রৌদ্রজ্জ্বল, তাপমাত্রা ২৩.৯ °C
 
৮ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, বৃহস্পতিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

বাবা তোমাকে ভালবাসি

প্রকাশিত : ১৯ জুন ২০১৫
  • মেধা নম্রতা

পৃথিবী যদি মা হয়, তবে আকাশ আমাদের বাবা। নয় বছর বয়সে স্কুলের খাতায় প্রথম রচনা লিখেছিল দীপ্ত। কারণ ওর বাবা নেই। স্কুল গেটে অনেক বন্ধুর বাবা আসেন তাদের নিতে। তারা ছেলেমেয়েদের হাত থেকে ব্যাগ নিজের কাঁধে ঝুলিয়ে আইসক্রিম, বার্গার, কখনও পেন্সিল, শার্পনার কিনে দিয়ে গল্প করতে করতে বাড়ি যেতেন। দীপ্তর মাও কিনে দেন, কিন্তু ওর ইচ্ছা করত বাবার কাছে থেকে পেতে। মন খারাপ করে ভাবত, ইস্্ আমার যদি বাবা থাকত! আসলে প্রতিটি সন্তানের কাছে মা এবং বাবা সমভাবে প্রয়োজন। ছেলেমেয়েদের জন্য মায়ের আদর যেমন নিঃস্বার্থ শর্তহীন, তেমনি সন্তানদের প্রতি বাবার স্নেহ-ভালবাসা, দায়-দায়িত্বও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। মায়ের মতো পিতাও সন্তানের এক অমল আশ্রয়। এই অনুভূতি কেবল তারাই বুঝতে পারে, যাদের পিতা আছে। পিতৃহীনের কষ্ট কাউকে বলা যায় না। মাতৃত্বের বিশালতার পাশে বাবার প্রয়োজন অসীম। মায়ের মতোই সমান দরকার।

এই রকম এক অনুভূতি নিয়ে বিংশ শতাব্দীর প্রথমদিকে মা দিবসের পাশাপাশি বাবা দিবসও পালন করা শুরু হয়। এই দিন পৃথিবীর সব বাবা তাদের সন্তানদের কাছ থেকে এক আবেগভরা ডাক শুনতে পান। আর সন্তানরাও এই দিনে বাবাদের প্রতি তাদের সঞ্চিত শ্রদ্ধা এবং ভালবাসা প্রকাশ করে। কেউ কেউ বাবার জন্যে কিনে নেয় ফুলসহ নানা ধরনের উপহার। বাবা এবং সন্তানের মধ্যে সৃষ্টি হয় আবেগঘন কিছু মনকাড়া মুহূর্ত। প্রমাণিত হয়, সন্তানের আস্থার সবচেয়ে বড় আশ্রয় হচ্ছে বাবা।

ওয়াশিংটনের গির্জার ফাদার যখন প্রার্থনা করতে করতে মায়ের জন্য অনেক ভাল ভাল কথা বলছিলেন, ঠিক সেই সময় সনোরা স্মার্ট ডড নামে একজন বাপসোহাগী মেয়ের মাথায় এই আইডিয়া আসে যে, মা দিবসের পাশাপাশি বাবা দিবসও তো পালন করা যায়। সন্তানের ওপর বাবার ভালবাসা একেবারে ফেলে দেয়ার মতো নয়। তাই বাবার প্রতি ভালবাসা থেকেই সনোরা স্মার্ট ডড নিজেই উদ্যোগী হয়ে ১৯১০ সালের ১৯ জুন থেকে বাবা দিবস পালন করতে শুরু করেন। যদিও বেশ আগে থেকেই পৃথিবীর সব পিতার প্রতি সন্তানের শ্রদ্ধা ও ভালবাসা প্রকাশের জন্য একটি নির্দিষ্ট দিন থাকা জরুরী বলে অনেকেই ধারণা করছিলেন। আর তাই ১৯০৮ সালের জুন মাসের ৫ তারিখ আমেরিকার পশ্চিম ভার্জিনিয়ার ফেয়ারমেন্টের এক গির্জায় আনুষ্ঠানিকভাবে বাবা দিবস পালিত হয়।

একটি বিষয় পরিষ্কার, মা দিবসের মতো বাবা দিবস তেমন গর্জিয়াস হয় না কখনও। তা ছাড়া বাবারা প্রথম দিকে নিজেরাই খুব উৎসাহী ছিলেন না বা হননি এই দিবসটি পালনের জন্য। কিন্তু পরবর্তীতে পরিস্থিতি বদলে যায়। সন্তানদের ভালবাসার কাছে হার মেনে বাবারাও আগ্রহী হয়ে ওঠে বাবা দিবস সম্পর্কে। ১৯১৩ সালে আমেরিকার সংসদে বাবা দিবসকে সম্মান দিয়ে দিনটিকে ছুটির দিন হিসেবে ঘোষণা করার জন্য একটি বিল উত্থাপন করা হয়। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ক্যালভিন কুলিজ ১৯২৪ সালে এই বিলের পক্ষে পূর্ণ সম্মতি জানান। শেষ পর্যন্ত প্রেসিডেন্ট লিন্ডন বি জনসন ১৯৬৬ সালে বাবা দিবসকে ছুটির দিন হিসেবে ঘোষণা দিয়ে সারা পৃথিবীর বাবাদের অসামান্য সম্মানে ভূষিত করেন। বিশ্বের অধিকাংশ দেশে অত্যন্ত আনন্দের সঙ্গে জুন মাসের তৃতীয় রবিবার বাবা দিবস পালিত হয়। সন্তান স্নেহে সুখী বাবারা এই দিন সন্তানের হাত ধরে আরও একবার তাদের এই পৃথিবীর যাবতীয় কঠিন পথে পা ফেলতে সাহায্য-সহযোগিতা করেন। কর্মব্যস্ততার কারণে যেসব বাবা সন্তানকে সময় দিতে পারে না, বা যেসব বাবা নানা কারণে সন্তানের সঙ্গে থাকতে পারে না, এই বাবা দিবস সবাইকে এক ভালবাসার বাঁধনে জড়িয়ে দেয়। সারা জীবন বাবারাই সন্তানদের জন্য উপহার কিনেছে, মেয়ের জন্য বার্বি পুতুল বা ছেলের জন্য ক্রিকেট ব্যাট-বল। আজ সেই ছোট্ট সোনামণিরা বাবার জন্য উপহার কিনে আনে। কেক সাজায়। গান গায়। এই ভালবাসার কোন তুলনা হয় না। দূরে থাকা বাবার জন্য ছেলেমেয়েরা নানারঙের কার্ড পাঠিয়ে মনে করিয়ে দেয়, বাবা আমি তোমাকে অনেক ভালবাসি। মিস ইউ বাবা। তুমি কবে আসবে?

বর্তমান ব্যস্ত সময়ে সন্তানের জন্যও সময় দিতে পারছে না কর্মজীবী বাবা-মায়েরা। সে ক্ষেত্রে এরকম একটি দিন যদি সন্তান এবং বাবা-মাকে ঘিরে অনুষ্ঠিত হয়, তবে তা সবার জন্যে হয়ে ওঠে আনন্দের । হিন্দু ধর্মে আছে, পিতাই স্বর্গ। পিতার শিক্ষা, আদর্শ, কর্তব্যনিষ্ঠা, অনুপ্রেরণা, শুভকামনা, আশীর্বাদ সন্তানের জন্য খুব প্রয়োজন। বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশে বাবাকেই সংসারের কর্তা বলে সামাজিকভাবে স্বীকৃতি দেয়া হয়। সে ক্ষেত্রে পরিবারে বাবা গুরু-স্থানীয় প্রথম শিক্ষক।

আমাদের সমাজ ব্যবস্থায় বাবার অসমাপ্ত কাজ সম্পূর্ণ করার দায় সন্তানের ওপর বর্তায়। বৃদ্ধ বয়সে বাবার সম্মান-সম্পদের উত্তরাধিকার হয় সন্তানেরা। এশিয়ায় বাবার সঙ্গে সন্তানের সম্পর্ক খুব সুন্দর হয়। সম্রাট পিতা বাবর সন্তান হুমায়ুনের জীবন রক্ষায় ঈশ্বরের কাছে নিজের জীবন তুলে দিতে চেয়েছিলেন। গৌতম বুদ্ধ সংসার মায়া ছিন্ন করলেও বাবার প্রতি কখনও অসম্মান দেখাননি। হযরত মুহম্মদ (সা.) এতিম ছিলেন বলে বাবা-মার স্নেহবঞ্চিত সন্তানদের প্রতি সর্বদা সকরুণ ছিলেন। তিনি বলেছিলেন, বৃদ্ধ বাবা-মার সেবা করার মধ্যে হজ করার সওয়াব রয়েছে। এছাড়া পারিবারিক বন্ধন এবং সামাজিক যোগাযোগ রক্ষা ও সচল রাখার জন্যে বাবা এবং মা দিবসের অভূতপূর্ব ভূমিকা দেখতে পাচ্ছি আমরা। আজকাল অনেক সন্তান আছে, তারা বাবা-মায়ের কোন তত্ত্বতালাস, খোঁজখবর নেয় না। এমনকি বৃদ্ধাশ্রমে রেখে যাওয়া বাবা-মাকে জন্মদিন, বিবাহবার্ষিকী, ঈদ, পূজা, পয়লা বৈশাখে একবার সালাম-শ্রদ্ধা-শুভেচ্ছাও জানায় না। নিজের বাসায় বাবা-মা থাকলেও তাদের সঙ্গে ভাল ব্যবহার করে না। সমাজের এসব অবক্ষয় দূর করতে মা দিবসের মতো বাবা দিবস পালন করা খুব দরকার। এই কর্তব্যহীন অসাধু অকৃতজ্ঞ সন্তানেরা এই দিনে বাবা-মায়ের ওপর দায়িত্ব পালনকারী সন্তানদের দেখে লজ্জা পেতে শিখুক। তাতে সমাজের অনেক উপকার হবে।

তেমনি এই সমাজে কিছু প্রতারক বাবা আছে, যারা খেয়ালের বশে সন্তান জন্ম দিয়ে তার দায়িত্ব পালন না করে সরে যায়। অথবা স্ত্রীর সঙ্গে ডিভোর্স হওয়ার পরে সন্তানদের দিকে ফিরেও তাকায় না। তাদের জন্য কোন দায়িত্ব পালন না করে আবার বিয়ে করে সন্তান জন্ম দিয়ে পৌরুষ দেখায়। বাবা দিবসের পবিত্র দিনে এসব বাবা নামের পশুরা যেন ঘৃণিত হয়। সন্তান এক সময় ঠিক উঠে দাঁড়ায়, কিন্তু তারা কখনওই তাদের এই রকম নরাধম পিতাকে ক্ষমা করে না। প্রতিটি শিশুর কাছে তাদের বাবা হলো সুপারম্যান। সে হাজারও লাখো টাকার দামী জিনিস দিলেও সুপারম্যান বাবা আর কিছু না দিতে পারার বাবাও তার সন্তানের কাছে সুপারম্যান। একজন পুরুষকে সন্তান জন্মের পরে বাবা হয়ে উঠতে হয়। সন্তানের প্রতি তার আচরণ, ভালবাসা, ধৈর্য, মনোযোগ, আদর, আস্থা, অনুপ্রেরণা, সাহস ইত্যাদির কারণে বাবা একটি শর্তহীন আশ্রয়। যে কোন বিপদে সন্তান প্রথম তার বাবার কাছেই ছুটে আসে। বাবাদের জন্য গর্ব এবং অহঙ্কারের বিষয় হচ্ছে, সন্তান বড় হতে হতে বাবার হাত ধরে চলতে চায়। মহাকবি শেক্সপিয়ার বলেছেন, ‘জ্ঞানী বাবা সেই জন, যিনি তাঁর সন্তানকে জানেন।’ একজন বাবা তার সন্তানকে সব চেয়ে ভাল বুঝতে পারে যদি সে সত্যিকারভাবে সন্তানকে বুঝতে চায়। বর্তমান সময় হচ্ছে কোয়ালিটি দেয়ার সময়। শত ব্যস্ততার ভেতরেও বাবাকে তার সন্তানের কাছে আসতে হবে। সন্তানের মানসিক গঠনে বাবার ভূমিকা ব্যাপক। কেবল খেলনা বা দামী গাড়ি বাড়ি অবাধ প্রশ্রয় দিয়ে নয়, কাছে এসে সন্তানের মাথায় হাত দিয়ে অন্তত যদি এটুকুও যদি কোন বাবা বলে যে, আমি তো আছি তোমার পাশে, তাহলেও সন্তানের আত্মবিশ্বাস প্রশস্ত হয়। উইলিয়াম ওয়ার্ডওয়ার্থ বলেছেন, ‘বাবা ... এই শব্দটায় যতটুকু পবিত্রতা, তা তো কেবল ঈশ্বরই দিয়ে রেখেছেন।’ বিশ্বের সকল বাবার জন্য বাবা দিবসের শুভেচ্ছা। লাভ ইউ বাবা।

লেখক : বেসরকারী কলেজের শিক্ষক

প্রকাশিত : ১৯ জুন ২০১৫

১৯/০৬/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: