মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
১০ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শনিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

ইলিশ মৌসুমের শুরুতেই ॥ জলদস্যু আতঙ্ক

প্রকাশিত : ১৮ জুন ২০১৫
ইলিশ মৌসুমের শুরুতেই ॥ জলদস্যু আতঙ্ক
  • দক্ষিণের জেলেরা সাগরে নামতে ভয় পাচ্ছে
  • চলছে র‌্যাবের সর্বাত্মক অভিযান
  • জলদস্যুরাও কৌশল পাল্টে অরণ্যের গভীরে গাছের ওপর নিরাপত্তা চৌকি বসিয়ে আস্তানা গেড়েছে
  • জলদস্যুদের টোকেন অনুযায়ী টাকা না দিলে অপহরণ অথবা মৃত্যু

খোকন আহম্মেদ হীরা, বরিশাল ॥ ইলিশ মৌসুম শুরু হলেও বরিশালসহ গোটা দক্ষিণাঞ্চলের জেলেদের জালে এখনও তেমন একটা ইলিশ ধরা পড়ছে না। অপরদিকে জেলেরা সাগরে নামতেই জলদস্যুদের অপহরণের শিকার হচ্ছেন। গত এক মাসে প্রায় দশটি মাছ ধরার ট্রলারে ডাকাতির ঘটনা ঘটেছে। এছাড়া জলদস্যুরা কমপক্ষে ১৫ জেলেকে অপহরণ করেছে। প্রতি জেলের কাছ থেকে দুই লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করেছে দস্যুরা। সর্বশেষ অপহরণের ১৪দিন পর গত ১৬ জুন ১০ লাখ টাকা মুক্তিপণ দিয়ে জলদস্যুদের কাছ থেকে মুক্তি পেয়েছেন পাথরঘাটার ছয় জেলে। ফলে প্রতিবছরের ন্যায় এবারও জলদস্যু আতঙ্ক বিরাজ করছে দক্ষিণাঞ্চলের জেলেপল্লীতে। এদিকে জলদস্যুদের বিরুদ্ধে র‌্যাব-৮ এর সদস্যরা জিহাদ ঘোষণা করে অভিযান শুরু করেছেন। গত বছরের অক্টোবর থেকে চলতি মাসের ১৫ জুন পর্যন্ত র‌্যাবের সফল অভিযানে ছয়টি জলদস্যু বাহিনীর প্রধানসহ ১১ সক্রিয় সদস্য বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছে। এ সময় র‌্যাব সদস্যরা উদ্ধার করেছেন দস্যু পাসসহ বিপুল পরিমাণ আগ্নেয়াস্ত্র। র‌্যাব সূত্রে জানা গেছে, এ অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

সূত্রমতে, প্রতিবছর বঙ্গোপসাগরে একের পর এক জলদস্যু বাহিনীর হামলার শিকার হয়ে শত শত জেলে নিঃস্ব হয়ে গেছেন। অনেকে ইলিশ ধরাও বন্ধ করে দিয়েছেন। জলদস্যুদের কাছ থেকে পঞ্চাশ থেকে লাখ টাকা মূল্যের আগাম ‘দস্যু কার্ড’ সংগ্রহ করা হলে জেলেদের অপহরণ করা হবে না বলেও তাকিত দিচ্ছে দস্যুবাহিনী। গত ৩ জুন বেলা সাড়ে ১১টার দিকে বঙ্গোপসাগরের নারিকেলবাড়িয়া এলাকায় এফবি ফারজানা, এফবি এলাহী ভরসা ও এফবি আল্লাহর দানসহ কয়েকটি ট্রলারে হামলা চালিয়ে লুটপাট করেছে জলদস্যুরা। এ সময় অপহরণ করা হয় একাধিক জেলেকে। পরে মোটা অঙ্কের টাকা দিয়ে জেলেদের ছাড়িয়ে আনতে হয়েছে। এছাড়াও ইলিশ শিকার করতে গিয়ে বঙ্গোপসাগর থেকে জলদস্যুরা মুক্তিপণের দাবিতে ছয় জেলেকে ট্রলারসহ অপহরণ করে। অপহরণের ১৪দিন পর (১৬ জুন) অপহৃত জেলে লোকমান হোসেন, খলিলুর রহমান, ইব্রাহিম, আনিসুর রহমান, জাকির হোসেন ও সোলায়মান মাঝির পরিবারের সদস্যরা ১০ লাখ টাকা মুক্তিপণ দিয়ে তাদের মুক্ত করেন। অপহৃত জেলেরা জানান, জলদস্যু জাহাঙ্গীর বাহিনী সাগর থেকে তাদের ধরে নিয়ে সুন্দরবনের গহীনে আটকে রেখে মুক্তিপণের দাবিতে অমানুষিক নির্যাতন চালায়। পরবর্তীতে বিকাশের মাধ্যমে মুক্তিপণের টাকা পেয়ে ১৬ জুন সকালে জলদস্যুরা তাদের বাগেরহাটের মংলার কোন এক স্থানে এনে ছেড়ে দিয়েছে।

বরগুনার পাথরঘাটার জেলে আব্দুল হালিম জানান, আগে বঙ্গোপসাগরে জলদস্যুদের উৎপাত কম ছিল। গত কয়েক বছর থেকে জলদস্যুদের উৎপাত বেড়ে গেছে। দস্যুরা নতুন নিয়ম বের করেছে। তাদের কাছ থেকে আগাম কার্ড সংগ্রহ করতে হবে নইলে গত কয়েক বছরের ন্যায় এবারও অপহরণ করা হবে। আর তাদের দাবিকৃত মুক্তিপণের টাকা না দিলে হত্যা করে সাগরে ফেলে দেবে। তাই চিন্তা করেছি সাগরে আর মাছ ধরতে যাব না, অন্য কোন কাজ করে সংসার চালাব। তালতলী উপজেলার নিদ্রা গ্রামের ট্রলার মালিক আলমগীর হোসেন বলেন, আমার ট্রলার একবার জলদস্যুদের হামলার শিকার হয়েছিল। সে সময় ট্রলারে থাকা জেলেদের মধ্যে তিনজনকে অপহরণ করে নিয়ে যায় জলদস্যুরা। আমি আমার নিজের জমি বিক্রি করে তাদের ছাড়িয়ে এনেছি। তাই দরকার হলে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে না খেয়ে থাকব তারপরও আর ট্রলার সাগরে পাঠিয়ে মাছের ব্যবসা করব না।

বরগুনা জেলা মৎস্য ট্রলার মালিক সমিতির সভাপতি মোস্তফা চৌধুরী জানান, প্রতি ইলিশ মৌসুমে জেলেরা সাগরে নিরাপত্তার জন্য সুন্দরবনের জলদস্যুবাহিনীগুলোর কাছ থেকে ট্রলারপ্রতি ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকা দিয়ে টোকেন সংগ্রহ করে সাগরে যেত। তার পরও নতুন নতুন দস্যুবাহিনীর কবলে পড়তে হতো জেলেদের। তিনি আরও জানান, গত বছর ইলিশ মৌসুমে পাথরঘাটার জেলেরা সরকারী নিরাপত্তায় সাগরে মাছ ধরার প্রতিশ্রতির কারণে জলদস্যুদের কাছ থেকে টোকেন সংগ্রহ করেননি। এ কারণে ওই মৌসুমে পাথরঘাটার ১৮ জেলেকে দস্যুদের হাতে প্রাণ দিতে হয়েছে।

র‌্যাবের সফল অভিযান ॥ বরিশাল র‌্যাব-৮ এর উপ-অধিনায়ক মেজর আদনান জানান, বিগত সময়ে সুন্দরবন সংলগ্ন নদী বিধৌত অঞ্চলে একাধিক জলদস্যু বাহিনী বিপুলসংখ্যক নিরীহ জেলেকে অপহরণ, মুক্তিপণ আদায়সহ হতাহতের ঘটনা ঘটিয়েছে। সম্প্রতি দস্যুদের বিরুদ্ধে র‌্যাবের জিহাদ ঘোষণা করে র‌্যাব সদস্যসহ বিভিন্ন আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিশেষ অভিযান অব্যাহত থাকায় ক্রমেই দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের উপকূলীয় অঞ্চলে জলদস্যুদের অপতৎপরতা অনেকাংশে কমে গেছে। সূত্রমতে, বিগত সময়ে র‌্যাব-৮ এর অব্যাহত অভিযানে একাধিক জলদস্যু বাহিনীর প্রধান নিহত হবার পাশাপাশি উদ্ধার করা হয়েছে বিপুল পরিমাণ দেশী-বিদেশী অস্ত্র ও গোলাবারুদ। সর্বশেষ গত ১৫ জুন ভোরে সুন্দরবনের বাগেরহাটের শরণখোলা উপজেলা রেঞ্জের কাতলারখাল এলাকায় র‌্যাবের সঙ্গে আধাঘণ্টাব্যাপী বন্দুকযুদ্ধে জলদস্যু জামাল বাহিনীর প্রধান নুরুজ্জামান জামাল ওরফে শাহ জামাল (৩৫) নিহত হয়েছে। এসময় দস্যুদের ব্যবহৃত একটি পিস্তল, ৭টি একনলা বন্দুক, ২টি এয়ারগান, ৪টি কাটা বন্দুক, ৮টি দেশীয় তৈরি ধারালো অস্ত্র, ১৪টি বন্দুকের তাজা কার্তুজ, ২৭ রাউন্ড রাইফেলের গুলি, ৫৭টি এয়ারগানের গুলি, ৩৫টি বন্দুকের ফায়ারকৃত কার্তুজ, বিপুল পরিমাণ রশদসামগ্রী, চাঁদা আদায়ের কার্ড ও তৈজসপত্র উদ্ধার করা হয়। নিহত জলদস্যু প্রধান নুরুজ্জামান জামাল ওরফে শাহ জামাল বরগুনা জেলার পাথরঘাটা উপজেলার পদ্মা গ্রামের রুস্তম হাওলাদারের পুত্র। এরপূর্বে ১০ মে সুন্দরবনের চাঁদপাই রেঞ্জের নন্দবালা খালের পূর্বপাশের গহীন জঙ্গলের ভেতরে বসে র‌্যাবের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে ‘মাইজ্যা বাহিনীর’ দুই সক্রিয় দস্যু সদস্য নিহত হয়। ওই সময়ও বিপুল অস্ত্র-গোলাবারুদ উদ্ধার করা হয়েছে। ২৬ ফেব্রুয়ারি সুন্দরবনের শরণখোলা রেঞ্জের কাতলারখালের দক্ষিণ পাশের গহীন জঙ্গলে র‌্যাবের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছে ‘সাগর-সৈকত’ বাহিনীর তিন সদস্য। ৯ জানুয়ারি পশুর নদী সংলগ্ন সীমানার খালে দারোগা বাহিনীর উপ-প্রধান সগীর হাওলাদার নিহত হয়। এর আগে গত বছরের (২০১৪ সালের) ১১ নবেম্বর একই রেঞ্জের আন্ধারমানিক ফরেস্ট ক্যাম্পের উত্তরপাশে শ্যালাগাংস্থ আরবারিয়া খাল এলাকায় বনদস্যু দারোগা বাহিনীর প্রধানসহ দুইজন ও একই বছরের ৮ অক্টোবর সুন্দরবনের চাঁদপাই রেঞ্জের শ্যালাগাংয়ের মিরগামারিস্থ ফরেস্ট ক্যাম্পের পশ্চিমপাশে র‌্যাব-৮ এর সদস্যদের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে আউয়াল বাহিনীর দুই সদস্য নিহত হয়েছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে র‌্যাবের একাধিক কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, জলদস্যু দমন ও আস্তানা শনাক্তকরণের জন্য জলদস্যুপ্রবণ এলাকায় র‌্যাব-৮ এর একাধিক গোয়েন্দা টিম তাদের কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছেন।

মুক্তিপণ দিয়ে ফিরে আসা জেলেরা জানান, র‌্যাবের তৎপরতা বৃদ্ধি পাওয়ার পর জলদস্যুরা সুন্দবনের শরণখোলা রেঞ্জের সুপতি, চান্দেশ্বর, কচিখালী, কটকা অঞ্চলের দরজার খাল, কাতলারখাল, খুনের খাল, বলেশ্বর নদী সংলগ্ন মোহনা এলাকার গহীন জঙ্গলের গাছের ওপর নিরাপত্তা চৌকি বসিয়ে আস্তানা গেড়েছে। তারা আরও জানান, সাগরের একেক এলাকায় একেকটি দস্যু বাহিনী নিয়ন্ত্রণ করে। বর্তমানে সুন্দরবন সংলগ্ন পশুর নদী, মংলা অঞ্চল, বলেশ্বর নদী সংলগ্ন শরণখোলা, পাথরঘাটা ও চরদুয়ানী এলাকার কয়েকটি দস্যু বাহিনী সক্রিয় রয়েছে।

জলদস্যুরা আইলার চেয়েও ভয়ঙ্কর ॥ আইলা, বন্যা-ঝড়-জলোচ্ছ্বাসের চেয়েও দক্ষিণাঞ্চলের জেলেদের কাছে ভয়ঙ্কর রুদ্রমূর্তি হচ্ছে জলদস্যু। মেহেন্দীগঞ্জের ভাষানচর এলাকার জেলেপল্লীর বাসিন্দা বজলুর রহমান বলেন, ঝড়-বন্যার তবুও আলামত পাওয়া যায়, কিন্তু জলদস্যুদের কোন আলামত পাওয়া যায় না। হঠাৎ করে এসে দস্যুরা জেলেদের সর্বস্ব কেড়ে নিয়ে যায়। বজলুর রহমানের স্ত্রী আজিমোন নেছা জানান, মৎস্য শিকারে যাবার পর ফিরে না আসা পর্যন্ত স্বামীর চিন্তায় তিনি অস্থির থাকেন। আকাশে মেঘ নেই, গাঙ্গে বানের কিংবা তুফানের আলামত নেই। তবুও তার উৎকণ্ঠা। না জানি কখন জলদস্যুরা হানা দিয়ে কেড়ে নেয় তার স্বামীর জীবন। এ চিন্তা শুধু আজিমোনের একারই নয়; উপকূলের জেলে পরিবারের সকল বধূ ও তাদের পরিবারের। কারণ, মেঘনা নদী থেকে শুরু করে বঙ্গোপসাগরে ইলিশ শিকারীদের পাশাপাশি ঘুরে বেড়ায় জলদস্যু নামের একদল হায়েনা। জেলেরা জানান, বঙ্গোপসাগর ও তৎসংলগ্ন নদীগুলোতে নৌ-ডাকাতির সঙ্গে জড়িত জলদস্যুদের অধিকাংশই থাকে সুন্দরবনের গহীন অরণ্যে। আরও কয়েকটি গ্রুপ থাকে লক্ষীপুর, মনপুরা ও চরফ্যাশনের দূরবর্তী কালকিনি এলাকায়। অত্যাধুনিক অস্ত্র নিয়ে ওসব দস্যু নৌপথে চলাচল করে। গত দু’বছর ধরে ডাকাতির পরিবর্তে উপকূলের জলদস্যুরা সোমালিয়ার জলদস্যুদের মতো জেলেদের অপহরণ করে মুক্তিপণ আদায় করে আসছে।

প্রকাশিত : ১৮ জুন ২০১৫

১৮/০৬/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন

প্রথম পাতা



ব্রেকিং নিউজ: