কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৩ ডিসেম্বর ২০১৬, ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শনিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

বিয়ে ॥ নারী-পুরুষের চিরন্তন সম্পর্ক

প্রকাশিত : ২০ জুন ২০১৫

হলুদ বাটো মেন্দি বাটো, বাটো ফুলের মৌ, বিয়ের সাজে সাজবে কন্যা ... বিয়ের কনের গায়ে হলুদের সময় এমন গান আজও শোনা যায়। ‘এমন মজা হয় না, গায়ে সোনার গয়না বুবুমনির বিয়ে হবে বাজবে কত বাজনা ...’ গানটি ষাটের দশকে এতটাই জনপ্রিয়তা পায় বিয়ে বাড়ির মাইকে এই গান না হলেই নয়। আর বাঙালীর শিকড়ের সংস্কৃতির ঐতিহ্যে বিয়ের গীত না গাইলে আজও ষোলোকলা পূর্ণ হয় না। এমন একটি গীত ‘বিরাজ কৈপুল যৈপুল চট্ট হুক্কার মোগাড়ো তামাকের ডিবাডো লইয়া বইসা কাছে রাইতে রাইতে চড়কার বাজ বাজে ওলো নানী গুমগুমগুম ছুমছুমছুম আর বুজি দ্যখ দেখাতে ভালো লাল দেখাতে খট্টস ...’ (আঞ্চলিক গীতের ভাবার্থ হলো বিরাজ কৈপুল কই আছো শুনে যাও হুকা ও তামাকের ডিব্বা নিয়ে বসো বাড়িতে বিয়ের চড়কার বাদ্য বাজে আমাদের মেয়ে দেখতে শুনতে খুব ভালো...)।’ দেশে বিয়ের অনুষ্ঠানের কতই না আয়োজন।

বিয়ে মানবজীবনের দ্বিতীয় পর্বের অভিষেক। মানবজীবনের এর আগের সময়কাল- অরূপের অন্ধকার থেকে মর্তে আগমনে শিশুর ওপর আলোর বিন্দু এসে ঝরে পড়ে রূপের জগতে। জন্ম হয় চেতনার, কণ্ঠে ওঠে ‘মা মা গো মা আমি এলাম তোমার কোলে, তোমার ছায়ায় তোমার মায়ায় মানুষ হবো বলে...।’ অপার স্নেহে বেড়ে ওঠা শিশু হাঁটি হাঁটি পা পা করে পৌঁছে কৈশোরের উচ্ছলতায়। গেয়ে ওঠে ‘আমি রাজি রাখো বাজি একডুবে ভরা নদী হয়ে যাবো পার ...’। কিশোর উদ্দীপনার উত্তরণ যৌবনের আহ্বানে। অভ্যর্থনা জানায় ‘এসো যৌবন এসো হে বন্ধু এসো এসো দিন গুনেছি তোমারই জন্য...’। যৌবনের দিনগুলো নিয়ে আসে বসন্তের বারতা। খুঁজে পেতে চায় সঙ্গী। প্রণয়ের পাখিরাও কিচিরি মিচির শুরু করে। তারপর পরিণয়ের পালা শেষে অনুভব, পৃথিবীতে একা নয়। পাশে আছে আরও কেউ। সুখের এমন স্বীকৃতিতে সুর তোলে ‘তুমি আর আমি আর আমাদের সন্তান এই আমাদের পৃথিবী, তুমি সুর আমি কথা মিলে মিশে হয় গান ...’। এভাবেই জীবনের সুর ও কথা নিয়ে পৃথিবীতে কিছুটা সময় কেটে অনেক স্মৃতি রেখে ফের ফিরে যায় অরূপের অন্ধকারে। এমনই মানবজীবনে বিয়ের প্রাচীন রীতি ও বর্তমানের রীতির মধ্যে বিশাল ব্যবধান। বৈষ্ণব সাহিত্যে প্রেম ও বিয়ের দুইটি রূপের উল্লেখ আছে। ভাব ও মহাভাব। ভাবের সঙ্গে আছে মানব-মানবীর জুটি বাঁধা। আরেকটি রাধাকে মহাভাব পেয়ে বসে। সে কৃষ্ণের বাঁশির সুর শুনে অন্ধকারে অরণ্যে কৃষ্ণাভিসারে যায়। বিয়ে নিয়ে মনীষী বার্টান্ড রাসেলের উক্তি- দুইজন মানুষ যখন বায়োলজিক্যালি হরমোন সিক্রেশন অনুভব করে তখন বিয়ের বন্ধনে আবদ্ধ হয় এবং আজীবন একইভাবে পরস্পরের প্রতি কামনা অনুভব করার শপথ গ্রহণ করে। তার এই মতামত বর্তমান কালেও প্রযোজ্য। তারও আগে প্রাচীনকালে মহাভারতের নানা উপাখ্যানে মানব-মানবীর মিলনে কামসূত্রের সঙ্গে আসক্তি প্রেম-প্রণয় পরিণয় নিয়ে বহু গল্প রচিত হয়েছে। সত্যবতি-পরাশয়ের কাহিনী সেখান থেকে উলুপি অর্জুন কৃন্তি ও সূর্য, হিড়িম্বা ও ভীম, বিশ্বামিত্র মেনকার মিলনে শকুন্তলা চিত্রাঙ্গদা, উর্বশী ও অর্জুন নিয়ে কত ঘটনা রচিত হয়েছে। রামের বাবা রাজা দশরথের সঙ্গে কৌশল্যার এবং রাম ও সীতার বিয়ে নিয়ে যে উপাখ্যান তা ইতিহাসের পালাবদলে এ যুগেও বহুবিবাহের সঙ্গে বহুগামিতাও ফের আসছে।

প্রাচীন মহাভারতে যাই থাক সব কিছু ছাপিয়ে বর্তমানের বিয়েতে নারী বৃত্তাবদ্ধ। দূর অতীতে নারী যথেষ্ট স্বাধীনতা ভোগ করত। তরুণ তরুণীরা মেলামেশা করত অবাধে। স্বাধীনভাবে জীবন সঙ্গী নির্বাচনের পুরো অধিকার ছিল। পরবর্তী সময়ে নারীর এই অধিকার কেড়ে নেয়া হয়। পুরুষের ইচ্ছানুযায়ী নির্বাচিত করা হয়। তারওপরও সতীত্ব নামের একটি কনসেপ্ট অবশ্য রক্ষণীয় শর্ত হিসাবে সমাজে প্রতিষ্ঠা পায়। অথচ পুরুষের জন্য তা প্রযোজ্য নয়। পুরুষবাচক এমন শব্দও সৃষ্টি করা হয়নি। সৎ শব্দের দ্বারা আমরা যা বুঝি সতী শব্দের দ্বারা তা বুঝতে চাই না। নারী-পুরুষের কাছে কামনার বস্তু তাই কামিনী, রমনের বস্তু তাই রমণী। শুধু নারীদের জন্য সমাজ সৃষ্টি করেছে এই শব্দ। এভাবেই মৌর্য সম্রাট চন্দ্রগুপ্তের রাজসভায় গ্রীক রাজদূতের মেগাস্থিনিসের একটি উক্তি ‘তারা যুবতী কন্যাদের হাটে নেয়। কেউ বিবাহেচ্ছু হয়ে এগিয়ে এলে সম্পূর্ণ অনাবৃত করে নিরীক্ষণ করতে দেয়া হয়। পছন্দ হলে পণের বিনিময়ে স্বামী-স্ত্রী হিসেবে বাস করে। সেই পর্যায় থেকে আজকের সমাজ এতটুতুই এগিয়েছে- এখন আর অনাবৃত করা হয় না। আবৃত অবস্থায় মেঘের মতো চুল কি না, আঙুল চাঁপা ফুলের মতো কিনা, ঠোঁট কমলালেবুর কোয়ার মতো কি না, চিবুকের গঠন ডিমের মতো কি না, বুকের গঠন পিনোন্নত কি না, কোমর লতার মতো কিনা, নিতম্ভ সুগঠিত কি না, গায়ের রং কাঁচা সোনার মতো কিনা ... সবকিছুই পরখ করে নেয়া হয়। এতসবের ওপর নির্ভর করে বিয়ের পর সেবাদাসী (এবং যৌনদাসী) হিসাবে কেমন হবে। নীরদ সী চৌধুরী এক বক্তব্যে বলেছেন ‘বিবাহের সময় বাঙালীর মধ্যে মাতৃভক্তি লইয়া বাড়াবাড়ি এবং অনেকটা ভ-ামীও লক্ষ্য করা যায়। বিবাহ করিতে যাইবার আগে ছেলে তার মাকে বলে তোমার জন্য দাসী আনিতে যাইতেছি।’ বিয়ে আর নরনারীর প্রেমে এরচেয়ে গুরুতর অবমাননা আর কি হয়! তারপরও এভাবেই বিয়ে হচ্ছে এবং হবে...। তবে দিনও পাল্টে যাচ্ছে।

একটা সময় বেশিরভাগ বিয়ে হতো ঘটকালির মাধ্যমে। ৮০’র দশকের পর পরিবর্তন আসে। ঘটকালি বিয়ের পাশাপশি ছেলে-মেয়ের উভয়ের পছন্দের বিয়ের পালা শুরু হয়। প্রেমের এই বিয়ে ষাটের দশকে ভাল চোখে দেখা হতো না। কেউ প্রণয়াসক্ত হলে বাধা দেয়া হতো। একবিংশ শতকে পরিবর্তন এসেছে। কেমন ছিল নিকট অতীতের বিয়ে, পেছনে ফিরে দেখা যায়- বেশিরভাগ বিয়ে হতো ঘটকের মাধ্যমে। ছেলে ও মেয়ের বাবা ঘটককে খবর দিত। ঘটক নোটবুকের নাম পরিচয় উপস্থাপন করার পর কোনটিই পছন্দ না হলে ঘটক পাত্র-পাত্রী খুঁজতে মাঠে নামত। ঘটকের বখশিশ তো আছেই। এক সময় ব্যাটে-বলে মিললে কনে দেখার পালা। সেই আদিকালের মতো চুল কান নাক ঠোঁট পরখ করা।

উঠানে পানি ঢেলে তার ওপর পা ফেলে শুকনোয় হাঁটা। কনে পছন্দ হলে যৌতুকের দরাদরি। সব মিটে গেলে বিয়ের দিনক্ষণ। গ্রামের সাধারণ বিয়েতে কলাগাছের গেট বানিয়ে উঠান পর্যন্ত রঙ্গিন কাগজ কেটে নক্সা এঁেট সাজানো। সামিয়ানা টাঙ্গিয়ে অতিথিদের বসার ব্যবস্থা। বিয়েতে মাইক বাজানো ছিল বাধ্যতামূলক। গ্রামোফোন রেকর্ডে বাংলা হিন্দী গান না বাজালে বিয়ে বাড়ি মনে করা হতো না। বিয়ের অনুষঙ্গগুলো তো আছেই। গীতের সুরে বর ও কনের গায়ে হলুদ মাখা। দুই পক্ষের আগমন। কাজীর উপস্থিতির সঙ্গে অনুষ্ঠানিকতার পালা শুরু।

রেজিস্ট্রি ফর্মে নাম ঠিকানা লিখে কিছুটা কাজ এগিয়ে নেয়া। তারপর বরের আগমনে মহা হৈহুল্লোর। কাজীর রেজিস্ট্রি ফর্মে আজও বিয়েকে নিকাহ বলে চিহ্নিত করা আছে। একটা সময় এই ফর্মের ১৯এর ঘর (নারীর অধিকার সুরক্ষা) পূরণ এবং দেন মোহারানার অর্থ নিয়ে বাগ্বিত-া ছিল। দেনমোহরানা ঠিক না হলে অনেক বিয়ে ভেঙ্গেও যেত। সব কিছু ঠিকঠাক হওয়ার পর বর কনে উভয়পক্ষের সাক্ষী প্রথমে কনেকে কবুল পড়াতে যান। কনে ক্ষীণ কণ্ঠে কবুল শব্দ উচ্চারণ করলে কাজী জানতে চান শুনেছে কি না। হ্যাঁ সূচক হলে বরের কাছে গিয়ে আনুষ্ঠানিকতা। বর ও কনে উভয়ই কবুল পাঠের পর ফর্মে স্বাক্ষর করে। এই সময় উভয়েরই হাত কিছুটা হলেও কাঁপে। তারপর বিয়ের মিষ্টি বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই লাড্ডু বিতরণ। এই মিষ্টিকে বলা হয় শুকরিয়া মিঠাই। একটা সময় আখের গুড় শুকরিয়া মিষ্টি হিসেবে বিতরণ করা হয়েছে। ৪০ ও পঞ্চাশের দশকে বড় বনেদী পরিবারের বরের বাহন ছিল হাতি। উচ্চ মধ্যবিত্ত এবং মধ্যবিত্ত পরিবারে গরুরগাড়ি ও ঘোড়া গাড়ি (টমটম) ছিল বরের বাহন। বিয়ের গরুর গাড়ি দেখেই বোঝা যেত। মাটির হাঁড়িতে করে মিষ্টি বহনকরাীরা থাকত গরুর গাড়ির সামনে। তারপর মোটর গাড়ির পালা। বর বা কনের বাড়িতে মোটরগাড়ি না থাকলেও ভাড়া করে আনতে হয়। বর্তমানে বিয়ের মোটরগাড়ি তো শোভাযাত্রার মতো। বরের মোটরগাড়ি ফুলে ফুলে ছেয়ে দেয়া হয়। বিয়ের পর এই গাড়িতে করেই কনে যায় শ্বশুরবাড়ি। কনেকে নামিয়ে নেয়ারও একটা প্রথা আছে। বরের বাবা মা বা প্রবীণ সদস্য কনেকে মিষ্টি মুখ করে (বেশিরভাগ সময় পায়েশ খাইয়ে) বরণ করে নেন। বিয়ের এই রীতি গ্রামে ও শহরের প্রায় এক। শহরে বেশিরভাগ বিয়ে হয় কমিউনিটি সেন্টারে। বর কনে উভয়পক্ষই নিজেদের বাড়িতে হলুদের অনুষ্ঠান রেখে বিয়ে পড়ানোসহ অতিথি আপ্যায়ন ও বাকি কাজ সবই কমিউিনিটি সেন্টারে। তবে বিয়ের বাড়ি সাজানো হয় নানাভাবে। আলোকসজ্জাও থাকে।

আগে বিয়ের অনুষ্ঠানে স্থির চিত্র এ্যালবামে স্মৃতি চিহ্ন হিসেবে থাকত। বর্তমানে চলমান চিত্র (ভিডিও চিত্র) বাধ্যতামূলক। উচ্চবিত্ত উচ্চমধ্যবিত্ত এবং মধ্যবিত্ত পরিবারের বর্তমানের বেশিরভাগ বিয়েতে পেশাদার ঘটকের প্রয়োজন তেমন হয় না। আত্মীয় স্বজনদের মধ্য থেকেই অনুঘটকের কাজটি হয়ে যায়। আবার শিক্ষিত ছেলেমেয়ে নিজেরাই যুগলবন্দী হতে পছন্দ করে। এই বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক’জন শিক্ষার্থীর সাফ কথা- এখন দেখে শুনে বিয়ের পিঁড়িতে বসতে হবে যাতে পরবর্তী জীবনে হাপিত্যেশ করতে না হয়। আবেগ তো থাকতেই পারে তবে বাস্তবতার সঙ্গে সমন্বয় দরকার। তাদের কথা শুনে একটি বিষয় পরিষ্কার হওয়া গেল প্রজন্ম অনেক কিছু বুঝতে শিখেছে।

Ñসমুদ্র হক, বগুড়া থেকে

প্রকাশিত : ২০ জুন ২০১৫

২০/০৬/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: