটে যায়, কাজেরীর স্বচ্ছ স্নিগ্ধ ভালোবাসা টানে বারবার, হালকা বাতাস ছাপিয়ে চোখের কোণে চিকচিক করে ওঠে বৃষ্টির ছাঁট। একদিন সতীষকে সঙ্গে নিয়ে লোহারশালী গ্রামের পথে হাঁটে হিরালাল। যদি তাকে ফিরিয়ে আনা যায় এই ভরসায়। আলপথ ধরে-ধরে, বাঁশঝাড়ের সীমানা পেরিয়ে পানের বরজের পাশ দিয়ে হাঁটতে থাকে সময় সংক্ষিপ্ত করার জন্য, দূরের আসমানে পঙ্গপালের মতো জমাট বাঁধা মেঘের চাপচাপ আচ্ছাদন দেখতে পায় একসময়। খুব ঝেঁড়ে বৃষ্টি হবে বোঝা যায়, তুলোর মতো বিচ্ছিন্ন কিছু মেঘ উড়ে যাচ্ছে কোথায়, তাবৎ আসমান মেঘেদের স্পর্শে কাতর এখন। চোখ দিয়ে যেন তাকাতে পারে না মানুষ, পৃথিবীকে উজাড় করে দেবে বৃষ্টির জলে। দুপুর পেরিয়ে বিকেল গিয়ে সন্ধ্যা উঁকিঝুঁকি দিয়ে এখন রাত্রে এসে ঠেকেছে, পথ যেন বা আর সমাপ্ত হতে চায় না। একটা পথের বাঁক শেষ হয় তো আরেক পথের সীমা এসে চোখ ধাঁধিয়ে দেয়। মনটা একটু-একটু সঙ্কুচিত হয়, এভাবে পথের গাদাগাদি দেখতে-দেখতে উদ্ভট অনেক চিন্তা মাথার মধ্যে জট পাঁকায়, কখনো নিজেকে ভারী নিঃসঙ্গ মনে হলেও সতীষকে পাশে পেয়ে তা কেটে যায় নিমেষে, মুহূর্তে উৎকণ্ঠা ঝেঁড়ে ফেলে মটমটিয়ে তাকিয়ে গটগটিয়ে হেঁটে চলে কিছুক্ষণ।

সতীষের আগ্রহ আগের মতো নেই এখন। তবে মা’ কে দেখতে যাওয়ার আনন্দ একটু মিইয়ে গেলেও প্রাণশক্তি বা উদ্যমতা এতোটুকু কমতি হয়নি। দীর্ঘ পথ হাঁটার পরিশ্রমে আঁধার ঘনিয়ে আসে দু’চোখে আর সমস্ত শরীর কেমন বিষণœ, শক্তিও কেমন ঢুলছে ওর, কাজেরিকে দেখার আনন্দ আর অভিপ্রায় হিরালালের মধ্যেও কি কম সঞ্চয় আছে? বুকে একটা এলোমেলো বাতাস বয়ে যাচ্ছে তার, উল্টেপাল্টে খুলে-খুলে একটু-একটু করে দেখতে চায় স্মৃতির রঙিন প্রজাপতির পাখনা। তার মধ্যে বুকের আরেক প্রান্তে ক্যাকটাসের মতো ক্রমে-ক্রমে কষ্টের বীজ বড় হচ্ছে, দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে প্রতিনিয়ত, যন্ত্রণায় কুঁকড়ে যায় হিরালালের মন-প্রাণ, কিভাবে কোন্ মুখে আজ দাঁড়াবে সে কাজেরীর সম্মুখে, এ এক বড় রকমের অগ্নিপরীক্ষা তার কাছে, অনেক-অনেক কথা, অনেক অনেক স্বপ্ন লুকিয়ে আছে মনে বাতায়ণে, বুকের সন্নিকটে।

একসময় লোহরশালী গ্রামে পৌঁছে যায়, শ্বশুরবাড়ির নিকোনো উঠোনে এসে দাঁড়ায়, আর একটু পরেই বৃষ্টি হবে আকাশের গোমর দেখে অনুমন করা যায়। সতীষ হনহনিয়ে বাড়ির একেবারে অন্দরে চলে যায়, হিরালালের মনে খানিকটা আনন্দ এসে উথলে পড়ে, এতোকাল যে ঔষধে কাজ হয়নি, এবার একমাত্র সন্তানের মুখ দেখে হয়তো কাজেরি ফিরে আসবে তার সংসারে, একজন কাজেরীর জন্য হিরালালের সংসারে হাহাকার ঘনীভূত, সংসার সীমান্তে নিথর পাথর মূর্তির মতো হিরালাল। ভুল তো সে শুধরে ফেলেছে আর কক্ষনো তার ওমন অন্যায় কাজ হবে না। মানুষই তো কখনো-কখনো অমানুষ হয় আবার মানুষেও রূপান্তরিত হয়, ক্ষমা পাওয়ার কোনো যোগ্যতা কি হিরালালের নেই? সতীষের মিষ্টি মুখ দেখে এবার কাজেরি ফিরে আসবে তার নিজের আশ্রয়ে, হিরালালের বুক কেমন উথালপাথাল করে, বাড়ির বাইরে দাঁড়িয়ে থাকে আকাশের শুকতারাটির মতো অধীর আগ্রহ নিয়ে, মনের মধ্যে অনেক কথা আঁকুপাঁকু করে। কতো কথা কতো স্বপ্ন-সাধ আর কতো শত গল্প গচ্ছিত আছে। শরীর বড় ক্লান্ত হয়ে আছে, তবু বুকের ঠিক মাঝামাঝি স্থানে জবা ফুলের মতো লাল-নীল রঙিন ভালোবাসা উপছে ওঠে। মুহূর্তে সন্ধানী চোখ লক্ষ্য করে বাড়িটা কেমন নিস্তব্ধ আর শান্ত শিশুর মতো। রোগশয্যায় দিনাতিপাত করছে তাহলে কি এই মস্ত বাড়িটা। কোথায় একটা অসুখ দগদগে ঘা’য়ের কবলে পড়ে হিমশিম খাচ্ছে, বেয়াড়া ধাতের চিন্তাগুলো অকারণে মাথার কোষে-কোষে কেমন কোঁদল পাঁকায়। হতচ্ছাড়া মনটা আর থিতু থাকে না। চরকা নাচনের মতো অনবরত ঘুরে যায় যাচ্ছেতাইভাবে। অধীর উত্তেজনায় শরীরে কেমন একটা নেশার মতো টান পরে, বাঁশঝাড়ের ভেতর থেকে ঘনান্ধকার ধীর পায়ে নেমে এসে কেমন বিদঘুটে দেখাচ্ছে পরিবেশ। রাতের অন্ধকার এভাবেই যেন সমস্ত কিছু বিনাশ করে, বাড়িটার আগাগোড়া নিকষকালো অন্ধকার বিচ্ছিরিভাবে গ্রাস করেছে, হিরালাল কলার খোসার মতো এলিয়ে যায় একটু-একটু, ধীরে-ধীরে সেই কালীদাসের মেঘরমণী ঘিরে ফেলে সমগ্র আকাশটাকে। অকস্মাৎ বাড়ির ভেতর থেকে অশ্রুসজল চোখে সতীষ বেরিয়ে আসে বার বারান্দায়। হিরালাল আশ্চর্যভাবে তাকিয়ে থাকে কয়েক মুহূর্ত, সতীষের ম্লান মুখের ওপর কিসের একটা কালো ছায়া পড়েছে, স্পষ্ট বোঝা না গেলেও অনুমানে আন্দাজ করা যায়, মেঘরমণীর ছায়া কি তাহলে সতীষের মুখের অবয়বে পড়লো এখন। হিরালাল বোকা নিস্তল অন্ধকারের মতো পাথর যেন, চোখ দুটো ফ্যাঁকাসে আর শীতল বরফ তার। সতীষ একসময় বললো সে কথা, কাজেরি নেই, আকাশের কোটি- কোটি তারকার মধ্যে কাজেরি ডুবে আছে, হারিয়ে আছে মহানন্দে। ওর কোনো কষ্ট নেই আর, অনেক-অনেক ভালোবাসা নিয়ে কিস্তিমাত করছে সে। হিরালালের কানে যেন বা কোনো কথা যায়নি, নির্বাক পুঁইগাছটার মাচার মতো নিরপরাধ পুঁচকে সতীষকে দেখে। কি যেন বা বলছে আরো কতো কি! সতীষ নদীর স্রোতের মতো কথা বলে, সব কথা কি শোনা যায়, অনেকটা সময় পরে বাড়ি থেকে সতীষের এক মামা বাইরে এলো। কতো কি যে বললো, হিরালালের কানে কিছুই তা গেলো না। বদ্ধ কালা এখন হিরালাল। কাজেরীর বড়দা বললো, কাজেরীকে আবার আমরা বিয়ে দিতে চেয়েছিলাম, কিন্তু সে কোনোভাবেই বিয়েতে মত দেয়নি...

সতীষের আরেক মামী ম্লান কালো মুখে বললো, তোমাকে যে এতোটা ভালোবাসতো জানতাম না কোনোদিন...

পড়শি এক মাসী অকস্মাৎ জানালো, আহা সোনার প্রতিমাকে চিনতে পারলে না বাছা, স্বামী ভক্তি ওমন নারী এ কলি যুগে লাখে মেলে না। আরেক বৃদ্ধা মহিলা বড় রকমের দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো, লাতিন আমার প্রায় বলতো গো সতীষের বাবার একদিন ভুল ভাঙবে, তখন আমি ফিরে যাবো দেখে নিয়ো তোমরা!

সতীষের বড় মামী বেশ গম্ভীর প্রকৃতির, সে রূপধারী আর বিদ্যাভরি বলে একটু ডাঁটও রয়েছে, অনেকক্ষণ পরে সে মহিলা অন্দরমহল থেকে এসে বাইরের উঠোনের দিকে মুখ বাড়িয়ে বললো, বেদ-মহাভারত রামায়ণে আমরা যে পঞ্চ সতী-সাব্বি নারীকে দেখি, তাদের চেয়ে অনেক বেশি সতী সাব্বি ছিলো কাজেরী, বিয়ের কথা উঠলেই হাউমাউ করে কেঁদে বলতো, সাপে কাঁটা লখিন্দরকে নিয়ে বেহুলা ভেলায় চড়ে কৈলাশের সর্পপুরীতে গিয়েছিলো এবং মৃত স্বামীর প্রাণ ভিক্ষা করে এনেছিলো নাচে-গানে মন-প্রাণ জয় করে...

একটু থেমে যায় আচমকা, তারপর কিছুটা কৌতূহল সৃষ্টি করে প্রসন্ন হাসি ছড়িয়ে আবার বললো, কাজেরী ওদের চেয়ে কোনো অংশে কম সতী মেয়ে ছিলো না, অহল্যা দেবরাজ ইন্দ্রকে দেহদান করেছিলো, তারাদেবী সুগ্রীবের অঙ্কশায়িনী হয় স্বামী বালিরাজার মৃত্যুর পর, কুন্তী তো বিয়ের আগেই কুমারীত্ব খুইয়ে ফেলে, রাবণপতœী মন্দোদরী দেবর বিভীষণের দেহলগ্না হয়,অথচ আমাদের কাজেরী আসলেই ছিলো সতী নারীর উৎকৃষ্ট উদাহরণ...কিছুক্ষণের মধ্যে সবার চোখে মেঘের ঘনঘটা লক্ষ্য করা যায়। অনেকটা সময় কেটে যায় একটু-একটু করে, একসময় সতীষের মেঝমামী ডুকড়ে কেঁদে ওঠে, কান্নাটা বড় বিদঘুটে আর হতচ্ছাড়া মনে হচ্ছিলো, এমন কান্নার ঢঙ দেখলে মন মেজাজ আপনা থেকেই বিগড়ে যায়, হিরালাল তবুও কিছুই বলতে পারে না। আপাতত মুখে কুলুপ দিয়ে থাকাই শ্রেয়ঃ, নয়তো হিতে-বিপরীত হওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে। হিরালালের একসময় মনে হয়, আর কি বা হিতে-বিপরীত হবে অথবা সর্ব্বনাশ হতে বাকি। কাজেরীর চলে যাওয়ার সঙ্গে-সঙ্গে সমস্ত সম্পর্ক চলে গেছে, এখন এখানে আর কি কারণে দাঁড়িয়ে থাকা, এরপর আর কি কথা বা থাকতে পারে। তামাম দুনিয়া অন্ধকারাচ্ছন্ন মনে হয় তার কাছে, একবার ক্ষুব্ধ গলায় প্রতিবাদে বিস্ফোরিত হতে অভিলাষ জাগে, কিন্তু ক্রমে শরীরের সমস্ত শক্তি কেমন নিস্তেজ আর গলিত হতে থাকে, নিজের মধ্যে নিজেই যেন সেঁধিয়ে যায় একটু-একটু, এরপর সতীষের মামা বললো, তারপরও আমরা বিয়ের জন্য চাপ দিতাম, একদিন আমাদের কাজেরী কড়িবর্গায় কাপড় পেঁচিয়ে...আর বলতে পারে না। কণ্ঠনালী যেন বা রুদ্ধ হয়ে আসে তার। হিরালালও আর শুনতে চায় না। এরপর না এরপর আর কিছুই শোনার খায়েশ নেই তার। তাছাড়া আর কি ই বা থাকতে পারে। মনে-মনে ভাবে বদ্ধ পাগল বা অন্ধেরা বড় ভাগ্যবান, পৃথিবীর অনেক কিছু তাদের হিসাবের মধ্যে থাকে না। এমন কি দেখতেও হয় না। ধর্মের নামে অধর্মের জয়-পরাজয় মানুষকে কুরে কুরে খাচ্ছে দিবানিশি এবং এভাবেই দিশেহারা প্রাণীকূল নিমেষে কখনো নিস্প্রাণ কখনো সজীব হয়ে ক্ষীণ অথবা গাঢ় স্বচ্ছ আলোর সমুদ্রে কল্পনার ইন্দ্রজাল রচনা করে চলছে। (চলবে)

প্রকাশিত : ২৬ জুন ২০১৫

২৬/০৬/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: