আংশিক মেঘলা, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৬ ডিসেম্বর ২০১৬, ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, মঙ্গলবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য প্রয়োজন তাহমিনা মিলি

প্রকাশিত : ২২ জুন ২০১৫

মোটা হয়ে যাচ্ছে শহুরে শিশুরা। প্রাত্যহিক নাগরিক জীবনযাপনে আমরা নানা ধরনের সমস্যা মোকাবেলা করতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছি। সেখানে আমাদের সন্তান, ভবিষ্যত প্রজন্মের শারীরিক সমস্যা যে কোন সচেতন মানুষকেই আতঙ্কিত এবং হতাশ করে তুলেছে। সেরকম শিশু আমার, আপনার সবার ঘরেই রয়েছে, যাদের নিয়ে আমরা চিন্তিত এবং হতাশ না হয়ে পারি না। বিষয়টির সঙ্গে শুধু ব্যক্তিগত হতাশা, শঙ্কা কিংবা দুশ্চিন্তা জড়িত নয়, এর সঙ্গে গোটা জাতির ভবিষ্যত নির্ভর করছে বলে এ বিষয়ে সবার সচেতনতা প্রয়োজন।

গবেষকরা শিশুদের মুটিয়ে যাওয়ার কারণ হিসেবে ক্যালরিসমৃদ্ধ খাবার বেশি খাওয়া এবং দৈনিক কমপক্ষে এক ঘণ্টা ঘাম ঝরিয়ে খেলাধুলা না করাকে দায়ী করেছেন। তারা বলেছেন, অনিয়ন্ত্রিত টেলিভিশন দেখা, কম্পিউটার, ট্যাব, মোবাইল ফোনে ভিডিও গেমস খেলার নেশা শিশুদের জন্য বড় ধরনের ক্ষতির কারণ হয়ে উঠেছে। শিশু, পুষ্টি ও ডায়াবেটিস রোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, মুটিয়ে যাওয়া বা স্থ’ূলতার কারণে শিশুরা জটিল রোগে আক্রান্ত হচ্ছে।

বাংলাদেশের শহরাঞ্চলে শিশুদের স্থ’ূলতার সমস্যা প্রকট হওয়ার আগেই এ ব্যাপারে সবাইকে বিশেষভাবে সতর্ক হতে হবে। জরিপ ও গবেষণা চালানোর সময় সংশ্লিষ্টরা দেখেছেন শহরাঞ্চলের শিশুরা প্রয়োজন অনুযায়ী প্রোটিন, ভিটামিন, খনিজ জাতীয় খাবার খাচ্ছে না। তারা মাংস, মাছ, ডিম, দুধ, ফলমূল খাচ্ছে। আজকাল শিশু, কিশোর, ছেলেমেয়েরা ফাস্টফুডে বেশি আসক্ত।

আজকের শিশুরাই পরিবার এবং জাতির ভবিষ্যত। তারা যদি শিশু-কিশোর বয়স থেকেই জটিল রোগে আক্রান্ত হয়, অসুস্থ শরীর নিয়ে বেড়ে ওঠে, শারীরিক নানা অক্ষমতা, দুর্বলতা, সীমাবদ্ধতা যদি তাদের সঙ্গী হয়, তারা ঠিকভাবে পড়াশোনা করতে পারবে না, ফলে তাদের পরীক্ষার ফলাফলও আশাব্যঞ্জক হবে না। তাদের মেধার যথাযথ বিকাশ হবে না। দুর্বল, জটিল রোগে কাবু শিশুরা সৃজনশীল চিন্তাভাবনা করতে পারবে না, যখন তারা পূর্ণবয়স্ক যুবক হবে তখন টগবগে উদ্যমী মনোভাবের বদলে তাদের মধ্যে বিষণœতা, ভীরুভাব, হতাশা, দুর্বলতা, হীনম্মন্যতা চেপে বসবে। তখন তারা জাতিকে ভাল কিছু উপহার দিতে পারবে না, বরং জাতির জন্য বিরাট বোঝা হিসেবে বিবেচিত হবে সন্দেহ নেই।

একটা সময় ছিল যখন বিকেল হলেই এক ছুটে শিশুরা চলে যেত বাড়ির পাশের মাঠে। ক্রিকেট, ফুটবল, গোল্লাছুটসহ নানা রকম খেলা চলত। গত কয়েক বছরের ব্যবধানে এখন মাঠের অভাবে শিশুরা খেলে বাড়ির গ্যারেজে, কিংবা রাস্তার গলিতে। ঢাকা, চট্টগ্রাম শহরের এ্যাপার্টমেন্টবাসী শিশু-কিশোর বয়সীদের ঘরের বাইরে গিয়ে খেলাধুলার কোন সুযোগ নেই। তাদের দিন কাটে ঘরের চার দেয়ালের মাঝে। অনেকটাই কারাগারের বন্দীদের মতো। খোলা মাঠে দুরন্ত শৈশব, কৈশোরের উদ্দামতা, উচ্ছ্বলতা প্রকাশের কোন সুযোগ নেই তাদের। ইচ্ছে করলেও তারা মাঠে গিয়ে ফুটবল, ক্রিকেট, গোল্লাছুট কিংবা অন্যান্য খেলাধুলায় মেতে উঠতে পারে না। তাদের অবসর সময় কাটে কম্পিউটার, ট্যাবলেট বা স্মার্টফোনে বিভিন্ন ধরনের গেম খেলে। নগরায়নের ফলে শহরগুলোতে খেলাধুলার মাঠ এবং খোলা জায়গা ক্রমেই সঙ্কুচিত হয়ে আসছে। বড় বড় খেলার মাঠ দখল করে সেখানে নির্মাণ করা হচ্ছে বড় বড় দালান, মার্কেট, অফিস প্রভৃতি। বিভিন্ন স্কুলে একসময়ে খেলার মাঠ আবশ্যকীয় ব্যাপার ছিল, অথচ এখন বেশিরভাগ স্কুলেই ছাত্রছাত্রীদের খেলাধুলার জন্য কোন মাঠ নেই। যে কারণে তারা অবসর সময়গুলোতে খেলাধুলা করতে পারছে না। খেলাধুলার সুযোগ না থাকায় শিশুদের শারীরিক ও মানসিক গঠন ব্যাহত হচ্ছে। এভাবেই তারা বিভিন্ন জটিল রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। শারীরিক কোন পরিশ্রম না হওয়ায় অনেক শিশু স্থ’ূয়লকায় হয়ে পড়েছে। সারাদিন কম্পিউটার, ল্যাপটপ, ট্যাব, স্মার্ট ফোন নিয়ে মেতে থাকায় তাদের চোখে নানা সমস্যা দেখা দিচ্ছে, অল্প বয়সেই তাদের চোখে চশমা লাগছে। মজার ব্যাপার হলো, খেলার মাঠের অভাবে এখনকার অনেক শিশু-কিশোর মাঠের বদলে ঘরে বসে একা একা ক্রিকেট ফুটবল খেলছে কম্পিউটারে, এতেই তারা অভ্যস্ত হয়ে পড়ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরামর্শ হলো, শিশুদের প্রতিদিন কমপক্ষে এক ঘণ্টা ঘাম ঝরিয়ে খেলতে হবে। আজকাল ঢাকা, চট্টগ্রাম মহানগরীতে শিশুরা সেই সুযোগ পাচ্ছে না। ঢাকা শহর জুড়েই রয়েছে মাঠের অভাব। ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের আওতায় মাঠ আছে মাত্র ১১টি। এর মধ্যে আবার সবগুলোতে খেলাধুলার সুযোগ নেই। এ্যাপার্টমেন্টগুলোতেও শিশুদের খেলাধুলার তেমন সুযোগ নেই বলা চলে। মুক্ত পরিবেশে, অবারিত মাঠে ছুটোছুটি করে আমাদের শৈশব, কৈশোর কেটেছে। তখন শহরগুলোতেও প্রচুর খেলার মাঠ এবং খোলা জায়গা ছিল, যেখানে শিশু কিশোর তরুণ বয়সীরা ফুটবল, ক্রিকেট, ব্যাডমিন্টন, হা-ডু-ডু, ভলিবল খেলে বিকেলের অবসর সময়টা চমৎকারভাবে কাটিয়ে বাড়ি ফিরে পড়তে বসত। এতে মনটা প্রফুল, সতেজ, সজীব থাকত। এখন তারা ভিডিও গেমস, ফেসবুক নয়ত ইন্টারনেটে টুইটারে মজে থাকছে বেশিরভাগ সময়। এতে তাদের শারীরিক পরিশ্রম হচ্ছে না, যা সুস্থ শরীরের জন্য একান্ত প্রয়োজন।

বড় বড় শহরে এখন যেখানে সেখানে স্কুল-কলেজ গড়ে উঠেছে। এসব স্কুল-কলেজ হয়ত বড় কোন আবাসিক ভবনে কিংবা বাণিজ্যিক ভবনে ভাড়া নিয়ে পরিচালিত হচ্ছে। যেখানে ছেলে মেয়েদের খেলাধুলার জন্য কোন মাঠ নেই। ক্লাসরুমেই তাদের পুরোটা সময় কাটাতে হচ্ছে। ফলে স্কুল-কলেজ জীবনটা একঘেয়ে, বৈচিত্র্যহীন, বিরক্তিকর হয়ে উঠছে তাদের জন্য। কয়েকদিন আগে এক অভিভাবক জানালেন, তার ছেলের স্কুলের মাঠটি এত ছোট যে বল ছুড়লে তা প্রিন্সিপালের রুমে গিয়ে পড়বে। পরিচিত একজন স্কুল-শিক্ষক তাদের নিজের স্কুলের কথা বলতে গিয়ে বললেন, এখন ছেলেরা ক্লাসের বেঞ্চে বসে ‘পেন ফাইট’ খেলে। এতে তাদের টিফিন হজম হয় না, নানা অস্বস্তিতে ভোগে, অল্পবয়সেই তাদের ভুঁড়ি বাড়ছে।

এক্ষেত্রে অভিভাবকদেরও দায়িত্ব কোন অংশে কম নয়। সন্তানের সুস্বাস্থ্য এবং সমৃদ্ধ ভবিষ্যতের কথা বিবেচনা করে তাদের খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন করতে হবে। সন্তান চাইলেই তার জন্য হাই ক্যালরিযুক্ত খাবার ফাস্টফুড, চকলেট, কোল্ড ড্রিংকস কিনে দেয়া থেকে বিরত থাকা উচিত। যেসব খাবার অতিরিক্ত গ্রহণে রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, হৃদরোগ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে তা পরিহার করতে হবে। সুস্থ সুন্দর শরীর গঠনে শিশু-কিশোরদের অলস সময় কাটানোর বদলে ইনডোর খেলাধুলা ও গেমসের বদলে আউটডোর গেমসের প্রতি বেশি উৎসাহী করে তুলতে হবে। টেলিভিশন, কম্পিউটার, ট্যাব, স্মার্ট ফোন নিয়ে অবসর সময় কাটানোটা কোনভাবেই সুফল বয়ে আনছে না তাদের জন্য। তারচেয়ে শারীরিক পরিশ্রম হয়, ঘাম ঝরে তেমন খেলাধুলার মাধ্যমে সুস্থ সুন্দর শরীর গড়ে তোলাটাই উত্তম- এটা তাদেরকে উপলব্ধি করাতে হবে। ঢাকা, চট্টগ্রাম মহানগরীতে শিশু কিশোরদের খেলাধুলা শরীর চর্চার জন্য প্রয়োজনীয় মাঠের ব্যবস্থা করতে হবে।

জাতির ভবিষ্যত নির্ভর করছে আজকের শিশু-কিশোরদের সুস্বাস্থ্য এবং সুস্থতার ওপর। এজন্য সরকারী উদ্যোগে মিনি জিমনেশিয়াম প্রতিষ্ঠা করা যেতে পারে। স্কুল-কলেজে এ ধরনের জিমনেশিয়াম রাখা যেতে পারে, যেখানে ছেলেমেয়েরা পড়াশোনা শেষে অবসর সময়টাতে শরীর চর্চার সুযোগ পায়। অন্যান্য বিষয়ের পাশাপাশি শারীরিক শিক্ষা বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে সিলেবাসে অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন। যার মাধ্যমে ছাত্রছাত্রীরা নিজেদের স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য শরীর চর্চার নানা কৌশল রপ্ত করতে পারে অনায়সেই। আজকের শিশু-কিশোরদের সক্ষম সুস্থ মেধাবী প্রজন্ম হিসেবে গড়ে তুলতে হেলাফেলা করে সময় পার করার সুযোগ নেই। এজন্য যা করা প্রয়োজন তা করতে হবে চ্যালেঞ্জিং মনোভাব নিয়ে। কারণ আমরা জাতির জন্য অনিশ্চিত ভবিষ্যত ডেকে আনতে পারি না কোনভাবেই।

মডেল : জিৎ, রায়হান, সাজু, রোহিত, ঐশি ও অদ্রিতা

প্রকাশিত : ২২ জুন ২০১৫

২২/০৬/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: