আংশিক মেঘলা, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৭ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, বুধবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

কেন আলবদরদের জন্য ফাঁসিও যথেষ্ট নয়

প্রকাশিত : ১৭ জুন ২০১৫
  • মুনতাসীর মামুন

হবে কী হবে না? হ্যামলেটের সেই বিখ্যাত উক্তির মতো-‘টুবি অর নট টু বি’। মুজাহিদের দ-ের দু’একদিন আগে থেকে এ প্রশ্নটিই ঘুরপাক খাচ্ছিল বিভিন্ন মহলে। উন্নয়নের ধাক্কায় যখন রাস্তাঘাট বিপর্যস্ত, মানুষ ঘর্মাক্ত ও বিরক্ত তখনও এ প্রশ্ন ছিল অনেকের মুখে। আমাকে ফোন করে জানতে চেয়েছেন অনেকে, যেন আমি সবজান্তা। আমি পরে নিজেকে প্রশ্ন করেছি, এ উদ্বেগ কেন সবার মাঝে? মানবতাবিরোধী অপরাধ বিচারের দণ্ড হওয়ার পর আপীল বিভাগে গেলে কেন এ প্রশ্ন ওঠে? এর অর্থ মানুষের সম্পূর্ণ আস্থা নেই। না থাকার কারণ কি? কারণ, পূর্ববর্তী কয়েকটি রায়ে ইতিহাস অমান্য করে দণ্ড হ্রাস বা মওকুফ। আইন দিয়ে ইতিহাস ঠেকানো কেউ পছন্দ করেনি একমাত্র জামায়াত-বিএনপি ছাড়া। এ বিষয়টি আইনের সঙ্গে যারা জড়িত তাদের সবার ভেবে দেখা উচিত। পদে গেলে পদ এক সময় সবাইকে হারাতে হয়। তখন? উচ্চ আদালতের অনেক বিচারককে প্রকাশ্যে কেন দেখা যায় না পদ হারানোর পর। এর মধ্যে প্রধান বিচারপতিই আছেন কয়েকজন। সাম্প্রতিককালে একমাত্র বিচারপতি খায়রুল হক-ই দিব্যি হেসে খেলে অবসরোত্তর জীবন যাপন করছেন। কেন?

এসব প্রশ্ন আরও তীক্ষè হয়েছিল বিচারপতি শামসুদ্দীন চৌধুরীকে এই বেঞ্চে না রাখার কারণে। তার ভক্তের সংখ্যা যেমন প্রচুর, তাকে অপছন্দ করেন এমন সংখ্যাও কম নয়। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের ব্যাপারে তার অবিচল পক্ষপাত অনেককে বিচলিত করে।

এখানেই প্রশ্ন আসে আইন ও ইতিহাস নিয়ে। প্রশ্ন ওঠে বিচারের সব পক্ষের দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে এবং সেই দৃষ্টিভঙ্গি আইন ও ইতিহাসকে পর্যুদস্ত করছে কিনা তা নিয়ে। সে আলোচনা পরে।

॥ দুই ॥

‘যুদ্ধাপরাধ আবার কী? বাংলাদেশে কোন যুদ্ধাপরাধী নেই।’ ২০০১ সালে মুজাহিদ এ রকম ঔদ্ধত্যভরেই কথা বলতেন। তার দাম্ভিকতা ঔদ্ধত্য কখনই কেউ পছন্দ করেনি। মানবতাবিরোধী অপরাধীদের মধ্যে একমাত্র সাকাচৌ-ই এ বিষয়ে তার সঙ্গে পাল্লা দিতে পারেন। মুজাহিদকে আমার সব সময় মানবতাবিরোধী অপরাধীদের মধ্যে সবচেয়ে ঠা-া মাথার ও ধূর্ত মনে হয়েছে। অবশ্য, বলতে পারেন এ ধরনের অপরাধীরা ঠা-া মাথার না হলে এত হত্যাকা- বা ধর্ষণ কিভাবে করেছিলেন? খালেদা জিয়া মুজাহিদকে খুব পছন্দ করতেন। কখনও নির্বাচনে না জিতলেও খালেদা ২০০১ সালে মুজাহিদকে সমাজকল্যাণমন্ত্রী বানিয়েছিলেন। একটি বিষয় লক্ষণীয়, খালেদা জামায়াতের যে দু’জনকে মন্ত্রী বানিয়েছিলেন নিজামী ও মুজাহিদ তারা দু’জনই ছিলেন ১৯৭১ সালে আলবদর কমান্ডার ও উপ-কমান্ডার। রক্তের প্রতি খালেদার এক অদম্য আসক্তি আছে। তার প্রমাণ ২০০১-৬ ও ২০১৩-১৪ সালের ঘটনাবলি। কত মানুষ যে পুড়িয়েছেন তিনি! রক্তের প্রতি আসক্তির কারণেই ঐ দু’জনকে মন্ত্রী করেছিলেন। মুজাহিদ সমাজকল্যাণমন্ত্রী হয়ে সারাদেশে সরকারী টাকায় জামায়াতী প্রতিষ্ঠানগুলো শক্তিশালী করেছিলেন। আজ যে বিতর্ক উঠছে বিএনপি জামায়াত ছাড়বে কিনা তার উত্তর- না। আমরা ইতিহাস না জেনে বিতর্ক করি। জিয়াউর রহমান খুনীদের মাঠে এনেছিলেন তাদের ত্যাগ করার জন্য নয়, তার গু-া বাহিনী হিসেবে কাজ করার জন্য। জামায়াত বিএনপির গুণ্ডা বাহিনী হিসেবে কাজ করবে, আর গডমাদার তাকে প্রটেকশন দেবেন। এটি বাস্তব ও সাধারণ সত্য।

আলবদর আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ ১৯৭১ সালে তার বাহিনী নিয়ে প্রথমে অসম পরে দিল্লী জয় করতে চেয়েছিলেন। কেন পারেননি সে প্রসঙ্গ পরে। পালিয়েছিলেন নেপাল, তারপর পাকিস্তান। আলবদর বন্ধু জিয়াউর রহমানের আমলে ফিরে আসেন দেশে। জেনারেল জিয়ার স্ত্রীর আমলে মন্ত্রী। ট্রাইব্যুনালে বিচারের সময় দেখেছি কাঠের বেষ্টনীতে বসে। এত উত্থান পতন একজনের জীবনে খুব কমই আসে। ট্রাইব্যুনালের বিচারকরা যখন রায় পড়ছিলেন তখন মনে হয়েছিল এই আলবদর কমান্ডারকে ১৯৭১ সালে আমরা বলতাম আজরাইল।

মুজাহিদের পুরো পরিবার রাজাকার। তার পিতা শান্তি কমিটির সদস্য হিসেবে মানুষজন হত্যা, লুটপাট করেছেন। তার পুত্র পৃথিবীর ইতিহাসে হিংস্রতম একটি বদর বাহিনীর উপপ্রধান ছিলেন। বদর বাহিনী যা করেছে তার জন্য মৃত্যুদ-ও যথেষ্ট শাস্তি নয়।

১৯৭১ সালে পাকিস্তানী বাহিনীর সহযোগী হিসেবে বদর বাহিনীর সৃষ্টি হয়। জামায়াতে ইসলামীর ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্রসংঘ রূপান্তরিত হয় আলবদর বাহিনীতে। এর বাইরেও যে কিছু লোকজন আলবদর বাহিনীতে যোগ দেয়নি তা নয়। ইসলামী ছাত্রসংঘের (সারা পাকিস্তান) প্রধান মতিউর রহমান নিজামী নিযুক্ত হন আলবদর বাহিনীর প্রধান। মুজাহিদ ছাত্র সংঘের হোমরা চোমরা ছিলেন। ১৯৭১ সালেই তিনি পূর্ব পাকিস্তান ইসলামী ছাত্রসংঘের প্রধান হন, সে হিসেবে আলবদরদের উপকমান্ডার। বস্তুত মাঠে মুজাহিদের দাপটই ছিল বেশি। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে তার বিরুদ্ধে সাতটি অভিযোগ করা হয়েছিল। আসলে এত অভিযোগের দরকার ছিল না। বুদ্ধিজীবী হত্যায় জড়িত ও নেতৃত্বদানের কারণেই তিনি মৃত্যুদ-ে দ-িত হতেন। আলবদর নেতা হিসেবে হত্যার পরিকল্পনা পন্থা সবই তার নির্দেশে হতো। মুজাহিদের মতো হিংস্র মানুষ খুব কমই দেখা মেলে। তার সেই হিংস্রতা বয়সের কারণেও হ্রাস পায়নি। তার অবয়ব দেখলেই তা অনুমান করা যায়।

প্রত্যেক আলবদরই যুদ্ধাপরাধী। তারা ছিল পাকিস্তানী বাহিনীর সহযোগী শক্তি, তবে সরাসরি অধীনস্থ। তারা কখনও কখনও স্বাধীনভাবে কাজ করলেও পাকিস্তানী সেনা কমান্ডের অনুমতি ছাড়া সাধারণত কাজ করতে পারত না। তাদের প্রশিক্ষণ, বেতন, অস্ত্রশস্ত্র সব পাকিস্তানী বাহিনীই যোগাত। সুতরাং ১৯৭১ সালের খুন, ধর্ষণ, হত্যা, লুট, অগ্নিসংযোগ প্রভৃতির দায়দায়িত্ব তাদের ওপরও বর্তায়। পাকিস্তান বাহিনীর ওপর নির্ভরতা ও তাদের হয়ে কাজ করার প্রমাণ এখনও পাওয়া যাচ্ছে। মনসুর খালেদের বইয়ের একটি অধ্যায় আছে ‘আলবদরদের অবদান’। তিনি বিভিন্ন সাক্ষাতকার, পত্রপত্রিকা থেকে আলবদর সম্পর্কে পাকিস্তানীদের বিবৃতি, বক্তৃতা সঙ্কলন করেন।

এসব পাকিস্তান সরকার ও পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর সঙ্গে তাদের সম্পৃক্ততাই তুলে ধরে এবং এগুলো যুদ্ধাপরাধের প্রমাণ।

মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলী ‘অপারেশন সার্চ লাইটের’ সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। বেসামরিক প্রশাসনের দেখাশোনাও তিনি করতেন। বুদ্ধিজীবী হত্যার জন্য তিনি দায়ী এ কথা অনেকেই বলেছেন। আমি ও মহিউদ্দিন আহমদ যখন তার সাক্ষাতকার নিই রাওয়ালপিন্ডিতে, তখন তিনি ১৯৭১ সালের গণহত্যার কথা অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেছেন, (১৯৯৮) আমাকে যে রাজাকার, আলবদর, আলশামস সবকিছু ছিল নিয়াজীর নিয়ন্ত্রণে। তিনি এর কিছুই জানেন না। ৯-১০ ডিসেম্বরের একটি ঘটনার কথা তিনি উল্লেখ করেছেন। তার ভাষায়-

‘শুনুন, জেনারেল শামসের ছিলেন পিলখানার দায়িত্বে। তিনি আমাকে তার সঙ্গে দেখা করতে বলেন। তিনি জানান, আমাদেরকে জেনারেল নিয়াজীর সঙ্গে দেখা করতে হবে। জেনারেল নিয়াজীর সঙ্গে সাধারণত আমাদের কোন বৈঠক হয় না। জেনারেল শামসেরকে বললাম, ঠিক আছে যাব। পিলখানায় পৌঁছতে পৌঁছতে সন্ধ্যা হয়ে এলো। সেখানে দেখলাম কিছু গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, গাড়িগুলো দাঁড়িয়ে কেন? তিনি বললেন, বিশেষ উদ্দেশ্যে আমরা জেনারেল নিয়াজীর কাছে যাচ্ছি, সে জন্যই গাড়িগুলো এখানে। তারপর বললেন, কয়েকজন লোককে গ্রেফতার করতে হবে। জিজ্ঞেস করলাম, কেন? বললেন, কথাটা নিয়াজীকেই তুমি জিজ্ঞেস কর। এতে তোমার মত কি? আমি বললাম, স্যার, এখন কাউকে গ্রেফতারের সময় নয়, বরং এখন কত লোক আমাদের সঙ্গে আছে সেটিই দেখার বিষয়।’

এই যে গ্রেফতার ও গাড়িগুলোর কথা বলা হচ্ছে, এখানেই ইঙ্গিত আছে আলবদরদের। আলবদররা তখন বিভিন্ন এলাকায় হানা দিয়ে মানুষ তুলে নিচ্ছে। এ গাড়িগুলো আলবদরদের দেয়া হতো মানুষজনকে তুলে নেয়ার জন্য।

আমাকে যখন জেনারেল ফরমান এ কথাগুলো বলেন, তখন বোধহয় তিনি ভুলে গেয়েছিলেন ১৯৮৩ সালে দৈনিক জং ও দৈনিক নওয়ায়ে ওয়াক্তে এক সাক্ষাতকারে তিনি কি বলেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ‘আলবদর ও আলশামসের কার্যকলাপের আমি প্রত্যক্ষ দর্শক। এই দুটি সংগঠনের স্বেচ্ছাসেবীরা বিচ্ছিন্নতাবাদীদের মোকাবেলায় তাদের জান কুরবান করেছিল।’

জেনারেল নিয়াজী কিন্তু ব্যাপারটা অস্বীকার করেননি। আমাকে তিনি বলেছিলেন (১৯৯৮) ‘আলবদর, আলশামস আমারই সৃষ্টি। এ প্রক্রিয়াটি আমি শুরু করি মে মাস থেকে। ওরা সরাসরি আমার কমান্ডে ছিল।’

২১ মে ১৯৭১ সালে আলবদর বাহিনীর যাত্রা শুরু। যে মেজর রিয়াজ এদের সংগঠিত করেছিলেন। তিনি মনসুরকে জানিয়েছিলেন- ‘তারা বাঙালি হওয়া সত্ত্বেও পাকিস্তানের অখ-তা ও প্রতিরক্ষাকে ঈমানের অংশ ও দ্বীনের দাবি বলে মনে করতেন। ’

ব্রিগেডিয়ার সিদ্দিক সালিকের নাম আমাদের পরিচিত। ঢাকায় ১৯৭১ সালে তিনি ছিলেন। বইও লিখেছেন। ‘ম্যায়নে ঢাকা ডুবতে দেখা’ গ্রন্থে তিনি লিখেছিলেন, ‘আলবদর আলশামস ও রাজাকাররা পাকিস্তানের জন্য তাদের জীবনকে উৎসর্গ করেছিলেন। যে কোন আদেশ তারা সম্পূর্ণভাবে পালন করত।’

ভাল বলেছেন আলবদরদের সুপার বস আবুল আলা মওদুদী। ১৯৭৩ সালে করাচীর দৈনিক জসরত পত্রিকায় তিনি বলেন, পূর্ব পাকিস্তানে যখন বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন চলছে তখন আলবদররা পাকিস্তানের ঐক্যের পক্ষে কাজ করছিল। আর যখন পাকিস্তানী বাহিনী দুষ্কৃতকারী ও ভারতীয় বাহিনীর গেরিলাদের বিরুদ্ধে অভিযান চালায় তখন এই তরুণরা পাক বাহিনীর পুরোপুরি সহযোগিতা করে। এমনকি সেনাবাহিনীর সাফল্য এই তরুণদের ওপর নির্ভর করেই অর্জিত হচ্ছিল। কেননা সেনাবাহিনীর বিরাট অংশ ছিল পশ্চিম পাকিস্তানের। তারা পূর্ব পাকিস্তানের রাস্তা-ঘাট ও ভাষা জানত না বা চিনত না। ওই সময়ে এই তরুণরা ইসলামের প্রতি ভালবাসা ও দেশপ্রেমে উদ্বেলিত হয়ে সামনে এগিয়ে যায় এবং তারা ভারতীয় বাহিনীর আগ্রাসী হামলা প্রতিহত করার জন্য স্বদেশী বাহিনীকে পূর্ণরূপে সাহায্য করে। তারা প্রচুর কুরবানী স্বীকার করে। এরাই ছিল সেই নওজোয়ান যারা পাক বাহিনীর অগ্রপথিক ছিল। তাদের মধ্য থেকে প্রায় ৫ হাজার ওই সঙ্কটময় পরিস্থিতিতে শহীদ হয়েছেন আর যারা জীবিত রয়ে গেছেন তারা আপন বাঙালি ভাইদের হাতে এখন শহীদ হচ্ছেন।’

৫০০০ আলবদর নিহত হলে তো আমরা বেঁচে যেতাম। নিহতের সংখ্যা অনেক কম। আর বাংলাদেশ হওয়ার পর তাদের কোথায় নিধন করা হয়েছে? হয়নি। তবে, ধরে নিতে হবে পাকিস্তানীরা বিশেষ করে পাকিস্তানের জেনারেল ও ‘মৌলানা’রা মিথ্যা বলায় অভ্যস্ত।

॥ তিন ॥

মানবতাবিরোধী অপরাধের সঙ্গে জড়িত যাদের বিচার হয়েছে তাদের অধিকাংশই আলবদর বাহিনীর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। কারণ, তখন তারা তরুণ হিসেবে ইসলামী ছাত্রসংঘের সঙ্গে জড়িত হয়ে গিয়েছিলেন। আর পুরো ছাত্রসংঘ রূপান্তরিত হয়েছিল আলবদরে। মতিউর রহমান নিজামী ছিলেন আলবদর প্রধান, মুজাহিদ উপ-প্রধান, কামারুজ্জামান ছিলেন শেরপুরের কমান্ডার। নয়াদিগন্ত পত্রিকার মালিক মীর কাসিম ছিলেন চট্টগ্রামের, কাদের মোল্লা ছিলেন মিরপুরের।

সশস্ত্র আলবদররা রাজাকার, শান্তি কমিটি থেকেও ছিল বেশি সংগঠিত,অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত ও বেশি হিংস্র। বস্তুত, যুদ্ধাপরাধী যতজন গ্রেফতার হয়েছেন তার মধ্যে মুজাহিদ ছিলেন সবচেয়ে হিংস্র। ১৯৭১ সালে তিনি বলেছিলেন- ‘পাকিস্তান ইসলামী ছাত্রসংঘ পৃথিবীতে হিন্দুস্থানের কোন মানচিত্র স্বীকার করে না। ইসলামী ছাত্রসংঘ ও আলবদর বাহিনীর কাফেলা দিল্লীতে উপনীত না হওয়া পর্যন্ত ছাত্রসংঘের একটি কর্মীও বিশ্রাম গ্রহণ করবে না।

এখন থেকে দেশের কোন পাঠাগার, গ্রন্থাগার, পুস্তক বিক্রয় কেন্দ্র বা দোকানে পাকিস্তানের আদর্শবিরোধী কোন পুস্তক রাখা চলিবে না। কোন স্থান, গ্রন্থাগার ও দোকানে পাকিস্তানের আদর্শ ও সংহতিবিরোধী পুস্তক দেখা গেলে তা আগুনে পোড়ানো হবে।’

আগে যে বলেছি, আলবদরের সর্বোচ্চ শাস্তিও যথেষ্ট নয় তার একটি কারণ আছে। একজন মানুষ আরেকজনকে খুন করতে পারে গুলি করে, ছুরিকাঘাত করে ও নানাভাবে। কিন্তু ঢাকার আলবদররা মুজাহিদের নির্দেশে সাত মসজিদ রোডের ফিজিক্যাল ট্রেনিং ইনস্টিটিউটে মানুষজনকে জড়ো করত এবং নানাবিধ অত্যাচার করত, তারপর হত্যা করত বিচিত্র সব উপায়ে। আজ অনেক তরুণ যখন জামায়াতের প্রতি সমবেদনা প্রকাশ করে তখন বলতে ইচ্ছে হয় এদের পিতা-মাতাকে মুজাহিদদের হাতে তুলে দিলে কেমন হয়? বা বিএনপির যেসব তরুণ জামায়াতের তরুণদের সঙ্গে গলাগলি করে গাড়ি পোড়ায়, পুলিশ হত্যা করে তাদের বা তাদের পিতা-মাতাকে আলবদরদের হাতে তুলে দিলে বা তাদের হাতে মৃত্যু হলে তারা জামায়াত সমর্থন করত?

আলবদররা কী করেছিল? এ প্রশ্ন শুনে অনেকে বলতে পারেন সবাই যা জানে সে বিষয়ে প্রশ্নের তাৎপর্য কী? আলবদর পাকিস্তানীদের সাহায্য করেছিল মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের ব্যক্তিদের দমনে। এ কারণে, একদিকে পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর সঙ্গে মিলে গেরিলা/সম্মুখযুদ্ধে অংশ নিয়েছে। অন্যদিকে, নিরীহ বাঙালিদের বাড়িঘর লুট করেছে, হত্যা করেছে ও ধর্ষণ করেছে। এথনিক ক্লিনজিংয়ে নেতৃত্ব দিয়েছে। কিন্তু, আলবদর আরেকটি কাজ করেছে। তা হলো, সুনির্দিষ্টভাবে বুদ্ধিজীবী/পেশাজীবীদের হত্যা করেছে। আলবদর বাহিনী গঠন হওয়ার পর থেকেই এ হত্যাকা- পরিচালিত হয়েছে, তবে ডিসেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহে অপহরণ ও হত্যাকা- তুঙ্গে ওঠে। সারা বাংলাদেশে একযোগে বুদ্ধিজীবীদের অপহরণ ও হত্যা করা হয় পূর্ব পরিকল্পনা অনুসারে। অপহরণের পর নিষ্ঠুরভাবে অত্যাচার চালানো হয়। মাঝে মাঝে মনে হয়, আলবদর হোক, রাজাকার হোক, মানুষ কি মানুষের ওপর এমন অত্যাচার করতে পারে? ১৯৭১-৭২ সালের দৈনিক পত্রপত্রিকাগুলো দেখলে আলবদরদের নিষ্ঠুরতার অনেক খবর জানা যাবে।

রায়েরবাজার ও মিরপুরের বধ্যভূমি যা আবিষ্কৃত হয়েছিল ১৬ ডিসেম্বর, আলবদরদের নৃশংসতার প্রতীক। দুয়েকটি উদাহরণ দেয়া যাক- ‘আর একটু এগিয়ে যেতেই সামনে বড় বড় দুটো মস্ত মানুষ, নাক কাটা, কান কাটা, মুখের কাছ থেকে কে যেন খামচিয়ে মাংস তুলে নিয়েছে হাত-পা বাঁধা।...’

‘আর একটু এগিয়ে যেতেই বাঁ হাতের যে মাটির ঢিবিটা ছিল তারই পাদদেশে একটি মেয়ের লাশ। মেয়েটির চোখ বাঁধা । মুখ ও নাকের কোন আকৃতি নেই, কে যেন অস্ত্র দিয়ে তা কেটে খামচিয়ে তুলে নিয়েছে। স্তনের একটি অংশ কাটা.. মেয়েটি সেলিনা পারভীন। শিলালিপির এডিটর।...

‘মাঠের পর মাঠ চলে গিয়েছে। প্রতিটি ফলার পাশে পাশে হাজার হাজার মাটির ঢিবির মধ্যস্থ কঙ্কাল সাক্ষ্য দিচ্ছে কত লোক যে এই মাঠে হত্যা করা হয়েছে।’

‘ঢাকার রায়েরবাজারের বধ্যভূমি দেখে এসে এই প্রতিবেদন লিখেছিলেন অধ্যাপিকা হামিদা রহমান। হামিদা রহমান ডা. ফজলে রাব্বীর লাশ দেখে লিখেছিলেন-‘ডা. রাব্বীর লাশটা তখনও তাজা, জল্লাদ বাহিনী বুকের ভিতর থেকে কলিজাটা তুলে নিয়েছে। তারা জানত যে, তিনি চিকিৎসক ছিলেন। তাই তাঁর হৃৎপি-টা ছিঁড়ে ফেলেছে। চোখ বাঁধা অবস্থায় কাত হয়ে দেহটা পড়ে আছে। পাড় থেকে ধাক্কা দিয়ে গর্তের মধ্যে ফেলে দেয়া হয়েছে। রাব্বী সাহেবের পা দুখানা তখনও জ্বলজ্বল করে তাজা মানুষের সাক্ষ্য দিচ্ছে। নাক, মুখ কিছুই অক্ষত ছিল না। দস্যু হায়েনার নখের আঘাতে ক্ষত-বিক্ষত।... সামনে চেয়ে দেখি, নিচু জলাভূমির ভিতর এক ভয়াবহ বীভৎস দৃশ্য। সেখানে এক নয়, দুই নয় একেবারে বারো/তেরোজন সুস্থ সবল মানুষ। একের পর এক শুয়ে আছে।’

মওলানা আবদুর রশীদ তর্কবাগীশ বলেছিলেন ‘হানাদার পাক বাহিনীর সহযোগী আলবদররা পাক সেনাদের আত্মসমর্পণের পর যখন পালিয়ে যায় তখন তাদের হেড কোয়ার্টারে পাওয়া গেল এক বস্তা বোঝাই চোখ। এ দেশের মানুষের চোখ। আলবদরের খুনীরা তাদের হত্যা করে চোখ তুলে বস্তা বোঝাই করে রেখেছিল।’ [দৈনিক পূর্বদেশ, ১৯.১.১৯৭২] উল্লেখ্য, ডা. আলীম চৌধুরীর চোখ আলবদররা উৎপাটন করেছিল। মওলানা তর্কবাগীশ আরও বলেছিলেন, ‘খুনীদের নামে এই বাহিনীর নাম দেয়া হলো আলবদর বাহিনী। এ কি কোন মনঃপূত নাম? যে বদর যুদ্ধ ছিল আদর্শের জন্য, ইসলামের প্রথম লড়াই, সেই যুদ্ধের সঙ্গে কি কোন সংযোগ এই নৃশংসতার মধ্যে ছিল? হানাদারদের সহযোগী এই বদর বাহিনী শুধু ইসলামের শত্রু নয়। এরা হলো জালেম।’

(চলবে)

প্রকাশিত : ১৭ জুন ২০১৫

১৭/০৬/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: