আংশিক মেঘলা, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৬ ডিসেম্বর ২০১৬, ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, মঙ্গলবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

শতবর্ষে কারমাইকেল কলেজ

প্রকাশিত : ১৯ জুন ২০১৫
  • মোতাহার হোসেন সুফী

কারমাইকেল কলেজ রংপুর বিভাগের শীর্ষস্থানীয় অন্যতম উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান। উচ্চশিক্ষা বিস্তারের গৌরবময় ঐতিহ্যের অধিকারী কারমাইকেল কলেজ। ইংরেজ আমলের অবিভক্ত বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষার প্রসার ও প্রচারের জন্য অসামান্য খ্যাতির অধিকারী যেসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সেগুলোর অন্যতম কারমাইকেল কলেজ। রঙ্গপুর, দিনাজপুর অঞ্চলসহ অবিভক্ত ভারতের জলপাইগুড়ি, আসাম ও সংলগ্ন এলাকার শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষার সুযোগ সৃষ্টির ক্ষেত্রে এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের রয়েছে গৌরবময় ইতিহাস। রঙ্গপুরে উচ্চবিদ্যালয় পর্যায়ে অনেক শিক্ষা প্রতষ্ঠান থাকলেও কলেজ পার্যায়ে কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ছিল না। কারমাইকেল কলেজের প্রাকৃতিক পরিবেশ ও সৌন্দর্য মনোরম। নয় শত বিঘা জমি নিয়ে কারমাইকেল কলেজের সুবিস্তীর্ণ এলাকা। নিভৃত নিরালায় কারমাইকেল কলেজের শান্ত স্নিগ্ধ পরিবেশ এবং সবুজ বৃক্ষ ও প্রান্তরের মনোরম প্রাকৃতিক সৌন্দর্য অভিভূত করে যে কোন মানুষের দৃষ্টিকে। এই কলেজের মূল ভবন ইন্দোস্যারাসেনিক আদলে নির্মিত স্থাপত্য শিল্পের এক অপূর্ব নিদর্শন।

উচ্চশিক্ষা প্রসারের লক্ষ্যে ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষার্ধে ১৮৭৭ সালে রঙ্গপুর জিলা স্কুলে কলেজ চালু করার জন্য আই.এ. ক্লাস খোলার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। ছাত্রের অভাবে কলেজ চালু করা যায় না। পরবর্তী সময়ে কুন্ডির জমিদার মৃত্যুঞ্জয় রায়চৌধুরী রঙ্গপুরে একটি কলেজ স্থাপনের জন্য ১২৫ বিঘা জমি দান করেন। সরকারী অনমোদন না পাওয়ায় তাঁর এই প্রচেষ্টা বাস্তবায়িত হয়নি। তবে তিনি তাঁর প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছিলেন। তিনি বিত্তবান জমিদার ও শিক্ষানুরাগী ব্যক্তিবর্গকে এজন্যে উদ্বুদ্ধ করতে থাকেন। ১৯১৩ সালে তৎকালীন অবিভক্ত বাংলার গভর্নর লর্ড থমাস ডেভিড ব্যারন কারমাইকেল রংপুরে আগমন করলে তাঁকে নাগরিক সংবর্ধনা প্রদান করা হয় এবং সেই সঙ্গে উচ্চশিক্ষা বিস্তারে একটি কলেজ প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তার কথা অবগত করে তাঁকে সহযোগিতা প্রদান করতে অনুরোধ জ্ঞাপন করা হয়। তিনি এই অনুরোধের জন্য সকলের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে তাঁর সম্মতি প্রদান করেন। সেই সঙ্গে তিনি কলেজ প্রতিষ্ঠার জন্য প্রাথমিক পর্যায়ে তিন লাখ টাকার প্রয়োজন হবে বলে অবহিত করেন। ১৯১৩-১৪ সালে রঙ্গপুরের তৎকালীন জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ও কালেক্টর মি. জ্ঞানেন্দ্রনাথ গুপ্ত (জে.এন.গুপ্ত) বি.এ. (অক্সফোর্ড), আই.সি. এসকে সভাপতি করে একটি কমিটি গঠন করা হয়। এই কলেজের প্রতিষ্ঠার সূচনালগ্নে রঙ্গপুরের বিত্তবান জমিদার এবং বিদ্যোৎসাহী ব্যক্তি অর্থ, জমি, শ্রম দিয়ে প্রশংসনীয় ভূমিকা পালন করেছেন। তাঁরা যুগে যুগে স্মরণীয় হয়ে থাকবেন। কলেজের অন্নদামোহন হল মিলনায়তনে যেসব দাতার উল্লেখ নাম ফলকে উৎকীর্ণ রয়েছে তাঁরা হলেন :

রায় অন্নদামোহন রায়চৌধুরী, জমিদার, টেপা

রাজা গোপাললাল রায়, জমিদার, তাজহাট

মহারাজা মনীন্দ্রচন্দ্র নন্দী বাহাদুর, জমিদার, কাশিমবাজার

মি. অন্নদা প্রসাদ সেন, জমিদার, রাধাবল্লভ

মি. বঙ্কুর্বিহারী সাহা

রানী বৃন্দারানী দেব্যা চৌধুরানী, জমিদার, ডিমলা

দৌলতুন্নেছা বিবি ও পলকজান বিবি

মি. গিরিন্দ্র মোহন রায়চৌধুরী, জমিদার, তুষভা-ার

শ্রীমতী ভবসুন্দরী দেব্যা চৌধুরানী, জমিদার, মন্থনা

জনাব মৌলভী আবদুল আজিজ চৌধুরী, জমিদার, মহিপুর

জনাব মুন্সী রহিমউদ্দিন চৌধুরী

মি. শিবেন্দ্র চন্দ্র রায় চৌধুরী

মি. দেবেন্দ্র নারায়ণ রায়

মি. যতীন্দ্রনাথ (মজুমদার), জোতদার, কুড়িগ্রাম

মি. শ্যামমোহন দাশ, রসুলপুর

মি. আদিত্য চন্দ্র সরকার, খোলাহাটি

মি. বিপিন চন্দ্র রায় চৌধুরী, বামনডাঙ্গা

শ্রীমতী সুনীতিবালা দেবী

মি. পুষ্পরায় ঝাউর, কামারজানি

মি. আশুরাম মহেশ্বরী, মহিমাগঞ্জ

মি. রাজমহল ওসওয়াল, গাইবান্ধা

মৌলভী সৈয়দ উমেদ রসুল শাহ ফকির, চড়াইখোলা

মি. গণেশলাল মালেব, কিশোরগঞ্জ

মুন্সী ফেসরা মোহাম্মদ চৌধুরী, ইটাখোলা

মি. মনীন্দ্র রায় চৌধুরী

রায় মৃত্যুঞ্জয় রায় চৌধুরী

মি. পূর্ণচন্দ্র রায় বাহাদুর

মি. মনীশ চন্দ্র রায়চৌধুরী

টেপার জমিদার অন্নদামোহন রায় চৌধুরী এক লাখ টাকা দান করায় প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হন তাজহাটের জমিদার রাজা গোপাললাল রায়। তিনিও এক লাখ টাকা অনুদান ঘোষণা করে দ্বিতলবিশিষ্ট ছাত্রাবাস (জি.এল. হোস্টেল) নির্মাণের ব্যয়ভার বহন করেন।

১৯১৩ সালে তৎকালীন গবর্নর লর্ড থমাস ডেভিড ব্যারন কারমাইকেল তিন লাখ টাকা কলেজ প্রতিষ্ঠার জন্য সংগ্রহের কথা বলেছিলেন। কিন্তু ১৯১৬ সালের মধ্যেই সংগৃহীত হলো চার লাখ টাকা। রঙ্গপুরের ইতিহাসের একটি অবিস্মরণীয় দিন ১৯১৬ সালের ১০ নবেম্বর। এই দিনে বাংলার গবর্নর লর্ড থমাস ডেভিড ব্যারন কারমাইকেল কলেজের ভিত্তিপ্রস্তুর স্থাপন করেন। তাঁর নামানুসারে এই কলেজের নামকরণ করা হয় কারমাইকেল কলেজ। ভিত্তিপ্রস্তুর স্থাপন অনুষ্ঠানে ভাষণ দান প্রসঙ্গে গবর্নর লর্ড থমাস ডেভিড ব্যারন কারমাইকেল মূল্যবান বক্তব্য প্রদান করে বলেছেনÑ

উরংপরঢ়ষরহব ধহফ পড়ৎঢ়ড়ৎধঃব ংড়পরধষ ষরভব রিষষ নব ঃযব পযরবভ রফবধষং ড়ভ ঃযব হবি রহংঃরঃঁঃরড়হ.

কারমাইকেল কলেজের ভিত্তিপ্রস্তুর স্থাপিত হওয়ার পর নির্মাণকাজের তদারকির জন্য গঠিত হয় ২৮ সদস্যবিশিষ্ট একটি কমিটি। পদাধিকারবলে এই কমিটির সভাপতি ছিলেন রংপুরের তৎকালীন জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ও কালেক্টর মি. জ্ঞানেন্দ্রনাথ গুপ্ত (জে.এন.গুপ্ত) আই.সি.এস। তিনি ছিলেন অক্সফোর্ডের গ্রাজুয়েট। তিনি কারমাইকেল কলেজের মূল ভবনের পরিকল্পনা অক্সফোর্ডের আদলে প্রণয়ন করেন। কলেজ ভবন নির্মাণ কাজে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেন মি. এম. সি. মল্লিক আই. সি. এস. রংপুরের প্রথম প্রকৌশলী মি. আশুতোষ লাহিড়ী বি.সি.ই., মি. ভূজেন্দ্রনাথ মুখার্জী, মৌলভী শামসুদ্দিন আহমদ, রায় বাহাদুর শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, মি. রমনীমোহন দাস, ডেপুটি কালেক্টর শ্রী বসন্তকুমার দাস, মি. যোগেন্দ্র দত্ত, মি. যোগেন্দ্রনাথ নন্দী, মি. এ.পি. পিটার সম, মি. হরিচরণ শেঠ, মি. মাহতাবচন্দ্র ঘোষ সার্কেল অফিসার রাধারমণ মজুমদার, সুরেশচন্দ্র রায়চৌধুরী প্রমুখ। কারমাইকেল কলেজ ভবনের মুখ্য পরিদর্শক ও নির্মাতা ছিলেন স্থপতি মি. পুলিনচন্দ্র রায়। তাঁর নির্দেশনায় ও তত্ত্বাবধানে কলেজের মূল ভবন সুদক্ষ রাজমিস্ত্রিদের দ্বারা অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে নির্মিত হয়েছে। মি. মনীন্দ্রনাথ সাধু সি.ই. ছিলেন তাঁর সহকারী প্রকৌশলী।

কারমাইকেল কলেজের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ ছিলেন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ড. ওয়াটকিনস বি.এ (অনার্স, অরাডন) ডিডি (হিডেনবার্গ, জার্মানি)। কলেজের নিজস্ব ভবন নির্মিত না হওয়া পর্যন্ত রংপুর জিলা বোর্ড ভবনে চালু ছিল শিক্ষা কার্যক্রম।

১৯১৮ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি বাংলার গবর্নর আর্ল অব রোনান্ডেসে উদ্বোধন করেন কলেজের নবনির্মিত মূল ভবন। তিনি জমি ক্রয় ও অন্যান্য খরচের জন্য ৫০ হাজার টাকা অনুদান ঘোষণা করেন। এরপর তিনি আরও ৪০ হাজার টাকা অনুদান প্রদান করেন। ১৯১৭ সালের জুলাই মাসে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় এই কলেজে আই. এ. এবং বি. এ শিক্ষা কার্যক্রম চালু করার অনুমতি প্রদান করে। ১৯২২ সালে বাংলার গবর্নর লর্ড লিটন কারমাইকেল কলেজ পরিদর্শনে এসে সন্তুষ্ট হয়ে আই. এস. সি. শিক্ষা কার্যক্রম চালু করার অনুমতি দেন। বি.এ. পাস শিক্ষা কার্যক্রমের সঙ্গে বাংলা, ইংরেজী, আরবী, সংস্কৃত, ফারসী, অঙ্ক, ইতিহাস, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, অর্থনীতি, দর্শন প্রভৃতি বিষয়ে অনার্স কোর্স চালু করার অনুমতি পাওয়া যায়। ১৯২৫ সালে বি.এস.সি শিক্ষা কার্যক্রম চালু হয়। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পূর্ব পর্যন্ত এই কলেজ কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত ছিল। ১৯৫৩ সালের পূর্ব পর্যন্ত কলেজটি অধিভুক্ত থাকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে এবং পরে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যায়ের অনুমোদন লাভ করে শিক্ষা কার্যক্রম অব্যাহত রাখে। ১৯৬৩ সালের ১ জানুয়ারি তারিখে কারমাইকেল কলেজকে সরকারীকরণ করা হয়। তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানে কারমাইকেল কলেজ প্রথম সরকারী কলেজ। চাহিদা অনুযায়ী এ সময় কলেজের অবকাঠামোগত সম্প্রসারণ হতে থাকে। ১৯৬৩-৬৪ সালে নির্মিত হয় কলেজের দ্বিতীয় ভবন, ১৯৬৭ সালে তৃতীয় ভবন। ১৯৭২-৭৩ সালে নির্মিত হয় শহীদ মিনার। এম. এ. জি. ওসমানী ছাত্রাবাস নির্মিত হয় ১৯৭৩-৭৪ সালে। ১৯৭৭ সালে রসায়ন ভবনের নির্মাণ কাজ শুরু হয়। এই প্রসঙ্গে উল্লেখ্য, কলেজের প্রতিষ্ঠালগ্নের পরবর্তী সময়ে নির্মিত হয়েছিল জি. এল. ছাত্রাবাস, সি. এম ছাত্রাবাস ও কেবি ছাত্রাবাস। কলেজের প্রতিষ্ঠালগ্নে ছাত্রীদের জন্য কোন আবাসিক সুবিধা ছিল না। ছাত্রীরা শহর হতে প্রথমে ঘোড়ার গাড়িতে ও রিকশাযোগে কলেজে যাতায়াত করত। পরে শহর থেকে কলেজে যাতায়াতে ছাত্রীদের জন্য বাসের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। ছাত্রীসংখ্যা ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পেতে থাকলে ১৯৮৭-৮৮ সালে প্রথম ছাত্রীনিবাস বেগম রোকেয়া ছাত্রীনিবাস নির্মিত হয়। ১৯৮৯-৯০ সালে নির্মিত হয় শহীদ জননী জাহানারা ইমাম ছাত্রীনিবাস। স্মর্তব্য, শহীদ জননী জানানারা ইমাম ছিলেন কারমাইকেল কলেজের ছাত্রী। এরপর নির্মিত হয় তাপসী রাবেয়া ছাত্রীনিবাস। কলেজ মসজিদ নির্মিত হয় ১৯৭৮ সালে। ১৯৮৯-৯০ সালে পর্যাপ্ত সুবিদাসহ নির্মিত হয় ছাত্রীদের জন্য নতুন বিশ্রামাগার। ১৯৯৯ সালে কলেজ চত্বরে স্বাধীনতা স্মারক ভাস্কর্য নির্মাণের প্রচেষ্টা গ্রহণ হয় কিন্তু স্বাধীনতাবিরোধী অপশক্তির অশুভ তৎপরতার কারণে তা বাস্তবায়িত হয়নি।

একথা আগেই উল্লেখ করেছি, কারমাইকেল কলেজের প্রতিষ্ঠালগ্নে প্রথম অধ্যক্ষ ছিলেন ড. ওয়াটকিনস বি. এ (অরাডন) ডি. ডি (হিডেনবার্গ, জার্মানি) ১৯১৭ থেকে ১৯২০ সাল। পরবর্তীদের মধ্যে প্রফেসর ইউ. সি. নাগ (দায়িত্বে ২৩-১১-২০ থেকে ২৬-৪-২১), প্রফেসর নৃত্যালাল মুখার্জী (ইংরেজী) ২৭-৮-২১ থেকে ৪-৯-২৫, প্রফেসর সুরেন্দ্রচন্দ্র দত্তগুপ্ত এম. এ. (ইংরেজী) (দায়িত্বে ৫-৯-২৫ থেকে ১৬-৭-২৬), ড. দেবেন্দ্রনাথ মল্লিক র‌্যাংলার বি. এ (ক্যান্টার, ডি. এস. সি. ইউকে. ডাব) এফ. আর. এস. ই ২৬-৭-২৬ থেকে ১৫-৮-৪০, প্রফেসর দেবপ্রসাদ ঘোষ এম. এ. (গণিত) বি. এল ১৬-৮-৪০ থেকে ১৬-৮-৫০। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর অধ্যক্ষ পদে প্রথম দায়িত্বপ্রাপ্ত হন প্রফেসর আবদুল হাকিম কোরাশী এম. এ। কারমাইকেল কলেজ সরকারীকরণের পূর্বপর্যন্ত অধ্যক্ষ পদে বৃত ছিলেন প্রফেসর আসকার আলী এম.এ (ইংরেজী), বার-এট-ল (লন্ডন)। সে সময় অধ্যাপনার পাশাপাশি প্রশাসনিক কাজে নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন উপাধ্যক্ষ হৃদয়রঞ্জন লাহিড়ী। ‘ফাদার লাহিড়ী’ নামে তিনি ছিলেন সমধিক পরিচিত। সরকারীকরণের সময় অধ্যক্ষ পদে নিয়োগপ্রাপ্ত হন প্রফেসর ইলিয়াস আহমেদ এম. এ (ইংরেজী)। সহ-অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন অধ্যাপক মোঃ মোজাফফারুল ইসলাম (ফারসী ও উর্দু)।

কারমাইকেল কলেজের প্রশাসনিক ও শিক্ষা কার্যক্রমে পরামর্শ ও সহায়তা প্রদানের জন্য প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে ছিল কারমাইকেল কলেজ গবর্নিং বডি। গবর্নিং বডিতে প্রশাসন থেকে সদস্য, দাতাদের মধ্য থেকে সদস্য, শিক্ষানুরাগী ব্যক্তিবর্গ থেকে সদস্য, অভিভাবক সদস্য ও শিক্ষক প্রতিনিধি ছিলেন। পদাধিকারবলে কলেজ গবর্নিং বডির সভাপতি ছিলেন জেলা প্রশাসক এবং সম্পাদক ছিলেন কলেজ অধ্যক্ষ। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর কারমাইকেল কলেজ গবর্নিং বডি পুনর্গঠিত হয়। জেলা প্রশাসনের প্রতিনিধি ব্যবসায়ী সংগঠন রংপুর চেম্বার অব কর্মাসের প্রতিনিধি, অভিভাবক প্রতিনিধি ও শিক্ষক প্রতিনিধি সমন্বয়ে গঠিত হয়েছিল কারমাইকেল কলেজ গবর্নিংবডি। পূর্বের ঐতিহ্য অনুসরণে রংপুরের জেলা প্রশাসক পদাধিকারবলে ছিলেন কলেজ গবর্নিংবডির সভাপতি এবং কলেজ অধ্যক্ষ ছিলেন সম্পাদক। ১৯৬৩ সালের ১ জানুয়ারি তারিখে কারমাইকেল কলেজ সরকারীকরণের পূর্ব পর্যন্ত কার্যকর ছিল কারমাইকেল কলেজ গবর্নিংবডি। শিক্ষার্থীদের অভিভাবক প্রতিনিধি হিসেবে কারমাইকেল কলেজ গবর্নিং বডির সদস্য ছিলেন আইনজীবী মোহাম্মদ হোসেন ও আইনজীবী শীতল কুমার রায়চৌধুরী। কারমাইকেল কলেজ গবর্নিং বডির অভিভাবক সদস্য হিসেবে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছেন আইনজীবী মোহাম্মদ হোসেন। স্মর্তব্য, তিনি ছিলেন কারমাইকেল কলেজর প্রাক্তন ছাত্র। তিনি ছিলেন শিক্ষাদরদী ও সমাজহিতৈষী। কলেজ গবর্নিংবডির সদস্য ছাড়াও তিনি ছিলেন রংপুর পৌরসভার ওয়ার্ড কমিশনার, রংপুর সদর হাসপাতাল ও রংপুর জেল পরিদর্শক। কারমাইকেল কলেজ গবর্নিং বডির সম্পাদক কলেজ অধ্যক্ষের পরামর্শ ও অনুমতিক্রমে তিনি কলেজ গবর্নিং বডির সভার বিজ্ঞপ্তি, সভার আলোচ্যসূচী সভার সদস্যগণের সুচিন্তিত পরামর্শ, সভা অনুষ্ঠানের পর সভার কার্যবিবরণী লিপিবদ্ধ করতেন। প্রশাসনিক ও শিক্ষা কার্যক্রমে সমস্যা দেখা দিলে তাঁর সুচিন্তিত পরামর্শ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে কলেজের অধ্যক্ষ আসকার আলী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতেন। কারমাইকেল কলেজের সরকারীকরণের প্রক্রিয়া শুরু হয় ১৯৬১ সালে। নানাবিধ কারণে তা বিলম্বিত হয়। ১৯৬২ সালে সরকারীকরণের প্রক্রিয়া চূড়ান্ত হয়। সে সময়ে ছাত্রসংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় শিক্ষার প্রসারে কারমাইকেল কলেজ গবর্নিং বডি উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ গ্রহণ করে। মানবিক, বিজ্ঞান ও বাণিজ্য বিভাগের ১২ বিষয়ে ২৪ প্রভাষক নিয়োগের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। প্রভাষক নিয়োগের জন্য চাকরিপ্রার্থীদের সাক্ষাতকার গ্রহণ ও নিয়োগ প্রদানের ক্ষেত্রে কলেজ গবর্নিংবডির সদস্যগণের সঙ্গে অভিভাবক সদস্য আইনজীবী মোহাম্মদ হোসেন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন।

ইংরেজ আমলে কারমাইকেল কলেজের ছাত্র ও শিক্ষকগণ শিক্ষা কার্যক্রমের পাশাপাশি সাহিত্য, সংস্কৃতি ও রাজনীতিক্ষেত্রে অনন্য ভূমিকা পালন করেছেন। ইংরেজবিরোধী স্বাধীনতা সংগ্রামে কংগ্রেসের নেতৃত্বে বঙ্গভঙ্গবিরোধী পরবর্তী আন্দোলন, অসযোগ আন্দোলনসহ অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ আন্দোলনে তাঁরা অংশগ্রহণ করেছেন। পাকিস্তান আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেছে মুসলমান ছাত্রসমাজ। কমিউনিস্ট পার্টির উদ্যোগে তোলাগ-ি আন্দোলন ও তেভাগা সংগ্রামে অংশগ্রহণ করেছে ছাত্র ফেডারেশনের নেতাকর্মীগণ। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর ১৯৪৮ সালে রাষ্ট্রভাষা প্রশ্নে পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা কায়েদে আজম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ একমাত্র রাষ্ট্রভাষা উর্দুর পক্ষে অবস্থান গ্রহণ করেন। রাষ্ট্রভাষা উর্দুর সঙ্গে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলাভাষার দাবি আদায়ে হয় ভাষা আন্দোলন। ভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠার ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারিতে পুলিশের গুলিবর্ষণে শহীদ হন বরকত, সালাম, রফিক, জব্বার প্রমুখ। ১৯৫৪ সালে পূর্ব পাকিস্তানের সাধারণ নির্বাচনের স্বায়ত্তশাসনের দাবি আদায়ে ২১ দফার ভিত্তিতে যুক্তফ্রন্ট অংশগ্রহণ করে নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জন করে। যুক্তফ্রন্টের নির্বাচনী বিজয়কে নস্যাত করে প্রেসিডেন্ট ইস্কান্দর মীর্জা ৯২-ক ধারা জারি করেন। প্রেসিডেন্ট ইস্কান্দর মীর্জাকে ক্ষমতাচ্যুত করে ক্ষমতা দখল করেন সেনাপ্রধান জেনারেল আইয়ুব খান।

১৯৬২ সালে প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান কর্তৃক গঠিত হামুদুর রহমান শিক্ষা কমিশনের বিরুদ্ধে ছাত্র আন্দোলন হয়। ১৯৬৬ সালে স্বাধিকার অর্জনে জননেতা শেখ মুজিবুর রহমানের ৬ দফা দাবি আদায়ের আন্দোলন হয়। ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানে প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খানের পতন ঘটে। সেনাপ্রধান জেনারেল ইয়াহিয়া খান ক্ষমতা গ্রহণ করেন। ১৯৭০ সালে ‘এক ব্যক্তি এক ভোট’ নীতির ভিত্তিতে সমগ্র পাকিস্তানে অনুষ্ঠিত হয় সাধারণ নির্বাচন। পূর্ব পাকিস্তানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জন করে। রাজনৈতিক সঙ্কট সমাধানে সংলাপের নামে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান ভাঁওতাবজি করে ‘অপারেশন সার্চ লাইট’ নামে গণহত্যার আদেশ প্রদান করেন। ১৯৭১ সালে ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। নয় মাসের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা অর্জন করে। কারমাইকেল কলেজের ছাত্রসমাজ বিভিন্ন ছাত্র সংগঠন ও রাজনৈতিক সংগঠনের মাধ্যমে উল্লিখিত সব আন্দোলন ও সংগ্রামে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছে।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনে মহান মুক্তিযুদ্ধে কারমাইকেল কলেজের ছাত্র ও শিক্ষকগণের ভূমিকা গৌরবময়। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে শিক্ষক ও ছাত্রদের অনেকে শহীদ হয়েছেন। পাকিস্তানী হানাদারবাহিনী কারমাইকেল কলেজের কয়েকজন শিক্ষক এবং ছাত্রসহ অগণিত সাধারণ মানুষকে হত্যা করেছে। মুক্তিযুদ্ধে জামায়াতে ইসলামীর আলবদর প্রধানের ষড়যন্ত্রে যাঁরা শহীদ হয়েছেন তাঁরা :

১. আবদুর রহমান, রসায়ন

২. শাহ সোলেমান আলী, সহকারী অধ্যাপক, উর্দু

৩. কালাচাঁদ রায়, প্রভাষক, রসায়ন

৪. চিত্তরঞ্জন রায়, প্রভাষক গণিত

৫. সুনীলবরণ চক্রবর্তী, প্রভাষক, দর্শন

৬. রামকৃষ্ণ অধিকারী, প্রভাষক, বাংলা প্রমুখ।

মুক্তিযুদ্ধে কারমাইকেল কলেজের শহীদ ছাত্রদের মধ্যে যাদের নাম জানা যায় তাঁরা :

১. খন্দকার মুখতার ইলাহী

২. শরিফুল ইসলাম

৩. গোলাম গউস

৪. আবুল কাশেম

৫. আবদুর রকিব প্রমুখ

কারমাইকেল কলেজের ইতিহাসের একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা ২০০৮ সালের ২ ও ৩ মে তারিখে অনুষ্ঠিত প্রাক্তন ছাত্রছাত্রীদের প্রথম পুনর্মিলনী উৎসব। প্রাক্তন ছাত্রছাত্রীদের এই পুনর্মিলনী উৎসব উদযাপনের মাধ্যমে কলেজের প্রাক্তন ও বর্তমান ছাত্রছাত্রীদের মাঝে রচিত হয়েছে এক অনন্য মেলবন্ধন। কারমাইকেল কলেজের রয়েছে গৌরবোজ্জ্বল ঐতিহ্য। এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে অসংখ্য মেধাবী ছাত্রছাত্রী কৃতিত্বপূর্ণ ফলাফল অর্জন করে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে অসামান্য অবদান রেখে চলেছেন।

প্রাক্তন ছাত্রছাত্রীদের অনেকে চিকিৎসক, প্রকৌশলী, বৈজ্ঞানিক, রাজনীতিবিদ, আইনজীবী, শিল্পী, সাহিত্যিক, ক্রীড়াবিদ, ব্যবসায়ী, পত্রিকা সম্পাদক ও সাংবাদিকসহ সামরিক এবং বেসামরিক বহুবিধ পেশায় মেধার কৃতিত্বপূর্ণ স্বাক্ষর রেখেছেন। প্রাক্তন ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে কয়েকজন দেশের রাষ্ট্রপতি, সুপ্রীমকোর্টের প্রধান বিচারপতি, বিচারপতি, জেলা জজ, মন্ত্রিপরিষদের সদস্য, সেনাবাহিনী প্রধান, সচিব, জেলা প্রশাসক, প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা, বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, সরকারী ও বেসরকারী কলেজের অধ্যক্ষ ও শিক্ষকসহ বিভিন্ন উচ্চতর পদে অধিষ্ঠিত হয়েছেন।

প্রকাশিত : ১৯ জুন ২০১৫

১৯/০৬/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: