কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৪ ডিসেম্বর ২০১৬, ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, রবিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ

আইনের তোয়াক্কা না করেই পূবালী ব্যাংকে পর্ষদ গঠন

প্রকাশিত : ২২ জুন ২০১৫
  • ব্যাংকের ১ পরিচালককে সরানোর নির্দেশ বাংলাদেশ ব্যাংকের
  • শূন্য পদে অবিলম্বে যোগ্যতাসম্পন্ন ব্যক্তিদের নিয়োগ দিতে চিঠি

রহিম শেখ ॥ পরপর দুই মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও পুনরায় দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছে বেসরকারী খাতের পূবালী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ। এজন্য ব্যাংকের চেয়ারম্যান হাফিজ আহমেদ মজুমদারসহ প্রভাবশালী ১০ পরিচালককে সরানোর নির্দেশ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। আর এ সব শূন্য পদে অবিলম্বে যোগ্যতাসম্পন্ন ব্যক্তিদের নিয়োগ দিতেও বলা হয়েছে। সম্প্রতি পূবালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকে কাছে পাঠানো এক চিঠিতে এ নির্দেশনা দিয়ে বলা হয়েছে, তাদের কারোরই পরিচালক পদে আসার যোগ্যতা নেই। এতে সংশোধিত ব্যাংক কোম্পানি আইনের তোয়াক্কা না করে পর্ষদ গঠন সমীচীন নয় বলেও মন্তব্য করা হয়েছে চিঠিতে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক সূত্র জানায়, ব্যাংক কোম্পানি আইন অনুসারে পূবালী ব্যাংকের চেয়ারম্যান হাফিজ আহমেদ মজুমদার, ভাইস-চেয়ারম্যান হাবিবুর রহমান ও ফাহিম আহমেদ ফারুক চৌধুরী, পরিচালক যথাক্রমে মনিরুদ্দিন আহমেদ, সৈয়দ মোয়াজ্জাম হুসাইন, মঞ্জুরুর রহমান, আহমেদ শাফি চৌধুরী, এম খাবিরুজ্জামান ইয়াকুব, মুসা আহমেদ, মোস্তাফা আহমেদ, আজিজুর রহমান এবং রুমান শরিফের মেয়াদ শেষ হয়। তারপরও ব্যাংকটির এ পর্ষদ দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছে। সংশোধিত ব্যাংক কোম্পানি আইন অনুসারে মোস্তাফা আহমেদ ও মঞ্জুরুর রহমান বাদে বাকি ১০ ব্যক্তির পরিচালনা পর্ষদে থাকার সুযোগ নেই। অন্যদিকে, পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ এ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) নির্দেশনা অনুসারেও পর্ষদে থাকার সুযোগ নেই এদের। সংস্থার নির্দেশনা অনুসারে, পরিচালনা পর্ষদে থাকতে হলে ন্যূনতম ২ শতাংশ শেয়ার ধারণ করতে হয়। কিন্তু এদের প্রায় সবারই শেয়ারের পরিমাণ ২ শতাংশের কম।

গত ১১ জুন পাঠানো বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগের এক চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, গত ৩১ মার্চ ব্যাংকের ৩২তম বার্ষিক সাধারণ সভা অনুষ্ঠিত হয়। ব্যাংকের দুইজন স্বতন্ত্র পরিচালক ব্যতীত চেয়ারম্যান, ভাইস-চেয়ারম্যানসহ মোট ১২ জন পরপর দুই মেয়াদে দায়িত্ব পালন করলেও তাদের নিয়ে তৃতীয় মেয়াদে পর্ষদ পুনর্গঠন করা হয়। অথচ একাদিক্রমে দুই মেয়াদ দায়িত্ব পালনের পর পরবর্তী তিন বছরের মধ্যে পরিচালক হওয়া যায় না। এজন্য শূন্য পদে যোগ্যতাসম্পন্ন ব্যক্তিদের পরিচালক পদে আনার নির্দেশ দেয়া হয় চিঠিতে। আগে পর্ষদের কেউই নির্বাচিত হওয়ার পর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনুমোদনের তোয়াক্কা না করলেও নতুন যে ১০ পরিচালক আসবে তাদের জন্য অবশ্যই অনুমোদন নেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এছাড়া চিঠিতে পরিচালনা পর্ষদের উল্লিখিত ১০ জন বাদে মনজুরুর রহমান ও আব্দুর রাজ্জাককে নিয়োগের পূর্বে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে নথিপত্রসহ আবেদন করতে বলা হয়েছে। তবে তৃতীয় মেয়াদে রুমানা শরীফকে ডেল্টা লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির ৫ শতাংশ শেয়ারধারী, আব্দুর রাজ্জাককে দ্যাটস ইট ফ্যাশন লিমিটেড নামে একটি প্রতিষ্ঠানের ২.০৩ শতাংশ শেয়ারধারী এবং আহমেদ শাফি চৌধুরীকে ট্রান্সকম লিমিটেডে ২.০১ শতাংশ শেয়ারধারী দেখিয়ে নমিনী হিসেবে পরিচালনা পর্ষদে আনা হলেও এব্যাপারে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের চিঠিতে কিছু বলা হয়নি।

তথ্য মতে, বাংলাদেশ ব্যাংক ও সিএসইসির নিয়মকে পাশ কাটিয়ে মেয়াদ শেষে লোক দেখানো এজিএম করে (নির্বাচন ছাড়া) ঘুরেফিরে তারাই দায়িত্বে থেকেছেন। অথচ তাদের কারোরই পরিচালক পদে আসার যোগ্যতা নেই। হাইকোর্টে এ সংক্রান্ত একটি মামলা চলমান থাকার সুযোগে গত ৩১ মার্চ ৩২তম এজিএমে তৃতীয় মেয়াদে পরিচালক নির্বাচিত হন। ব্যাংকের অধিকাংশ শেয়ারধারী প্রবাসী হওয়ায় এজিএমে তারা উপস্থিত ছিলেন না। সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, ২০১৩ সালের ৩০তম এজিএমের পূর্বে ন্যূনতম ২ শতাংশ শেয়ার না থাকায় পূবালী ব্যাংকের পরিচালক নির্বাচনের গঠিত কমিশন ১৪ আগস্ট হাফিজ আহমেদ মজুমদারসহ তৎকালীন আট পরিচালককে নির্বাচনের অযোগ্য ঘোষণা করে। পরবর্তীতে তারা হাইকোর্টে গেলে গত বছরের ২০ আগস্ট কমিশনের সিদ্ধান্ত স্থগিত করে দেন আদালত। পরদিনই কোন সময়ে অপেক্ষা না করেই ব্যাংকের এজিএমের আযোজন করে তারা পরিচালক নির্বাচিত হন। পরবর্তীতে ২০১৪ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি দুই শতাংশ শেয়ার না থাকায় পূবালী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান ও পরিচালক মোহাম্মদ ফায়জুর রহমান, আহমেদ শফি চৌধুরী, ফাহিম আহমেদ ফারুক চৌধুরী, মোহাম্মদ কবিরুজ্জামান ইয়াকুব, রুমানা শরিফ, সুরাইয়া রহমান ও আজিজুর রহমানের পদ শূন্য ঘোষণা করে হাইকোর্ট। তারা এর বিরুদ্ধে আপিল করলেও খারিজ হয়ে যায়। পরিচালকদের মধ্যে আহমেদ সাফি চৌধুরৗ, সুরাইয়া রহমান ও রুমানা শরীফের শেয়ার সংখ্যা অতি সামান্য। এদেরকে ব্যাংকটির তিন প্রাতিষ্ঠানিক শেয়ারহোল্ডারের প্রতিনিধি দেখিয়ে পর্ষদে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। যা ব্যাংক ও কোম্পানি আইন বহির্ভূত।

এ প্রসঙ্গে ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম এ হালিম চৌধুরী জনকণ্ঠকে বলেন, এটা আইনের একটা ব্যাখ্যার বিষয়। বোর্ড এ বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সঙ্গে বসতে যাচ্ছে। খুব শীঘ্রই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের চিঠির জবাব দেয়া হবে বলে তিনি জানান। এ বিষয়ে পূবালী ব্যাংকের চেয়ারম্যান হাফিজ আহমেদ মজুমদার জনকণ্ঠকে বলেন, আমরা ১৫ বছর ধরে বাংলাদেশ ব্যাংকের এ ধরনের অন্যায় আচরণের প্রতিবাদ করে আসছি। আইনে দুই মেয়াদ অর্থাৎ ছয় বছর টানা মেয়াদ পালনের সুযোগ থাকলেও আমরা দুই বছর দায়িত্ব পালন করেছি। আরও চার বছর দায়িত্ব পালনের সুযোগ আছে। আইনে এ বিষয়ে অস্পষ্টতা আছে, শিগগিরই এর স্পষ্টতা চাওয়ার উদ্যোগ নেয়া হবে। এছাড়া কেন্দ্রীয় ব্যাংক এ বিষয়ে আপত্তি তোলায় আমরা চলতি সপ্তাহেই আদালতের আশ্রয়নেব। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের চিঠিতে বলা হয়েছে নতুন পরিচালক দায়িত্ব পালনের পূর্বে বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন নেয়া বাধ্যতামূলক। এ বিষয়ে পূবালী ব্যাংকের চেয়ারম্যান হাফিজ আহমেদ মজুমদার বলেন, আমরা নির্বাচিত পরিচালক, আমাদের কেন অনুমোদন লাগবে। তাহলে আমাদের নির্বাচিত হয়ে আসার প্রয়োজন কি। এসব নিয়ে অনেক ব্যাংকই হয়রানির শিকার হচ্ছে। আইনে পরিবর্তন প্রয়োজন। এ বিষয়ে আমরা দ্রুতই আমাদের পক্ষ থেকে উদ্যোগ নেব, যাতে আর কেউ এ সব নিয়ে হয়রানির শিকার না হয়। এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের মহাব্যবস্থাপক চৌধুরী মো. ফিরোজ বিন আলম জনকন্ঠকে বলেন, সংশোধিত ব্যাংক কোম্পানি আইন অনুযায়ী, পর পর দুই মেয়াদের বেশি দায়িত্ব পালন করতে পারবেন না ব্যাংকের পরিচালকরা। এ ছাড়া পরিচালক পদে দায়িত্ব পালনের পূর্বে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনুমোদনেরও বাধ্যবাধ্যকতা রয়েছে। এই দুটি বিষয় আমরা চিঠি দিয়ে পূবালী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদকে জানিয়েছি।

প্রকাশিত : ২২ জুন ২০১৫

২২/০৬/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন

অর্থ বাণিজ্য



ব্রেকিং নিউজ: