আংশিক মেঘলা, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৬ ডিসেম্বর ২০১৬, ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, মঙ্গলবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

খালেদার বিরুদ্ধে নাইকো দুর্নীতি মামলা চলবে, হাইকোর্টের আদেশ

প্রকাশিত : ১৯ জুন ২০১৫
খালেদার বিরুদ্ধে নাইকো দুর্নীতি মামলা চলবে, হাইকোর্টের আদেশ
  • দুই মামলায় আদালতে খালেদা, জেরা ২৩ জুলাই

স্টাফ রিপোর্টার ॥ বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) দায়ের করা নাইকো দুর্নীতি মামলা বিচারিক কার্যক্রমের ওপর স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার করে নিয়েছে হাইকোর্ট। খালেদা জিয়ার করা আবেদন খারিজ করে আদেশ পাওয়ার দুই মাসের মধ্যে তাকে বিচারিক আদালতে আত্মসমর্পণেরও নির্দেশ দেয়া হয়েছে হাইকোর্টের রায়ে। ফলে খালেদার বিরুদ্ধে নাইকো দুর্নীতি মামলার বিচার চালাতে আর কোন বাধা থাকল না বলে আইনজীবীরা জানিয়েছেন। অন্যদিকে, খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে দুদকের দায়ের করা জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট ও জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় সাক্ষ্যগ্রহণ ও বাদীকে আসামিপক্ষের জেরার জন্য আগামী ২৩ জুলাই পরবর্তী দিন ঠিক করেছে আদালত।

জরুরী অবস্থার সময় দুর্নীতি দমন কমিশনের দায়ের করা নাইকো মামলা চ্যালেঞ্জ করে খালেদার রিট আবেদনে সাত বছর আগে স্থগিতাদেশ দিয়েছিল হাইকোর্ট। সে সময় জারি করা রুল খারিজ করেই বিচারপতি মোঃ নূরুজ্জামান ও বিচারপতি জাফর আহমেদের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ বৃহস্পতিবার এ রায় দেন।

রায়ে বলা হয়, রিট আবেদন গ্রহণযোগ্য নয়। রুল খারিজ করা হলো। এ আদেশ বিচারিক আদালতে পৌঁছার দুই মাসের মধ্যে আসামিকে আত্মসমর্পণ করতে নির্দেশ দেয়া হলো। রায়ে আরও বলা হয়, নিম্ন আদালতে জামিন চাইলে আদালত জামিন বিবেচনা করবেন, কেননা আবেদনকারী (খালেদা) জামিনের অপব্যবহার করেননি।

রায়ের পর খালেদা জিয়ার আইনজীবী ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন আপীল করবেন জানিয়ে সাংবাদিকদের বলেন, খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাতের সুনির্দিষ্ট কোন অভিযোগ এ মামলায় নেই। তাহলে খালেদার আবেদন খারিজ হল কেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, আদালত বলেছে, দুদক এ মামলা দায়েরের যে অনুমোদন দিয়েছিল, তা সঠিক ছিল। এ কারণে রুল খারিজ করা হয়েছে। তিনি জানান, একজন কমিশনারের সই থাকলেই দুদকের মামলার অনুমোদন গ্রহণযোগ্য হবে বলে এর আগে আপীল বিভাগের এক রায়ে বলা হয়েছিল। তিনি বলেন, খালেদা জিয়ার মামলায় ওই অনুমোদন হাইকোর্টে দেখানো হলেও শেখ হাসিনার মামলায় তা করা হয়নি।

এ বিষয়ে দুদকের আইনজীবী খুরশীদ আলম খান রায়ের পর সাংবাদিকদের বলেন, শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে করা দুই মামলার মধ্যে ‘তফাৎ রয়েছে’। তাছাড়া খালেদার মামলায় অপরাধ সংগঠনের ‘যথেষ্ট প্রাথমিক উপাদানও’ রয়েছে। আদালত রুল খারিজ করায় এ মামলা চলতে আর আইনী কোন বাধা থাকল না বলে জানান তিনি।

সেনানিয়ন্ত্রিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় খালেদা গ্রেফতার হওয়ার পর ২০০৭ সালের ৯ ডিসেম্বর তার বিরুদ্ধে তেজগাঁও থানায় নাইকো দুর্নীতি মামলা দায়ের করে দুদক। পরের বছর ৫ মে খালেদাসহ ১১ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেয়া হয়। এতে অভিযোগ করা হয়, ক্ষমতার অপব্যবহার করে তিনটি গ্যাসক্ষেত্র পরিত্যক্ত দেখিয়ে কানাডীয় কোম্পানি নাইকোর হাতে তুলে দেয়ার মাধ্যমে আসামিরা রাষ্ট্রের প্রায় ১৩ হাজার ৭৭৭ কোটি টাকার ক্ষতি করেছেন।

খালেদা জিয়া উচ্চ আদালতে গেলে ২০০৮ সালের ৯ জুলাই দুর্নীতির এ মামলার কার্যক্রম স্থগিত করে হাইকোর্ট, সেই সঙ্গে দেয়া হয় রুল। প্রায় সাত বছর পর চলতি বছর শুরুতে রুল নিষ্পত্তির মাধ্যমে মামলাটি সচল করার উদ্যোগ নেয় দুদক। খালেদার আবেদনে রুলের ওপর শুনানি শুরু হয় ১৯ এপ্রিল।

খালেদা জিয়া ছাড়া এ মামলার বাকি আসামিরা হলেনÑ চারদলীয় জোট সরকারের আইনমন্ত্রী মওদুদ আহমদ, সাবেক জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী এ কে এম মোশাররফ হোসেন, তখনকার প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব কামাল উদ্দিন সিদ্দিকী, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সাবেক ভারপ্রাপ্ত সচিব খন্দকার শহীদুল ইসলাম, সাবেক সিনিয়র সহকারী সচিব সি এম ইউছুফ হোসাইন, বাপেক্সের সাবেক মহাব্যবস্থাপক মীর ময়নুল হক, বাপেক্সের সাবেক সচিব মোঃ শফিউর রহমান, বিতর্কিত ব্যবসায়ী গিয়াস উদ্দিন আল মামুন, ঢাকা ক্লাবের সাবেক সভাপতি সেলিম ভূঁইয়া এবং নাইকোর দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক ভাইস প্রেসিডেন্ট কাশেম শরীফ।

জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট ও চ্যারিটেবল ট্রাস্ট

বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) দায়ের করা জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট ও জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় সাক্ষ্যগ্রহণ ও বাদীকে আসামিপক্ষের জেরার জন্য আগামী ২৩ জুলাই পরবর্তী দিন ঠিক করেছে আদালত। বৃহস্পতিবার ঢাকার তৃতীয় বিশেষ জজ আদালতের বিচারক আবু আহমেদ জমাদার এই দিন ঠিক করেন। এদিন পুরান ঢাকার বকশীবাজারে ঢাকা আলিয়া মাদ্রাসা সংলগ্ন কারা অধিদফতর প্যারেড মাঠে স্থাপিত বিশেষ জজ আদালতে খালেদা জিয়ার উপস্থিতিতেই এ দুই মামলার শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। সকাল ১০টা ৩৫ মিনিটে আদালতে হাজির হন খালেদা জিয়া।

এর আগে গত ২৫ মে এ দুই মামলায় আদালতে হাজিরা দিতে এসে খালেদা জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় বাদীর দেয়া সাক্ষ্য বাতিলের আবেদন করেছিলেন। বিচারক আবু আহমেদ জমাদার তা নাকচ করে দিলে খালেদার আইনজীবীরা হাইকোর্টে যান। এ বিষয়টি জজ আদালতে তুলে ধরে খালেদার আইনজীবীরা এদিন অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলার শুনানি মুলতবির আবেদন করেন।

আদালতে খালেদার পক্ষে শুনানি করেন এ্যাডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেন, ব্যারিস্টার মাহবুবউদ্দিন খোকন, এ্যাডভোকেট মাসুদ আহমেদ তালুকদার ও এ্যাডভোকেট সানাউল্লাহ মিয়া। দুদকের পক্ষে ছিলেন পাবলিক প্রসিকিউটর মোশাররফ হোসেন কাজল।

শুনানি মুলতবির আবেদন শুনে বিচারক খালেদার আইনজীবীদের জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় বাদীর জেরা শুরু করতে বলেন। এ সময় খালেদার আইনজীবীরা প্রস্তুতির অভাবের কথা বলে জেরা এড়ানোর চেষ্টা করেন। জিয়া অরফানেজ ট্রাস্টে মামলার মুলতবি আবেদনের শুনানিতে একপর্যায়ে আদালতে খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেন, তার মক্কেল (খালেদা জিয়া) এ মামলায় তাকে কোন টাকা পয়সা দেননি। তাই এ মামলায় কোন প্রস্তুতিও নেননি। পরে আদালতের নির্দেশে খন্দকার মাহবুব হোসেন জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলার বাদী দুদকের উপ-পরিচালক হারুন অর রশিদকে জেরা শুরু করেন। আংশিক জেরা শেষে বিচারক দুই মামলার শুনানির জন্য ২৩ জুলাই দিন ঠিক করে দেন।

বৃহস্পতিবার জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় রাষ্ট্রপক্ষের অন্য ছয় সাক্ষীও আদালতে উপস্থিত ছিলেন। এরা হলেনÑ সোনালী ব্যাংকের ম্যানেজার হারুনুর রশিদ, অফিসার (ক্যাশ) শফিউদ্দিন মিয়া, আবুল খায়ের, প্রাইম ব্যাংকের সিনিয়র অফিসার সিরাজুল ইসলাম, সিনিয়র এ্যাসিস্ট্যান্ট ভাইস প্রেসিডেন্ট সৈয়দা নাজমা পারভীন ও ভাইস প্রেসিডেন্ট আফজাল হোসেন।

এই দুই দুর্নীতি মামলায় নানা কারণ দেখিয়ে শুনানির জন্য নির্ধারিত ৬৬ কার্যদিবসের মধ্যে ৫৮ কার্যদিবসই অনুপস্থিত থেকেছেন খালেদা জিয়া, হাজির হয়েছেন মাত্র ৮ দিন। দীর্ঘদিন ধরে শুনানিতে অনুপস্থিত থাকায় গত ২৫ ফেব্রুয়ারি খালেদা জিয়াসহ অপর দুই আসামি মাগুরার সাবেক এমপি কাজী সালিমুল হক কামাল ওরফে ইকোনো কামাল ও ব্যবসায়ী শরফুদ্দিন আহমেদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানাও জারি করেছিল আদালত। ৪ মার্চও এ গ্রেফতারি পরোয়ানা বহাল রাখে আদালত। পরে গ্রেফতারি পরোয়ানা মাথায় নিয়ে প্রতি ধার্য তারিখে আদালতে উপস্থিত থাকার নিশ্চয়তা দিয়ে গত ৫ এপ্রিল আত্মসমর্পণ করে জামিন নেন খালেদা জিয়াসহ ওই তিন আসামি।

চ্যারিটেবল ট্রাস্ট ॥ ২০১১ সালের ৮ আগস্ট সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াসহ চারজনের বিরুদ্ধে জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলা দায়ের করেন দুর্নীতি দমন কমিশনের সহকারী পরিচালক হারুনুর রশিদ। তেজগাঁও থানার এ মামলায় ক্ষমতার অপব্যবহার করে জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্টের নামে ৩ কোটি ১৫ লাখ ৪৩ হাজার টাকা আত্মসাৎ করার অভিযোগ আনা হয় আসামিদের বিরুদ্ধে। ২০১২ সালের ১৬ জানুয়ারি খালেদা জিয়াসহ চারজনকে আসামি করে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা। এ মামলার অপর আসামিরা হলেনÑ খালেদার সাবেক রাজনৈতিক সচিব হারিছ চৌধুরী, হারিছের তখনকার সহকারী একান্ত সচিব ও বিআইডব্লিউটিএর নৌ-নিরাপত্তা ও ট্রাফিক বিভাগের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক জিয়াউল ইসলাম মুন্না এবং ঢাকার সাবেক মেয়র সাদেক হোসেন খোকার একান্ত সচিব মনিরুল ইসলাম খান। এদের মধ্যে হারিছ চৌধুরী মামলার শুরু হতেই পলাতক। তার বিরুদ্ধে গেফতারি পরোয়ানাও রয়েছে। খালেদাসহ বাকি দুই আসামি জামিনে রয়েছেন।

অরফানেজ ট্রাস্ট ॥ জিয়া অরফানেজ ট্রাস্টে অনিয়মের অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশন ২০০৮ সালের ৩ জুলাই রমনা থানায় অন্য মামলাটি দায়ের করে। এতিমদের সহায়তার জন্য একটি বিদেশী ব্যাংক থেকে আসা ২ কোটি ১০ লাখ ৭১ হাজার ৬৭১ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ আনা হয় এ মামলায়। দুর্নীতি দমন কমিশনের সহকারী পরিচালক হারুন উর রশিদ ২০১০ সালের ৫ আগস্ট বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া, ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানসহ ৬ জনের বিরুদ্ধে এ মামলায় অভিযোগপত্র দেন।

মামলার অপর আসামিরা হলেনÑ মাগুরার সাবেক সাংসদ কাজী সালিমুল হক কামাল ওরফে ইকোনো কামাল, ব্যবসায়ী শরফুদ্দিন আহমেদ, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সাবেক সচিব কামাল উদ্দিন সিদ্দিকী এবং প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ভাগ্নে মমিনুর রহমান। তারেক রহমান উচ্চ আদালতের জামিনে গত ছয় বছর ধরে বিদেশে অবস্থান করছেন। রবিবার খালেদা জিয়ার সঙ্গে সালিমুল হক কামাল ওরফে ইকোনো কামাল, ব্যবসায়ী শরফুদ্দিন আহমেদও জামিন পান। বাকি দুজন পলাতক।

প্রকাশিত : ১৯ জুন ২০১৫

১৯/০৬/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন

প্রথম পাতা



ব্রেকিং নিউজ: