রৌদ্রজ্জ্বল, তাপমাত্রা ২৩.৯ °C
 
৮ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, বৃহস্পতিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

দক্ষিণ আফ্রিকায় অপহৃত বাংলাদেশী যুবককে উদ্ধারে জোর চেষ্টা

প্রকাশিত : ২১ জুন ২০১৫
  • ঢাকায় মুক্তিপণের টাকা তুলতে গিয়ে গ্রেফতার মহিলা কারাগারে

গাফ্ফার খান চৌধুরী ॥ গত ১৮ দিনে এক ফোঁটাও ঘুম হয়নি। নাওয়া নেই, খাওয়া নেই। একই চিন্তা মাথার মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে- কখন উদ্ধার হবে বুকের ধন। একমাত্র ছেলে। উদ্ধার হলেই শান্তি। ছেলে উদ্ধার না হলে আমার কি হবে? পৃথিবীতে থাকার মতো বলতে একমাত্র ছেলেই রয়েছে। পৃথিবীতে আমার আর কেউ নেই। আমাকে কে দেখবে? আমার স্বামী নেই। আত্মীয়স্বজন বলতেও তেমন কেউই নেই। ছেলে বেঁচে আছে না, মেরে ফেলা হয়েছে আল্লাহ জানেন। বলতেই ডুকরে কেঁদে উঠলেন দক্ষিণ আফ্রিকার জোহানেসবার্গে অপহৃত বাংলাদেশী তরুণ নাফিসের মা। সিআইডির পদস্থ কর্মকর্তারাও নানাভাবে ছেলেকে উদ্ধারের ব্যাপারে তাঁকে আশ্বস্ত করছিলেন। কিন্তু মায়ের মন বলে কথা। যতক্ষণ ছেলে উদ্ধার না হচ্ছে, ততক্ষণ কি মায়ের মন ঠিক থাকে! এক পর্যায়ে হাউমাউ করে কাঁদতে থাকেন নাফিসের মা।

নাফিসকে উদ্ধারে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সিআইডি যোগাযোগ করেছে। এ সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় কাগজপত্র, পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত খবর, মামলার নথিপত্রসহ আনুষঙ্গিক কাগজপত্র পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে হস্তান্তর করেছে সিআইডি পুলিশ। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছে। মন্ত্রণালয়ের তরফ থেকে দক্ষিণ আফ্রিকার সঙ্গে যোগাযোগ হয়েছে। সিআইডি ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের যোগাযোগের প্রেক্ষিতে নাফিস অপহরণের সঙ্গে জড়িত তিনজন গ্রেফতার হয়েছে। তাদের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করছে দক্ষিণ আফ্রিকার পুলিশ। স্বল্প সময়ের মধ্যেই নাফিসকে সে দেশের পুলিশ উদ্ধার করতে পারবে বলে সিআইডির তরফ থেকে জানানো হয়েছে।

পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের এক পদস্থ কর্মকর্তার রুমে বসেই কথা হচ্ছিল নাফিসের মা রুবি বেগমের সঙ্গে। তার পুরো শরীর বোরকায় ঢাকা। জানা গেল, তিনি বোরকা পরেন। কিন্তু এতটা ডেকে নয়। তাঁর মাথা থেকে পা পর্যন্ত সবকিছুই ঢাকা। মূলত নিরাপত্তার কারণে তিনি এমন বেশ ধারণ করেছেন। নাফিসের অপহরণের সঙ্গে জড়িতদের মধ্যে বাংলাদেশী অপহরণকারীরা যাতে নাফিসের মাকে চিনতে না পারেন এজন্যই এমন বেশ।

নাফিসের মা জানালেন, তাদের বাড়ি মুন্সীগঞ্জ জেলার গজারিয়া থানাধীন গোয়াগাছিয়া ইউনিয়নের ভাসানচর গ্রামে। অনেক আগেই তাঁর স্বামী গত হয়েছেন। অভাবের সংসারে একমাত্র মেয়ে তানিয়া আর একমাত্র ছেলে নাফিসকে (৩০) তেমন পড়াশোনা করাতে পারেননি। অনেকটা অভাবের মধ্যেই মেয়ে তানিয়াকে বিয়ে দেন। প্রায় নয় বছর ধরে তানিয়া তার স্বামী ও একমাত্র ভাই নাফিসকে নিয়ে দক্ষিণ আফ্রিকার জোহানেসবার্গে পাড়ি জমান। সেখানে তারা একটি বড় ডিপার্টমেন্টাল স্টোর খুলে ব্যবসা করছেন। ব্যবসায় আয় উন্নতি ভাল। সবকিছুই ভালভাবেই চলছিল। কিন্তু গত ২ জুন হঠাৎ করেই যেন মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়ে।

ওইদিন জোহানেসবার্গ থেকে নিখোঁজ হয় নাফিস। বৃদ্ধ মা চিন্তা করবেন ভেবে নিখোঁজের বিষয়টি নাফিসের বোন ও বোনজামাইয়ের তরফ থেকে তাৎক্ষণিক জানানো হয়নি। কিন্তু প্রতিদিনই টেলিফোনে মা একমাত্র ছেলের খোঁজখবর নিতেন। এক পর্যায়ে তানিয়া ও তার স্বামী বিষয়টি বাংলাদেশে থাকা মাকে জানান। এরপর থেকেই ঘুম হারাম।

নাফিসের বোন ও তার স্বামী জোহানেসবার্গে বহুভাবে নাফিসের সন্ধান করার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু কোন লাভ হয়নি। এরপর বিষয়টি দক্ষিণ আফ্রিকার পুলিশকে জানানো হয়। প্রায় দুইদিন পর নাফিসকে অপহরণ করা হয়েছে বলে তার বোন ও বোন জামাইকে টেলিফোনে জানায় অপহরণকারীরা। মুক্তিপণ হিসেবে সাত লাখ টাকা দাবি করা হয়। মুক্তিপণের টাকাটি মুন্সীগঞ্জের গোয়াগাছিয়া ইউনিয়নের বাসিন্দা ঢাকায় বসবাসরত আলেয়া নামে এক নারীর পুরনো ঢাকার একটি ব্যাংক এ্যাকাউন্টে জমা করার কথা বলা হয়। এরপর অপহরণের সঙ্গে আলেয়ার পরিবারের জড়িত থাকার বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে যায়। গত ১৬ জুন নাফিসের পরিবারের তরফ থেকে রাজধানীর লালবাগ থানায় এ সংক্রান্ত একটি মামলা দায়ের করা হয়। মামলা নম্বর-৮। থানা পুলিশের কাছ থেকে মামলাটি চলে আসে সিআইডির কাছে।

সিআইডি সূত্রে জানা গেছে, মামলা তদন্তের দায়িত্ব পাওয়ার পর আলেয়ার ব্যাংক এ্যাকাউন্টের উপর নজরদারি শুরু হয়। এ্যাকাউন্ট সম্পর্কে প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করা হয়। গত ১৮ জুন ছেলের মুক্তিপণের সাত লাখ টাকা জমা দেন নাফিসের মা। টাকা জমা দেয়ার পর ওইদিনই টাকা তুলতে যায় আলেয়া। এ সময় আলেয়াকে গ্রেফতার করা হয়।

আলেয়াকে জিজ্ঞাসাবাদে জানায়, তার স্বামী তাজুল ইসলাম তাকে তার এ্যাকাউন্টে সাত লাখ টাকা জমা হবে বলে জানায়। কিসের টাকা তা জানায়নি। টাকাগুলো তুলে জমি কেনার কথা বলে। সেই মোতাবেক আলেয়া টাকা তুলতে ব্যাংকে যায়।

সিআইডির একজন উর্ধতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জনকণ্ঠকে জানান, আলেয়াকে নানাভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। এমনকি আলেয়ার সঙ্গে দক্ষিণ আফ্রিকার জোহানেসবার্গে অবস্থিত তার স্বামীর সঙ্গে টেলিফোনে কয়েক দফায় কথা বলানো হয়। আলেয়া তার স্বামীকে অপহৃত নাফিসকে মুক্তি দিতে বার বার অনুরোধ করেন। কিন্তু আলেয়ার স্বামীর তরফ থেকে নাফিসকে মুক্তির বিষয়ে কোন সাড়া মেলেনি। নাফিসকে উদ্ধারে প্রয়োজনে বাংলাদেশে থাকা আলেয়া ও তার স্বামীর পরিবারের সবাইকে গ্রেফতার করা হবে বলেও আলেয়ার মাধ্যমে তার স্বামীকে জানানো হয়। তাতেও নাফিসকে মুক্তির বিষয়ে আলেয়ার স্বামীর কাছ থেকে কোন সাড়া মেলেনি। শেষ পর্যন্ত সার্বিক পরিস্থিতি নাফিসের বোন ও বোনজামাইয়ের মাধ্যমে এবং সিআইডির তরফ থেকে দক্ষিণ আফ্রিকার পুলিশকে জানানো হয়। কোনক্রমেই নাফিসকে মুক্তি দিতে রাজি না হওয়ায় দক্ষিণ আফ্রিকার পুলিশ আলেয়ার স্বামী তাজুল ইসলাম ও তার দুই বন্ধু মহসীন এবং ওয়াসিফকে গ্রেফতার করে। তাদের বৃহস্পতিবারই রিমান্ডে নেয় দক্ষিণ আফ্রিকার পুলিশ। সেখানে তিনজনকে জিজ্ঞাসাবাদ চলছে। এদিকে আলেয়াকে লালবাগ থানায় দায়েরকৃত অপহরণ মামলায় গ্রেফতার দেখিয়ে ঢাকার সিএমএম আদালতে সোপর্দ করা হয়। আদালত তাকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠায়।

এ ব্যাপারে সিআইডির অর্গানাইজড ক্রাইম (সংঘবদ্ধ অপরাধ) বিভাগের বিশেষ পুলিশ মীর্জা আব্দুল্লাহেল বাকী জনকণ্ঠকে বলেন, নাফিসকে উদ্ধারে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হস্তক্ষেপ কামনা করা হয়েছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে আলেয়াকে জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্য, মামলার নথিপত্রসহ যাবতীয় কাগজপত্র দেয়া হয়েছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নিয়ে দক্ষিণ আফ্রিকার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করছে। এছাড়া সিআইডি পুলিশ, নাফিসের বোন ও বোন জামাইয়ের তরফ থেকে দক্ষিণ আফ্রিকার পুলিশের সঙ্গে সর্বক্ষণিক যোগাযোগ অব্যাহত আছে। নাফিসকে উদ্ধারে সবোর্চ্চ চেষ্টা চলছে। এদিকে নাফিসের বোন ও বোন জামাইকে কয়েক ব্যক্তি ফোন করে। ফোনকারীরা নিজেদের পাকিস্তানের মাফিয়া বলে পরিচয় দেয়। তারা আলেয়াকে সিআইডি পুলিশের হাত থেকে মুক্ত করে দিতে নাফিসের বোন ও বোনজামাইকে উদ্যোগ নেয়ার কথা বলে। অন্যথায় নাফিসের পরিণতি ভাল হবে না বলে ফোনকারীরা হুমকি দেয়।

সিআইডির একজন উর্ধতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জনকণ্ঠকে জানান, নাফিসকে উদ্ধারে আলেয়ার মাধ্যমে নানাভাবে চেষ্টা করা হয়েছে। এমনকি ফোনকারীদের সঙ্গেও আলেয়া ও সিআইডির তরফ থেকে কথা বলা হয়েছে। তারা শুধু আলেয়াকে ছেড়ে দিতে বলে। এদিকে সিআইডি ও আলেয়া নাফিসকে ছেড়ে দিতে বলে। দীর্ঘ সময় এ নিয়ে দেনদরবারও হয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত নাফিসের সন্ধান না পাওয়ায় বাধ্য হয়ে আলেয়াকে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। নাফিসকে উদ্ধার করা সম্ভব হলে আলেয়াকে ছেড়ে দেয়ার বিষয়টি ভেবে দেখা যেত। নাফিসকে উদ্ধার করতে বাংলাদেশ ও দক্ষিণ আফ্রিকার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পুলিশ আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করছে। আশা করা যাচ্ছে দ্রুতই নাফিসকে উদ্ধার করা সম্ভব হবে। নাফিসকে উদ্ধার করতে প্রয়োজনে বাংলাদেশে থাকা আলেয়া ও তার স্বামীর পরিবারের সবাইকে পুলিশ হেফাজতে আনার বিষয়ে সম্মিলিত সিদ্ধান্ত হয়েছে।

প্রকাশিত : ২১ জুন ২০১৫

২১/০৬/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন

শেষের পাতা



ব্রেকিং নিউজ: