কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৫ ডিসেম্বর ২০১৬, ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, সোমবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

নিজের কথা ভাবুন সময়ের সঙ্গে থাকুন

প্রকাশিত : ১৯ জুন ২০১৫
  • ডা. মুনা সালিমা জাহান

পারভীন শাহীদা সরকারী কলেজের সহযোগী অধ্যাপিকা। বয়স ৫০ ছুঁই ছুঁই। বছরখানেক ধরে মাসিক অনিয়মিত হচ্ছে। এবার তো প্রায় ৪ মাস মাসিক বন্ধ। আজকাল ক্লাস নিতে গিয়ে মেজাজ ঠিক রাখতে পারছেন না। অল্পতেই ছাত্রছাত্রীদের বকাঝকা করছেন। সেদিন ক্লাসের একপর্যায়ে হঠাৎ করে ঘামতে শুরু করনে। খুব গরম লাগতে লাগল। কান-মাথা দিয়ে যেন ভাঁপ বের হচ্ছে। ক্লাসরুমে এসি নেই। ফ্যানের নিচে ২-৩ মিনিট স্থির দাঁড়িয়ে রইলেন। এরপর কোনরকম ক্লাস শেষ করে টিচার্স রুমে ফিরে এলেন। কিছুদিন থেকে মাঝেমধ্যে এমন হচ্ছে। ভাবছেন শীঘ্রই ডাক্তার দেখাবেন।

* এক মাস ধরে প্রস্রাবের রাস্তায় আর যোনিপথে জ্বালা এবং মৃদু চুলকানি হচ্ছে মনোয়ারা বেগমের। ঋতুস্রাব বন্ধ হয়ে গেছে সাত বছর হতে চলল। যৌনমিলনে আর আগ্রহ পান না অনেক দিন। আর এখন তো জ্বালার ভয়ে একেবারেই রাজি হন না তিনি। ৩৫ বছর সংসার করেও স্বামীকে বলতে লজ্জা পাচ্ছেন তার এ সমস্যার কথা। কী করবেন বুঝতে পারছেন না।

* পুকুর ঘাটে নেমেছিলেন আলেফজান বেগম। অজু করে উঠে আসার সময় কেমন করে যে ঘাটের ওপর পড়ে গেলেন, বুঝতেই পারলেন না। শিরদাঁড়ায় প্রচ- ব্যথা। উঠে দাঁড়ানো সম্ভব হলো না। শহরে বড় ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাওয়া হলো। এক্স-রে করে দেখা গেল মেরুদ-ের ৪-৫টি হাড় ভেঙ্গে এক সঙ্গে চেপে গেছে। তিনি আর আগের মতো সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারবেন না। মাত্র ৬৬ বছর বয়সে তিনি কুঁজো হয়ে গেলেন।

ওপরের তিনটি কেস স্টাডিতে যে সমস্যাগুলো তুলে আনা হলো, এগুলো সবই পজের শুরু থেকে পরবর্তী সময়ে একজন নারীর জীবনে যেসব পরিবর্তন ও সমস্যা দেখা দিতে পারে, তার খ-চিত্র মাত্র। পজ বা ঋতুচক্র একেবারে বন্ধ হয়ে যাওয়ার মাধ্যমে মেয়েদের জীবনের প্রজননক্ষম সময়ের অবসান ঘটে, শুরু হয় নতুন অধ্যায়। মোটামুটি ৪৩-৫৩ বছরের মধ্যেই মেয়েদের জীবনে পজ আসে। ডিম্বাশয় থেকে ইস্ট্রোজেন এবং প্রোজেসটেরন হরমোন তৈরি ধীরে ধীরে কমে যাওয়ায় পজের শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তন শুরু হয়।

পরিবর্তন ও সমস্যাগুলো

ঋতুচক্র একেবারে বন্ধ হয়ে যাওয়ার ২-১ বছর আগ থেকেই মাসিকের অনিয়ম দেখা দিতে পারে এবং তা ঘন ঘন হওয়া থেকে শুরু করে কয়েক মাস বিরতিতে হতে পারে। হঠাৎ খুব গরম লাগা, কান-মাথা দিয়ে যেন ভাঁপ বের হওয়া। শরীরের ওপরের অংশ ঘেমে অস্থির লাগা। আর এ পুরো ব্যাপারটি ঘটে স্বল্প সময়ের জন্য এবং তা দিনে বেশ কয়েকবার হতে পারে। এটিই হলো হটফ্ল্যাশ। রাতে ঘুম কমে যাওয়া, শরীর জ্বালা করা, সামান্যতেই রেগে যাওয়া, বিষণœতা আর অবসাদ বোধ করা। স্মরণশক্তি ও মনোযোগের অভাব হতে পারে। যৌনমিলনে অনীহা দেখা দিতে পারে। যোনিপথ ও আশপাশের ত্বক শুষ্ক হয়ে সহজে ভঙ্গুর হতে থাকে বলে এখানে ঘন ঘন প্রদাহ এবং চুলকানি হতে পারে। যোনিপথের শুষ্কতা, সংকোচন ও প্রদাহের কারণে যৌনমিলনে জ্বালা করতে পারে। পজ এবং বয়স বৃদ্ধিজনিত আরও কিছু সমস্যা যেমনÑ প্রস্রাবের নিয়ন্ত্রণ কমে যাওয়া, ঘন ঘন প্রস্রাব ও প্রস্রাবের জ্বালা হতে পারে। হাড়ের ক্ষয় (অস্টিওপোরোসিস) বেড়ে গিয়ে হাড় সহজে ভঙ্গুর হয়ে যায়। ফলে অল্প আঘাতে বা বিনা আঘাতেও ভেঙ্গে যেতে পারে। হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ ইত্যাদির ঝুঁকি বেড়ে যায়। এছাড়া দীর্ঘমেয়াদে হরমোন রিপ্লেসমেন্ট থেরাপি নিলে স্তন ক্যান্সারের ঝুঁকি বেড়ে যায়।

ভাল থাকার উপায়

পজে একজন নারীর শরীরে ও মনে যে পরিবর্তনের ভেতর দিয়ে যায়, আগে থেকেই যদি সে সম্পর্কে স্বচ্ছ একটা ধারণা থাকে, তাহলে পরিবর্তনগুলোর সঙ্গে খাপ খাওয়ানো সহজ হয়। আত্মবিশ্বাস এবং পরিবারের সদস্যদের সহযোগিতা এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। প্রয়োজন জীবনযাত্রার কিছু পরিবর্তন আনয়ন। যদি আগে থেকে নিয়মিত শরীরচর্চা বা হাঁটার অভ্যাস না থাকে, তাহলে আর দেরি না করেই শুরু করতে হবে। শরীরটাকে পরিমিত বিশ্রামসহ সচল বা কর্মময় রাখা জরুরী। মেডিটেশন বা যোগব্যায়াম যথেষ্ট সহায়ক হতে পারে। খাবার তালিকায় ছোট মাছ, শাকসবজি বিশেষ করে কাঁচা পেঁপে, শিম, কপি, মটরশুটি ইত্যাদি বাড়িয়ে দেয়া। নিয়মিত আঁশযুক্ত ফল খাওয়া। ক্যালসিয়ামসমৃদ্ধ খাবারÑ দুধ, দই, ছানা ইত্যাদি নিয়মিত খাওয়া। গরু ও খাসির মাংস (রেডমিট) এড়িয়ে চলা। পরিমিত (দিনে ৫-৬ গ্লাস) পানি পান করা। চা-কফি দিনে ১-২ কাপে নামিয়ে আনা। পজ হলে যৌনেচ্ছা এবং ক্ষমতা একেবারে চলে যাবেÑ এটা নিতান্তই ভ্রান্ত ধারণা। নিয়মিত মিলন দীর্ঘ জীবন ধরে রাখতে সহায়ক। যোনিপথে কোন সমস্যা হলে তার যথাযথ চিকিৎসা এবং শুষ্কতার জন্য বিশেষজ্ঞের পরামর্শ অনুযায়ী চলা। ভেজাইনাল লুব্রিকেন্টস ব্যবহার করা যেতে পারে। হাড় ক্ষয়রোধে ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন ‘ডি’ সাপলিমেন্ট গ্রহণে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিতে হবে। বছরে একবার স্বাস্থ্য পরীক্ষা, বিশেষ করে স্তন, জরায়ু ও ডিম্বাশয়ের পরীক্ষা দরকার। অনেক সময় পজজনিত সমস্যার জন্য হরমোন থেরাপির (এইচআরটি) প্রয়োজন হয়। এ চিকিৎসা শুধু বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের পরামর্শে হবে এবং কখনই দীর্ঘ সময়ের জন্য নয়। প্রতি বছর পালিত হয় বিশ্ব পজ দিবস। সে ক্ষেত্রে সর্বদাই নিজের স্বাস্থ্য নিয়ে ভাবুন, অগ্রসর থাকুন। বাংলাদেশের সব পজ পরবর্তী নারী, নিজেদের স্বাস্থ্য নিয়ে ভাবুন ও সুস্থ-সুন্দর থাকুন। সময়ের সঙ্গে অগ্রসর হোন।

লেখক : স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ

প্রকাশিত : ১৯ জুন ২০১৫

১৯/০৬/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: