মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
১০ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শনিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ

পশ্চিমারা কেন মধ্যপ্রাচ্যে হাত গুটিয়ে

প্রকাশিত : ১৭ জুন ২০১৫
  • এনামুল হক

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্য থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিচ্ছে। সেখানকার টালমাটাল পরিস্থিতিতে সে আর জড়িত থাকতে চাইছে না। মধ্যপ্রাচ্যের এখনকার দৃশ্যপট বড়ই নিরানন্দ। গোটা অঞ্চলের রাজনৈতিক ব্যবস্থা ধসে পড়েছে। গৃহযুদ্ধে ক্ষতবিক্ষত হয়ে চলেছে সিরিয়া, ইরাক ও লিবিয়া। ইসলামী স্টেটের (আইএস) কালো আলখাল্লাধারী জিহাদীরা খিলাফত গঠন করেছে। আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারের জন্য ইয়েমেন ও অন্যত্র প্রক্সি যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছে সৌদি আরব ও ইরান। তিউনিসিয়ায় আপাতত বজায় রয়েছে এক ভঙ্গুর গণতন্ত্র। অন্যদিকে মিসরে কায়েম হয়েছে হোসনি মোবারকের সময়ের চেয়েও কঠিন ধরনের স্বৈরাচারী ব্যবস্থা। এই টালমাটাল অবস্থা থেকে আপাতত রক্ষা পেলেও দুটি দেশ লেবানন ও জর্দান ভরে উঠেছে উদ্বাস্তুর ঢলে।

বলাবাহুল্য মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান এই বেহাল অবস্থার জন্য যুক্তরাষ্ট্রই বহুলাংশে দায়ী। ২০০৩ সালে ইরাকে মার্কিন আগ্রাসন ও দখলদারীর মধ্য দিয়ে এই ভাঙ্গনের প্রক্রিয়া শুরু হয়। তখন মার্কিন সামরিক শক্তি রুদ্রমূর্তি ধারণ করেছিল। ইরাকে মোতায়েন ছিল দুই লক্ষাধিত মার্কিন সৈন্য। আফগানিস্তানে ওদের সংখ্যা ছিল লক্ষাধিক। ওবামার আমলে মধ্যপ্রাচ্য ও অন্যান্য স্থান থেকে সামরিক শক্তি গুটিয়ে নেয়ার পালা শুরু হয়। গত মে মাসে ওবামা বলেন, যুক্তরাষ্ট্র এখন আর কোথাও বড় ধরনের স্থলযুদ্ধে লিপ্ত নেই। আফগানিস্তানে মার্কিন সৈন্য সংখ্যা এখন নেমে এসেছে ১০ হাজারে। ইরাকে ২৬৭৯। তুরস্কে প্রায় দেড় হাজার, কুয়েতে ১১৩১৩, বাহরাইনে ৩৩৬৯, কাতারে ৬০৭, আমিরাতে ৩৫০।

অথচ কয়েক দশক ধরে স্ট্র্যাটেজিক কারণে এই মধ্যপ্রাচ্যের উপরই ছিল যুক্তরাষ্ট্রের মূল দৃষ্টি নিবদ্ধ। আজ যুক্তরাষ্ট্রের সেই দৃষ্টি সরে গেছে পূর্ব এশিয়ায়। মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্ব তার কাছে কমে গেছে। তাই সেখানে যতই মারামারি কাটাকাটি বা ল-ভ- অবস্থা চলুক যুক্তরাষ্ট্র আর নিজেকে জড়াতে চাইছে না। তার প্রমাণ হিসেবে রয়েছে ইরাক ও সিরিয়া। সব ধরনের শিয়া সুন্নিদের মধ্যে লড়াইয়ের কারণে এই দেশ দুটি খ--বিখ- হচ্ছে। আইএস ইতোমধ্যে এ দুটো দেশের বেশকিছু ভূখ- দখলে নিয়ে কায়েম করেছে খিলাফত। সিরিয়ার বাশার সরকার ব্যাপক লোক হত্যা করেছে। আমেরিকা এই করবে সেই করবে বলে অনেক রকম হুমকি দিয়েছে। বাস্তবে কিছুই করেনি। সেখানকার বিদ্রোহী শক্তিকে কোন সাহায্য দেয়নি। তেমনি সাহায্য দেয়নি লিবিয়ার গাদ্দাফীবিরোধী শক্তিকে। অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহে উপসাগরের কোন কোন রাজতন্ত্র হুমকির মুখে পড়েছে। আমেরিকা মুখে যাই বলুক তার এই ঘনিষ্ঠ মিত্রদের জন্য কিছুই করেনি। এই রাজতন্ত্রগুলো এমনকি আমেরিকার অতি ঘনিষ্ঠ মিত্র ইসরাইল পর্যন্ত নিজেদের পরিত্যক্ত বলে মনে করেছে।

টালমাটাল মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার এখন মূল কর্মকা- বলতে রয়েছে পরমাণু প্রশ্নে ইরানের সঙ্গে সমঝোতা চুক্তিতে উপনীত হওয়ার এবং ফিলিস্তিন ও ইসরাইলের মধ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠার চেষ্টা। সিরিয়ার মধ্যপন্থী বিদ্রোহীদের তৃতীয একটি শক্তিকে আমেরিকা ট্রেনিং দিচ্ছে বটে। তবে সেটা বেশ মন্থর গতিতে চলছে। সিরিয়ায় আইএস ঘাঁটিতে মাঝেমধ্যে মার্কিন বিমান হামলা চালানো হলেও সে হামলা তেমন জোরালো নয়। অতিসম্প্রতি প্যারিসে এক বৈঠকে ইরাকী প্রধানমন্ত্রী আইএস হুমকি মোকাবেলায় মার্কিন সাহায্য সমর্থনের অভাবের কথা ক্ষোভের সঙ্গে উল্লেখ করেছেন। আমেরিকার এই নিষ্ক্রিয় ও নির্লিপ্ত ভূমিকাকে ব্যঙ্গ করেছে ইরানও। সে দেশের বৈদেশিক অভিযানে নিয়োজিত কুদস বাহিনীর প্রধান বলেছেন যে একমাত্র ইরান ও তার মিলিশিয়া ক্লায়েন্টরা আইএসের বিরুদ্ধে লড়াই করতে ইচ্ছুক। এদিকে পরমাণু প্রশ্নে ইরান মার্কিন সমঝোতা চেষ্টাকে নিয়ে মার্কিন মিত্ররা বিশেষ করে ইসরাইল বেশ রুষ্ট। উপসাগরীয় আরব দেশগুলোও যথেষ্ট অস্বস্তিতে রয়েছে এবং বেশ খানিকটা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। ইরানের রাশ টেনে ধরতে আমেরিকার কাছ থেকে যে কমিটমেন্ট তারা চেয়েছিল তা তারা পায়নি। মার্কিন ইরান সমঝোতার প্রয়াস সম্পর্কে যুক্তরাষ্ট্রের গবেষণা প্রতিষ্ঠান ব্রুকলিন ইনস্টিটিউশনের এক কর্মকর্তা বলেন, এই সমঝোতার উদ্দেশ্য ইরানকে নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের শয্যাযাপনের চেষ্টা নয় বরং সৌদি আরবের সঙ্গে শয্যাযাপন থেকে বেরিয়ে আসা।

কিন্তু কেন যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যের এই অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতিতে নিজের হাত গুটিয়ে রেখেছে? তার উত্তরে বলা যায় যে মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক গুরুত্ব যুক্তরাষ্ট্রের কাছে আর আগের মতো নেই। স্নায়ুযুদ্ধের অধ্যায় তো আগেই শেষ হয়ে গেছে। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে সন্ত্রাসবাদের আজ যে অবস্থা তা এই মুহূর্তে নিজ ভূখ-ের জন্য হুমকি নয় বলে মনে করে যুক্তরাষ্ট্র। এরপর আছে তেল। ফ্র্যাকিং প্রযুক্তির বদৌলতে যুক্তরাষ্ট্র আজ বিশ্বের অন্যতম তেল উৎপাদনকারী দেশে পরিণত হয়েছে। এক দশকের মধ্যে উত্তর আমেরিকা তার চাহিদার পুরো তেল ও গ্যাস উৎপাদন করতে পারবে। আমেরিকার ভূরাজনীতিতে এখন এক নম্বর অগ্রাধিকার ক্রমবর্ধমান উচ্চাভিলাষী চীনকে মোকাবেলা করা। তাছাড়া এশিয়া প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল আজ বিশ্ব রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কর্মযজ্ঞের প্রধান ক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। সে কারণে ও দিকেই এখন চলে গেছে আমেরিকার মূল দৃষ্টি। সে জন্যই সে মধ্যপ্রাচ্যে আর জড়াচ্ছে না এবং হাত গুটিয়ে রেখেছে। এতে যে শূন্যতা সৃষ্টি হয়েছে তাতে সংঘাত বিশৃঙ্খলা ও অরাজকতা দেখা দিয়েছে।

সূত্র : দি ইকোনমিস্ট

প্রকাশিত : ১৭ জুন ২০১৫

১৭/০৬/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: