কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৫ ডিসেম্বর ২০১৬, ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, সোমবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

‘পৃথিবী অবাক তাকিয়ে রয়’

প্রকাশিত : ২৪ জুন ২০১৫
  • জাহিদুল আলম জয়

‘অহঙ্কারই পতনের মূল’- এই প্রবাদবাক্যটি এখন ভারতীয় ক্রিকেট দলের ক্ষেত্রে শতভাগ প্রযোজ্য। ক্রিকেটের তথাকথিত তিন মোড়লের এই এক মোড়ল কখনই বাংলাদেশকে পাত্তা দেয়নি! সুযোগ পেলেই টাইগার ক্রিকেট নিয়ে তামাশা করেছেন তারা। কিন্তু সময়ের কি নির্মম পরিহাস। যাদেরকে ‘ছোট’ বলে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করেছে, অবজ্ঞা করেছে সেই তাদের কাছেই আত্মসম্মান বিসর্জন দিতে হলো ভারতীয় ক্রিকেট দলকে। দেশে চলমান ওয়ানডে সিরিজের প্রথম দুই ম্যাচেই সাবেক বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের নাকানি-চুবানি খাইয়ে প্রথমবারের মতো ভারতের বিরুদ্ধে সিরিজ জয়ের কৃতিত্ব দেখিয়েছে লাল-সবুজের এই বাংলাদেশ।

আজ সিরিজের তৃতীয় ও শেষ ওয়ানডেতে মুখোমুখি হচ্ছে দুই প্রতিবেশী দেশ। বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে ‘জোর’ করে জয় ছিনিয়ে নেয়ার প্রতিদান ইতোমধ্যে পেয়েছে ভারত। তাদের যে অহংবোধ ছিল তা ধুলোয় মিশিয়ে দিয়েছেন মাশরাফি, সাকিব, তামিম, মুস্তাফিজরা। মিরপুরে তৃতীয় ম্যাচেও জয় পেলে ‘বাংলাওয়াশ’ এর তেতো স্বাদ দেয়া যাবে দুইবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের। এ লক্ষ্য পূরণে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ টাইগাররা।

বাংলাদেশের ক্রিকেটের প্রধান সমস্যা ছিল ধারাবাহিকতার অভাব। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এ ধারা থেকে দারুণভাবে বেরিয়ে এসেছে বাংলার দামাল ছেলেরা। দুর্দান্ত ধারাবাহিক পারফর্মেন্স উপহার দিয়ে চলেছেন মুশফিক, তামিম, সাকিব, মাশরাফিরা। চলতি বছরও সাফল্যের এ ধারা অব্যাহত আছে। বিশ্বকাপ ক্রিকেটে নজরকাড়া সাফল্যের পর নিজ দেশে ক্রিকেটের দুই পরাশক্তি পাকিস্তান ও ভারতকে নিয়ে ছেলেখেলা করেছে টাইগাররা। পাকিদের বাংলাওয়াশ করার পর ভারতকেও একই পরিণতি দেয়ার অপেক্ষায় মাশরাফি বাহিনী। এর আগে ২০১৪ সালের নবেম্বর-ডিসেম্বরে জিম্বাবুইয়ে ৫-০ ব্যবধানে নাস্তানাবুদ করে বাংলাদেশ। সেই থেকে অপরাজেয় যাত্রা শুরু টাইগারদের। এরপর পাকিদের ৩-০ ব্যবধানে বাংলাওয়াশ করার পর ভারতের বিরুদ্ধে ২-০ ব্যবধানে এগিয়ে থেকে সিরিজ জয় নিশ্চিত হয়েছে। অর্থাৎ দেশের মাটিতে টানা ১০ ওয়ানডে জয়ের কৃতিত্ব দেখিয়েছে চান্দিকা হাতুরাসিংহের দল। দুর্দান্ত এই ধারাবাহিক পারফর্মেন্সই জানান দিচ্ছে, বাংলাদেশের সাফল্য এখন আর আচমকা কোন ঘটনা নয়। যে কারণে অনেক বোদ্ধাই বলতে বাধ্য হচ্ছেন, সত্যিকারের টাইগারে কাঁপছে ক্রিকেটবিশ্ব। বাংলাদেশকে ক্রিকেটের বড় শক্তি অর্থাৎ নতুন পরাশক্তি হিসেবেও দেখা হচ্ছে।

চলতি বছরটা যেন বাংলাদেশের ক্রিকেটের জন্য আশীর্বাদ হয়ে এসেছে। ধারাবাহিকভাবে দুর্দান্ত সাফল্য পাচ্ছে টাইগাররা। বিশ্বকাপ ক্রিকেট থেকে সাফল্যের পথে যাত্রা শুরু। যে ধারা অব্যাহত আছে চলমান ভারতের বিরুদ্ধে সিরিজেও। পাকিস্তানের কাছে টেস্ট সিরিজে হারলেও ওয়ানডে সিরিজে প্রতিপক্ষকে ‘বাংলাওয়াশ’ ও একমাত্র টি২০ তেও সহজে জয় পায় লাল-সবুজের এই দেশ। টানা চার ম্যাচে পাকিদের রীতিমতো কাঁদিয়ে ছাড়ে টাইগাররা। খুলনায় প্রথম টেস্টে নজরকাড়া পারফর্মেন্স প্রদর্শন করে তামিম, ইমরুল, সাকিবরা ম্যাচ ড্র করেন। মিরপুরে শেষ টেস্টে ব্যাটিংটা ভাল না হওয়ায় হারতে হয়। তবে এতে ম্লান হয়নি টানা সাফল্যের আলো। পাকিবধের পর এখন চলছে ভারত ধোলাইয়ের কাজ। পাকিস্তানের মতো শক্তিশালী দলকে বলেকয়ে হারিয়েছে বাংলাদেশ। তিন ওয়ানডে ও একটি টি২০ তে হেসেখেলে জয় তুলে নিয়েছে টাইগাররা। কোন ম্যাচেই প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তুলতে পারেনি আজহার আলী ও শহীদ আফ্রিদির দল। টেস্ট সিরিজ হারলেও এখানেও উন্নতির ছাপ দেখা গেছে টাইগারদের পারফর্মেন্সে। বাংলাদেশের এই সাফল্যকে এখন আর কেউ চমক হিসেবে দেখছে না। কেননা টাইগাররা গত কয়েক বছর ধরেই ধারাবাহিক পারফর্মেন্স প্রদর্শন করে চলেছে। গত মার্চে বিশ্বকাপ ক্রিকেটেও দুর্দান্ত খেলে মাশরাফি বিন মর্তুজার দল। ইংল্যান্ডকে টপকে কোয়ার্টার ফাইনালে খেলে লাল-সবুজের এই দেশ। আম্পায়ারদের কারণে ভারতের কাছে হেরে শেষ আট থেকে বিদায় নিতে হলেও টাইগারদের পারফর্মেন্স ক্রিকেটবিশ্বে প্রশংসিত হয়। তবে বিশ্বকাপে বিতর্কিত ওই হারের জ্বালা দেশের মাটিতে ভালভাবেই মিটিয়েছে টাইগাররা।

ভারতকে টানা দুই ম্যাচে হারিয়ে আইসিসির ওয়ানডে র‌্যাঙ্কিংয়ে সাত নম্বর স্থানটি পাকাপাকি করেছে বাংলাদেশ। দারুণ দুই জয়ে মর্যাদার চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতে খেলাও নিশ্চিত হয়েছে। কিন্তু অনেকেরই কৌতূহলী জিজ্ঞাসা, এই মুহূর্তে ক্রিকেট বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান কী সত্যিই সাত নম্বরে? আইসিসির র‌্যাঙ্কিং হয়ত বলছে সাত, কিন্তু পরিসংখ্যান বলছে এই মুহূর্তে বিশ্বের দুই নম্বর ক্রিকেট শক্তি বাংলাদেশ! আইসিসির র‌্যাঙ্কিং নিয়ে আছে অনেক জটিলতা। তবে ওসব বাদ দিয়ে ২০১৫ সালের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত সব দেশের জয়-পরাজয়ের অনুপাত করলেই স্পষ্ট হয়ে যাবে ব্যাপারটি। ২০১৫ সালের ১ জানুয়ারি থেকে এখন পর্যন্ত ওয়ানডে দলগুলো যতগুলো ম্যাচ খেলেছে, তার ওপর ভিত্তি করেই এই পরিসংখ্যান। সেই পরিসংখ্যানে এক নম্বর স্থান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন অস্ট্রেলিয়ার। জানুয়ারি থেকে এখন পর্যন্ত মাইকেল ক্লার্কের দল মোট ১৩টি একদিনের আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলে জয় পেয়েছে ১১ টিতে। এতে আছে একটি ‘টাই’ আর একটি হারের রেকর্ড। জয়-পরাজয়ের অনুপাতে এই মুহূর্তে ক্রিকেট বিশ্বে সবার শীর্ষে অসিরা।

মজার ব্যাপার হচ্ছে, এই অনুপাতে অস্ট্রেলিয়ার ঠিক পরপরই অবস্থান বাংলাদেশের। বাংলাদেশ চলমান বছরে এখন পর্যন্ত ১১টি একদিনের আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলে জিতেছে ৮টি ম্যাচ। এই হিসেবে দ্বিতীয় সেরা দল বাংলাদেশ। জয়-পরাজয়ের অনুপাতের হিসাবে তো বটেই। এ বছর ওয়ানডে জেতার দিক দিয়ে বাংলাদেশের পেছনে আছে ভারত, শ্রীলঙ্কা, ইংল্যান্ড, পাকিস্তান ও ওয়েস্ট ইন্ডিজের মতো ক্রিকেট পরাশক্তিরা। জয়ের সংখ্যায় বাংলাদেশের চেয়ে কিছুটা এগিয়ে নিউজিল্যান্ড ও দক্ষিণ আফ্রিকা। কিন্তু মোট ম্যাচের তুলনায় সেটার অনুপাত বাংলাদেশের চেয়েও কম। এসব তথ্যই বলছে, বাংলাদেশকে হেলাফেলার দিন শেষ।

কপিল দেবের নেতৃত্বে ১৯৮৩ সালে ভারত এবং অর্জুনা রানাতুঙ্গার নেতৃত্বে ১৯৯৬ সালে শ্রীলঙ্কার বিশ্বকাপ জয় ক্রিকেট ইতিহাসের স্মরণীয় ঘটনগুলোর মধ্যে শীর্ষে। এ দুটি বিশ্বকাপে ক্রিকেট দেখেছিল দুটি নতুন পরাশক্তির উত্থান। ’৮৩-র বিশ্বকাপ জিতে ভারত ও ’৯৬-র বিশ্বকাপ জিতে শ্রীলঙ্কা বিশ্ব ক্রিকেটে নিজেদের শক্তিমত্তার জানান দেয়। ভারত, শ্রীলঙ্কার পথ অনুসরণ করে বাংলাদেশও এখন ক্রিকেটে নতুন পরাশক্তি। বিশ্বকাপে মাশরাফির নেতৃত্বে সাকিব, তামিম, নাসিররা বহির্বিশ্বকে দেখিয়েছে বাঘের গর্জন। ভারত, শ্রীলঙ্কার মতো বিশ্বকাপ জয়ে না হোক ২০১২ সালের এশিয়া কাপে রানার্সআপ, বিশ্বকাপে কোয়ার্টার ফাইনালে খেলা, ঘরের মাঠে সিরিজে পাকিস্তান ও ভারতকে বলেকয়ে নাস্তানাবুদ করে বাংলাদেশ জানান দিয়েছে, তারাও ক্রিকেটের পরাশক্তি। তিন বছর আগে এশিয়া কাপে বলতে গেলে পাল্টে যাওয়া বাংলাদেশকেই দেখে ক্রিকেট বিশ্ব। পাকিস্তানের বিরুদ্ধে হার দিয়ে মিশন শুরু হলেও ওই ম্যাচেই বাংলাদেশ জানান দেয় শুধু অংশগ্রহণই তাদের লক্ষ্য নয়। পরের দুই ম্যাচে সে সময়ের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন চ্যাম্পিয়ন ভারত ও রানার্সআপ শ্রীলঙ্কাকে হারিয়ে প্রথমবারের মতো এশিয়ার সেরার আসরের ফাইনাল মঞ্চে জায়গা করে নেয় লাল-সবুজের দেশ। ফাইনালে পাকিস্তানের কাছে হারলেও বাংলাদেশের পারফর্মেন্স সবাইকে বিমোহিত করে।

সাফল্যের এই ধারাবাহিকতায় ছেদ পড়ে ২০১৪ সালে। কিন্তু সাময়িক ব্যর্থতা কাটিয়ে আবারও চেনা ছন্দে ফিরেছে টাইগাররা। বাংলাদেশের ক্রিকেটে পরিবর্তনের এ হাওয়া লেগেছে ২০১১ সালের অক্টোবরে সফরকারী ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিরুদ্ধে সিরিজ থেকে। এরপর ধারাবাহিকভাবে সাফল্য পেয়ে চলেছে টাইগাররা। এবারের বিশ্বকাপ ও ২০১২ সালের এশিয়া কাপের আগে বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসে সেরা সাফল্য ছিল ২০০৭ বিশ্বকাপ। ক্যারিবীয় দীপপুঞ্জে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপে বাংলাদেশ হারিয়েছিল দুই পরাশক্তি ভারত ও দক্ষিণ আফ্রিকাকে। যোগ্যতা অর্জন করেছিল সুপার এইটে খেলার।

২০১৫ সালে টাইগাররা খেলেছে কোয়ার্টার ফাইনালে। সাফল্যের এই ধারা অব্যাহত আছে এখনও। যে কারণে বদলে যাওয়া বাংলাদেশকে এখন বড় শক্তি হিসেবেই দেখছে ক্রিকেট বিশ্ব।

প্রকাশিত : ২৪ জুন ২০১৫

২৪/০৬/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: