মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
১০ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শনিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

নেতৃত্ব প্রশ্নবিদ্ধ ॥ ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে বিএনপি

প্রকাশিত : ২০ জুন ২০১৫
  • মুহম্মদ শফিকুর রহমান

কোন রাজনৈতিক দল যখন ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে উপনীত হয়, কেন হয়, পেছনে যে কারণটি থাকে তা হলো দলটি ঘনঘন নীতি-আদর্শ পাল্টায়, সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারে না, দোদুল্যমানতায় থাকে। বিএনপি এখন সে পর্যায়ে নেমে এসেছে। দলের নেত্রী ‘ম্যাডাম’ খালেদা জিয়া কখন যে কি বলেন বা তার কোন্ কথাটি সত্যি, কোন্টি মিথ্যে তা বোঝবার উপায় নেই। ক্ষণে এক কথা ক্ষণে আরেক কথা। অবশ্য ভদ্র মহিলা তো এক চীফ মার্শাল ল’ এ্যাডমিনিস্ট্রেটরের (ঈগখঅ) পতœী। আজ যে কথা বলবেন কাল সে কথায় থাকতে হবে এমন কিছু দিব্যি দেয়া থাকে না। যে কারণে ঈগখঅ-র একটা মানে হলো ‘পধহপবষ সু ষধংঃ ধহহড়ঁহপবসবহঃ.’ খালেদা জিয়াও আজ এক ঘোষণা দেন, কাল থুক্কু দিয়ে আবার বিপরীতে অন্য কথা বলেন। যে কারণে তার নেতৃত্বও আজ প্রশ্নবিদ্ধ। দলের নীতি নির্ধারকদের একটি বড় অংশ খালেদা জিয়ার দোদুল্যমান রাজনীতি দেখে দেখে কেউ সরে দাঁড়িয়েছেন, কেউ লম্বা ঘুম দিয়েছেন, কেউবা ঘুম থেকে চোখ মুছতে মুছতে উঠে বলছেন, ‘খালেদাকে দিয়ে হবে না।’ এর অর্থ হলো দলের নেতৃত্ব প্রশ্নবিদ্ধ এবং নেতৃত্ব পাল্টাতে হবে। যারা খালেদা পুত্র তারেককে নিয়ে এতদিন নাচানাচি করছিলেন তারাও যেন চুপ হয়ে গেছেন। তারেক দুর্নীতির দায়ে গ্রেফতারি পরোয়ানা ঘাড়ে নিয়ে শোনা যায় লন্ডনে পালিয়ে আছেন। তার পেছনে রয়েছে ইন্টারপোল। ‘তারেক ভাইয়ার’ প্রতিও এখন আর কারও আস্থা নেই।

ভারতের সাম্প্রতিক জাতীয় নির্বাচনে শ্রীমতী সোনিয়া গান্ধীর নেতৃত্বাধীন ভারতীয় ন্যাশনাল কংগ্রেস, যা ইন্দিরা কংগ্রেস নামেও পরিচিত, খুব খারাপভাবে হেরে গেল উগ্রবাদী বিজেপি বা ভারতীয় জনতা পার্টির কাছে। নির্বাচনের রেজাল্ট বের হওয়ার আগেই খালেদা জিয়ার প্রতিনিধিরা দৌড়ালেন দিল্লীতে। হাতে ফুলের মালা, বিজেপির প্রধানমন্ত্রী শ্রী নরেন্দ্র দামোদর দাস মোদির অপেক্ষায়। কখন আসবেন? কিন্তু না তিনি এলেন ঠিকই, তবে খালেদার প্রতিনিধিরা মালাটা পরাতে পারলেন না। দিল্লীর সাউথ ব্লকের সামনের রাস্তা থেকে শুরু করে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, পার্লামেন্টের কমিটি কক্ষ, দৌড়াতে দৌড়াতে চেহারা ঘেমে একাকার আর হাতের ফুলও শুকিয়ে তামাক পাতা। কিন্তু না, ফুল গেছে যাক, সমর্থন দেয়ার জন্য তো দিল্লীর রাস্তায় রাস্তায় হাঁটার দরকার নেই। দেশে মিডিয়ার বহর তো কম নয় এবং অনেক তার নতজানু। ডেকে বলে দেয়া যায়। যেই কথা সেই কাজ। বললেন, ‘বিএনপি ভারত-বিরোধী দল নয়। কোনদিন ভারত-বিরোধিতা করেনি, আজও করছে না, ভবিষ্যতেও ভারত-বিরোধিতা করবে না।

মোদি আসছেন বাংলাদেশে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আমন্ত্রণে রাষ্ট্রীয় সফরে। কেবল রাষ্ট্রীয় সফর বললে সব বলা হবে না। ভারতের পার্লামেন্টের উভয়কক্ষে দুই দেশের স্থলসীমা চুক্তি যা ১৯৭৪ সালে জাতির পিতা বঙ্গবঙ্গু শেখ মুজিব ও ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধী স্বাক্ষর করেছিলেন, যা ‘মুজিব-ইন্দিরা’ চুক্তি নামে খ্যাত, তা সর্বসম্মতভাবে অনুমোদন করিয়ে তবেই বাংলাদেশে আসছেন। লক্ষ্য চুক্তিটি বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা। খালেদা ভেবেছিলেন মোদি যেহেতু কংগ্রেস-বিরোধী তাই কংগ্রেসের ঐতিহাসিক মিত্র আওয়ামী লীগও মোদির শত্রু হবে। কিন্তু না, বরং মোদি আওয়ামী লীগ তথা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের সঙ্গে রাষ্ট্রীয় সখ্যতা গড়ে তুললেন এবং পারস্পরিক সম্মানের ভিত্তিতে সখ্যতার নিদর্শনস্বরূপ নিজেই বাংলাদেশে এলেন। শুধু এলেন না, বাংলাদেশ মাতিয়ে গেলেন। ছিটমহলের কথা আগেও বলেছি। আজ শুধু এটুকু বলব, দুই দেশের ছিটমহলের ওই মানুষগুলোর মুখে হাসি ফুটিয়ে গেলেন। তারা নাগরিকত্ব পেল, ভোটাধিকার পেল, জাতীয় পতাকা পেল, ভূমির মালিকানা দলিল পেল। এসবই সম্ভব হয়েছে জাতির জনকের কন্যা এ সময়ের সবচেয়ে সাহসী, দূরদর্শী ও মেধাবী প্রধানমন্ত্রী দেশরতœ শেখ হাসিনার নেতৃত্বের ক্যারিশমায়, যা নরেন্দ্র মোদির মধ্যেও দেখা গেল।

খালেদা আশা ছাড়লেন না। অনেক চেষ্টা-তদবির করে মোদির সঙ্গে কয়েক মিনিটের একটা সাক্ষাতের ব্যবস্থা করলেন। মূলত গেছেন মোদির কাছে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে নালিশ জানাতে। বলতে, মোদি ভাই, শেখ হাসিনা আমাকে রাস্তায় নামতে দেয় না। আপনার দেশ বিশ্বের সবচেয়ে বড় গণতন্ত্রের দেশ, তা থেকে একটু গণতন্ত্র দেন, একটু রাস্তায় নামি। মোদি ভাই নাকি বলেছেন, হ্যাঁ, আমরা বৃহৎ গণতন্ত্রের দেশ হলেও প্রতিবেশী গণতান্ত্রিক দেশের সঙ্গে পাশাপাশি হাঁটতে চাই, কিন্তু কোনভাবেই সাম্প্রদায়িকতা ও জঙ্গীবাদকে প্রশ্রয় দেব না। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও ঘোষণা দিয়েছেন জঙ্গী দমনে জিরো টলারেন্স নীতিতে অটল আছেন। শোনা গেছে, মোদি ভাই নাকি খালেদা জিয়াকে ১০ ট্রাক অস্ত্র, ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বিচ্ছিন্নতাবাদী পৃষ্ঠপোষকতা, এসব প্রশ্নও তুলেছেন। বুঝতে অসুবিধা হয় না মোদির সঙ্গে দেখা করে খালেদা কি নিয়ে ঘরে ফিরেছেন। বস্তুত, মোদি খালেদা জিয়া ও তার সরকারের সময়টা রীতিমত স্ট্যাডি করে তবে তাকে সাক্ষাতকার দিয়েছেন। অন্যদিকে খালেদা না জানেন মোদিকে, না জানেন ভারতের রাজনীতি। ভারতের রাজনীতিতে স্বাধীনতা-বিরোধী কেউ নেই, যেমনটি আছে বাংলাদেশে জামায়াত-শিবির-মুসলিম লীগের মতো যুদ্ধাপরাধী দল, যাদের সঙ্গে খালেদা গাঁটছড়া বেঁধে রাজনীতি করছেন। খালেদা এও নিশ্চয়ই জানতেন না যে, মোদি আমাদের স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের একজন সহযোগী। তখন তিনি ছাত্র ছিলেন।

মোদি জানেন, মিলেনিয়াম ডেভেলপমেন্টে গোল (গউএ) থেকে শুরু করে অনেক সূচকেই বাংলাদেশ ভারতকে পেছনে ফেলে এগিয়ে চলেছে। কাজেই যত ছোট দেশই হোক, অর্থনীতিও যত ছোট হোক, যোগ্য নেতৃত্বের সঙ্গেই, অর্থাৎ শেখ হাসিনা ও তার সরকারের সঙ্গেই চলতে ভাল। অযোগ্য, অশিক্ষিত কারও সঙ্গে চলতে গেলে যে বারবার হোঁচট খেতে হবে। কেবল তাই নয়, যারা জঙ্গী লালন করে, নাশকতার উদ্দেশ্যে জঙ্গীদের ভারতে পাঠায়, ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বিচ্ছিন্নতাবাদীদের অর্থ, অস্ত্র ও প্রশিক্ষণ দেয়াসহ সবরকম পৃষ্ঠপোষকতা দেয়, তাদের সঙ্গে মোদি কেন সখ্যতা করবে? মোদি তো আর খালেদা নয়, যে দেশ গোল্লায় যাক, তার চেয়ার দরকার। মোদিরা দেশপ্রেমিক, তারা আগে দেশের স্বার্থ দেখে, তারপর রাজনীতি।

মোদিকে এখন আর ভাল লাগে না খালেদার। এত করে কাকুতি-মিনতি করলেন, তবু মোদি ভাই এতটুকু গণতন্ত্র দিয়ে গেলেন না। কাজেই ফাও সাপোর্টের দরকার কী? বরং গালাগাল দিলে দেশাভ্যন্তরে রাজাকাররা খুশি হবে। অতএব, ভারত-বিরোধিতার নীতিই ভাল। আবার শুরু হলো সেই পুরনো ভাঙ্গা ঢোল। আওয়ামী লীগ ভারতের কাছে দেশ বিক্রি করে দিয়েছে। শেখ হাসিনা ভারতকে বাংলাদেশ ট্রানজিট দিলেন, দেশের স্বার্থ দেখলেন না। তাছাড়া এক শ্রেণীর মানুষ আছে যারা এ ধরনের মিথ্যেও বিশ্বাস করে। ট্রানজিটটা কি তাও হয়ত জানে না। চিলে কান নিয়েছে বলে চিলের পিছু দৌড়াচ্ছে, কানে হাত দিয়ে দেখছে না। আজ সময় পাল্টেছে। এখন হাতে হাত ধরে চলার যুগ। ইউরোপের এক প্রান্ত থেকে ট্রেনে, বাসে করে ক’টি দেশে যাওয়া যায়। তাদের কিন্তু দেশ বিক্রি হয় না, বরং যেসব দেশের ওপর দিয়ে বাস বা ট্রেনটি যাচ্ছে সেসব দেশ সুবিধা পাচ্ছে। বাংলাদেশ ভূ-খণ্ড দিয়ে যখন ভারতের বাস-ট্রাক চলাচল করবে বাংলাদেশ উপযুক্ত ভাড়া পাবে। কেবল ভারত থেকে ভারত বা কলকাতা থেকে ত্রিপুরা যাওয়া নয়, ভুটান, নেপাল হয়ে আবার ভারতে যাবে। তেমনি আমাদের বাস ভুটান, নেপাল, ভারত হয়ে আবার দেশে আসবে। কেবল যাত্রী না, মালামালও আসবে- যাবে, আমরা ভাড়া পাব। তাহলে দেশটা বিক্রি হলো কোথায়? খালেদা জিয়ার ভারত-বিরোধিতা বাংলাদেশের জনগণ অনেক দেখেছে। এখন টায়ার্ড। কি বলেননি? পার্বত্য শান্তি চুক্তির পর বললেন, শেখ হাসিনা ফেনী থেকে শুরু করে গোটা চট্টগ্রাম-পার্বত্য চট্টগ্রাম ভারতের হাতে তুলে দিয়েছেন। যুক্তফ্রন্টের সময় মুসলিম লীগ বলেছিল আওয়ামী লীগকে ভোট দিলে বিবি তালাক হয়ে যাবে। খালেদা বললেন, আওয়ামী লীগকে ভোট দিলে দেশ ভারত হয়ে যাবে, মসজিদে আজানের ধ্বনি বদলে উলুধ্বনি হবে, মানুষ টুপি-দাড়ি রাখতে পারবেন না।

আর কত? তাই এখন তার দলের ভেতর থেকেই আওয়াজ উঠেছে খালেদা-তারেককে দিয়ে হবে না, বিএনপিকে বাঁচানো যাবে না। বিএনপিকে এখন কোরামিন দিতে হবে। অবশ্য এটাও ঠিক, এসব না বললে যে পাকিস্তানের আইএসআই কিংবা অপর কোন আরব দেশের পেট্রোল-ডলার বন্ধ হয়ে যাবে। শোনা যায় এখন সে অবস্থায় চলে গেছে বিএনপি। শাহবাগ জাগল অথচ এত পেট্রোলবোমা মারা হলো, মানুষ পুড়ে মরল, পঙ্গু হলো, তবু জনগণ দূরে থাক দলীয় নেতাকর্মীরা (অবশ্যই জামায়াত-শিবির বিরোধী) পর্যন্ত জাগল না, রাস্তায় নামল না। ভুল রাজনীতির পরিণতি এটাই হয়।

ঢাকা ॥ ১৯ জুন ২০১৫

লেখক : ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক ও সভাপতি, জাতীয় প্রেসক্লাব

প্রকাশিত : ২০ জুন ২০১৫

২০/০৬/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: