আংশিক মেঘলা, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৬ ডিসেম্বর ২০১৬, ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, মঙ্গলবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

কোরাল আইল্যান্ড

প্রকাশিত : ১৯ জুন ২০১৫
  • রাজু মোস্তাফিজ

দুলাল ভাই বেশ ক্লান্ত। তাড়াতাড়ি তৈরি হতে বললাম। আজ আমরা ‘কোরাল আইল্যান্ডে’ যাব। ৮টার মধ্যে সকালের নাস্তা করে আমরা সকলে হোটেল থেকে বের হয়ে পড়লাম। বাসে উঠে ১০ মিনিটের মধ্যে পাতায়া সী বিচে পৌঁছালাম। আমাদের জন্য স্পিড বোট রেডি হয়ে আছে। আমরা ৪৩ জন গিয়েছি। দুটো স্পিড বোটে রওনা দিলাম। সী চি থেকে ১৫ কিঃ মিঃ দূরে ‘কোরাল আইল্যান্ড’। ২০ মিনিটের মধ্যে আমরা পৌঁছলাম প্যারাসুটিং স্পটে। দিগন্ত জোড়া নীল আকাশে পাখির মতো উড়ে বেড়ানো অনুভূতি সত্যি অন্য রকম। আমি এর লোভ সামলাতে পারলাম না। ৫শ’ বাথ দিয়ে প্যারাসুটে আকাশ ভ্রমণের একটি টিকিট কেটে ফেললাম। উজ্জ্বল আকাশের রোদ। অপূর্ব দৃশ্য। পর্যটকরা এখানে আসে আকাশে উড়ে বেড়াবার জন্য। নিবিড় শ্যামলিমা, চোখ জুড়ানো নিসর্গ, পাহাড় ছুঁয়ে মেঘমালার উড়ে চলা। কিছূক্ষণের মধ্যে প্যারাসুটে ওঠার সমস্ত প্রস্তুতি নিলাম। আমার যখন ডাক পড়ল এখানকার কিছু পুরুষ আর নারী কর্মী মধ্যে কেউ আমার শরীরে দ্রুত বেল্ট পরিয়ে দিচ্ছে আর কেউ লাইফ জ্যাকেট পরতে সহায়তা করছে। প্যারাসুটে আমি উড়ে চলছি। ধীরে ধীরে আকাশে ওড়াল দিলাম। খুব ভয় হচ্ছিল আমার। শরীর ঘামছিল। ততক্ষণে সমুদ্রের ওপর নীল আকাশে উড়ে চলছি। কিছুক্ষণ ওড়ার পর একটু একটু করে স্বাভাবিক হয়ে উঠলাম। আমার সঙ্গে আরও কয়েকজন আকাশে ওড়ছে। প্যারাসুটে ঘুরে বেড়ানোর সময় ওপর থেকে দেখা যায় আকাশ ছোঁয়া গাছগাছালির মধ্যে বিশাল বিশাল পাহাড়। সমুদ্র, পাহাড় এবং আকাশের মিতালীর এক অপূর্ব দৃশ্য।

আকাশে ওড়ার সময় সাদা তুলোর মেঘগুলো উড়ে উড়ে যাচ্ছে পাশ দিয়ে, এ এক অন্য রকম অনুভূতি। কিছুক্ষণের মধ্যে নিচে নেমে আসলাম। বিশ্রাম নিলাম কিছুক্ষণ। আমার সঙ্গে অনেকেই সাহস পাননি প্যারাসুটে ভ্রমণের। কথা হয় ভারতের জুম্মু-কাশ্মীর প্রদেশ থেকে আসা শিখ যুবক লাকী (২৫) -এর সঙ্গে। লাকী বয়সে তরুণ। অমায়িক ব্যবহার। সে আমাকে জানায়, কোরালল্যান্ডস দ্বীপে যাবার জন্য বিভিন্ন কোম্পানির প্যাকেজ টুরের ব্যবস্থা রয়েছে। রয়েছে সিঙ্গেল ইঞ্জিনের স্পিড বোট। বোটের ভাড়া তিন হাজার বাত। যাত্রী ওঠে ১০ জন। আর ডাবল ইঞ্জিনের স্পিড বোডের জন্য ভাড়া চার হাজার ৫শ’ বাত। তবে দ্বীপে থাকা খাওয়ার জন্য আলাদা আলাদা টাকা ব্যয় করতে হয়। কিছুক্ষণ পর আমরা রওনা দিলাম কোরালল্যান্ড দ্বীপে। অদ্ভুদ সুন্দর পরিবেশ। নির্জন এলোমেলো বাতাস স্বচ্ছ নীল পানি পর্যটকদের হাতছানি দিয়ে ডাকে। স্বাতন্ত্র্যের কারণে কোরাল ল্যান্ড দ্বীপে প্রতি বছরেই হাজার হাজার পর্যটক বেড়াতে আসে। জীববৈচিত্র্যে ভরা এই দ্বীপটিতে প্রকৃতি যেন সৌন্দর্যের পসরা খুলে বসে আছে।

কোরাল ল্যান্ড দ্বীপে নেমেই এর নৈসর্গিক সৌন্দর্য দেখে পর্যটকরা আত্মহারা হয়ে ওঠেন। অনেকে নেমেই দৌড় শুরু করেন। জলের বড় বড় ঢেউগুলো এখানে আছাড় খাচ্ছে। এ এক অপরূপ দৃশ্য। নীল আকাশ, নীল জলের সঙ্গে গাঢ় সবুজ গাছ প্রকৃতির সৌন্দর্য সব কিছু উজাড় করে দিয়েছে দ্বীপটিকে। এলোমেলো বাতাস সমুদ্রের গর্জনের সঙ্গে মিলেমিশে এক মোহনীয় পরিবেশ সৃষ্টি করেছে। এই দ্বীপে আমরা ঘুরে বেড়াচ্ছি। প্রচুর পর্যটক এখানে এসেছে। সুমদ্রের পানিতে শিশু যুবক-যুবতী নারী-পুরুষ সকলে সমুদ্রের পানির ঢেউয়ে খেলছে। সমুদ্রের নির্দিষ্ট জায়গার বাইরে কেউ যেতে পারে না। অনেক যুবক স্পিড বোটে ঘুরছে। ক্লান্তিহীনভাবে আমরাও সী বিচের এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্ত হেঁটে বেড়াচ্ছি। দেখছি চোখ ভরে। পর্যটকরা নিশ্চিন্ত মনে ঘুরছে আনন্দ করছে। কিছু মহিলা-পুরুষ সী বিচে খেলছে বিচ বল। আমি দুলাল ভাইসহ পুরো দল ঘুরে বেড়াচ্ছি। মনে হচ্ছে কোথাও আমার হারিয়ে যাবার নেই মানা।

এখান থেকে যখন ফিরছি তখন দুপুর দুটো। পাতায়া বিচ থেকে আমরা একটি ইন্ডিয়ান হোটেলে খেয়ে রওনা দিলাম ব্যাঙ্ককের পথে। ব্যাঙ্কক যাবার পথে আমাদের ‘ওয়ার্ল্ড জেমস কালেকসন’ সেন্টারে নিয়ে যাওয়া হলো। বাস থেকে নেমেই ভিতরে ঢুকলাম। বহুতল ভবন। কয়েকশত পুরুষ মহিলা এখানে কাজ করে। ওয়ার্ল্ড জেমস কালেকসনের কর্তৃপক্ষ আমদের স্লাইডে দেখাল থাইল্যান্ডের সাধারণ মানুষরা বিভিন্ন পাহাড় ও সমুদ্র থেকে হীরা, পান্নাসহ বিভিন্ন গহনার পাথর কিভাবে সংগ্রহ করে। কিভাবে আন্তর্জাতিক মানের গহনা তৈরি করছে। সারা পৃথিবীর মানুষ এখান থেকে বিভিন্ন অলঙ্কারসহ বিভিন্ন জিনিসপত্র কেনাকাটা করে। এখানে এক থাই কিশোরী সেলসম্যান আমার সহধর্মিণী জবার জন্য একটি পাথরের ব্রেসলেট পছন্দ করে দিল। আমি কিনলাম ৫শ’ বাথ দিয়ে। এখানকার বিভিন্ন দোকান ঘুরতে ঘুরতে কখন এক ঘণ্টা ঘুরে পার হয়ে গেছে টেরই পাইনি। আমাদের গাইড তাড়া করছে গাড়িতে ওঠার জন্য।

আবার রওনা দিলাম হাইওয়ে রাস্তা দিয়ে ব্যাঙ্ককের পথে। পড়ন্ত বিকেল। পাহাড় আর নারকেল বাগানের মাঝে আমাদের বাস চলছে। দু’ঘণ্টা সময় লাগবে ব্যাঙ্কক শহর পৌঁছাতে। দূরের গ্রামগুলোতে বড় বড় নারকেল গাছ। জনমানবশূন্য গ্রামগুলো। তবে মাঝে মাঝে রাস্তার এক পাশে বড় বড় বাজার চোখে পড়ল। এগুলো রাস্তা থেকে বেশ দূরে। সব ধরনের দোকান রয়েছে এখানে। বাসটি খুব দ্রত গতিতে চলছে। আমি মনে মনে ভাবছি, কি নিয়মের মধ্যে গাড়ি চালাচ্ছে ড্রাইভার। কখনোই ওভার ট্রেকিং করছে না। আমাদের দেশের মতো হাইওয়ের মতো রাস্তা লাগায়া কোন বাজার নেই। সব কিছু পরিকল্পিত। যা চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা যায় না। ব্যাঙ্কক শহর যেন ফ্লাইওভারের শহর। একতলা থেকে তিনতলা পর্যন্ত ফ্লাইওভার। প্রতিটি ফ্লাইওভারে চলছে হাজার হাজার গাড়ি। আলোয় আলোয় ঝলমলে হয়ে উঠেছে পুরো ব্যাঙ্কক শহর। রাত সাড়ে সাতটার দিকে সুকুমভিত-১৫ সড়কে ‘হোটেল ম্যানহাটন’ এ আমরা পৌঁছালাম। ব্যাঙ্ককের এটি একটি ব্যস্ততম এলাকা। রাস্তার মোড়ে মোড়ে রাস্তার নম্বর লেখা রয়েছে। রাতে হোটেলে ফ্রেশ হয়ে আবারও বেরিয়ে পড়লাম রাতের ব্যাঙ্কক দেখার নেশায়।

সুকুমভিত-১৩ রোডে বাংলাদেশী খাবার হোটেলে নাসিরে ঢুকলাম আমরা। এই হোটেলের মালিকের বাড়ি বাংলাদেশের বরিশাল জেলায়। কাজের সন্ধানে এখানে এসেছে কয়েক বছর আগে। কাজের ফাঁকে টাকা সঞ্চয় করে নিজেই হোটেল ব্যবসা খুলেছে। রাতের খাবার পর আমরা বের হয়ে পড়লাম। সুকমভিত এলাকার রাস্তার ফুটপাথ দিয়ে হাঁটছি। ফুটপাথে অসংখ্য দোকান। বাড়ির ব্যবহারিক জিনিসপত্র, বাচ্চাদের খেলনা, কাপড়সহ প্রতিটি জিনিস পাওয়া যায়। রাত যত গভীর হচ্ছে ক্রেতা ততই বাড়ছে। এই সব দোকানের ফাঁকে ফাঁকে অর্ধনগ্ন থাই ও আফ্রিকান তরুণীরা খদ্দেরের জন্য অপেক্ষা করছে। ডাকছে পথচারীদের। তবে কাউকে বিরক্তি করে নয়। এটাই মনে হয় ব্যাঙ্কক নগরীর মানুষদের জীবন। হাঁটতে হাঁটতে আমরা ৪ নং সুকমভিত সড়কে পৌঁছালাম। এখানে বার আর নাইট ক্লাবগুলো। বিভিন্ন ক্লাবে চলছে নাচ আর হট মিউজিক। প্রচুর ইউরিপিয়ান এখানে এসেছে। প্রচুর আনন্দ করছে তারা। নাচের সঙ্গে তারাও নাচছে। মনে হচ্ছে পৃথিবীর সব আনন্দেই তারা মেতে উঠেছে। আমার বার বার মনে হচ্ছিল আমাদের দেশে হতাশা, দুর্নীতি, নানা রাজনৈতিক অস্থিরতায় আমরা যখন অস্থির তখন কী নিশ্চিন্ত মনে এখানে মানুষ আনন্দ করছে।

প্রকাশিত : ১৯ জুন ২০১৫

১৯/০৬/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: