কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৩ ডিসেম্বর ২০১৬, ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শনিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

ইন্দোনেশিয়ার চলচ্চিত্র উৎসবে ‘বিবেক’

প্রকাশিত : ১৮ জুন ২০১৫

কন্যাদায়গ্রস্ত পিতা-মাতাও যে বেকার যুবকের হাতে কন্যাকে তুলে দিতে চায় না তার যথেষ্ট কারণ আছে। কার্য কারণ ছাড়াই বেকার যুবক আরাধ্য প্রেয়সীকে ঘরে তুলতে বিদ্রোহী হয়ে যদি ঘরে তোলেও প্রেমের ডানায় ভর করে, তবে খুব শীঘ্রই বুঝে যায় বাস্তবতা কতটা কঠিন। প্রেমের পরশের উথাল-পাতাল ঢেউ ডিঙ্গিয়ে যুবকটি যখন মুখোমুখি হয় স্ত্রীর গাইনোলজিক্যাল অসুখের টানাপোড়েনে, যখন সে স্বচক্ষে দেখতে থাকে প্রাণাবিক প্রিয় স্ত্রী অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে ক্রমান্বয়ে চঞ্চলা থেকে নিস্তেজ হয়ে পড়ছে এবং অর্থাভাবে স্ত্রীকে সুস্থ করে তোলার মতো ডাক্তার দেখাতে পারছে না, তখন তার অবস্থা মাঝ সমুদ্রে ডুবন্তপ্রায় মানুষের মতো, যার সামনে কূল নেই-কিনার নেই কিন্তু একমাত্র অশনি আতঙ্ক আছে। ডুবন্ত যাত্রী যেমন সহযাত্রীকে ডুবিয়ে হলেও নিজে বাঁচতে চায় তেমনি দশা বেকার স্বামীর। লোকের হাত-পা ধরে ভিক্ষা করতে হলেও তা সই, তবু স্ত্রীকে বাঁচানো চাই। মান-সম্মান, জীবন-মরণ যেখানে তুচ্ছ সেখানে চুরি করা আর এমন কী ভাবনার। তবু মানুষের বিবেক বলে কথা। শেষ পর্যন্ত বিবেকের কাঠগড়ায় সে আসামি কিংবা বিবাদী। অনেকটা সে রকম গল্প মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ছোটগল্প বিবেক। বিবেক গল্প অবলম্বনে হাসান শাহরিয়ারের সংলাপ ও চিত্রনাট্যে, পরিচালক সাইফ সুমন পরিচালিত, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের আর্থিক অনুদানে নির্মিত চলচিত্র ‘বিবেক’ সম্প্রতি প্রদর্শিত হলো বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির চিত্রশালার মূল অডিটরিয়ামে মুভিয়ানা ও শিল্পকলা একাডেমির যৌথ আয়োজনে নতুন নির্মাতা নতুন চলচ্চিত্র শিরোনামের চলচ্চিত্র উৎসবে।

উৎসবের প্রদর্শিত চলচিত্র ‘বিবেক’-এর কেন্দ্রীয় চরিত্রে ঘনশ্যাম (আজাদ আবুল কালাম)। ঘনশ্যামের স্ত্রী মনিমালা (এনাম তারা সাকি) অসুস্থতার ধারাবাহিততায় মুমূর্ষুপ্রায়। মুমূর্ষুপ্রায় স্ত্রীকে সুস্থ করে তুলতে দরিদ্র ঘনশ্যাম তার সন্তানকে পাঠিয়ে ডাক্তারের শরণাপন্ন। দুই ডাক্তারের দুই বৈশিষ্ট্য। একজন গ্রাম্য অভিজ্ঞতার আলোকে গ্রাম্য ডাক্তার, অপরজন আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে নাগরিক ডাক্তার। চলচ্চিত্রটির আলোকে উভয়ের কমন বৈশিষ্ট্য, ফি পাওয়ার নিশ্চয়তা না পেলে রোগী দেখবে না, তা সে বাঁচুক কিংবা মরুক। অবস্থার টানাপোড়েনে দরিদ্র ঘনশ্যাম তার জমিদার বন্ধু অশ্বিনীর (মোহাম্মদী বারী) হাতের সোনার ঘড়ি চুরি করে, দরিদ্রের সহযাত্রী শ্রীনিবাসের (সেতু) মুদ্রার থলে চুরি করে। চুরির অর্থ দিয়ে যখন ডাক্তার আনতে সক্ষম হয় ঘনশ্যাম, ততক্ষণে অনেক দেরি। বিপরীত বৈশিষ্ট্যের উভয় ডাক্তার পরম করুণাময়ের হাতে মনিমালাকে সঁপে দিয়ে বিদায় নেয়। মনিমালার মৃত্যু আর বেঁচে থাকার মধ্যবর্তী সময়ের টানাপোড়েনের মতোই বাস্তবতা আর বিবেচনার টানাপোড়েনে ঘনশ্যাম। অশ্বিনীকে সোনার ঘড়ি আর শ্রীনিবাসকে মুদ্রা ফিরিয়ে দিয়ে বিবেকের দংশনের হাত থেকে মুক্তিপ্রাপ্ত ঘনশ্যাম দৌড়ে এগিয়ে চলে যদি পরম করুণাময় তার মৃতপ্রায় স্ত্রীকে সারিয়ে তোলে। আর সেখানেই শেষ হয় চলচ্চিত্র বিবেক।

বিবেক গল্পের কাহিনীর সমান্তরাল স্থান-কাল-পাত্রকে অবিকল তুলে ধরাটা বর্তমানের এই নাগরিক সময়ে কঠিন হলেও পরিচালক সাইফ সুমন সেক্ষেত্রে সফল। ল্যাম্পের আলো হয়ে তেপান্তরে মিশে চলায় তা স্পষ্ট। তারেক মাসুদের ছোট ভাই নাহিদ মাসুদের শব্দগ্রহণে ঝিঁঝিঁ পোকার ডাকে গ্রাম্য জীবন জীবন্ত। এনাম তারা সাকির পোশাক বিশ্বস্ত। সাচী চৌধুরীর ক্যামেরা ক্লোজ হয়ে লংশটে যাওয়া-আসায় ধীর-শান্ত-প্রয়োজনীয় কিন্তু হঠাৎ করেই ঘনশ্যামের মনের টানাপোড়েনের ভাষা বোঝাতে কেন মাথার উপর ক্যামেরা লাঠিমের মতো ঘুরল তা বোঝা গেল না। ঘনশ্যাম যদি চোখে সর্ষে ফুল দেখে তবে তো তা তার চোখের পয়েন্ট অব ভিউ হবে। মনের বিভ্রম ঘনশ্যামের, অপর কারও নয়। যেমনি অশ্বিনী এবং শ্রীনিবাসকে মনোজগতে ঘনশ্যামের কৈফিয়ত দেয়ার সময় ক্যামেরা বিশ্বস্ত ও নান্দনিক। মোহাম্মদ আলী বাবুর মেকআপে যদি দক্ষতা বোঝানোর বিষয় থেকে থাকে তবে তা মনিমালার মুখাবয়বকে ঘিরে। বেঁচে থাকা আর মৃত্যুর পথযাত্রা মুখেই ছাপ ফেলে যায়। চোখের নিচে কালি পড়বে না এ হয় না। তবে ঘনশ্যামের মুখাবয়বের টানাপোড়েনের ছাপ বাবুর মেকআপে চমৎকার। রিফাত আহমেদ নোবেল আবহ সঙ্গীত সৃজনে বিবাগী। রং বিন্যাসে সুজন মাহমুদ নিয়ন্ত্রিত।

নিয়ন্ত্রিত কিন্তু বিস্ফোরিত অনুভূতি প্রকাশে সবকিছুকে ছাপিয়ে বিবেক চলচ্চিত্রে আবারও দীপ্তমান ঘনশ্যামরূপী অভিনেতা আজাদ আবুল কালাম। সঙ্কটে দরিদ্রতা কিভাবে একটা মানুষকে নিষ্পেষণে পিষে মারতে পারে তার জীবন্ত প্রতিনিধিত্বে আজাদ আবুল কালাম। অসহায়ত্বে সব শক্তিহীনতা এক দেহের ভাষায় ফুটিয়ে তুলতে তার মতো শক্তিমান অভিনেতার বিকল্প আর কে হতে পারে! সীমিত সুযোগ তবুও বমি করতে গিয়ে এনাম তারা সাকির ক্ষয়িষ্ণুদশা, মোহাম্মদ বারীর জমিদারির আভিজাত্য, সেতুর সরলতা, আমির সিরাজির কাঠিন্য, তৌফিকুল ইসলাম ইমনের শুচিবায়ুতা, প্রশান্ত হালদারের মধ্যস্বত্বা, সন্তুর নিরুপায়তা, জসিমের আক্রোশ প্রভৃতির সন্নিবেশে বিবেক চলচ্চিত্র বিবেককে জাগ্রত করে। যে কারণে ইন্দোনেশিয়ার জাকার্তায় অনুষ্ঠিত এশিয়া প্যাসিফিক ইন্টারন্যাশনাল ফিল্মমেকার ফেস্টিভ্যাল এ্যান্ড এ্যাওয়ার্ড উৎসব থেকে এশিয়া প্যাসিফিক গোল্ডেন এ্যাওয়ার্ড বিবেক জয় করে জুরি বোর্ডের সম্মিলিত বিবেকের বিবেচনার সমর্থনে।

অপূর্ব কুমার কুণ্ডু

প্রকাশিত : ১৮ জুন ২০১৫

১৮/০৬/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: