আংশিক মেঘলা, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৭ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, বুধবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

সর্বস্তরে চাই সংযম

প্রকাশিত : ২৬ জুন ২০১৫
  • মেধা নম্রতা

রোজা হচ্ছে একটি ফার্সি শব্দ। এই শব্দের আরবি অর্থ সিয়াম। বাংলা করলে দাঁড়ায় কোন জিনিস থেকে নিজেকে বিরত রাখা বা থাকা। রমজান মাসটি মুসলমানদের জন্য সিয়ামের মাস। অর্থাৎ এই মাসটিকে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন মুসলমানদের সুবহে সাদিক বা ফজরের আযানের আগে থেকে সূর্যাস্ত বা মাগরিবের আযান পর্যন্ত পানাহার, পাপাচার থেকে বিরত থাকতে নির্দেশ দিয়েছেন। এই বিরত থাকাই হচ্ছে- রোজা বা সিয়াম পালন করা। মুসলমানদের জন্য এটি একটি অবশ্য পালনীয় ধর্মীয় কাজ। অর্থাৎ ১২ বছরের উর্ধে মুসলমান নর-নারীর ওপর রোজা পালন ফরজ।

গত ১৯ জুন বাংলাদেশে রোজা শুরু হয়েছে। ধর্মপ্রাণ প্রতিটি মুসলমান অত্যন্ত পবিত্র মনে রোজা পালন করছে। এই মুসলমানদের মধ্যে গরিব, দিনমজুর খেটেখাওয়া মানুষও যেমন রয়েছে, তেমনি আছে নিম্নবিত্ত, মধ্যবিত্ত মুসলমান ও ধনী লোকজন। আল্লাহর সন্তুষ্টি এবং তাঁর প্রিয়তা অর্জনের জন্য যারা রোজা করছে, তারা কি মাহে রমজানের পবিত্র উদ্দেশ্যকে মেনে তবেই রোজা রাখছে? সুরা বাকারার ১৮৩ নম্বর আয়াতের শেষে আল্লাহ বলেছেন, লা’আল্লাকুম তাত্তাকুন যার অর্থ আল্লাহ ভীতি বা তাকওয়া অর্জন করতে পারা। কিন্তু কিভাবে এটি সম্ভব? এই মাসে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যের দাম নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। গরিবের খাবার চাল, আলু, সবজি, পেঁয়াজ ধরাছোঁয়া যায় না। ধনী মুসলমানদের জন্য এই মূল্য হয়ত তেমন কিছুই না। কিন্তু সাধারণ আয়ের মুসলমান, গরিব, এতিমদের জন্য এই মূল্য কষ্টকর। তাদের আয় রোজার মাসের আগেও যা ছিল, তাই আছে। এই ব্যবসায়ীরাও রোজা করছে, কিন্তু তারা কয়েকগুণ লাভের জন্য খাদ্যদ্রব্যের মূল্য বাড়িয়ে দিচ্ছে রোজা বা সিয়ামের মূল উদ্দেশ্যকে পাত্তা না দিয়ে। রোজার উদ্দেশ্য পালনের ক্ষেত্রে পরিষ্কার বলা হয়েছে, সিয়াম সাধনাকালে আমাদের মাঝে যেন কোন প্রকার কুপ্রবৃত্তি বাসা বাঁধতে না পারে। বাংলাদেশের দৈনিক কাঁচাবাজার একবার পরিদর্শন করলেই আমরা বুঝতে পারব, সিয়াম সাধনায় আমরা কতখানি সিয়াম পালন করছি।

রাসূল (সা.) আরও বলেন, রোজা মানুষের জন্য ঢালস্বরূপ। যুদ্ধের ময়দানে ঢাল যেমন প্রতিপক্ষের আঘাতকে প্রতিহত করে, রোজাও ঠিক তেমনি আমাদের বাস্তব জীবনে শয়তানের কুমন্ত্রণা থেকে ফিরিয়ে রাখে। প্রশ্ন থেকেই যায়, এই পবিত্র সিয়ামের মাসে ব্যবসায়ীদের অধিক লাভের মানসিকতা কতটা সুপ্রবৃত্তিসুলভ? একটি গরিব নিম্নবিত্ত-মধ্যবিত্ত রোজাদার বা সিয়াম পালনকারী মুসলমানদের অতি উচ্চমূল্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যসামগ্রী কিনতে বাধ্য করা কি রোজা পালনের উদ্দেশ্য? এই রমজানে মিথ্যচারিতা, সুদ, ঘুষ, অতিরিক্ত মুনাফা বা লাভ ইত্যাদি থেকে বিরত না থাকতে পারলে, দিনভর না খেয়ে থেকে পিপাসার কষ্ট নিয়ে উপোস থাকার কোন যুক্তি নেই। এ সম্পর্কে রাসূল (সা.) বলেন, যে ব্যক্তি রোজা রাখা সত্ত্বেও মিথ্যা কথা বলা, নিষিদ্ধ কাজ ত্যাগ করতে পারল না, অযথা তার পানাহার বর্জন করে উপবাস থাকার কোন প্রয়োজন নেই (বুখারী)।

আমরা কতকিছুর জন্য সরকারের ওপর চাপ প্রয়োগ করে সরকারকে ব্যতিব্যস্ত করে তুলি, অথচ সিয়ামের মাস রমজান এলে খাদ্যদ্রব্যের লাগামছাড়া মূল্যবৃদ্ধি রোধের জন্য সরকারের ওপর কোন চাপ সৃষ্টি করি না। সরকার নিজে থেকেই বাজার মূল্য নির্ধারণ করে দেয়, যদিও ব্যবসায়ীরা মোটেই তা মান্য করে না বা মান্য করতে বাধ্য থাকে না। বাংলাদেশে সারা বছর স্থায়ী বাজার মনিটরিং ব্যবস্থা করা হয় না। আর এই মাসে তো আরও ছাড় পায় ব্যবসায়ীরা। যার যেমন খুশি দাম বসিয়ে যতখুশি লাভ তুলে নেয় সাধারণ কাস্টমারের চামড়া ছিলে। তাই রোজা করে সিয়ামের কষ্ট পায় কেবল সাধারণ সিয়ামকারী বা রোজা পালনকারীরা।

আরও একটি লক্ষ্যণীয় বিষয়, রোজা পালনকারীদের সেহ্রি আর ইফতারিতে কি কি খাবেন আর কি কি খাবেন না, সে বিষয়ে নানা মিডিয়ায় নানারকম সাজেশন, উপদেশ, নিষেধ, কৌশল, পদ্ধতি শেখানো হচ্ছে। অথচ ইফতারির টেবিল উপচে পড়ছে খাদ্যসামগ্রিতে। কত রকমের খাবার। সারা দিনের শেষে এ রকম একটি নানা রকমের সুস্বাদু খাদ্যদ্রব্য ভর্তি টেবিল দেখতে কার না ভাল লাগে। কিন্তু রোজা বা সিয়ামের উদ্দেশ্য কি এই টেবিল? রোজা পালনকারীরা কি সারা দিন বাদে এ রকম একটি খাদ্যদ্রব্য ভর্তি টেবিলের জন্য অপেক্ষা করে রোজা পালন করে? সারা দিন রোজা থেকে কি আমরা একবারের জন্যও অনুভব করতে পারি না, দেশের কত মানুষ অভুক্ত অবস্থায় রোজা করছে। কিংবা সামান্য খেয়ে মহান আল্লাহর প্রিয় বান্দা হতে চেষ্টা করছে! এই কি ইসলামের শিক্ষা? অথচ ইসলামে পরিষ্কার বলা আছে কেবল একা খেয়ে পরিতৃপ্ত হলে আল্লাহর প্রিয় বান্দা হওয়া যাবে না। সেই প্রিয় বান্দা, যে কিনা তার খাবার থেকে দীন-দরিদ্র আত্মীয়স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশী, চেনাজানা মানুষকে দিয়ে নিজে অন্ন গ্রহণ করে। ইফতারির সময় বিত্তবানদের এই খাদ্য ভর্তি একটি টেবিলে যা থাকে, তা এই দেশের কয়েকটি দরিদ্র পরিবারের প্রতিদিনের ক্ষুধার গ্রাস। কত মানুষ খেতে পায় না। অনেক মহিলা আছে যারা সকাল থেকে ইফতারির আয়োজন নিয়ে ব্যস্ত থাকে। অনেক পুরুষ আছে, তারা সারা দিন বাদে খাদ্যদ্রব্য ভর্তি টেবিল না দেখলে রেগে যায় বা অসন্তুষ্ট হয়। অথচ রোজা পালনকালে এই চেতনা আমাদের একবারও হয় না, যে মানুষরা খেতে পায় না তাদের কষ্ট অনুভব করার জন্যই একমাসের এই রোজা বা সিয়াম। এই একমাস রোজা পালন করে অনাহার অর্ধাহারে যারা বাঁচে, তাদের কষ্টকে বাস্তবে কিছুটা হলেও অনুভব করা যায়। তাদের সমব্যথী হয়ে এই একটি মাস মুসলমানরা কি সামান্য বিরত থাকতে পারে না প্রাচুর্য থেকে? বিশ্বের ধনী-গরিব প্রত্যেক মুসলমান এক সময়ে সেহ্রির খাবার খেয়ে রোজা পালন করে। আবার একই সময়ে ইফতারি ভঙ্গ করে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করে। অথচ সেহ্রি ও ইফতারি খাবার ব্যাপারে মুসলমানদের মধ্যে কোন সমতা নেই। নেই কম খেয়ে গরিবের কষ্ট বোঝার মতো মন ও মানসিকতা। রমজান মাসে সংযম পালন করাই হচ্ছে আসল কথা। রোজা আমাদের পূর্ব পুরুষদের জন্যও অবশ্য পালনীয় ছিল। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, হে ঈমানদারগণ! তোমাদের ওপর রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেরূপ ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদের ওপর, যেন তোমরা পরহেজগারী অর্জন করতে পার। [২ : ১৮৩] জ্ঞানে বুদ্ধিতে প্রাপ্তবয়স্ক প্রত্যেক নর-নারীর জন্য আল্লাহ রোজা করার নির্দেশ দিয়েছেন। রোজা বা সিয়াম করার মাধমে তিনি প্রতিটি মুসলিম নর-নারীকে তাকওয়া বা আল্লাহ ভীতি অর্জনের নির্দেশ দিয়েছেন। সত্যিকারভাবে এই ভীতি না থাকলে মানুষ আল্লাহর সান্নিধ্য লাভ করতে ব্যর্থ হবে। ইসলাম ধর্মে মানবতা বা ইনসানিয়াত হচ্ছে মূলভিত্তি। মানুষের জন্য এই পৃথিবী। তাই রমজানের এই পবিত্র মাসে ধনী-গরিব প্রত্যেকে পরস্পর-পরস্পরের কথা সহানুভূতির সঙ্গে বিবেচনা করে আল্লাহর সন্তুষ্টি পাওয়ার জন্য রোজা রাখা বাঞ্চনীয়। রমজান মোবারক হোক।

লেখক: বেসরকারি কলেজের শিক্ষিকা

প্রকাশিত : ২৬ জুন ২০১৫

২৬/০৬/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: