আংশিক মেঘলা, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৬ ডিসেম্বর ২০১৬, ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, মঙ্গলবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

কবির জন্মোৎসবের আগে

প্রকাশিত : ২৬ জুন ২০১৫

২০১২ সালের আগস্টে কবি নব্বই পূর্ণ করবেন- এ এক আনন্দ সংবাদ। নিঃশব্দ অভিভাবকের মতো তাঁর উপস্থিতিও কবিসমাজের জন্য পরম স্বস্তির। আনুষ্ঠানিকভাবে জন্মোৎসব পালন করা হবে কবির অনিচ্ছাসত্ত্বেও। কেন অনিচ্ছা সে প্রসঙ্গে পরে আসছি। ওই জন্মোৎসবের কয়েক সপ্তাহ আগে তাঁর বাসভবনে যাই। শুক্রবার সেদিন, সকাল ১০টা। তিনি নাস্তার টেবিলে। আমি সোজা তাঁর শোয়ার ঘরে গিয়ে বসি। কেয়ারটেকার ছেলেটি গিয়ে খবর দেয়। অন্য সময় দেখেছি তাঁকে সাহায্য করা লাগে। সেবার দেখলাম ওয়াকার নিয়ে তিনি নিজেই হেঁটে এলেন। বসলেন চেয়ারে। এই চেয়ারেই দিনের বেশিরভাগ সময় বসে থাকেন। সামনে টিভির বিশাল স্ক্রিন। আলাপচারিতার মাঝখানে তিনি আকিস্মকভাবে বলে ওঠেন, ‘কবিতা লিখতে পারছি না। পড়তেও পারি না চোখের সমস্যার কারণে। সারাদিন টিভির বড় পর্দার সামনে বসে থাকা। নিরর্থক মনে হয় জীবন।’

তাঁর কথায় চমকে উঠি, কষ্ট পাই। কী করে তাঁকে বলি, জীবন কখনও থেমে যেতে পারে, জীবনের ভার বহন করা অসহনীয় হয়ে উঠতে পারে। তবু জীবন নয় নিরর্থক। কিন্তু বলতে পারি না। কে তাঁকে কী শোনাবে? তিনি বিলক্ষণ সমঝদার মানুষ। মাসের পর মাস, বছরের পর বছর একই কক্ষে বসবাস করতে করতে আর কবিতার সঙ্গে দূরত্ব রচিত হতে হতে একজন কবির এমনটা মনে হওয়া মোটেই অস্বাভাবিক নয়। আমি জানি, কথা বলতে বলতে একপর্যায়ে তিনি উষ্ণ হবেন, প্রসঙ্গ থেকে প্রসঙ্গান্তরে যাবেন। তখনই মোক্ষম কথাটা তাঁকে বলার সুযোগ পাবÑ দেখেন আবুল ভাই, জীবন নিরর্থক নয়।

এবার যেহেতু তাঁর নব্বই পূর্ণ হচ্ছে, এটা একটা মাইলফলক। এই জন্মদিনকে তাই স্মৃতিময় করে রাখতে চান তাঁর পরিবারের সদস্যরা। বিশেষ করে সম্প্রতি আমেরিকা থেকে দেশে বেড়াতে আসা তাঁর কন্যা। বহু বছর আবুল ভাই তাঁর জন্মদিন পালন করেন না। সঠিকভাবে বলতে গেলে বলতে হয়, পঁচাত্তর সালের পর থেকেই তিনি আর জন্মদিন করেন না। তাঁর জন্ম তারিখটি যে পনেরোই আগস্ট! বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নিহত হওয়ার মতো চিরকলঙ্কময় তারিখটিতে কীভাবে তিনি আনন্দ করবেন? ওই দিন আমাদের জাতীয় শোক দিবস। তবু সেদিন কেউ কেউ ঘটা করে জন্মদিনের আয়োজন করে, উৎসব করে। এসবের বিপক্ষে তাঁর নিজের এই জন্মদিন পালন থেকে বিরত থাকা কি এক ধরনের প্রতিবাদ নয়?

সম্ভবত ২০১২ সালের জন্মদিনটিতেই নয়, তাঁর পরিবারের সদস্যরা জন্মদিনের আয়োজন করছেন পনেরোই আগস্টের পরে কোন এক সন্ধ্যায়।

কবি আবুল হোসেন আমাকে দেখেই খুশি হয়ে বলছিলেন, তোমার কথা গতকাল ভাবছিলাম। বয়স তাঁর শরীরে কামড় বসালেও মন তাঁর বুড়িয়ে যায়নি। আর জ্ঞান ও বিবেচনাবোধ তাঁর টনটনে। ভুল বলা বা বাড়িয়ে বলা তাঁর স্বভাবে নেই। সত্যিই তিনি আমার কথা আগের দিন ভাবছিলেন! একটু অবাক হই। পরে বুঝতে পারি উপলক্ষ ছিল স্মরণের। জন্মদিনের অনুষ্ঠানে অতিথিদের তালিকা করা হচ্ছে। কবির পুত্রবধূ খসড়া লিস্ট তাঁকে দেখালে সেখানেই তিনি আমার নামটা পান। এভাবেই আমার কথা ভাবা। তবে সেই সঙ্গে এ কথাও জানাতে ভুললেন না, তুমি খুব কম আস। তোমরা এলে ভাল লাগে। খুবই স্বাভাবিক চেনা মানুষের সান্নিধ্য তাঁকে স্বস্তি দেয়। ভাল লাগে তাঁর। ঘণ্টাখানেক গল্প করে আমি যখন উঠে আসছি, তখন বার বার বললেন, খুব ভাল লাগল তোমার সঙ্গে কথা বলে। তখনই তাঁর কথার মৃদু উত্তর দিতে চেষ্টা করি। বলি, এই যে ভাল লাগার কথা বললেন, আমার মতো আপনার কাছে কেউ কেউ তো আসেন। তাঁদের সঙ্গে গল্প করতে আপনার ভাল লাগে। এই ভাল লাগা কি নিরর্থক? বলেন, জীবন কি নিরর্থক?

তিনি একটুখানি হাসেন। অস্ফুট স্বরে বলেন, না নিরর্থক নয়।

‘এত ভালো লিখেছিলাম একদিন’

কবি আবুল হোসেনের সমালোচক-সত্তার খোঁজ অনেকেই পাননি। তাঁর সান্নিধ্যে আসা সব কবিও কি পেয়েছেন? মনে হয় না। যদিও কবিতার আলোচনা বা সমালোচনামূলক রচনা তেমন নেই তাঁর। কবিদের সঙ্গে একান্ত আড্ডায় কবিদের কবিতার বৈশিষ্ট্য নিয়ে কিছু কিছু ইঙ্গিত দিতেন। তাঁর শুদ্ধাচারী মনোভাব থেকে খুব কাছের কোন কোন কবিকে নির্দিষ্ট কবিতা সম্বন্ধে সাজেশনও দিয়েছেন কখনও কখনও। শামসুর রাহমান সদ্য লখা অনেক কবিতাই তাঁকে শুনিয়েছেন। তাঁর একটি কবিতা থেকে বেশকিছু অংশ আবুল হোসেন বাদ দেয়ার কথা বলেছিলেনÑ এমন কিছু স্মৃতি তিনি আমার সঙ্গে শেয়ার করেছেন। বাংলাদেশের কবিতার সমালোচক হিসেবে আধুনিককালে যাঁরা প্রশংসা অর্জন করেছেন তাঁদের ভেতর আবদুল মান্নান সৈয়দ অগ্রগণ্য। এই মান্নান সৈয়দ বরাবরই অত্যন্ত উচ্চমূল্য দিয়ে এসেছেন আবুল হোসেনের কাব্য-বিবেচনাকে।

কবি আবুল হোসেনের সঙ্গে আমার পরিচয়ের সুযোগ ঘটে সম্ভবত আশির দশকের শেষদিকে। কবি তখন বসতেন বারডেমে। কবি শামসুর রাহমানের ক্যাট স্ক্যান করানো হলো সেখানে। তার আগে ও পরে কবি আবুল হোসেনের কক্ষে আমরা বসি। এর ক’বছর পরে সাহিত্য মাসিক ‘মাটি’ প্রকাশের সময় কবি আবুল হোসেনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার শুরু। তিনি এসেছিলেন মাটির নয়াপল্টনের কার্যালয়ে। মাটির দীর্ঘতম সাক্ষাতকারটি ছিল তাঁরই। এরপর বিভিন্ন সময়ে আমি আনুষ্ঠানিকভাবে তাঁর সাক্ষাতকার গ্রহণ করি। কবির ধানম-ির বাসায় যখনই গিয়েছি গল্পে গল্পে অতীত দিনের অনেক ইতিহাসই শোনার সৌভাগ্য হয়েছে। তবে নিজের কবিতা সম্পর্কে এমন সরাসরি সন্তুষ্টি প্রকাশ করেন তিনি ২০১১ সালে একান্ত আলাপচারিতায়। বলাবাহুল্য, কিছুটা বিস্মিত হই। রেকর্ডারে ধারণকৃত সেই দীর্ঘ আলাপচারিতার প্রাসঙ্গিক অংশটুকু এখানে তুলে ধরছি।

মারুফ রায়হান : ২০১১ সাল শুরু হলো। নতুন বছরে কিছু লিখেছেন?

আবুল হোসেন : না।

মারুফ : সর্বশেষ কবিতা কবে লিখেছেন মনে করতে পারেন?

আবুল হোসেন : ৮-৯ মাস আগে হবে।

মারুফ : লেখার ইচ্ছা নিশ্চয়ই কমে যায়নি, কিন্তু শারীরিক কারণে হাতে লিখতে পারছেন না। তাই তো?

আবুল হোসেন : হাতে লিখতে পারছি না, সেটাই সব নয়। আসলে যা লিখতে চাই সেটা ঠিক আসছে না। কষ্টেসৃষ্টে হাতে না হয় লিখতাম। কিন্তু লেখাটা ঠিক আসছে না।

মারুফ : এ রকম আগেও কি হয়েছে দীর্ঘকালের জন্য যে, আপনার লেখা হচ্ছিল না?

আবুল হোসেন : হ্যাঁ, হয়েছে।

মারুফ : তাহলে বলতে পারি এই লেখা না আসার সঙ্গে কবির বয়সের কোন সম্বন্ধ নেই।

আবুল হোসেন : (হেসে দিয়ে) সেটা বুঝতে পারছি না। তবে এর আগে যখন বিদেশে ছিলাম, সে সময় ৫ বছরে ৫-৭টা কবিতা লিখেছিলাম। তবে সে সময়ের সঙ্গে আমার বর্তমান সময়ের তুলনা দেয়া যাবে না। তখন পুরোপুরি সুস্থ ছিলাম। যদিও পরিবেশটা ঠিক লেখার উপযুক্ত ছিল না।

মারুফ : এখন আপনার ভেতরে কবিতার তাড়না, মুড এবং গুনগুন কি আগের মতোই আছে?

আবুল হোসেন : এগুলো মোটামুটি আছে। এখনও লিখতে পারব বলেই বিশ্বাস আছে।

মারুফ : খুব ভাল। এটাই গুরুত্বপূর্ণ। কবিতার যে শৃঙ্খলা, তার পূর্ণাঙ্গ অবয়ব অনুভব করাÑ এসব পুরোপুরি হয় উঠছে না বলে নতুন কবিতা লেখা হচ্ছে না। এটা কি বলতে পারি?

আবুল হোসেন : হ্যাঁ, ঠিক বলেছ। কবিতার তাগিদ আছে পুরোপুরি।

মারুফ : কারও কবিতা কি পড়তে ইচ্ছে হয়? পুরনো কিংবা নতুন কোন বই?

আবুল হোসেন : পড়ার ইচ্ছে তো আছেই। এখন নিজেরই পুরনো কবিতার বই খুলে বসি। পড়তে থাকি কী লিখেছিলাম।

মারুফ : নিজের লেখা আবার নতুন করে পড়ে কী মনে হচ্ছে?

আবুল হোসেন : (আবার হাসলেন) কী মনে হচ্ছে বলব? মনে হচ্ছে যে, এত ভালো লিখেছিলাম একদিন। এখন কেন লিখছি না। কেন লিখতে পারছি না। কেন হচ্ছে না?

মারুফ : নিজের কবিতা সম্পর্কে এই যে বললেন, এত ভাল লিখেছিলাম। এই দৃঢ় বিশ্বাসটাই তো গুরুত্বপূর্ণ। অনেক কবি নিজের লেখা সম্পর্কে দ্বিধাগ্রস্ত থাকেন। আত্মবিশ্বাসটা জোরালো থাকে না। জীবনানন্দ জানতেন তিনি কী লিখেছেন।

আবুল হোসেন : আমি শুধু প্রেরণার বশে লিখিনি। প্রেরণা ছাড়া কবিতা লেখা যায় না। প্রেরণা তো আসল। কিন্তু প্রেরণা প্রাপ্তির পর সেটাকে নিয়ে কাজ করতে হয়। একেকটা লেখার জন্য অনেক সময় নিয়েছি। আমি বলব আমার কপালটা ভালো।

মারুফ : আপনি কি বোঝাতে চাইছেন যে, আপনার নিজের কবিতা নিয়ে আপনি সন্তুষ্ট?

আবুল হোসেন : আমি বলব, আমার কপালটা ভালো। মোটামুটি লিখতে পেরেছি। এসব লেখা অন্যরা কীভাবে দেখছেন জানি না। তবে আমার নিজের যেমন ভালো লাগছে, যদি আমার পাঠকদেরও সে রকম ভালো লাগে, তবে সেটাই হবে সবচেয়ে সুখের।

প্রকাশিত : ২৬ জুন ২০১৫

২৬/০৬/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: