কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৩ ডিসেম্বর ২০১৬, ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শনিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

মুখ

প্রকাশিত : ১৯ জুন ২০১৫
  • সুশীল সাহা

বাঙালী ইতিহাসের স্মরণীয় দুই বিপর্যয় হলো ১৯৪৭-এর দেশভাগ আর ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ। এরমধ্যে আবার ১৯৭১-এর বিপর্যয়টি আবার নানা দিক থেকেই গুরুত্বপূর্ণ। ওটাও আরেক দেশভাগ, কিন্তু তাতে বিরাজিত শৃঙ্খলমুক্তির আনন্দ। এই শৃঙ্খলমুক্তি খুব সহজে ঘটেনি। নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের অবসানে এসেছে স্বাধীনতা। জন্ম নিয়েছে নতুন দেশ, স্বাধীন, সার্বভৌম বাংলাদেশ।

এই ১৯৭১ নিয়েই ‘মুখ’ পত্রিকার সাম্প্রতিক সংখ্যা প্রকাশিত হয়েছে। প্রায় ৩০০ পৃষ্ঠার এই আয়োজনে দুই বাংলার ৪৫ জন লেখকের লেখা ছাপা হয়েছে। সাক্ষাতকার ছাপা হয়েছে ৭ জনের। এছাড়া আছে ৬ জন শিল্পীর আঁকা ছবি। ছবিগুলো নিঃসন্দেহে এই সঙ্কলনের একটি বড় সম্পদ। ছবিগুলো এঁকেছেন যোগেন চৌধুরী, অসীম পাল, বিপ্লব ম-ল, দেবনাথ বিশ্বাস, পার্থ দাশগুপ্ত ও মোহিনী বিশ্বাস।

এই ধরনের একটি সঙ্কলনে যা মূলত প্রাধান্য পায়Ñ স্মৃতিকথা, এখানেও তার ব্যত্যয় ঘটেনি। প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক হাসান আজিজুল হকের স্মৃতি ‘৭১ করতলে ছিন্নমাথা, এক অবিস্মরণীয় লেখা যার খানিকটা অংশ এখানে পুনর্মুদ্রিত হয়েছে। অন্যদিকে প্রয়াত নাজিম মাহমুদের অনন্য রচনা ‘যখন ক্রীতদাস : স্মৃতি ’৭১ থেকে একটি চমৎকার অংশ এই সঙ্কলনে ছাপা হয়েছে। বীভৎস ’৭১ যেন দগদগে ঘায়ের মতো নিজেকে মেলে ধরে আমাদের সামনে। অন্যদিকে মুনতাসীর মামুনের লেখায় ফুটে উঠেছে যন্ত্রণা, হতাশা, অপমানবোধ এবং খানিকটা আশার প্রতিফলন। সুরাইয়া বেগমের লেখায় আমরা পেয়ে যাই যন্ত্রণাবিদ্ধ নারীদের কথা। যুদ্ধে যাঁরা হন সবচেয়ে নিগৃহীত ও অপমানিত।

সঙ্কলনের প্রথম লেখাটি নিবেদিত হয়েছে সদ্যপ্রয়াত গোবিন্দ হালদারের প্রতি শ্রদ্ধার্ঘ নিবেদন করে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে এই মানুষটির কলম থেকে নিঃসৃত অসামান্য কিছু গানের স্মৃতি আপামর বাঙালী সারাজীবন মনে রাখবে। ‘এক সাগর রক্তের বিনিময়ে’ কিংবা ‘আমরা একটি ফুলকে বাঁচাবো বলে যুদ্ধ করি’ গানের ভূমিকা সুতীক্ষè অস্ত্রের চেয়ে কোন অংশেই কম ছিল না। এই প্রতিবেদনটিকে প্রবন্ধের তকমা দিয়ে ঠিক করেননি সম্পাদক।

একটি অসামান্য গল্প লিখেছেন কথাসাহিত্যিক সাত্যকি হালদার। মাত্র একটি গল্পই এই সঙ্কলনে ঠাঁই পেয়েছে। ভালো লেখার একটিই ভালো। কবিতার আধিক্য প্রত্যাশিত ছিল যা এক অদ্ভুত সংযমে সম্পাদক এখানে সঙ্কলিত করেছেন মাত্র ১৪টি কবিতা। শামসুর রাহমান কিংবা নির্মলেন্দু গুণের কবিতা নিয়ে নতুন করে কিছু লেখার নেই। বিভাস রায়চৌধুরীর উদ্বাস্তু শিবিরের ছেলেÑ এই শীর্ষ নামে ৮টি কবিতা ছাপা হয়েছে। কবিতাগুলোর মধ্যে ভিটেমাটি ছেড়ে আসা মানুষের দুঃখ বেদনা যেমন মূর্ত হয়েছে তেমনি সেখানে ঠাঁই পেয়েছে যুদ্ধকালীন সময়ের উচ্চ- স্মৃতি।

এই সঙ্কলনের সবচেয়ে আকর্ষণীয় অংশ হলো ৭ জন বিশিষ্ট মানুষের সাক্ষাতকার। অভিনেতা বিশ্বজিত শুনিয়েছেন তাঁর ঋত্বিক সন্নিধানের কথা। ‘দুর্বার গতি পদ্মা’ নামে সেই সময়ে নির্মিত ’৭১ ভিত্তিক তথ্যচিত্রের তিনি ছিলেন প্রযোজক ও অভিনেতা। সময়ের অতল থেকে তিনি তুলে এনেছেন মানুষ ঋত্বিকের অসামান্য সান্নিধ্যের কথা। ছবির তুল্যমূল্যের চেয়ে বড় হয়ে দেখা দিয়েছে সেই মূল্যায়ন। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে অধ্যাপক তরুণ সান্যাল কিংবা বিশিষ্ট কবি নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর অবদান আজ সুবিদিত। তাঁরা তাঁদের স্মৃতিচারণে আমাদের প্রত্যাশা মিটিয়েছেন। অবাক করে দিয়েছেন বিশিষ্ট চলচ্চিত্রকার তানভীর মোকাম্মেল। তাঁর অসামান্য সাক্ষাতকার এই সঙ্কলনের একটি সম্পদ। উপেন তরফদার, আজিজুল হক এবং ডাঃ আভা দে সরকার বহু স্মৃতিজাগানিয়া মন্তব্য করেছেন। ধন্যবাদ জানাতে হয় সেইসব গ্রহীতাদের যাঁরা বহুযতেœ একটির পর একটি প্রশ্ন সাজিয়ে তাঁদের অতীত খুঁড়ে মণিমানিক্য নিয়ে আসতে সাহায্য করেছেন।

আগেই লিখেছি, এই সঙ্কলনের বড় প্রাপ্তি ছ’টি চিত্রকর্ম। প্রসঙ্গত লিখছি এতে বাংলাদেশের দু’একটি কাজ যুক্ত হলে খুব ভালো হতো। আমরা জানি ১৯৭১ নিয়ে শিল্পী শাহাবুদ্দিনের কিছু অবিস্মরণীয় ছবির কথা। তা থেকে অন্তত একটিও যদি এখানে রাখা যেত, তা এক অন্য মাত্রা যোগ করত। শেষ প্রচ্ছদে একটি ছবি সংযোজিত হয়েছে। কোন ক্যাপশন না থাকায় ঠিক বোঝা গেল না ছবিটি কিসের! চিত্রগ্রাহকেরও নামও ওখানে প্রত্যাশিত ছিল।

বাংলা ভাষাভাষী হিসেবে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম আমাদের কাছে এক পরম আদরণীয় বিষয়। যুদ্ধকালীন সময়ে আমরা এই বঙ্গের মানুষ নানাভাবে এর সঙ্গে যুক্ত হয়ে গিয়েছিলাম। নিকট অতীতের সেসব ইতিহাস আজও বহু মানুষের মনে জাগরুক হয়ে আছে। সম্পাদকদ্বয় দীপঙ্কর দাস ও পার্থসারথি দে এক সময়োচিত কর্তব্য সমাধা করেছেন। এজন্য তাঁরা ধন্যবাদার্হ হয়ে থাকবেন।

প্রকাশিত : ১৯ জুন ২০১৫

১৯/০৬/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: