কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৩ ডিসেম্বর ২০১৬, ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শনিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

কবি শামসুর রাহমানের গণমানুষ চেতনা

প্রকাশিত : ২৬ জুন ২০১৫
  • শুকদেব চন্দ্র মজুমদার

শামসুর রাহমানের বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের একেবারে প্রথম দিকের কবিতা ‘কয়েকটি দিন : ওয়াগনে’, যেখানে তাঁর গণমানুষ চেতনার প্রখর রূপটির প্রায় প্রথম সন্ধান লাভ করা যায়। ‘পূর্ব পাকিস্তান সরকারের দাক্ষিণ্যে পরিত্যক্ত ও অকেজো রেলওয়ে ওয়াগনে’ বিহারের বাস্তুহারা একটি পরিবার যেভাবে মানবেতর জীবনযাপন করছিল তার মর্মস্পর্শী বর্ণনা দিয়েছেন তিনি কবিতাটিতে। সে বর্ণনারই কিয়দংশ হলো : ‘বোনের কান্না! বৃদ্ধ পিতার ভীষণ কাশি!/ক্লান্ত রাত্রে ট্রেনের শব্দে ঘুম আসে না!/কয়লার গুঁড়ো আকাশে ছড়ায়। ক্ষীণ আকাশ।/অনেক স্বপ্ন ঢাকা পড়ে গেছে ধুলার চাপে।’

শান্ত অপরাহ্ণ স্বর্গ-শিশির চাঁদ ফুল পাখি ইত্যাদির ভিড়েও তাঁর চোখ আটকে যায় এক সময় ফুলের কাঁটা বা কীটের দিকে, চাঁদের কলঙ্কের দিকেÑযখন জোছনায় কবি দেখে ফেলেন অন্য রকমের দৃশ্য। দেখেন মারী ও মড়কে পুড়ে গেছে শুভবোধের শাখা-প্রশাখা, দেখেন অন্ন-বস্ত্রহীন মানুষের করুণ রূপ : ‘খাঁ-খাঁ জ্যোৎস্নায় নগ্নিকা দেখি/শুকোতে দিচ্ছে ছেঁড়া শাড়ি তার।/বিশীর্ণ শিশু ঘন ঘন করে /মায়ের শূন্য হাতের তালুতে দৃষ্টিপাত।’

শামসুর রাহমান তাঁর দ্বিতীয় কাব্যেই কতখানি মাটির কাছাকাছি সরে এসেছেন তা বোঝা যায় তাঁর ‘খুপরির গান’ কবিতাটি থেকে। ময়লা চাদর, ছারপোকা, ইঁদুরের উৎপাত আর বমিময় অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে বদ্ধ ঘরে অনিদ্রা দুঃস্বপ্ন আর মাথাব্যথাসহ বস্তির জীবনযাপনের বাস্তবতা তাঁর কবিতায় উঠে এসেছে। কবিতাটির কিছু অংশ এমন : ‘বমির নোংরায় ভাসে মেঝে, রুটির বাদামি টুকরো /চড়ুই পালাল নিয়ে। তাকাব না কখনো বাইরে.../ঘরে জানলা নেই...হলুদ যেসাস বিদ্ধ কড়িকাঠে.../রৌদ্রঝলসিত কাক ওড়ে মত্ত রক্তে কাঠফাটা/আত্মার প্রান্তরে। সারারাত/অনিদ্রা দুঃস্বপ্ন আর/ছারপোকা, ছিদ্রান্বেষী ইঁদুরের উৎপাত উজিয়ে/ময়লা চাদর ছেড়ে উঠি ফের মাথাব্যথা নিয়ে।’ একই কাব্যের ‘তিনটি বালক’ কবিতায় ক্ষুধার্ত তিনটি বালকের ক্ষুধার স্বরূপ, খাদ্যান্বেষণ ও স্বপ্নের কথা বলেছেন কবি। উদ্ধৃতি দিয়ে কথাগুলো জানানো যাক : ‘রুটির দোকান ঘেঁষে তিনটি বালক সন্তর্পণে/দাঁড়ালো শীতের ভোরে, জড়োসড়ো। তিন জোড়া চোখ/বাদামি রুটির দীপ্তি নিল মেখে গোপন ঈর্ষায়।/রুটিকে মায়ের স্তন ভেবে তারা, তিনটি বালক.../মাঝে-মাঝে স্বপ্ন দেখে : ম্লান কুয়াশায়/এক ঝাঁক ঘুঘু নামে পূর্বপুরুষের/সম্পন্ন ভিটায়।’

কৃষিজীবী শ্রমজীবী মানুষের প্রতি কবি একইভাবে আন্তরিক দৃষ্টি দিয়ে তাদের কঠিন জীবন সংগ্রামের অকৃত্রিম চিত্র তুলে ধরেছেন তাঁর কবিতায়। কৃষিজীবী মানুষের দুঃখ এ দেশে তেমন করে কোন কালেই দূর হয়নি। এখনও তারা সারের জন্য, ভাল বীজের জন্য লড়াই করে। ধান মাড়াইয়ের সঙ্গে সঙ্গে যেন তারা জীবনটাকেই মাড়াই করে চলে ক্রমাগত। জোছনা আসে যায় নিয়ত, কিন্তু তাদের জীবনে কম-বেশি অমাবস্যাই লেগে থাকে যেন। পূর্ণিমা রাতের জন্য প্রত্যাশা তাই তাদের কখনও থামে না। কৃষকদের জীবনের এ ট্র্যাজেডি শামসুর রাহমানকে আহত করেছে, অকৃত্রিম হয়ে যা ফুটে উঠেছে তাঁর এ বয়ানে : ‘ওর দিন কাটে মাঠের কাজে। লাঙল ঠেলে/চিরে ফেলে মাটির বুক, বীজ বোনে,/সে, রৌদ্রের আঁচে ভাজা ভাজা,/নিড়ায় আগাছা আর দ্যাখে ওই আসছে আল বেয়ে/গামছা-বাঁধা ডাল-ভাত টুকটুকে লঙ্কা নুন নিয়ে নথ-পরা বউ।/ভাবে, কখন আসবে পূর্ণিমা রাত,’...

আল বেয়ে আসতে থাকা নথ-পরা বউ-এর স্বপ্নের নথিপত্র ঘাঁটাঘাঁটি করেও যে একসময় একজন কৃষকের কমবেশি স্বপ্নের প্রয়াণ ঘটে, পূর্ণিমা রাতের জন্যে তার কাতরতার বাস্তবতা তা ব্যক্ত করে। কৃষিজীবী মানুষের এ মাটি-নির্ভর জীবনালেখ্যের সঙ্গে অনেকটা তুলনীয় শ্রমজীবী মানুষ কুমোরদের জীবনালেখ্য। তবে তাদের উৎপাদন প্রক্রিয়া বিভিন্ন। কিন্তু কষ্ট দারিদ্র্য আর নিঃস্বতার দিকে থেকে তাদের মধ্যে তেমন কোন পার্থক্য নেই। কুমোরদের শ্রম আর নিঃস্বতার কারুণ্য কবিকে স্পর্শ করেছে। আর তাই এমন কবিতা তাঁর কলমের আঁচড়ে জন্ম নিয়েছে : ‘কি শীত কি গ্রীষ্ম/ঘোরে চাকা, চকচকে, গড়ে ওঠে ঢের/ঘটিবাটি, হাঁড়িকুড়ি নানান ছাঁদের/হাতের খানিক চাপে। একান্ত আপন তার হাত,/নিশ্চিত জানে সে জগন্নাথ।/ রতেœর ঝলক বুকে সারাক্ষণ, অথচ কী নিঃস্ব!’ জগন্নাথ হয়ত নিশ্চিত জানেন তাদের শ্রমশিল্পের মৌলিকতা সত্যতা ও আন্তরিকতার কথা, কিন্তু তিনি কোন প্রতিকার করেন না তাদের অভাব বা নিঃস্বতার, মূল্যায়ন করেন না তাদের শিল্পতৃষ্ণার। মৃন্ময়ী মাঝের চিন্ময়ীর এমন আচরণ তাদের বোধগম্য নয়। অন্য দিকে শিল্পজ্ঞানহীন বড়লোকের রয়েছে অঢেল ধন-সম্পত্তি, যা দেখে তাদের চোখে জাগে বিস্ময়। কবির দৃষ্টিও অনেকটা তেমনই, কারণ তিনি বড়লোকের বিত্তময় ঝকঝকে শহরের পাশে তাঁর পিতার বিত্তহীন গ্রামের কথা ভাবেন। যদিও মানবিক আভার বিচ্ছুরণে সে নিভৃত লোকালয় অতুলনীয়, তবুও শহুরে নিয়ন আলোর আভার কাছে সে বিচ্ছুরণ যেন খেই হারিয়ে ফেলেÑএমন মনে হয় কবির কাছে মাঝে মধ্যে। মনে হয় তাঁর কাছে গ্রামটি যেন মনমরা নিষ্প্রভÑ প্রবল হাওয়ায় ‘কম্পমান নিবু-নিবু দীপ।’ এমন মনে হওয়া তাঁর ‘আমার পিতার গ্রাম’ নামের কবিতাটিতে ধরা পড়েছে; কবিতাটির কিছু অংশ এমন : ‘উড়ে উড়ে চখা ঢোকে আমার ভেতরে সাবলীল;/স্মৃতির দেয়ালি জ্বলে এবং আমাকে/ঘিরে থাকে কবেকার হাহাকার। দূর থেকে দেখি/আমার পিতার গ্রাম অতিশয় প্রবীণ আঁধারে/ অনন্তের উৎস থেকে উঠে-আসা প্রবল হাওয়ায়/ কম্পমান নিবু-নিবু দীপ।’

কবির ভেতরে উড়ে উড়ে চখা ঢোকে, কিন্তু বাস্তবতা হলো কবি হলেন জন্ম-শহুরে। শহরের মায়া-মোহ ভালো-মন্দ এবং অবক্ষয়ের রূপ তাঁর জানা আছে। কবিতায় অবক্ষয়বাদী চেতনার রূপায়ণ সম্পর্কে সমর সেনের ভাষ্য হলো : ‘অবক্ষয় বিষয়ে সচেতনা এক ধরনের শক্তি কিন্তু এমন একটা সময় আসছে যখন সেই শক্তিটুকু দিয়ে চলবে না। তখন মনস্থির করতে হবে। যে কবি তাঁর ব্যক্তিসত্তা অটুট রাখতে পেরেছেন গণ-আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে যোগ দিলে তাঁর উপকার নিশ্চয় হবে।’ শামসুর রাহমান অনেক আন্দোলন সংগ্রামে সরাসরি যোগ দিয়েছেন। সমর সেনের কবিতায় যুগের অন্ধকার ক্লান্তি, হতাশা, অশান্তি, লাম্পট্য, সংস্কার-কুসংস্কার ও ক্লিন্ন পরিবেশের কথা যেমন এসেছে, শামসুর রাহমানের অনেক কবিতায়ও অনেকটা তেমনভাবেই এসেছে। যেমন : ‘এ শহর সাদা হাসপাতালের ওয়ার্ডে কেবলি/এপাশ ওপাশ করে, এ শহর সিফিলিসে ভোগে,/এ শহর পীরের দুয়ারে ধরনা দেয়, বুকে-হাতে/ঝোলায় তাবিজ তাগা, রাত্রিদিন করে রক্তবমি,/এ শহর কখনো হয় না ক্লান্ত শবানুগমনে।’

নাগরিকদের জীবন যাপিত হয় সাধারণত ধনতান্ত্রিক বা পুঁজিতাড়িত সমাজের ক্লেদ ক্লেশ আর অবক্ষয়ের মধ্যে, যেখান থেকে নিষ্কৃতি পান না মধ্যবিত্ত সমাজের পেশাজীবী বা চাকরিজীবীরাও। তাঁরাও অর্থের দিকে ক্রমাগত ধাবিত হয়ে হাঁপিয়ে ওঠেন, অথচ দু-তিন শ’ টাকার মোহ বা মায়াময় শেকল তাঁরা ছিঁড়তে পারেন না কখনও, কেননা কষ্টের সংসার, অনেকটা গোলামির সঙ্গেই তুলনীয় পেশাগত জীবনের কারাগার থেকে অবমুক্তি লাভ করে তাঁরা যাবেন কোথায়? ফলে স্বতঃস্ফূর্ততাহীন এক জীবন নিয়ে তাদের থাকতে হয়। সে জীবনেরই অবিকল বর্ণনা দিয়েছেন কবি ‘তিনশো টাকার আমি’ নামক একটি কবিতায়, যেটির কিছু অংশ এরূপ : ‘আখেরে হলাম এই? আর দশজনের মতন/দৈনিক আপিস করা, ইস্ত্রি করা কামিজের তলে/তিনশো টাকার এই পোষমানা আমিকে কৌশলে/বারোমাস ঝড়ে জলে বয়ে চলা যখন-তখন?/এই আমি? এবং প্রভুর রক্তনেত্র সারাক্ষণ/জেগে রয় ঘানিটানা জীবনের চৌহদ্দিতে; ফলে/ঠা-া চোখে ঠুলি এঁটে দশটা-পাঁচটার জাঁতাকলে/অস্তিত্বকে চেয়ে দেখি নিখুঁত গোলাম, নিশ্চেতন।’ তাই ঝকমকে শহর মখমলময় কোন বোধ বা উপলব্ধি সৃষ্টি করে না অন্তত নিম্নমধ্যবিত্ত মানুষের মনের গহীনে। জীবনবৃত্তে তা কোন স্বস্তির সংবাদ নিয়ে আসে না। এমন একটি অবস্থাতেই কবির মনে আসে আত্মক্লেদ। অসমঞ্জস প্রতিবেশের সঙ্গে এভাবে কবি নিজেকে না মেলাতে পেরে আলাদা হয়ে যান। শামিল হতে পারেন না সহসা সাধারণ্যে, বরেণ্য হিসেবে গ্রহণ করতে পারেন না অনেক মানুষের চিন্তা-চেতনা ও কর্মকা-ক। অবশ্য তন্ময় রহস্যানুসন্ধানী একটি মনÑ বোধ-অনুভূতি-এষণাও তাঁর এজন্যে দায়ী। এমন আপন মনোগত অবস্থা ও সামাজিক অবস্থানকে তিনি বর্ণনা করেছেন এভাবে : ‘ভাস্করের অসম্পূর্ণ মূর্তির মতন ঘুরে ফিরি।/উল্লোল নগরে কত বিলোল উৎসবে; কিন্তু তবু/পারি না মেলাতে আপনাকে প্রমোদের মোহময়/বিচিত্র বিকট স্বর্গে। বিষাক্ত ফুলের মতো কত।/তন্ময় রহস্য জ্ব’লে ওঠে আজও দু’চোখে আমার।’ স্বাধীনতা পরবর্তী নব্য লুটেরা সম্প্রদায় বুর্জোয়া ব্যবস্থারই অনিবার্য পরিণতি। সে পরিণতির কারণেই শ্রমজীবী মানুষের ক্লেদাক্ত জীবনের কাহিনী শেষ হয়নি। অবশ্য স্বাধীনতা প্রাপ্তির পর থেকে শ্রমজীবী কৃষিজীবীসহ সাধারণ মানুষের সে কাহিনী শেষ করার জন্য একের পর এক নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছিলÑ এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই; সে প্রেক্ষাপটেই বঙ্গবন্ধু আকস্মিকভাবে নিহত হন। লুটেরাদের লুণ্ঠন তাই থামেনি; সে লুণ্ঠনচিত্রই কবি অঙ্কন করেছেন এভাবে : ‘দুঃস্বপ্নে বাঁচাই সার, অগণিত অজ্ঞাত করুণ/কংকালে শিউলি ঝরে। দেশব্যাপী লুটেরা জোচ্চোর/স্ফুর্তিতে বিহ্বল; কেউ কেউ ওরা ভাটিয়ালি গায়,/অনেকে ট্যাঙোর তালে কোমর দোলায়, কখনোবা/চাটি মারে পরস্পর, স্বদেশী বর্গীরা দেয় হানা/পাড়ায় পাড়ায়, কখন যে কার থলে থেকে, হায়,/বেড়াল বেরিয়ে পড়ে আচমকা।’...

আচমকা বেরিয়ে পড়া বেড়ালকে আবার চমৎকার করে থলেতে পুরে রাখার জন্যে আসে সামরিক শাসন। তখন আদর্শ হয় বিনষ্ট ফলের মতো। সৎ-অসতের ভেদাভেদ হয় লুপ্ত। উত্থান ঘটে নব্য ক্রোড়পতিদের। নিঃস্ব হতে থাকে আরও নিঃস্বরা। উদ্ভট উটের পিঠে চলতে থাকে স্বদেশ। সে স্বদেশের অবস্থা চাঁদ সদাগর বর্ণিত চম্পক নগরের অবস্থার সদৃশ। কবি-বর্ণিত সে অবস্থা হলো : ‘নারীর শ্লীলতাহানি করে না অবাক কারুকেই।/সৎ অসতের ভেদাভেদ লুপ্ত, মিথ্যার কিরীট/বড় বেশি ঝলসিত দিকে দিকে, লাঞ্ছিত, উদভ্রান্ত/সত্য গেছে বনবাসে। বিদ্বানেরা ক্লিন্ন ভিক্ষাজীবী,/অতিশয় কৃপালোভী প্রতাপশালীর। নব্য কত/ক্রোড়পতি করে ক্রয় সাফল্যের অন্দর বাগান,/দরিদ্র অধিকতর দরিদ্র হবার ফাঁদে পড়ে/কাঁদে, করে করাঘাত দিনরাত সন্ত্রস্ত কপালে’। অন্ন বস্ত্র বাসস্থান শিক্ষা চিকিৎসাÑএসবের বঞ্চনা থেকেই সমাজে শ্রেণীবিভক্তির রেখা গাঢ়তর হতে থাকে, শ্রেণীচেতনা ও শ্রেণীসংগ্রাম উদ্ভূত হয়। এ শ্রেণীসংগ্রাম ও পুঁজিবাদী শোষণ-নিগ্রহ, বঞ্চিত মানুষের খাদ্যসমস্যা, ক্ষুধা ইত্যাদি শামসুর রাহমানের কবিতায় বিভিন্ন মাত্রায় প্রকাশিত হয়েছে। কয়েকটি উদাহরণ প্রসঙ্গক্রমে তুলে ধরা যেতে পারে: ‘দেখতে পাচ্ছো না, সাত ঘাট থেকে চেয়ে-চিন্তে-আনা/হে ব্যর্থ অন্নপূর্ণা,/যে, তোমার সন্তানের পাতের ভাত খায় সাত কাকে।’

শামসুর রাহমান ছিলেন গণমানুষ, সমাজ ও রাজনীতি সচেতন কবি, যদিও তিনি কোন রাজনৈতিক দলে সরাসরি যুক্ত ছিলেন না, বা কোন দলের অন্ধ সমর্থক ছিলেন না। তাঁর এসব সচেতনতা বা চেতনা মূলত একে অপরের পরিপূরক, একই মুদ্রার এপিঠ ওপিঠের মতো। সমাজমনস্ক হয়ে কখনও তিনি প্রথাগত সমাজের বিরুদ্ধে কথা বলেছেন, কখনও সমাজের অন্যায়-অবিচার, কুসংস্কার, ক্লেদকে উচ্চকিত করে তার অপনোদন চেয়েছেন। তিনি অবক্ষয়িত সমাজ-রাজনীতির কথা বলতে গিয়ে কখনও ব্যঙ্গ করেছেন, কখনও নিজেই ক্ষতবিক্ষত হয়ে ঘৃণার তীর ছুঁড়েছেন। তাঁর কবিতায় ক্ষয়িষ্ণু মূল্যবোধের কথা, নষ্ট সমাজব্যবস্থা, নষ্ট রাজনীতি ও নষ্ট মানুষের কথা বার বার উঠে এসেছে; তাই বলে তিনি স্পষ্ট করে কখনও আশাবাদের কথা বলেননিÑতা নয়। তিনি যে মূলত রোমান্টিক কবি ছিলেন, তা তার অনেক আশাবাদের কথাতেই পরিস্ফুট হয়ে উঠেছে। রোমান্টিক বলেই বাস্তবতার নানা নষ্টামির আঁচ তিনি সহ্য করতে পারতেন না। তাই সমাজ-রাজনীতির ত্রুটিগুলো অতি সহজেই তাঁর চোখে পড়ত। এ চোখে পড়ার পেছনে আরও একটি কারণ রয়েছে, কারণটি হলো, তিনি ছিলেন সত্য সুন্দর মঙ্গল ও কল্যাণের কবি। তিনি ছিলেন শুভবাদের কবি। তাঁর মনের মতো সমাজকে তিনি কেবলই খুঁজে বেড়াতেন এ দেশে। আর তা করতে গিয়েই তিনি তাঁর কবিতার এক বড় অংশকে এ দেশের কেবল গণমানুষের ইতিহাস নয়, সামাজিক রাজনৈতিক সাংস্কৃতিক ইতিহাসের এক মিনি আর্কাইভে পরিণত করেছেন।

প্রকাশিত : ২৬ জুন ২০১৫

২৬/০৬/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: