মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
১১ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, রবিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

সাগরের রং কেমন

প্রকাশিত : ২৬ জুন ২০১৫
  • এনামুল হক

বিশ্বের স্বানামধন্য কবি-সাহিত্যিকরা একেকজন একেকভাবে সাগরের বর্ণনা দিয়েছেন। জেমস জয়েসের ভাষায়, সমুদ্রের রঙ গাড় সবুজ। লর্ড বায়রন বলেছেন, স্রেফ ঘন নীল। হোমারের মতে, ‘মদ্যের মতো কৃষ্ণ’।

কিন্তু আমাদের বাস্তব অভিজ্ঞতায় বলে, সাগর-মহাসাগরের কোন নির্দিষ্ট ও স্থায়ী রঙ নেই। স্থান কাল অনুযায়ী এই রঙের লক্ষণীয় ভিন্নতা ঘটতে পারে। উজ্জ্বল ফিরোজা থেকে শুরু করে শ্বেতাভ সবুজ, উজ্জ্বল বিশুদ্ধ নীল, ঘন নীল, ধূসর এবং ময়লা বাদামি পর্যন্ত হতে পারে। অথচ আমরা সবাই এমন ধারণা নিয়েই বেড়ে উঠি যে, সমুদ্রের রঙ নীল।

সমুদ্রের রঙের যে তারতম্য ঘটে, তার জন্য দায়ী হলো পদার্থবিজ্ঞান ও জীববিজ্ঞান। বিশুদ্ধ পানির রঙ স্বচ্ছ। তবে পানি যদি এমন গভীর হয় যে, সাগর তলদেশ থেকে আলো প্রতিফলিত হতে না পারে, তাহলে সাগরের পানির রঙ ঘন নীল দেখায়। এর পেছনে পদার্থবিজ্ঞানের কিছু মৌলিক নিয়মসূত্র কাজ করে।

মানুষের চোখে এমন সব কোষ থাকে, যা ৩৮০ থেকে ৭০০ ন্যানোমিটারের ওয়েভলেনথের তড়িৎ চুম্বকীয় বিকীরণ নির্ণয় করতে পারে। এই ব্যান্ডের মধ্যকার বিভিন্ন ওয়েভলেনথের কারণে আমরা রঙধনুর বিভিন্ন রঙ দেখতে পাই। পানির মলিকুলগুলো দীর্ঘতর ওয়েভলেনথে আগত আলো অর্থাৎ লাল, কমলা, হলুদ ও সবুজ আলো ভালভাবে শুষে নিতে পারে। কিন্তু স্বল্পতর ওয়েভলেনথের নীল আলো তেমন শুষে নিতে পারে না। নীল আলো তেমন শোষিত হয় না বলে সেটা পানির অনেক গভীরে চলে যেতে পারে এবং তার ফলেই গভীর জলরাশিকে অধিকতর নীল দেখায়।

স্বল্প ওয়েভলেনথের আলোর বিক্ষিপ্তভাবে ছড়িয়ে পড়া কিংবা বিভিন্ন দিকে সরে যাওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে। এর ফলে তা পানি থেকে আমাদের চোখের দিকেও সরে আসতে পারে, যার কারণে সমুদ্রকে নীল দেখায়। তবে এখানেও কথা আছে। সাগরজলের বিশুদ্ধতার তারতম্য হয়। সাগরজলে মিশে থাকা ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র বস্তুকণা আলোর ছড়িয়ে পড়ার প্রক্রিয়াটি বাড়িয়ে দিতে পারে। নদ-নদী থেকে সাগরে বাহিত কিংবা তরঙ্গ ও ঝড়ঝঞ্ঝায় সাগর তলদেশ থেকে উর্ধে উৎক্ষিপ্ত বালুরাশি ও পলির কারণে উপকূলীয় জলরাশির রঙ প্রভাবিত হতে পারে। আবার কঠিন বস্তুর সঙ্গে ঘর্ষণে ক্ষয়প্রাপ্ত জৈব বস্তু যেমন উদ্ভিদদ্রব্য সবুজ, হলদে বা বাদামি বর্ণ যোগ করে সাগর জলরাশির রঙকে জটিল রূপ দিতে পারে। অন্যদিকে আবার ফাইটোপ্লাঙ্কটন দৃশ্যমান আলোর বর্ণালীর লাল ও নীল অংশগুলোতে তড়িৎ চুম্বকীয় বিকীরণ শুষে নিয়ে থাকে।

সাগরজলের রঙ কেমন হবে তার পেছনে এভাবেই পদার্থবিজ্ঞান ও জীববিজ্ঞান কাজ করে। তবে জীবজ্ঞানের ভূমিকাটি অধিকতর বড় বা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সাগরজলের রঙ নির্ধারণে সবচেয়ে বড় প্রভাব রাখে ফাইটোপ্ল্যাঙ্কটন নামে অভিহিত অতি ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র জীব। সাধারণত আলপিনের মাথার চেয়েও আকারে ছোট এসব এককোষী এ্যালজি পানি ও কার্বন-ডাই-অক্সাইডকে তাদের দেহ গঠনকারী জৈব যৌগ উপাদানে রূপান্তরিত করতে সূর্য থেকে প্রাপ্ত এনার্জি ধারণ করার জন্য সবুজ ক্লোরোফিল রঙকে কাজে লাগিয়ে থাকে। আমরা নিঃশ্বাসের সঙ্গে যে অক্সিজেন গ্রহণ করি, তার প্রায় অর্ধেক তারা এই ফটোসিনথেসিস বা আলোকসংশ্লেষণের মাধ্যমে তৈরি করে থাকে বলে এক হিসাবে জানা গেছে। ফাইটোপ্লাঙ্কটন দৃশ্যমান আলোর বর্ণালীর লাল ও নীল অংশের তড়িৎ চুম্বকীয় বিকীরণ শুষে নেয় বটে, তবে সেই সঙ্গে সবুজ রঙও প্রতিফলিত করে। এ কারণেই সাগরের যে জায়গায় ফাইটোপ্লাঙ্কটন অত্যধিক মাত্রায় বিদ্যমান, সেখানে সাগরের জলরাশিকে সবুজ বা ফিরোজা রঙের দেখায়। পরিবেশের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গতি নিয়ে কাইটোপ্লাঙ্কটনের সংখ্যার দ্রুত বৃদ্ধি ঘটে থাকে। একদিনে এদের সংখ্যা দ্বিগুণও হয়ে যেতে পারে।

প্রকাশিত : ২৬ জুন ২০১৫

২৬/০৬/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: