কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৪ ডিসেম্বর ২০১৬, ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, রবিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

সর্বমানুষের মুক্তিচেতনার কবি

প্রকাশিত : ১৯ জুন ২০১৫
  • শিমুল সালাহ্উদ্দিন

(পূর্ব প্রকাশের পর)

স্যার, অরুণ সেনের মতো লোক আপনার কবিতা নিয়ে অসাধারণ দীর্ঘ প্রবন্ধ লিখেছেন। সনৎ কুমার সাহা, গতবছর একুশে পুরস্কার পেলেন, নিয়মিতই লিখেছেন আপনার উপর। তথাপি, আমাদের সমালোচনা সাহিত্যে তো আসলে সংকট আছে, তার মধ্যে এই পাওয়াগুলো কিভাবে দেখেন?

মোহাম্মদ রফিক : তখন তো তোমাকে বললাম, ইদানিং শুনছি যে সুধীর চক্রবর্তী লিখেছেন। আমি লেখাটা হাতে পাইনি। হাতে পেলে তোমাকে বলতাম। সেখানে তিনি বলেছেন, আমি শুনেছি ঐ পত্রিকায়, আমার কপিলা উনার ভাল লেগেছে। আমার কিন্তু ঐ ব্যাপারে কোন দুঃখ নেই। আমি বাংলা সাহিত্যের দুজন প্রধান লেখক, অরুণ মিত্র তারপর আবদুল কাদীর সাহেব তাদের প্রশংসা পেয়েছি। আমাকে মুখোমুখি বলেছেন, অন্যের সামনে বলেছেন।

জি স্যার। অন্য একটা প্রসঙ্গে যাই। সেটা হলো আপনিতো বললেনই স্যার, যে বাংলা কবিতায় আপনি হলেন রবীন্দ্রবাদী।

মোহাম্মদ রফিক : রবীন্দ্রবাদী মানে ঐ বলয়ের।

ঐ বলয়টা স্যার কীভাবে ব্যাখ্যা করবেন?

মোহাম্মদ রফিক : বৈষ্ণব পদাবলী বা গীতিকা বা আমার ইতিহাস হলো বাঙলার সংস্কৃতি। বাঙলার যে আবহমান সংস্কৃতি লালন এবং যার ভিতরে এবং বিশেষ করে বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের একটা বিরাট ভূমিকা আছে, তুমি দেখো, যে এই দক্ষিণাঞ্চলই কিন্তু সেই অর্থে, এক অর্থে বাঙলার সংস্কৃতিকে তৈরি করেছে। তুমি মাইকেল বলো, রবীন্দ্রনাথ বলো, লালন বলো এরা সবাই এখান থেকে উঠে এসেছেন। হাসন রাজা বলো, সবাই কিন্তু এখান থেকে উঠে আসছে। দক্ষিণবাংলা বাঙলার জল, মাটি হাওয়ার বাঙলা। এবং আমি চেয়েছি, আমি মনে করি, আর্টারি, এই রক্তনালী যাকে বলে। বাঙলার রক্তনালী হচ্ছে বাঙলার নদী, বাঙলার জল এবং আমি চেয়েছি যে আমার কবিতায় যেন শেষ পর্যন্ত জল কথা বলে, নদী কথা বলে।

হাওয়া কথা বলে!

মোহাম্মদ রফিক : হাওয়া কথা বলে, মাঝি কথা বলে, পাখি কথা বলে । হ্যাঁ, আমি এটাই চেয়েছি এবং আমি এখনও যদ্দিন আমি বেঁচে থাকবো, এটাই চেষ্টা করে যাবো।

সংলাপের কিছু ব্যবহার আপনি কবিতায় খুব সফলভাবে করেছেন এবং সেটা এমন একটা সময়, ষাটের দশক মানে হলো, ষাটের দশক থেকে অনেক গুরুত্বপূর্ণ কবি আমাদের সাহিত্যে দাঁড়িয়েছেন নিজেদের স্বাতন্ত্র্য নিয়ে। আপনি স্যার সংলাপের এক ধরনের মজার ব্যবহার করেছেন, যেমন কপিলা বা গাওদিয়া কিংবা রূপকথা কিংবদন্তীর মধ্য দিয়ে যেগুলো আছে। যেমনÑ প্রথম ও দ্বিতীয় বইয়ের মধ্যেও সেই জিনিসগুলো আছে। যেটা জানতে চাই স্যার, ষাটের দশকের পরে সত্তর, আশি, নব্বই, এই সময়ে আমরা আসলে সেইরকম শক্তিমান কবি আর সেভাবে পাচ্ছি না। ষাটের দশকের মধ্যে আসলে কি এমন জাদু ছিলো যে আপনারা এতগুলো মানুষ আলাদাভাবে দাঁড়ালেন।

মোহাম্মদ রফিক : সেই কথা বলতে গেলে তুমি সারা পৃথিবীর দিকে তাকাও। সারা পৃথিবীতে কিন্তু ষাটের দশক একটা সাড়াজাগানো সময়। তোমাকে যদি আমি জিজ্ঞেস করি যে তুমি গত পঞ্চাশ বছরে একজন দার্শনিকের নাম বলোতো, যার প্রভাব সারা পৃথিবীতে পড়েছে?

জাঁ জ্যাঁক রুশো, জাঁ পল সার্ত্রে

মোহাম্মদ রফিক : না না, গত পঞ্চাশ বছরে তৈরি হয়েছে?

স্যার গত পঞ্চাশ বছরে তৈরি হয়েছেন এমন দার্শনিক তো স্যার ফ্যুকো, দেরিদাÑ

মোহাম্মদ রফিক : কিন্তু আজকে তুমি ভাবতে পারবে না, আমাদের সময়ে, তখনকার ইসে, এই ধরো সার্ত্রে, কামু প্রবল প্রতাপ নিয়ে এলেন। শুধু তাই না আমাদের অঞ্চলেও ধরো এবং ষাটের দশকে সারা পৃথিবী তারা শাসন করেছে। যেমন সুয়েকার্নো, যেমন জওহর লাল নেহের, আজকের অমিতাভের মতো নায়ক আর আছে? হ্যাঁ, ষাটের দশকে ফিদেল ক্যাস্ট্রো পৃথিবীতে এসেছে, আমাদের বঙ্গবন্ধুর উত্থান হয়েছে। এইসব ঘটনাতো সব মিলিয়ে ষাটের দশক তৈরি হয়েছে।

বটেই কিন্তু স্যারÑ

মোহাম্মদ রফিক : এবং তারপরে মুক্তিযুদ্ধের মতো একটা বড় ঘটনা ঘটে গেছে। এবং মনে রেখো কোনও কবি কিন্তু নিজে নিজে তৈরি হয় না, কবি হয়তো একটা ব্যক্তিগত প্রতিভার স্ফুরণ। কিন্তু সেই ব্যক্তিগত স্ফুরণটা কিন্তু নিজে নিজে খুব একটা ঘটে না। যতটা তার সমাজ বা আশপাশ তৈরি করে। একটা বলয় প্রয়োজন হয়, এই বলয়টা হারিয়ে যাচ্ছে ইদানিং। তা তুমি কি করে আশা করো যে, এখনও একজন লোক শুধুমাত্র নিজের ইসের বলে একটা বিরাট কাজ করে ফেলবে? সে সম্ভব না।

স্যার আমি মনে করি আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যার এবং আহসান হাবীব এদের একটা প্রভাব আপনাদের মধ্যে মানে ষাটের দশকের কবিদের মধ্যে ছিল।

মোহাম্মদ রফিক : না এই কথাটা আমি মোটেও মানতে রাজি না। ঐভাবে না।

সম্পাদনার প্রভাব।

মোহাম্মদ রফিক : আমাদের সময় শ্রেষ্ঠ সম্পাদক ছিলেন সিকান্দার আবু জাফর। তুমি এই নামটা বলতে ভুলে গেছ।

হ্যাঁ আমি বলতে ভুলে গেছি। স্যরি স্যার।

মোহাম্মদ রফিক : হ্যাঁ এবং যদি লেখক তৈরি করে থাকেন সেইটা একমাত্র সিকান্দার আবু জাফর ভাই। সায়ীদ সাহেব যেটা করেছেন, সায়ীদ সাহেব সম্পর্কে খুব একটা উচ্চ ধারণা আমার নেই। আমি সায়ীদ সাহেবের ছাত্র। এবং তিনি কিন্তু রাজনৈতিকভাবে খুব প্রতিক্রিয়াশীল লোক। এবং তিনি ছাত্র জীবনে মুসলিম লীগের ছাত্র সংগঠনের সঙ্গে জড়িত ছিলেন এবং ও যখন রাজশাহী কলেজের শিক্ষক হয়ে যান, তখনও গিয়ে সরাসরিভাবে প্রতিক্রিয়াশীল রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আঁতাত করেছেন। এবং তাঁকে, আমি যখন ভিপি ছাত্র ইউনিয়নের, তখন আমি তাঁকে কলেজ থেকে বিতাড়িত করেছি। সুতরাং...

আপনার শিক্ষক হওয়া সত্ত্বেও?

মোহাম্মদ রফিক : শিক্ষক হওয়া সত্ত্বেও। এবং কারণ তখন আমরা জীবন মরণ সংগ্রামে আইয়ুব শাহীর শাসনের বিরুদ্ধে। তখন আমাকে মার্শাল ল-এ আটকে জেলে পাঠানো হয়। এবং তুমি একটা কথা মনে রেখ , এখানে যখন আমাকে আর্মি নিয়ে গিয়েছিলÑ

এরশাদের আমলে?

মোহাম্মদ রফিক : হ্যাঁ, তখন আমি তাদের বলেছি যে আমাকে জোর করে বা চোখ রাঙিয়ে ভয় দেখাতে পারবেন না। কারণ আপনি কাগজ খুলে দেখেন যে, আমি যখন ছাত্র, এই দেশে কিন্তু মার্শাল ল কোর্টে প্রথম যাদের বিচার হয়েছে তার প্রথম নাম্বার আসামি আমি। আমার মার্শাল ল কোর্টে দশ বছর সশ্রম কারাদণ্ড হয়েছে, ১৯৬২ সালে। হ্যাঁ। এবং আমার কোর্টে যিনি প্রিজাইডিং অফিসার ছিলেন সেটা পাকিস্তান আর্মির একজন বিগ্রেডিয়ার ছিল এবং আপনার প্রধান যিনি ওঁকে দেখলে ওঁর রুমেও ঢুকতে সাহস করতেন না। ওঁকে স্যার স্যার বলে মুখে ফ্যানা তুলে দিতে হত। এবং সেই লোক আমাকে যখন শেষে দশ বছর সশ্রম কারাদণ্ড দেয় তখন পুলিশ রিপোর্ট করা হয়। আমি হচ্ছি কমিউনিস্ট পার্টির মেম্বার। তিনি বোধহয় জীবনে কমিউনিস্ট দেখেননি। তিনি বোধহয় ভাবতেন যে কমিউনিস্টরা সবসময় আন্ডারগ্রাইন্ডে থাকে। তিনি তাঁর এজলাস থেকে নেমে এসেছেন এবং আমার দিকে তাকাচ্ছেন। আমি হাফ প্যান্ট পরে দাঁড়িয়ে আছি। আমি তখন প্রথম বর্ষ অনার্সে ভর্তি হয়েছি। তখন রাজশাহী ইউনিভার্সিটিতে অনার্স ছিল না। অনার্সটা পড়ানো হত রাজশাহী কলেজে। আমি তখন হাফ প্যান্ট পরি। তিনি নেমে দেখছেন যে, হাফ প্যান্ট পরা একটা ছেলে কমিউনিস্ট।

হা হা হা।

মোহাম্মদ রফিক : হা হা। আমি এই কাহিনী কিন্তু ওদেরকে বলি।

এই কাহিনীটায়ই তো স্যার আসবো। এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা আপনার জীবনে। খোলা কবিতা যখন লিখা হলো, এরশাদের বিরুদ্ধে, স্বৈরাচার এরশাদের বিরুদ্ধে, আসলে এই বিশাল আন্দোলন এবং সেই আন্দোলনে খোলা কবিতা বিশাল ভূমিকা রেখেছিল। হাজার হাজার শ্রমিক জনতার সামনে আপনি কবিতা পড়েছেন। হাজার হাজার কপি বিক্রি হয়েছে। এটা বোধহয় আপনার জীবনের অন্যতম বড় ঘটনাগুলোর মধ্যে একটি।

মোহাম্মদ রফিক : অবশ্যই। আমার খোলা কবিতা সম্ভবত আমার সর্বাধিক প্রচারিত কবিতা।

সেই ঘটনাটা মানে ঐ দিনের ঘটনাটা আমি জানতে চাই, যেদিন আপনি প্রথমÑ

মোহাম্মদ রফিক : এখন প্রশ্ন হচ্ছে যে তোমার মনে নেই, এরশাদ যখন প্রথম ক্ষমতায় আসলো, ৮৩ সালের মনের হয় জুন, জুলাই, টুলাই হবে, আমি এখন ভুলে গেছি। তো তখন কিন্তু কোন দলই, প্রথম এরশাদের বিরুদ্ধে মুখ খোলেনি বাংলাদেশে। হ্যাঁ বিএনপি বল, আওয়ামী লীগ বল, কমিউনিস্ট বল, কেউই না। আমি সেদিন খুলনা আজম খান কলেজে। ছাত্র ইউনিয়নের অনুষ্ঠানে গেছি তাদের প্রধান অতিথি হিসেবে সম্মেলনের বক্তৃতা দিতে। তো পরদিন আবার ঢাকায়, তখন আমার চুল বড় তো, দেখি যে, যশোর থেকে আর্মি যাচ্ছে। আমি একটু অবাক হলাম, আর্মি যায় কেন? তারপরে দেখি, ফরিদপুরে এসেছি, এসে ফরিদপুরে বাস থামিয়েছে, নেমে আমি একটু চা খেতে বসেছি। দেখি লোকজন আমার দিকে ইয়ে মানে খুব অন্যরকমভাবে তাকাচ্ছে। আমি খুব সংশয়ে পড়ে গেলাম। তো একজন বয়স্ক লোক উঠে এসে আমার পাশে বসে বসল, আমতা আমতা করে বললো, আপনি কোন পীরের মুরিদ? বললাম, না আমি কোন পীরের মুরিদ না। কিন্তু আপনাকে তো বলতে হবে যে আপনি অমুক পীরের মুরিদ। আমি বললাম, কেন? বললো, আপনার যে বড় বড় চুল। আমি বললাম কি হয়েছে?, বললো, আপনাকে তো ঘাট আর্মি এসে ধরবে, পুলিশ চুল কেটে দেবে। আমি বললাম- কেন? বলল, জানেন না যে, আর্মি, পুলিশ নেমেছে। মার্শাল ল জারি হচ্ছে এবং চুল কাটছে, তো আমি খুব লজ্জিত বোধ করলাম, মানে খুব খারাপ লাগলো যে, আমার চুল কাটবে? তো আমি, যাই হোক, আমি মনে খুব আতঙ্ক নিয়ে আমি এসে পৌঁছালাম। জাহাঙ্গীরনগর এসে পৌঁছালাম। তার কয়েকদিন পরে দেখি পত্রিকায়, মনে হয় দৈনিক বাংলায়, প্রথম পৃষ্ঠায় দেখি এরশাদ সাহেবের কবিতা। এবং ভালবাসা বিষয়ক। আর সেটি কিছু হয়নি, মানে কবিতার। এবং আমি ইন্টারোগেশনে সেই আর্মি অফিসারকে বলেছিলাম, এই কবিতা যদি আপনি লিখতেন, এই কাগজে ছাপা হতো? উনি বললো- না। তাহলে আজকে কেন এই প্রথম পাতায় কেন ছাপা হলো? যাই হোক তারপরে বলি, আমি খুব অবাক হয়ে গেলাম, যে বাঙালী ভালবাসায়, আমি মনে করি যে ভালবাসার চেতনায় বাঙালী খুব সমৃদ্ধ, সেটা নিয়ে হাসি তামাশা করা এবং সর্বত্র এরা আমাদের মূল্যবোধকে ধ্বংস করে দেয়ার প্রকল্প নিয়ে নেমেছে। মানে মার্শাল ল জারি হওয়া না। মূল্যবোধগুলোকে ধ্বংস করে দেয়ার ব্যবস্থা। এবং হঠাৎ একদিন আমি কেন জানি, জানি না, আমি রাতে কবিতাটা লিখতে বসে গেলাম।

সব শালা কবি হবে পিঁপড়ে গো ধরেছে উড়বেই...

মোহাম্মদ রফিক : হ্যাঁ সে যাই হোক। ওর ভেতরে অনেক ব্যাপার আছেÑ

অবশ্যই, ঐ যে আপনি বলেছেন, যার মাথায় বুদ্ধি আছে সেতো বুঝবেই।

মোহাম্মদ রফিক : ওর ভিতরে চুলের ঘটনাটাও কিছুটা আছে। বেআদব চুল রেখে রাস্তা ঘাটে বেরুবো না। তা যাই হোক আমি ঐ লিখে ভাবলাম যে এটাকে কি করা যায়? প্রথমেই ভাবলাম যে এটা প্রচার হওয়াটা দরকার। তো ছাত্র ইউনিয়নের এক ছেলেকে বললাম। তো যা হোক তখন আবিদ আজাদ কবি, ওঁর একটা প্রেস ছিল, তো আমি আবিদ আজাদের শরণাপন্ন হলাম, যে এটা ছেপে দেবে নাকি? তো আবিদ রাজী হল এই শর্তে যে আমি এটা চেপে রাখবো। তো যখন আর্মি দেখেছে, আমি বলেছি যে, এটা আমার লিখা, তো প্রত্যেকের ক্ষেত্রে যেটা আমি বলবো যে, একজন আন-উইলিং লোককে আমার উইলিং কাজের পার্টনার হতে দেয়া, তো, আপনাদের অনেক ইয়ে আছে, পারলে খুঁজে বার করবেন, কোত্থেকে। তো যাই হোক, আবিদ আজাদের ঐখান থেকে ছেপে ছাত্রদের দিলাম বিলি করতে। তারপরে তো ওটা মহা ইয়ে পেয়ে গেল। কত লক্ষ কোটি ছাপা হয়েছে হিসেব নেই। তো রংপুরে গিয়েছিলাম এক অনুষ্ঠানে, তো এক ছেলে, লোক এসে আমাকে বললো যে, আপনাকে আমি মিষ্টি খাওয়াবো। বললাম- কেন? বললো, যে স্যার আপনার খোলা কবিতা না হলেতো আমি বিয়ে করতে পারতাম না।

মানে?

মোহাম্মদ রফিক : তো সে বলে যে, আমি দীর্ঘদিন ধরে প্রেম করছিলাম কিন্তু টাকা পয়সার জন্যে বিয়ে করতে পারছিলাম না, তো আমি আপনার খোলা কবিতাটা হাতে পেলাম আর ওটা ফটোকপি করে ১০০ টাকা করে বেঁচে বিয়ে করে ফেললাম।

(হাততালি) হা হা হা।

মোহাম্মদ রফিক : তো আমি এখন ঐ বিয়ের অনুষ্ঠানে তো আর নিতে পারবো না, তাই এখন আপনাকে মিষ্টি খাওয়াবো। তখন সে আমাকে রংপুরের প্রধান মার্কেটে নিয়ে গিয়ে মিষ্টি খাওয়ালো।

এটা তো একটা অসাধারণ প্রাপ্তি হিসেবে রয়ে গেল।

মোহাম্মদ রফিক : আমি আরেকটা ঘটনা বলি, আমি কলকাতা যাব। তো বাসের টিকেট কাটতে গিয়েছি, ইসের, কলাবাগানের ঐখানে। তো তোমার বয়েসি একটা ছেলে লিখছে, টিকেট কাটছে, তো সে বলছে, একটা খাতায় নাম লিখতে হবে। নাম কি আপনার? আমি বললাম মোহাম্মদ রফিক। তো বলে যে আপনি খোলা কবিতার লেখক? আমি বললাম, হ্যাঁ কেন, কি হয়েছে? বললো, আপনার কাছ থেকে আমি একশো টাকা কম নেবো। টিকিটের দাম তিনশো টাকা ছিল, সেটার একশো টাকা বোধহয় সে তার পকেট থেকে দিয়েছে। নিলই না। তো এইগুলো তো একটা ভালোবাসার প্রমাণ। ড. আখলাকুর রহমান একদিন আমাকে বলে যে, জানো? আমি তোমার খোলা কবিতার কত কপি বিক্রি করেছি! আচ্ছা, তারপরে তারেক আলী এবং লন্ডনে আলী তখন নিযুক্ত ছিল। ওরা আমাকে বলে যে ওদের বাড়িতে একদিন ইন্ডিয়ান অ্যাম্বেসির অফিসার কে গেছে, সে বলছে, যে এখানে আপনাদের মোহাম্মদ রফিক নামে একটা লোক কবিতা লিখেছে , এক ডলারে বিক্রি হচ্ছে। তো ও বলছে, ওটা এক ডলার নয় এক টাকা দাম যাতে সব লোকে পড়ে। তো বলে তাই নাকি? তো সে এর কিছুদিন পরে, এই সে আমাকে খবর দিল যে, এরকম এক ভদ্রলোক আপনার সঙ্গে দেখা করতে চায়। দেখা হত কি না আমি জানি না, অধ্যাপক সাঈদ, নাস্তা খেতে আসিস। ওঁ তো আমাকে তুই তুই করতো, আমরা একসঙ্গে পড়েছি। তুই যদি আসিস, তো আমরা একসঙ্গে দেখা করতে যেতে পারি, তো আমরা গেলাম সাঈদের বাসায়। গিয়ে দেখি যে এক ভদ্র লোক ইয়ে স্যুট ট্যুট পরা, বসে আছে তো তিনি বললেন যে, অনেক কথা টথা বললেন যে আমি হচ্ছি, ইন্ডিয়ান দিফেন্স সেক্রেটারি ইস্ট জোনের। তো আমরা সবাই আপনাকে চিনি। আমাদের সবাই আপনার লেখা পড়েছি। আমাদের সেক্রেটারি মহলে প্রচুর আলোচিত আপনি। কিন্তু আপনি যে রাজনৈতিক দলের পক্ষে ঐ রাজনীতির পক্ষে এখন আমরা নই। সরাসরি সে বললো, কারণ আমাদের হিসেবে আপনারা যদি ক্ষমতায় যান, ছয় মাসের বেশি ক্ষমতায় থাকতে পারবেন না। কিন্তু আপনি যদি ব্যক্তিগতভাবে কখনও মনে করেন যে, অসুবিধায় আছেন তাহলে আপনি শুধু কোনও মতে বর্ডার ক্রস করে বিএসএফকে আপনার নাম বলবেন আর আমার নাম বলবেন, এরাই সব ব্যবস্থা করবে, মানে বোঝালো আর কি, বন্ধুবান্ধবেরা যদি ব্যবস্থা করতে পারে করবে, বর্ডার ক্রস করে যে কোন ক্যাম্পে গিয়ে আমার নাম বলবেন, তারপরের ব্যবস্থা, ভারত সরকারের অতিথি। আমি দৃঢ়কণ্ঠে বললাম যে, আশাকরি সে প্রয়োজন হবে না।

হা হা হা। সে প্রয়োজন হবে না।

মোহাম্মদ রফিক : তো আপনাকে ধন্যবাদ। তো তুমি বুঝতেই পার যে, কি ধরনের আলোড়ন তৈরি করেছিল। আমি এই কথাগুলো মানে আমাদের ওখানে একটা রাজনৈতিক গ্রুপের সঙ্গে জড়িত ছিলাম। তারা এসে বললো যে আমরা এটাকে একটা অনুষ্ঠান করতে চাই। তো আমরা রিহারসাল শুরু করলাম। তো একদিন সেলিম এসে উপস্থিত হল, আমি এই একটা অংশের গান করে দেব। বললাম দাও। তো ওঁ ঐ অংশের গান করে দিল। তারপরে জমজমাট অনুষ্ঠান হল। এর পরে ঢাকা থেকে কবিরাও গেল। রুদ্র গেল, আরও কে কে গেল জানি। ও তুষার দা। জমজমাট অনুষ্ঠান হলো। এর কয়েকদিন পরে ঢাকা থেকে ছাত্রলীগের নেতা, জাসদের নেতা, ছাত্র ইউনিয়নের নেতা সবাই আমার জাহাঙ্গীর নগরের বাসায় গিয়ে হাজির হলো। বিএনপি, ছাত্রদলের নেতা ছিল কিনা, হয়তো ছিল। হয়তো ছিল না...। বলে আমরা এটা নিয়ে অপরাজেয় বাঙলার নিচে একটা অনুষ্ঠান করবো। তো আমি ছেলেমেয়েরা যারা অংশ নিয়েছিল, ওদের বললাম। ওরা খুব উৎসাহের সঙ্গে বললো যে হ্যাঁ। তারপরেতো অপরাজেয় বাংলার পাদদেশে একটা অনুষ্ঠান হলো। আমি বলবো একটা ঐতিহাসিক ঘটনা ঘটল। এবং সাথে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং তারা কিন্তু সাহস করে নিচে আসলো না। ঐ দোতালা, তিনতালায় দাঁড়িয়ে থাকলো। যা হোক অনুষ্ঠান টনুষ্ঠান হলো। হওয়ার পর ঐ ছাত্ররা, ঐ নেতারা বললো, স্যার আমরা এরশাদ বিরোধী মিছিল করবো। তবে আমরা রাস্তায় যাব না। আমি বললাম, আচ্ছা ঠিক আছে। এবং সেই হচ্ছে বাংলাদেশে প্রথম এরশাদবিরোধী মিছিল এবং সর্বদলের ছাত্রছাত্রী এবং নেতানেত্রী অংশ নিল। ঐখানেÑ

স্যার আপনি কি ঐখানে খোলা কবিতাটা পড়লেন?

মোহাম্মদ রফিক : না আমি পড়িনি ঐ ছাত্রছাত্রীরা পাঠক্রম করলো। কেউ আবৃত্তি করলো। আমি উপস্থিত ছিলাম।

বাহ্।

মোহাম্মদ রফিক : এবং ঐখানে শিক্ষকদের মধ্য থেকে একজনই অংশ নিয়েছিল। সে হচ্ছে হুমায়ুন আজাদ। আর ছাত্রদের মধ্য থেকে অংশ নিয়েছিল, রুদ্র, কামাল। এরা।

স্যার, হুমায়ুন আজাদ যেহেতু এলোই, একটা জরুরী বিষয় আমি অবতারণ করতে চাই, বাংলা একাডেমি পুরস্কার দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর আপনি এবং হুমায়ুন আজাদ নিলেন সেই পুরস্কার। এবং সেটা হলো এরশাদ সাহেবের সময়!

মোহাম্মদ রফিক : হ্যাঁ, এরশাদ থাকতেই। (চলবে)

প্রকাশিত : ১৯ জুন ২০১৫

১৯/০৬/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: